কৃষকের সংগ্রামে ‘কৃষক সমিতি’ ইতিহাস
জাহিদ হোসেন খান :
মানব সভ্যতার ভিত্তি হলো কৃষি, আর তার কারিগর হচ্ছে কৃষক। প্রকৃতির সকল প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে তাকে আয়ত্বে এনে আজকে যে বিপুল প্রাচুর্য্য ও সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে তার কৃতিত্ব মূলত কৃষকের। কৃষকের ইতিহাস হলো লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস। এ লড়াইয়ে কৃষক কখনও পরাজিত হয়েছে, তারপর আবার উঠে দাঁড়িয়েছে, লড়াই করেছে, সংগ্রাম থেমে থাকে নাই।
ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের পর এদেশে জমিদাররা খাজনা আদায়ের জন্য কৃষকদের ওপর চরম নিপীড়ন চাপিয়ে দেয়, উৎপাদিত পণ্য কম দামে কিনতে কিংবা কেড়ে নিতে থাকে। উৎপাদক কৃষক ও কারিগরদের ওপর ইংরেজ শাসকরা নানা করের বোঝা চাপাতে থাকে। ইংরেজ বেনিয়াদের চাহিদা মতো ফসল ও অন্যান্য জিনিস উৎপাদন করতে কৃষক ও কারিগরদের বাধ্য করা হয়। কৃষক, কারিগর ও মেহনতি মানুষের শ্রমে উৎপাদিত ফসল ও ধন-সম্পদ কেন্দ্রীভূত হতে থাকে জমিদার-জায়গীরদার ধনীদের ঘরে আর ইংরেজ বণিকদের কুঠিতে। এই অন্যায়-জুলুমের বিরুদ্ধে কৃষক ও কারিগররা রুখে দাঁড়িয়েছে। এদেশের কৃষকরা ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট কৃত্রিম রাষ্ট্র পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে লড়েছে। আজও স্বাধীন বাংলাদেশে কৃষকরা লড়ছে, জীবন দিচ্ছে। এসব লড়াই সংগ্রামের মধ্যে ফকির মজনু শাহ্’র নেতৃত্বে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬৩-১৮০০), তাতীদের বিদ্রোহ (১৭৭০-১৮০০), চাকমা বিদ্রোহ (১৭৭৬-১৭৮৭), নীল চাষিদের বিদ্রোহ (১৭৭৬-১৮০০), রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩), যশোর-খুলনা ও বীরভূমের প্রজা বিদ্রোহ (১৭৮৪-১৭৯৬), মেদেনীপুরে নায়েক বিদ্রোহ (১৮০৬-১৮১৬), ফরাজী বিদ্রোহ (১৮৩৮-১৮৪৭), সাওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-১৮৫৭), গারো বিদ্রোহ (১৮৩১-১৮৮২), সিরাজগঞ্জের কৃষক বিদ্রোহ (১৮৭২-১৮৭৩), তিতুমীরের বিদ্রোহ (১৮৩১), নাচোনা বিদ্রোহ, তেভাগার কৃষক আন্দোলন (১৯৪৭-১৯৪৯), টঙ্ক বিদ্রোহ (১৯৪৮), নানকার বিদ্রোহ (১৯৩৮-১৯৪৮) অন্যতম। এছাড়াও নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকারের লড়াই, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষকদের চিংড়ি ঘেরবিরোধী সংগ্রাম, রাজশাহীর বিল কালাই আন্দোলন, উত্তরবঙ্গে আখ চাষি ও তামাক চাষিদের সংগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জে কানসাট বিদ্রোহ, ফুলবাড়ীতে এশিয়া-এনার্জির বিরুদ্ধে কৃষদের জমি রক্ষার সংগ্রাম ও গাইবান্ধায় সারের দাবিতে কৃষক বিদ্রোহ (১৯৯৫), গোবিন্দগঞ্জে সাওতালদের জমি রক্ষার সংগ্রাম (২০১৭) এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষক-শ্রমিকের প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি। ইতিহাসে দেখা যায়, মুঘল আমলে আকবরের শাসনকালে ১৫৬২ ও ১৫৭৭ সালেও কৃষকরা বিদ্রোহ করেছিল। বাংলা ও ভারতবর্ষের অধিকাংশ কৃষক আন্দোলন, সংগ্রাম ও বিদ্রোহ শাসকগোষ্ঠী হত্যা-সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে দমন করেছে। আবার কোথাও কোথাও দাবি মানতে বাধ্য হয়েছে। এসব আন্দোলন-সংগ্রামের অভিঘাতেই ইংরেজরা যেমন ভারতবর্ষ ছাড়তে বাধ্য হয়, পশ্চিম পাকিস্তানী উপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু আজও কৃষকের জীবনে শান্তি ও জীবনের নিশ্চয়তা মেলেনি।
নিখিল ভারত কৃষক সভা: বিশ শতকের ত্রিশের দশকে ভারতবর্ষের কৃষক আন্দোলনকে ব্যাপকতর ও জয়যুক্ত করতে কৃষকদের সংগঠন অপরিহার্য হয়ে উঠে। এরই ফলশ্রতিতে ১৯৩৬ সনের ১৬ জানুয়ারি মীরাটে কৃষক নেতৃবৃন্দের এক অধিবেশন ডাকা হয়। এই অধিবেশনে ‘সারা ভারত কৃষক সংগঠন কমিটি’ গঠিত হয়। ১৯৩৬ সনের ১১ এপ্রিল লক্ষ্মৌতে কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের বাংলার প্রাদেশিক কৃষকসভা গঠন করার জন্য কমল সরকার ও নীহারেন্দু মজুমদারের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভা সম্মেলন ১৯৩৭ সনের ২৭-২৮ মার্চ কাঁকুড়া জেলার পাত্রসায়ের গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বাংলার ২০ জেলার ৮০ জন প্রতিনিধি যোগ দেন। সভাপতি পরিষদের পক্ষে মুজফ্ফর আহমদ একটি নীতিগত দলিল উত্থাপন করেন। প্রতিনিধি সসম্মেলন শেষ হওয়ার পর কৃষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তাতে ১৫ হাজার কৃষক উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে জমিদারী মালিকানা খতম করে কৃষকের হাতে জমির মালিকানা তুলে দেওয়ার দাবিসহ ৬টি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৩৮ সনের ২-৩ ডিসেম্বর হুগলি জেলার বড়ায় অনুষ্ঠিত হয় প্রাদেশিক কৃষক সভার দ্বিতীয় সম্মেলন। এই সম্মেলন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত কৃষক সভায় প্রায় ২৫ হাজার কৃষক যোগদান করে। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভার তৃতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় মালদহ জেলার নঘরিয়া গ্রামে। ১৯৩৯ সনের ৪-৬ মে মাসে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের কৃষক সভায় উপস্থিতি ছিল ৭৫ হাজার কৃষক-শ্রমিক। বঙ্গীয় কৃষক সভার চতুর্থ প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় যশোরের পাঁজিয়ায়। এই সম্মেলনের পূর্বেই মুজফ্ফর আহমদসহ অনেক নেতাকে কলকাতা থেকে বের করে দেয়া হয় এবং অনেকে গ্রেফতার হন। এই সম্মেলনে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ, রহিয়তওয়ারী ও খাসমহল প্রথা বাতিল, কৃষকের ঋণ মওকুফ ও বর্গা প্রথা উচ্ছেদসহ ৭ দফা দাবি গৃহীত হয়। ১৯৪৬-৪৭ সনে বাংলায় যে তেভাগা আন্দোলন গড়ে উঠে তার দাবি প্রথম উঠে ১৯৪০ সনের পাঁজিয়া সম্মেলনে। কৃষক সমিতির পঞ্চম প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪২ সনের জুন মাসে রংপুর জেলার ডোমারে। প্রাদেশিক কৃষক সমিতির ষষ্ঠ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তদানিন্তন জামালপুর জেলার নলিতাবাড়ী গ্রামে। ১৯৪৩ সনের ১০ মে নালিতাবাড়ীর এই সম্মেলনে নেতৃত্ব দেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ, বঙ্কিম মুখোপাধ্যায় ও প্রমথ ভৌমিক। বাংলার ২৩ জেলার ১৬৯ জন প্রতিনিধি এই সম্মেলনে অংশ নেন। মুজফফর আহমদ নতুন নিবন্ধ উত্থাপন করেন ও আব্দুল্লাহ রসুল সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন।
প্রাদেশিক কৃষক সমিতির ৭ম সম্মেলন ১৯৪৪ সনের ২৯ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে যে সভাপতিমণ্ডলী গঠিত হয় তাতে ছিলেন আব্দুল্লাহ রসুল, মণি সিংহ ও গোপাল হালদার। সম্পাদক নির্বাচিত হন মনসুর হাবিব। এই সম্মেলনে দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে ২ হাজাটর নারী সমেত প্রায় ৩০ হাজার কৃষক উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন মুজফ্ফর আহমদ। প্রাদেশিক কৃষক সমিতির অষ্টম সম্মেলন ১৯৪৫ সনের ১৩-১৪ মার্চ বর্ধমান জেলার হাট গোবিন্দপুরে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন উদ্বোধন করেন নিখিল ভারত কৃষক সভার নেতা জালালুদ্দিন বোখারী। বাংলার সমস্ত জেলা থেকে ৩২৫ জন প্রতিনিধি যোগদান করেন। সম্মেলনের শেষ দিনে ৭০/০ মাইল হেটে প্রায় ৭ হাজার মহিলাসহ ৩০ হাজার নেতাকর্মী কৃষক সমাবেশে যোগ দেন। প্রাদেশিক কৃষক সমিতির নবম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সনের ২১-২৪ মে খুলার মৌভোগে।
সম্মেলনের সিদ্ধান্তক্রমে দু’মাস পরেই বাংলার বিভিন্ন জেলায় তেভাগা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন এতোটা জঙ্গি ও ব্যাপকাতা লাভ করবে তা কৃষক সভার নেতারা পূর্বে অনুধাবন করতে পারেন নাই। ভারত বর্ষের স্বাধীনতার প্রাক্কালে এই ঘটনা এবং স্বাধীনতার পরেও এই আন্দোলন চলে। এই আন্দোলনে সারা বাংলার প্রায় ৬০ লাখ কৃষক অংশগ্রহণ করেন, ৩ সহস্রাধিক কৃষক গ্রেফতার বরণ করেন ও শতাধিক কৃষাণ-কৃষাণী মৃত্যুবরণ করেন। প্রাদেশিক কৃষক সমিতির দশম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৭ সনের ২৭-২৮ ফেব্রুয়ারি মেদেনীপুর জেলার পাঁচখুরি গ্রামে। প্রখ্যাত কৃষক নেতা কৃষ্ণ বিনোদ রায় সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। এই সম্মেলনের পর ১৯৪৭ সনের ১৪-১৫ আগস্ট দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটলো। ভাগ হলো কৃষক আন্দোলনের অগ্রসর অঞ্চল পাঞ্জাব ও বাংলা। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হিসেবে সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগের শাসনাধীনে চলে আসে। পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান রাখা হয়। পূর্ব-পাকিস্তানে কৃষক আন্দোলন-ইংরেজ শাসনের শেষ দিকে তেভাগা আন্দোলন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সশস্ত্র রূপ নিয়েছিল। আন্দোলনে শ্রেণিস্বার্থে হিন্দু-মুসলমান একসাথে লড়াই করে। সরকার কৃষকদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। ১৯৪৭ সনের ২২ জানুয়ারি গেজেটে “বঙ্গীয় বর্গাদার সাময়িক নিয়ন্ত্রণ বিল” প্রকাশিত হয়।
দেশ ভাগের পর একক কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে সংগঠন চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই ১৯৪৮ সনে সিপিআই দেশ ভিত্তিতে আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কৃষক সংগঠনের দেশভিত্তিতে বিভক্তি ঘটে। পূর্ব পাকিস্তানের কৃষক সংগঠনের দেশ ভিত্তিতে বিভক্তি ঘটে। পূর্ব পাকিস্তানের কৃষক নেতারা পূর্ব-পাকিস্তান ভিত্তিক সংগঠন দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। মণি সিংহকে সভাপতি ও মনসুর হাবিবকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হয়। সেপ্টেম্বর মাসে অত্যন্ত গোপনে লালমনিরহাটে এই প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে গৃহীত মূল সিদ্ধান্ত হল নবাব জমিদারদের দ্বারা পরিচালিত মুসলিম লীগ সরকার স্বেচ্ছায় জমিদারী উচ্ছেদ করবে না। কাজেই কৃষি প্রধান পূর্ব-পাকিস্তানে সুকঠিন ও সুউচ্চ পর্যায়ের গণ-আন্দোলনের ঢেউ তুলতে হবে এবং তা একবার তুলতে পারলে সেই আন্দোলনের ঢেউ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে।
১৯৪৮ সনে সিপিআই’র কলকাতার কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত হয় “ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভূখা হ্যায়” তাই আন্দোলন চলবে। এই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ, সিলেট, যশোর ও অন্যান্য জেলায় কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে উঠে। ময়মনসিংহে হাজং আন্দোলন, টংক প্রথা বিরোধী আন্দোলন, সিলেটে নানকার প্রথা ও জমিদারী বিরোধী আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে। সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানে এই আন্দোলন মুসলিম লীগ সরকার নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে দমন করে। কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অত্যাচার নির্যাতনে হাজার হাজার কমিউনিস্ট ও কৃষক কর্মী দেশছাড়া হয়। ১৯৫৮ সনের পূর্ব পর্যন্ত এ অঞ্চলে কোনো কৃষক সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয় নাই। ১৯৫১-৫২ সালে মৌলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশকে সভাপতি করে কমিটি গঠন করা হয় কিন্তু এই কমিটি তেমন কোনো কাজ করতে পারে নাই। অবশেষে ১৯৫৮ সনের ৩-৪ জানুয়ারি রংপুর জেলার ফুলছড়ি ঘাটে পূর্ব পাকিস্তান কৃষি ও কৃষক সম্মেলন আহ্বান করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন হাতেম আলী খান। ১৯৪৬ সনের লাহিড়ী মোহনপুরে কৃষক সমিতির ৩য় সম্মেলনে ১৫ জেলা থেকে ১৫ শতাধিক কৃষক নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করে। এই সম্মেলনে হাতেম আলী খান প্রদত্ত রিপোর্টে কৃষি সমস্যা সমাধানের জন্য ১৫ দফা কর্মসূচি দেন। এই সম্মেলনে মৌলানা ভাসানী সভাপতি ও হাতেম আলী খান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সনে রংপুরের পীরগঞ্জে ৪র্থ সম্মেলন ও ১৯৬৬ সনে ১২-১৩ এপ্রিল রায়পুরায় ৫ম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই দুটি সম্মেলনেও ভাসানী সভাপতি ও হাতেম আলী খান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সনে ৮-৯ এপ্রিল কুলাউড়ায় কৃষক সমিতির ৬ষ্ঠ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে ভাসানী অসুস্থ থাকায় আর হাতেম আলী খান, হাজী দানেশ, অমূল্য লাহিড়ী ও জীতেন ঘোষ কারাগারে থাকায় উপস্থিত থাকতে পারেন নাই। ১৯৬৫ সনে পাক-ভারত যুদ্ধকে কেন্দ্র করে কমিউনিস্ট পার্টির বিভক্তির জের ধরে কৃষক সমিতির এই সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় দুটি প্যানেল হয়। চীনপন্থিরা মওলানা ভাসানীকে সভাপতি ও আব্দুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে ১টি প্যানেল দেয় আর মস্কোপন্থিরা আমজাদ হোসেনকে সভাপতি ও হাতেম আলী খানকে সাধারণ সম্পাদক করে আরেকটি প্যানেল দেয়। সম্মেলনে কৃষক সমিতি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়।
ইতোমধ্যে শেখ মুজিবের ৬ দফার আন্দোলন সারাদেশে ব্যাপক আকার ধারণ করে। আন্দোলনে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার পাশাপাশি কৃষকের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। ১৯৬৯-এ আইয়ুব বিরোধী গণঅভ্যুত্থান ঘটে। পরবর্তীতে ’৭০ এর নির্বাচনে শেখ মুজিবের বিপুল বিজয়ের পরও ইয়াহিয়া ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ’৭১ এর ২৫ মার্চ গণহত্যা চালালে বাঙালির প্রতিরোধ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৯ মাসে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।
স্বাধীন বাংলাদেশে কৃষক নেতারা এক সভায় মিলিত হয়ে কৃষক সমিতির কর্মকাণ্ড আবার শুরুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এর অংশ হিসেবে ১৯৭২ এর মার্চে বেলাবোতে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীন দেশের প্রথম সম্মেলনে মণি সিংহ সভাপতি ও হাতেম আলী খান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কৃষক সমিতির দ্বিতীয় সম্মেলন হয় ১৯৪৭ সনে বগুড়ায়। এ সম্মেলনে পীর হাবিবুর রহমান সভাপতি ও আমজাদ হোসেন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ’৭৫-এর পট পরিবর্তনে কৃষক সমিতির তৎপরতা কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ১৯৭৬ সালের মার্চে রায়পুরায় তৃতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সম্মেলনে হাজার হাজার কৃষক-জনতার সমাবেশ ঘটে। সম্মেলনে হাতেম আলী খান সভাপতি ও ফজলুল হক খন্দকার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
এরপর জিয়া-এরশাদের সামরিক শাসনামলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কৃষক আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। কৃষকনেতা হাতেম আলী খান ও জিতেন ঘোষ মৃত্যুবরণ করেন। এসময়কালে বারীণ দত্ত সভাপতি ও ফজলুল হক খন্দকার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ৪র্থ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৭ সালে ঢাকার রেলওয়ে মিলনায়তনে। এই সম্মেলনে ফজলুল হক খন্দকার সভাপতি ও নূহউল আলম লেনিন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। অন্য রাজনীতিতে যোগদান করায় কৃষক আন্দোলন ও সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়া কৃষক সংগঠনেও বিভক্তি দেখা দেয়। ২০০৪ এ পুনরায় কৃষক সমিতি দুই অংশকে ঐক্যবদ্ধ করতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মেলন আহ্বান করা হয়। সম্মেলনে ফজলল হক খন্দকার সভাপতি ও মোর্শেদ আলী সাধারণ সম্পাদক নির্বঅচিত হন। সংগঠনে বিভক্তি ও ঐকবদ্ধ করার মধ্যবর্তী বিভিন্ন সময়ে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন কৃষক নেতা ছয়ের উদ্দিন ও আব্দুল মান্নান। পরবর্তীতে মাওলানা আহমেদুর রহমান আজমীকে সভাপতি ও মোর্শেদ আলীকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি করা হয়। ২০০৯ সালে সিরাজগঞ্জে কৃষক সমিতির একাদশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সারাদেশ থেকে ১০ সহস্রাধিক কৃষক অংশগ্রহণ করে। ৪০টি জেলার ৩ শতাধিক প্রতিনিধি ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান ও নেপাল থেকে কৃষক নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করে। সম্মেলনে মোর্শেদ আলী সভাপতি, কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন সাধারণ সম্পাদক ও মোহাম্মদ হানিফ সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। কৃষক সমিতির দ্বাদশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে ফরিদপুর শহরে। এ সময় ২০১৩ সনে ভোটারবিহীন নির্বাচন পরবর্তী বিএনপি জামাতের সহিংস আন্দোলন চলছিল। এহেন পরিস্থিতিতেও ফরিদপুর সম্মেলনে ১০ সহাস্রাধিক কৃষক অংশগ্রহণ করেন। পরিবহন ধর্মঘট থাকায় অনেক জেলার প্রতিনিধিরা এ সম্মেলনে অংশ নিতে পারে নাই। ভারত ও নেপাল থেকে প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনে মোর্শেদ আলী ও কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন পুনরায় সভাপতি ও সাধারণ নির্বাচিত হয়। এই সম্মেলনে সিরাজগঞ্জ সম্মেলনে উত্থাপিত দাবি আদায়ে সারাদেশে কৃষক আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। সম্মেলন পরবর্তীতে প্রায় ২ বছরকাল জামাত-বিএনপির সহিংস আন্দোলনের কারণে কৃষক সমিতির সাংগঠনিক কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। এই সম্মেলনের পর কয়েক দফা কৃষক বন্ধন ও জেলা-উপজেলায় স্মারকলিপি পেশে, হাটসভা-কৃষকসভা অনুষ্ঠিত হয়। মিছিল সহকারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালিত হয়।
আগামী ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ খুলনায় কৃষক সমিতির ত্রয়োদশ জাতীয় সম্মেলন হতে যাচ্ছে। এই সম্মেলন এমন এক সময় অনুষ্ঠিত যখন শাসক শাসকশ্রেণির অনুসৃত নয়া উদার অর্থনীতিতে কৃষি ও কৃষক বিপর্যস্ত। কৃষি অলাভজনক হওয়ায় কৃষি ছেড়ে কৃষক পাড়ি জমাচ্ছে দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারে। বিনা বাধায় কৃষি জমিতে গড়ে উঠছে শিল্প-কারখানা, ইটভাটা ও আবাসন। কৃষিজমি ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। যে কৃষকের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামে দেশবাসী গোলামির জিঞ্জির ভেঙে দেশ স্বাধীন করেছিল সেই কৃষক আজ বাঁচার তাগিদে বউ-বেটিকে বিদেশে ঝিয়ের কাজে পাঠাচ্ছে। ইতোমধ্যে এই সম্মেলন দেশের মুক্তিকামী মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে। আমরা প্রত্যাশা করি, এই সম্মেলনে ১৫ সহস্রাধিক কৃষক অংশগ্রহণ করবে। সারাদেশ থেকে প্রতিনিধিরা আসবে। ভ্রাতৃপ্রতিম দেশি-বিদেশি কৃষক সংগঠনের নেতারা অংশ নেবেন। ১৯৪৬ সনে খুলনার মৌভোগের সম্মেলনের মতো এই সম্মেলন দেশের কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য বদলের আন্দোলনে মাইলফলক হয়ে থাকবে। সফল হউক বাংলাদেশের কৃষক সমিতির ত্রয়োদশ জাতীয় সম্মেলন।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন