সঙ্গীত শিক্ষক পদ বাতিল
দেশে নতুন ফ্যাসিবাদ কায়েম হচ্ছে : উদীচী
একতা প্রতিবেদক :
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা পরিবর্তন করে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ বাতিল করার প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।
পৃথক দুই বিবৃতিতে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান উদীচীর নেতৃবৃন্দ।
একটি বিবৃতিতে উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন বলেন, আজ জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন করে ফ্যাসিবাদ কায়েম হচ্ছে ধর্মের নামে। উগ্রবাদী কয়েকটি ধর্মাশ্রয়ী দল এ ফ্যাসিবাদের পত্তন করছে। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত ভাবাদর্শ আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পাঁজরে প্রবিষ্ট হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে বসেছে বিভক্তিবাদী, ঘৃণাবাদী, সাম্প্রদায়িক উগ্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী, যারা সংগীত-শিল্পকলা-সাহিত্যের মতো সাংস্কৃতিক অনুসঙ্গের বিরুদ্ধে কুঠারহস্ত হচ্ছে। ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলের হুমকির মুখে সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে মূলত একটি বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে সরকারের নতজানু চরিত্রের প্রকাশ পেয়েছে।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, সুকুমারবৃত্তি বিকাশের মধ্য দিয়ে কোমলমতি শিশুদের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ তৈরি করা এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য। বাংলাদেশের জন্মের পর থেকেই এ দেশের সংস্কৃতিকর্মীরা পাঠ্যক্রমে শিল্পকলার নানা বিষয় সংযুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে। কারণ, অসাম্প্রদায়িক, দরদি ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা এবং শিশু-কিশোরদের উন্নত অভিরুচি গঠনের ক্ষেত্রে সঙ্গীত-শিল্প-সাহিত্যের কোনো বিকল্প নেই।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালায় সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি ছিল সরকারের যুগান্তকারী উদ্যোগ এবং এ দেশের সংস্কৃতিকর্মীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফল। কিন্তু কয়েকটি ধর্মাশ্রয়ী দলের বিরোধিতার মুখে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষকের পদ বাতিলের ঘটনা দেশে একটি ন্যাক্কারজনক নজির স্থাপন করলো।
উদীচী নেতৃবৃন্দ বলেন, হেফাজতে ইসলামের দাবির মুখে আওয়ামী লীগ সরকার পাঠ্যপুস্তক থেকে দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িকতার বার্তাবাহী বিপুল লেখা বাদ দিয়েছিল, শুধুমাত্র লেখকরা ‘হিন্দু’ ও ‘মুক্তচিন্তার’ হওয়ার কারণে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ শুধু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রই কায়েম করেনি, তারা সাম্প্রদায়িক, পশ্চাৎপদ ও ধর্মাশ্রয়ী উগ্রবাদী ভাবাদর্শের বিরুদ্ধেও বিজয় লাভ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পরম্পরা হিসেবেই সংঘটিত হয়েছে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান। যে কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী নীতির বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থান অবিনাশী প্রেরণা হয়ে থাকবে। মনে রাখতে হবে স্বৈরাচারী হাসিনা এবং তার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটেছে তার একদেশদর্শী ও গণবিরোধী নীতির কারণে।
উদীচী নেতৃবৃন্দ এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, যে ভাবাদর্শ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পরাজিত হয়েছিল, কোনোভাবেই তা এ দেশের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হতে পারে না। ধর্মের নামে এ দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের নীতি চাপিয়ে দিলে তা জনগণ মেনে নেবে না। এ দেশ মুক্তিযুদ্ধের দেশ। গণতান্ত্রিক, সর্বজনবাদী, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই এদেশের শক্তি ও সৌন্দর্য। একে রক্ষায় এ দেশের সাধারণ মানুষ ও সংস্কৃতিকর্মীরা প্রাণপণ করবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক পদ বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে অবিলম্বে সরে আসার আহ্বান জানান উদীচী নেতৃবৃন্দ।
অপর এক প্রতিবাদ বিবৃতিতে উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক পদ বাতিলের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে বলেন, শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতা, মানবিক বোধ, দলগত চেতনা ও শারীরিক-মানসিক ভারসাম্যপূর্ণ বিকাশের জন্য সংগীতচর্চা, শিল্পকলা ও ক্রীড়া শিক্ষা মৌলিকভাবে প্রয়োজন।
উদীচী নেতৃবৃন্দ বলেন, পৃথিবীর সব উন্নত দেশেই শিশুদের যথাযথ মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধির জন্য সংগীত, শিল্পকলা ও শরীরচর্চাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষার খাতা ও পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা মানে ছাত্র-ছাত্রীদের মনন ও আবেগজগতকে সংকীর্ণ করে দেওয়া। সংগীত ও শিল্প মানুষকে মুক্তভাবে ভাবতে শেখায়, অনুভবের শক্তিকে জাগিয়ে তোলে এবং সহমর্মিতা তৈরি করে; অন্যদিকে ক্রীড়া শিক্ষা শিশুর আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দলগত সমন্বয় ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করে। এই দুই বিষয় বাদ দিয়ে বা অবমূল্যায়ন করে প্রাথমিক শিক্ষার যে কাঠামো তৈরি করা হবে, তা হবে বিকলাঙ্গ, সংকীর্ণ ও মানবিকতাবিহীন।
উদীচী মনে করে, বাংলাদেশ যে অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার ওপর প্রতিষ্ঠিত- এই সিদ্ধান্ত সেই চেতনার পরিপন্থী। শিশুদেরকে শিল্প ও ক্রীড়া শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দিলে তার ভেতরের সৌন্দর্যবোধ, কল্পনাশক্তি, মানবিক অনুভূতি ও সৃজনশীলতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। এর প্রভাব পড়বে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্রে। একটি প্রগতিশীল, মুক্তমনা, নান্দনিকতায় সমৃদ্ধ সমাজ গড়তে হলে প্রাথমিক স্তর থেকেই শিশুকে শিল্প-সংস্কৃতি-খেলাধুলার চর্চার সুযোগ দিতে হয়। রাষ্ট্র যদি সেই দরজা বন্ধ করে দেয়, তবে তা হবে জাতিকে পশ্চাদমুখী করে দেওয়ার সমান।
উদীচীর নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, যারা ছোটবেলা থেকেই সুর ও সঙ্গীত সাধনার মধ্য দিয়ে বড় হয় তাদের মধ্যে শুভবোধ সদাজাগ্রত থাকে। তারা অসুর বা মন্দ কোন কাজের দিকে ধাবিত হয় না। সুরের প্রতি আকর্ষণ মানুষের জৈবিক বিষয়। আবহমান কাল ধরে বাংলার পথে প্রান্তরে হাজারো রকমের সঙ্গীত চর্চা হয়ে আসছে এবং সঙ্গীত চর্চা বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।
তাই, এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করা এবং সংগীত ও শারিরীক শিক্ষাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় পুনর্বহাল করতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানায় সংগঠনটি।
প্রথম পাতা
লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে চা-শ্রমিকদের অধিকার আদায় করে নিতে হবে
বন্দর ইজারার সিদ্ধান্ত না পাল্টালে ৪ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন অভিমুখে বিক্ষোভ
দেশের সংকট-নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান
সংশোধনী
পীর-ফকির-বাউলদের ওপর হামলায় পুলিশকে সন্ত্রাসের পক্ষে ব্যবহার করছে সরকার
পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে নিবর্তনমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতি
‘রাষ্ট্রের চরিত্র বদল না হওয়ায় শ্রমিক হত্যাকাণ্ডের বিচার হচ্ছে না’
অগ্নিকাণ্ডের কারণ উদঘাটন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করুন
‘মেহেরবানি’
আরপিও’র অগণতান্ত্রিক সংশোধনী এবং নির্বাচনী ব্যয় বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল কর
শোষণ-বৈষম্যবিরোধী গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন