আমাদের সংস্কৃতি–আমাদের ঐতিহ্য

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
শেখ আবদুল মান্নান: বাংলাদেশের সংস্কৃতির রয়েছে গৌরবময় ঐতিহ্য। বাংলার সংস্কৃতিই আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেয় আমরা বাঙালি। প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ, আধুনিক যুগ, একেক যুগে, একেক শাসকগোষ্ঠী এই দেশকে শাসন করে গেছে। যেমন প্রাচীন যুগের শাসকরা হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মের অনুসারী ছিলেন। সে সময়ে মেয়েরা শাড়ি, ছেলেরা ধুতি পরতো। যানবাহন ছিল নৌকা, গরুর গাড়ি ও পালকি। ধান, ডাল, যব, তুলা, সরিষা ও পান চাষ হত। মধ্যযুগ থেকে মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। তখন মেয়েরা শাড়ি পরতো, হিন্দু ছেলেরা ধুতি, চাদর, পায়ে খড়ম পরতো, মুসলমান ছেলেমেয়েরা পায়জামা-পাঞ্জাবি, ধুতি, লুঙ্গি পরত। নৌকা, জাহাজ, কাগজ, মসলিন কাপড় বানানো ও রপ্তানি শুরু হয় ঠিক তখন থেকেই। আধুনিক যুগের শুরু ইংরেজরা আসার পর। তখন থেকে যোগাযোগ, স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হয়। সংস্কৃতি হলো মানুষের আচার-আচরণের সমষ্টি, মানুষের জাগতিক নৈপুণ্য ও কর্মকুশলতা। তার বিশ্বাস, আশা-আকাক্সক্ষা, নৈতিকতা, রাজনীতির ভাষা, কলা, মূল্যবোধ সবকিছুই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা সোনার বাংলায়, বিচিত্র মানুষ, বিচিত্রভাবে বসবাস করে। এটাও এদেশের সংস্কৃতি। সময়ের পরিক্রমায় অনেক গ্রহণ, বর্জন, পরিবর্তন, পরিমার্জনের মধ্যদিয়ে আমাদের সংস্কৃতিতে অনেক নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে, আবার হারিয়ে গেছে অনেক উপাদান। বাংলার সংস্কৃতির ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। এখানে বাস করে : মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ আরো অনেক জাতি। এখানে প্রাণ খুলে তারা তাদের প্রাণের ভাষায় ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। একের অনুষ্ঠানে অন্যেরা আমন্ত্রিত হয়ে, একে অপরেরর সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে। আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্যের মধ্যে ধর্মীয় রীতিনীতি, উৎসব, লোকসাহিত্য, সঙ্গীত, ঋতুভিত্তিক উৎসব, বিভিন্ন প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন, খেলাধুলা, সামাজিক প্রথা প্রকৃতি অন্তর্ভুক্ত। এদেশে মুসলিম শাসক মোহাম্মদ-বিন-তুঘলক প্রকাশ্যে হিন্দুদের সঙ্গে হোলি খেলতেন। পালাগান, যাত্রাগান, লোকসাহিত্য প্রভৃতি বাঙালিদের হৃদয়ের কথাই বলে এবং বুকের বাঁশরি, কর্মক্লান্ত অবসর মুহূর্তগুলো গ্রাম্য সুর-মূর্চ্ছনায় মুখরিত হত। কবিগান, চম্পাবতী, লাইলী মজনু, শিরিন ফরহাদ, আলোমতি, বেদের মেয়ে জোৎস্না, চন্ডিদাস, রজকিনী মানুষ প্রাণ ভরে দেখত। গ্রামেগঞ্জে একদিকে যেমন ওয়াজ মাহফিল হতো, আবার যাত্রাপালাও হতো, কীর্তন হতো, পূজা-পার্বণ হতো। কথায় আছে বার মাসে তের পার্বণ। সবই ছিল সৌহাদ্যপূর্ণ, যা এখন কম মাত্রায় বিদ্যমান। ধর্ম আর রাজনীতি ছিল এসবের বাইরে। মধ্যযুগে মুসলমান শাসকরা যখন এই ভূখণ্ডে ক্ষমতায় আসে, তখনও কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় কিংবা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে দিতেন না। সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে মানুষের মমত্ববোধ বাড়ে, ভেদাভেদ ভুলিয়ে দেয়, দেশপ্রেম বাড়ায়। বাংলার গান– পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া, আধুনিক, রবীন্দ্র-নজরুল সঙ্গীত আমাদের হৃদয়ে দোলা দেয়, তেমনি বাংলার সাহিত্য, খেলাধুলা, উৎসব আমাদেরকে এক কাতারে সামিল করে। সকল ধর্মের মানুষকে একসূত্রে গেঁথে দেয়। রবীন্দ্রনাথসহ অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকরা আমাদের সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে হাজির করে সম্মানের স্থানে আসীন করে গেছেন। হরেক রকমের উৎসব ও ঋতুভিত্তিক সাংস্কৃতিক জীবনধারা আমাদের জীবনকে আলোড়িত করে, রক্তে তোলে আশ্চর্য-উন্মাদনা। বাংলা নববর্ষ, ফাল্গুন তথা বসন্তের আগমন প্রভৃতি উৎসবে বাঙালি মেতে উঠে নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুভূতির শিহরণে। নতুন পিঠার আয়োজন, শীতকালে খেজুর রস ও পিঠা-পায়েসের আয়োজন বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আমাদের সংস্কৃতির চর্চা হয় সুপ্রাচীন কাল থেকেই। বিভিন্ন সময়ে আমাদের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং সমৃদ্ধি এসেছে। মধ্যযুগে সুলতানী আমলে আমাদের সংস্কৃতির বিকাশে প্রভূত অগগ্রতি সাধিত হয়েছে, সুলতানী শাসনামলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চা, ধর্মীয় চর্চাকে উৎসাহিত করা হয়। হোসেন শাহের আমলে শ্রী চৈতন্যদেব বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেন। মোগল শাসকগণ কবিতা, গল্প, উপন্যাস রচনার জন্য সাহিত্যিকদের উৎসাহ দিতেন। কবিতা-গল্প শোনার জন্য লেখকদের রাজদরবারে আহ্বান করতেন। ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজরা দুইশো বছরেও বাঙালি সংস্কৃতিকে ক্ষতি করতে পারেনি। আর পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক কারণে আমাদের সংস্কৃতিতে দেখা দেয় অস্তিত্ব সংকট। আমাদের সংস্কৃতি সকল ধর্মের মতের মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়েছে, তাই তো সব ভেদাভেদ ভুলে ভাষার জন্য আন্দোলন করে আমরা জয়ী হয়েছি। ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছি, তাই তো কবি বলেছেন, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে-যে আমার জন্মভূমি’। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যে অবস্থা তার ওপর দাঁড়িয়ে সংস্কৃতি তার রূপ বদলেছে, সেই লোকনৃত্য, জারি-সারি, ভাওয়াইয়া, পালাগানের জায়গা দখল করেছে আধুনিক তথা উত্তরাধুনিককালের পশ্চিমা তথা ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চা। অতীতের কৃষিনির্ভর সংস্কৃতি বিলুপ্ত হতে থাকে এবং তথাকথিত আধুনিক যন্ত্রনির্ভর সংস্কৃতি চর্চা শুরু হয়। সমাজ কাঠামোতে পরিবর্তন সূচিত হয়। যৌথ পরিবার প্রথা, সামাজিক বন্ধন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে। একক পরিবার গড়ে উঠছে। স্নেহবোধ, আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ লোপ পাচ্ছে। আজ যেটি আরও তীব্ররূপ ধারণ করেছে। আগে যেখানে গ্রামীণ সংস্কৃতির রস আস্বাদন করে মানুষ আনন্দ উপভোগ করত, আজ সেখানে জায়গা নিয়েছে টিভি সিরিয়াল। মোবাইল। ভার্চুয়াল দুনিয়া। স্বাধীনতা পরবর্তী অসুস্থ রাজনীতির যাঁতাকলে পরে বাঙালি সংস্কৃতি। স্বাধীনতা-পূর্বকালে সংস্কৃতির গতিপথ এবং স্বাধীনতা-উত্তর সংস্কৃতির পথচলার স্রোতমুখ এক নয়, বরং কিছুটা ভিন্নপথে প্রবহমান। সংস্কৃতি রক্ষায় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দেশ স্বাধীন হয়, কিন্তু বর্তমানে দুষ্ট রাজনীতি, ক্ষমতার রাজনীতি, আপসকামিতার রাজনীতি বাঙালির সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরি করছে। হিন্দু-মুসলমানে বিভাজন তৈরি করছে। ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করছে, ধর্মীয় গোষ্ঠীকে রাজনীতিতে পুর্নবাসন করছে, তাদেরকে রাজনীতিতে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধ্বংস করছে। ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাকে পুঁজি করে তারা নানামুখী অপতৎপরতায় লিপ্ত। এখন আর গ্রামেগঞ্জে ওয়াজ মাহফিল হয় না, হয় জনসভা, ওয়াজের নামে জনসভা করে অন্য ধর্মের বা ভিন্ন মতালম্বীদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আমাদের সংস্কৃতিতে ভেদাভেদ তৈরি করা হচ্ছে। একে অপরকে ঘৃণা করতে শেখাচ্ছে। মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করছে। অপরাজনীতি, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, পেশিশক্তি সমাজে অশান্তির ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক সহযোগিতা দিন দিন কমে আসছে। মানুষ সুখে-দুঃখে অন্যের পাশে দাঁড়ানো ভুলে যাচ্ছে। সামাজিক বন্ধন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে। বাঙালির আতিয়েতার সুনাম সারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে আছে, তা-ও আজ আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। আধুনিক যুগে, আধুনিক জীবনযাত্রায় হয়তো পুরাতন ঐতিহ্য কিছু বিলুপ্ত হবে, আবার নতুন কিছু যুক্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের মূলধারার গতিপ্রবাহ বিনষ্ট করা। এটাকে পরিবর্তন বা বিচ্ছিন্ন করার কোনো সুযোগ নেই, তাকে ধরে রাখতেই হবে। আমরা বাঙালি, আমাদের সংস্কৃতিই আমাদের ঐতিহ্য। একটা দেশ হল একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, তার যেমন জাত নেই, সবাই বসবাস করবে, তেমনি শিক্ষা, জ্ঞান তারও কোনো জাত নেই। আমরা সবাই মানুষ–এই কথাটি কর্মে ও জীবনে ধারণ করতে হবে। এই ব্যাপারে কোনো আপোসকামিতা চলবে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের ক্ষমতাসীনরা সেই কাজটিই করছে। যখন যারা ক্ষমতায় যায় তখন শাসনের নামে শোষণই করে। নগরভিত্তিক পেশিশক্তির দৌরাত্ম্যের বিস্তৃতি, নষ্ট রাজনীতির প্রভাবে গ্রামীণ সমাজে অশান্তির ছায়া নেমে এসেছে। বাঙালি শান্তিপ্রিয় জাতি। কিন্তু বর্তমানে কু-রাজনীতি গ্রামীণ সমাজকেও বিভক্ত করছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকেও দুভাগ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যার প্রমাণ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা। যেখানে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদেরকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছ্ড়ানো, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মানসিকতা থেকে দূরে সরানোর জন্য পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। যা আমাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংসের সামিল। এমনিতেই আমাদের সমাজে কছেশ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা বিরাজমান। যেটি আগে ছিল না। আধুনিক যুগ বা বর্তমান যুগে এসে আমরা সেটি দেখতে পাচ্ছি। যার কারণে সামাজিক ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা, সহনশীলতার সংস্কৃতি বিনষ্ট হচ্ছে। এবং একটি শ্রেণি তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সময়ে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিভেদ বৈষম্য বাড়ছে। সাম্প্রদায়িক শক্তি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা দেশের জন্য অশনিসংকেত। সাহিত্যিক মোতাহার হোসেন চৌধুরী বলেছিলেন, ‘সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে বাঁচা। আমরা তাই তাই সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে বাঁচতে চাই। হিন্দু বুঝিনা, মুসলিম বুঝি না, খ্রিষ্টান বুঝি না, বৌদ্ধ বুঝি না, চাকমা বুঝি না, মারমা বুঝি না।। আমরা বিচিত্রভাবে বাঁচতে চাই সবাইকে নিয়ে। আমাদের সংস্কৃতিই আমাদেরকে খুলে দেবে চেতনার দরোজা। সুসভ্য করবে আমাদের ইতিহাস। সংস্কৃতি আমাদের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। কোনো সমাজের কোনো সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য যখন দীর্ঘদিন ধরে সে সমাজের মানুষের জীবনযাত্রায় গ্রহণযোগ্যতাকে ধারণ করে টিকে থাকে, তখন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু বাংলার সংস্কৃতি আজ আর পূর্বতন অবিচ্ছিন্ন ধারায় নেই। আধুনিক, বিদেশি ও কুশাসনের কারণে আমরা আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত জীবনধারাকে হারিয়ে ফেলতে বসেছি। তাই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করার জন্য সবাইকে জোরালোভাবে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় সংসদ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..