শতবর্ষে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’
ডা. এস.এম. ফরিদুজ্জামান
ঊনিশ শতকে বাংলার মুসলমান হিন্দুদের চেয়ে শিক্ষাদীক্ষা জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে যখন একটি ‘উপায়’ সন্ধান করা হচ্ছিল তখন ঢাকায় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর আত্মপ্রকাশ একটি স্মরণীয় ঘটনাই ছিল। যদিও সংগঠনটির নামের সাথে ‘মুসলিম’ শব্দটি যুক্ত ছিল, কিন্তু এটি শুধু মুসলমানদের জন্য সাহিত্য সমাজ ছিল না। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু অত্যন্ত মেধাবী ‘মুসলিমদের’ উদ্যোগে সাহিত্য সৃষ্টিই ছিল এর মূল লক্ষ্য। মুসলিম সাহিত্য সমাজ কোনো গণ্ডিবদ্ধ বা সাম্প্রদায়িক উদ্দেশে তার কাজ পরিচালনা করেনি। চূড়ান্তভাবে মানবমুক্তির জন্য বুদ্ধি বা জ্ঞানের মুক্তিই ছিল এ সংগঠনের উদ্দেশ্য।
১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হল ইউনিয়ন কক্ষে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র সভাপতিত্বে মুসলিম সাহিত্য সমাজ এর প্রতিষ্ঠা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। যার সদস্যরা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক আবুল হুসেন (১৮৯৭-১৯৩৮), মুসলিম হলের ছাত্র এ এফ এম আব্দুল হক, ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র আব্দুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪) ও আনোয়ার হোসেন এবং ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র আবুয্যোহা নূর আহমেদ (১৯০৭-১৯৭৩)। সংগঠনের কোনো সভাপতি ছিলেন না। তবে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতেন আবুল হুসেন। আর নেপথ্যে সবরকম দায়িত্ব পালন করতেন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের অধ্যাপক কাজী আব্দুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), কাজী আনোয়ারুল কাদির (১৮৮৭-১৯৪৮) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শ্রেণির ছাত্র আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩)।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ এর মূলমন্ত্র ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’। বুদ্ধির মুক্তি মানে বিচার-বুদ্ধিকে অন্ধ সংস্কার শাস্ত্রানুগত্য থেকে মুক্তিদান। তাদের স্লোগান ছিল–‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ এই সংগঠনের কর্মকাণ্ড ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামেও পরিচিতি পায়।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর মুখপত্রের নাম ছিল–‘শিখা’। সংগঠনের কর্মীদের ‘শিখা গোষ্ঠী’ নামেও পরিচয় করানো হতো। ‘শিখা’য় সংগঠনের সাময়িক অধিবেশন ও বার্ষিক সম্মেলনে পঠিত রচনা প্রকাশিত হতো। ১৯২৬ সাল থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত মোট দশটি বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও ‘শিখা’ প্রকাশিত হয়েছিল মোট পাঁচটি সংখ্যা।
বার্ষিক সাধারণ সভায় বিভিন্ন সময়ে বহু প্রখ্যাত মনীষীগণ উপস্থিত থেকেছেন। তাদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, স্যার এ এফ রহমান, খান বাহাদুর তসদ্দুক আহমেদ, ড. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ (পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য) ড. মাহমুদ হাসান (পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য), খান বাহাদুর আব্দুর রহমান খান, মোহিতলাল মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, হেমন্ত কুমার সরকার, মোহাম্মদ ইব্রাহিম (পরে জাস্টিস), মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, মোহম্মদ বরকতুল্লাহ প্রমুখ।
সাহিত্য-সমাজ-এর কর্মীদের মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, তুরস্কে মোস্তফা কামাল পাশা’র নেতৃত্বে নবজাগরণের সূচনা, অতীতের মুসলিম মনীষী মুতাজিলা সম্প্রদায়ের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। ধর্মকে কুসংস্কারের আবর্জনা থেকে মুক্ত করার জন্য ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর লেখকগণ বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করেছিলেন। ‘বুদ্ধির মুক্তি’ মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে বাঙালি মুসলমান সমাজকে অন্ধসংস্কার, শাস্ত্রের আক্ষরিক নিয়ম পালন এবং সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করার জন্য তাঁরা কলম বা সাহিত্যকেই বেছে নিয়েছিলেন।
মুসলিম সাহিত্য-সমাজের বার্ষিক সাধারণ সভায় উত্থাপিত প্রবন্ধসমূহ ‘শিখা’ পত্রিকায় ছাপা হতো। ‘শিখা’র প্রথম সংখ্যায় ছাপা হয়– নজরুলের ‘খোশ আমদেদ’ গান, কাজী আবদুল ওদুদের ‘বাঙালী মুসলমানের সাহিত্য-সমস্যা’, আবদুল কাদিরের ‘বাঙালার লোকসঙ্গীত’, রকীব উদ্দিন আহমদের ‘বাঙালী মুসলমানের আর্থিক সমস্যা’, কাজী আনোয়ারুল কাদীরের ‘বাঙালী মুসলমানের সামাজিক গলদ’, শামসুল হুদার ‘হযরত মুহম্মদের প্রতিভা’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘সঙ্গীত চর্চ্চায় মুসলমান’, মমতাজউদ্দিন আহমেদর ‘শিক্ষা সমস্যা’, আব্দুস সালাম খাঁর ‘নাট্যাভিনয় ও মুসলমান সমাজ’, আবুল হুসেনের ‘বাঙালী মুসলমানের শিক্ষা সমস্যা’।
দ্বিতীয় সংখ্যায় ছাপা হয়– কাজী নজরুলের ‘নতুনের গান’, কাজী আবদুল ওদুদের ‘বাঙলার জাগরণ’, কামরুদ্দীন আহমদের ‘সমবায় আন্দোলনে মুসলমানের কর্তব্য’, সৈয়দ আবদুল ওয়াহেদের ‘বাঙলার পীর পূজা’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘মানবমনের ক্রমবিকাশ’, কাজী আনোয়ারুল কাদিরের ‘ইংরাজী সাহিত্যে রোমান্টিক যুগ’ ও ফজিলাতুন্নেসার ‘নারীজীবনে আধুনিক শিক্ষার আস্বাদ।’
সাহিত্য সমাজের তৃতীয় বার্ষিক অধিবেশনে কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল ও মোহিতলাল মজুমদার যথাক্রমে ‘বাংলা সাহিত্যের চর্চ্চা’, ‘স্যার সৈয়দ আহমদ’, ‘ধর্ম ও সমাজ’, ‘তরুণ আন্দোলনের গতি’ ও ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন। প্রবন্ধগুলি ‘শিখা’র তৃতীয় সংখ্যায় মুদ্রিত হয়।
‘শিখা’ চতুর্থ সংখ্যায় সাহিত্য-সমাজের চতুর্থ বার্ষিক অধিবেশনের অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি, মূল সভাপতির অভিভাষণ ও ‘সম্পাদকের কথা’র সাথে কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন ও কাজী মোতাহার হোসেন পঠিত ‘গ্যেটে’, ‘ব্রিটিশ ভারতে মুসলমান আইন’ ও ‘ধর্ম ও শিক্ষা’ প্রবন্ধগুলি ছাপা হয়।
পঞ্চম ও শেষ সংখ্যা ‘শিখা’য় প্রকাশিত হয়– কাজী মোতাহার হোসেনের ‘মানুষ মোহম্মদ’, কামালউদ্দিনের ‘অর্থনৈতিক কলহ’, আবদুস সালামের ‘সেভিং ব্যাংকের সুদ’, আবুয্যোহা নূর আহমদের ‘মুসলিম জগতে লাইব্রেরি’, মোতাহার হোসেনর চৌধুরীর ‘আমাদের দৈন্য’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘নাস্তিকের ধর্ম’, আবুল হুসেনের ‘আমাদের রাজনীতি’, মোহাম্মদ আবদুর রশীদের ‘হিন্দু মুসলমানের কথা’ ও নাজির উদ্দিন আহমদের ‘স্বাধীন ভারতের দাস’।
বৈচিত্র্যময় সাহিত্য চর্চ্চার মধ্য দিয়ে মুসলিম সাহিত্য-সমাজ-এর কর্মীরা তাঁদের চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরতেন। বাংলার শিক্ষিত মুসলিম তরুণদের উপর এর অপরিসীম প্রভাব পড়েছিল। এর দ্বারা একটি জিজ্ঞাসু ও সহৃদয় গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছিল। পূর্বের যেকোনো চিন্তাধারা থেকে এটি ছিল অগ্রগামী এবং ‘আগ্রাসী’। তাই কোনো কোনো মহলে মুসলিম সাহিত্য-সমাজ একটি উৎপাত হিসেবেই গণ্য হতো। ঠিক যেমনটি ১৯২৮ সালে কলকাতায় মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের সম্পাদনায় এবং কাজী নজরুল ইসলাম কেন্দ্রিক ‘সওগাত’ পত্রিকাটি।
বুঝতে অসুবিধা হয় না। প্রথা বিরোধী লেখালেখির কারণে শুরু থেকেই সাহিত্য-সমাজকে প্রতিক্রিয়াশীলরা মেনে নেয়নি। পড়তে হয় তাদের প্রবল বিরোধিতার মুখে। মুসলিম সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল অংশের গাত্রদাহ সৃষ্টি হয়। প্রথম বিতর্ক সৃষ্টি হয় সাহিত্য-সমাজের ১ম বর্ষের ২য় অধিবেশনে আবুল হুসেনের ‘শতকরা পঁয়তাল্লিশ’ শিরোনামের পঠিত প্রবন্ধ ঘিরে। তৎকালে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহে মুসলিমদের জন্য তেত্রিশ থেকে বাড়িয়ে শতকরা পঁয়তাল্লিশ ভাগ পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে আবুল হোসেন এই ‘কনসেশন’ এর বিরোধিতা করে উক্ত প্রবন্ধটি লেখেন। আবুল হুসেন বলেন, “.......আজ সরকারের সাহায্যই আমাদের একমাত্র মূলধন হয়েছে। সরকার সে মূলধন দিতে একটু কার্পণ্য করলেই আমাদের কান্নাকাটি আকাশ বাতাস অস্থির করে তুলে। ভিক্ষুককে যেমন তুষ্ট করা কঠিন, ঠিক সেইরূপ আমাদিগকে তুষ্ট করাও সরকারের পক্ষে বড় কঠিন হয়ে উঠেছে। সরকার নানা কান্নাকাটি, আবদার আবেদনের পর আমাদের বরাদ্দ করেছেন। কিন্তু তাতেও আমরা তুষ্ট হয়েছি বলে মনে হয় না। ভিক্ষুক কি কখনো তুষ্ট হতে পারে? তাই শুনতে পাই কোনো এক মুসলিম কৌঁসিলী শতকরা ষাটটির জন্য ব্যবস্থাপক সভায় এক আবেদন পেশ করবেন। এইরূপ আবেদন যে কত বড় দৈন্যের পরিচায়ক, লজ্জাকর তা বলতে পারি না। ...... শতকরা পঁয়তাল্লিশের ব্যবস্থা এই দৈন্য, নির্লজ্জতা, দারিদ্র্য, মানসিক দুর্বলতাকে আরও প্রশ্রয় দিতে থাকবে”। পরবর্তী অল্প দিনের মধ্যে সাপ্তাহিক মোহম্মদী পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর গোলাম মোস্তফা (কবি, প্রবন্ধকার) উক্ত পত্রিকার (১৫ মে ১৯২৬) সংখ্যায় একটি প্রতিবাদ প্রকাশ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবুল হুসেনের চাকরিকে ‘অনুগ্রহের দান’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। গোলাম মোস্তফার এই ব্যক্তিগত আক্রমণের ফলে তীক্ষè আত্মমর্যাদাশীল আবুল হুসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরি থেকে ইস্তফা দিয়ে আইন পেশায় যুক্ত হন। উল্লেখ্য এম এ ডিগ্রির পাশাপাশি তাঁর বি এল ডিগ্রিও ছিল।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রথম বার্ষিক সাধারণ সভায় ৫ম অধিবেশনে কাজী আব্দুল ওদুদ তাঁর ‘সম্মোহিত মুসলমান’ প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন। এই প্রবন্ধে কাজী আবদুল ওদুদ লেখেন, “........মহাপুরুষ যে সর্বজ্ঞ নন, মানুষের সর্বময় প্রভু নন, মানুষের জীবন-সংগ্রামে তিনি একজন বড় বন্ধু মাত্র-অবশ্য যেমন বন্ধু সমুদ্রচারী পোতের জন্য আলোক স্তম্ভ; তাঁর কথাও চিন্তার ধারা চিরকালের জন্য মানুষের পথকে নিয়ন্ত্রিত করে দিয়েছে একথা বিশ্বাস করলে মানুষরূপে তাঁর সাধনাকে যে চরম অপমানে অপমানিত করা হয়, কেননা, সমস্ত সাধনার যে লক্ষ্য সেই আল্লাহর উপলব্ধি মানুষের পথ থেকে রুদ্ধ হয়ে যায়.........হয়তো তারই ফলে অন্যান্য ছোটখাটো প্রতিমার সামনে নতজানু হওয়ার দায় থেকে কিছু নিষ্কৃতি পেলেও ‘প্রেরিতত্ব’ রূপ এক প্রকাণ্ড প্রতিমার সামনে নতদৃষ্টি হয়ে তাঁরা যে জীবনপাত করছেন, আধ্যাত্মিকতা নৈতিকতা সাংসারিকতা সবদিক থেকেই তা শোচনীয় রূপে দুঃস্থ ও বিভ্রান্ত। ....... জীবনের অর্থই যেন আধুনিক মুসলমান বোঝে না। বুদ্ধি, বিচার, আত্মা, আনন্দ এ সমস্তের গভীরতার যে আস্বাদ তা থেকে বঞ্চিত ভিন্ন আর কিছু বলা যায় না। জগতের পানে সে তাকায় শুধু সন্দিগ্ধ আর অপ্রসন্ন দৃষ্টিতে,–এর কোলে যেন সে সুপ্রতিষ্ঠিত নয় একে যেন সে চেনে না। কেমন এক অস্বস্তিকর অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে সারা জীবনে সে ভীতত্রস্ত হয়ে চলেছে। মুসলমানের, বিশেষ করে আধুনিক মুসলমানের এই অবস্থা লক্ষ করেই বলতে চাই– সে সম্মোহিত। সে শুধু পৌত্তলিক নয়; সে এখন যে অবস্থায় উপনীত তাকে পৌত্তলিকতারও চরম দশা বলা যেতে পারে।
কিছুদিন পর ‘সম্মোহিত মুসলমান’ প্রবন্ধটি সাপ্তাহিক মোহম্মদী পত্রিকায় ছাপা হলে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। মোহম্মদী ও ছোলতান পত্রিকায় এই বিতর্কে একদিকে ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ ও ‘সবজান্তা’ ছদ্মনামে আবুল হোসেন। প্রতিপক্ষ ছিলেন মৌলনা আকরম খাঁ ও অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট দলিল উদ্দিন ও ‘দি মুসলমান’ সম্পাদক মুজীবর রহমান। সমালোচকগণ কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেনকে ‘নাস্তিক’ ও ‘কাফের’ বলে বসেন। বাদানুবাদ-এর একপর্যায়ে খান বাহাদুর কাজেম উদ্দিন সিদ্দিকীর মধ্যস্থতায় একটি ‘আপসরফা’ হয়।
সবচেয়ে বিভীষিকাময় ঘটনা ঘটে সাহিত্য-সমাজ এর ২য় বার্ষিক সম্মেলনে আবুল হুসেন উত্থাপিত ‘আদেশের নিগ্রহ’ প্রবন্ধকে কেন্দ্র করে। ‘আদেশের নিগ্রহ’ প্রবন্ধে আবুল হুসেন লেখেন– “...এই ধর্ম বিশ্বাস আদিম মানব-প্রকৃতির একটি প্রধান লক্ষণ। ভয়, দুর্বলতা ও অজ্ঞতা, এই তিনটি মনোভাব এই ধর্ম-বিশ্বাসের জননী। যে জাতি অর্থাৎ যে জাতির মন এখনও ন্যাংটা বর্বর যুগের কাছাকাছি পড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে সে জাতির ভয়, দুর্বলতা ও অজ্ঞতা তত বেশি। সুতরাং তার ধর্ম বিশ্বাসও তত প্রগাঢ়, অর্থাৎ ধর্মগুরুর আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালনে সে তত তৎপর এই ভয়ে, পাছে তার কোনো অনিষ্ঠ ঘটে কিংবা তার ধর্মগুরু প্রদর্শিত পরলোকে দুর্গতি হয়। বলাবাহুল্য, ধর্মগুরুর আদেশ নানা অনুষ্ঠানের ভিতর দিয়ে পালিত হয়। এক কথায় যে জাতি যত আদিম প্রকৃতি বিশিষ্ট সে জাতি তত অনুষ্ঠান প্রিয়।... কোরআন-হাদিস বাঙলার সাধারণ মুসলমানের নিকট বন্ধ করা (ঝবধষবফ) একখানি পুস্তক ব্যতীত আর কিছুই নয়, যে-পুস্তক হ’তে তারা কিছুই গ্রহণ করতে পারে না বা যার কথা শুনেও তারা তাদের জীবনে প্রয়োগ করতে পারে না অর্থাৎ পারছে না। তবে অনুষ্ঠান পালনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে তারা এখনও মুসলমান।” সম্মেলন স্থলেই তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। দুই বছর পর ‘শান্তি’ পত্রিকায় প্রবন্ধটি ছাপা হলে সম্ভ্রান্ত মুসলিম অধিপতিগণ ক্ষুব্ধ হন। লেখাটি উর্দুতে অনুবাদ করে ঢাকাস্থ অবাঙালিদেরও ক্ষিপ্ত করে তোলা হয়। ‘মোহম্মদী’ পত্রিকা ব্যাপকভাবে আবুল হুসেন এর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক লেখা প্রচার করে। আবুল হুসেনের পক্ষেও আব্দুল কাদির ‘শান্তি’ পত্রিকায় ‘মোহম্মদী’র বক্তব্যকে খণ্ডন করে ‘শাস্ত্রবাহকের হুমকি’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেন। কিন্তু বিষয়টি শুধু পত্রিকা আর সাহিত্য মহলে সীমাবদ্ধ থাকলো না। খান বাহাদুর আব্দুল আজিজ নামে ঢাকার এক সমাজপতি আবুল হুসেনের বাড়িতে যেয়ে পিস্তল বের করে হত্যার হুমকি দেন। অতঃপর ৮ ডিসেম্বর ১৯২৯ তারিখে ‘আহসান মঞ্জিল’-এ আবুল হুসেনের বিচার সভা বসে। সেখানে আবুল হুসেনকে একটি ক্ষমাপত্র লিখিয়ে সাধারণে প্রচার করা হয়।
এরপর আবুল হুসেন মুসলিম সাহিত্য সমাজ এর সম্পাদক ও ‘শিখা’র সম্পাদকের পদ ত্যাগ করেন।
অদম্য সাহসী সাহিত্য-সমাজ এর পরেও তাঁদের কাজ বন্ধ রাখেননি। ভাষা, সাহিত্য, সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি নিয়ে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৯৩৬ সালে দশম বার্ষিক সভার পর বিভিন্ন কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন বিধায় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-কে আর এগিয়ে নেয়া সম্ভব ছিল না।
১৯৩৮ সালে আবুল হুসেন-এর অকাল মৃত্যু ঘটে। তবে অন্যান্যরা বিচ্ছিন্নভাবে হলেও সমাজ সংস্কারের পথে তাদের ভূমিকা এগিয়ে নেন। যার প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে বাংলাদেশে যে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিলেন তারা মুসলিম সাহিত্য-সমাজ দ্বারা অনেকাংশে প্রভাবিত হয়েছিলেন বলে ধারণা করি।
২০২৫ সাল মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পূর্তি। স্পষ্টত যে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে তাঁরা যে লড়াই শুরু করেছিলেন তা এখনো চলমান। বর্তমানে চিন্তা ও বুদ্ধির যে হাহাকার চলছে, গোঁড়ামি ও কূপমণ্ডুকতার যে আস্ফালন দৃশ্যমান তখন তাকে মোকাবিলার জন্য মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তা ও কর্ম পদ্ধতি বর্তমান প্রজন্মের জন্য অবশ্যই জানা ও বোঝা প্রয়োজন। আর শতবর্ষ পূর্বে যে সাহসী মানুষেরা নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন প্রগতির পথে তাদের প্রতি সশ্রদ্ধ অভিবাদন।
লেখক : সিপিবি নেতা
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন