শিক্ষার রুগ্ণ দশা, রোগ বুঝে ওষুধ পড়ছে না

আকমল হোসেন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মাছের পচন ধরে মাথা থেকে আর জাতির ধ্বংস শুরু হয় অশিক্ষা আর কুশিক্ষা থেকে। তাই যদি না হবে তবে কেন ৩০ লক্ষ মানুষের জীবনদান ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে সামরিক শাসন, কিংস পার্টির আগমন, রাজনীতির নামে নাবালকদের নৃত্য, জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা, মব ভায়োলেন্স, চাঁদাবাজি, বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস, রাজনৈতিক সহিংসতা, অনির্বাচিতদের দেশ শাসন চলবে? জাতীয়তাবোধ দেশপ্রেম শিষ্টাচারের দৈন্যদশা কেন ঘটবে? রাজনৈতিক শিষ্টাচার পরস্পর পরস্পরের প্রতি সহনশীলতা এবং শ্রদ্ধাবোধের যে ঘাটতি সেখানে প্রশ্ন আসাই স্বাভাবিক, আমাদের শিক্ষা আমাদের কী শেখাচ্ছে? আমাদের শিক্ষক সমাজ কী পড়াচ্ছেন? রাজনীতিতে চর দখলের সাথে সকল রাজনৈতিক দলই কম-বেশি জড়িত, কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোথাও কি এই নির্দেশনা দেওয়া আছে? রাজনৈতিক সংকট মোচনে রাজনীতিকদের ওপর ভরসা না করে সেনাবাহিনী এনজিও ও সিভিল সোসাইটির ওপর নির্ভরতা রাজনীতিকদের কি সম্মানিত করে? নিশ্চয়ই না। রাজনীতিকদের যোগ্যতা এবং স্বচ্ছতার সীমাবদ্ধতার সুযোগে আমলাতন্ত্র এবং সিভিল প্রশাসনে ডিফেন্সের কর্তৃত্ব বেড়েছে। এসকল কাজের পেছনে শিক্ষার অপরিপক্কতাও দায়ি। এ দায় ৫৪ বছরের কোনো শাসক এবং শিক্ষার সাথে জড়িতজনেরা এড়াতে পারবেন না। যদি শিক্ষাব্যবস্থাকে দাঁড় করানো যায় এবং দুই-তিনটি জেনারেশন গড়ে দেওয়া যায় তাহলে আর উন্নয়নের জন্য পেছন ফিরে তাকানোর প্রয়োজন হবে না, যেটা করেছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম এবং ব্রাজিল। সেজন্য শিক্ষা নিয়ে কাজ করা জরুরি। দেশ জাতি আর মানুষের বাসযোগ্য ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষার্থীদের দেশের কারিগর হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। দেশপ্রেমিক মানুষ গড়তে ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা খুবই প্রয়োজন। নগদ যাহা পাও হাত পেতে নাও বাকীর খাতা শূন্য–এই ভোগবাদী এবং আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা পরিহার করা দরকার। শিশুদের জাতীয় সম্পদে পরিণত করার জন্য সেরকম কাজটাই করতে হবে। তারা হাসবে খেলবে তার মাঝ দিয়ে শিখবে, শেখার ক্ষেত্রে ভয়ভীতি ও পীড়াপীড়ি থাকবে না। পরীক্ষা-ভীতি যেন তাদের গ্রাস না করে সেদিকে খেয়াল রাখার প্রয়োজন। ৮ বছর পর্যন্ত শিশু দেখবে, শুনবে খেলবে এবং বলবে, সে রকম পরিবেশ বাড়িতে কমিউনিটিতে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৈরি করতে হবে। এ কাজগুলো শুধু শিক্ষকেরা করবেন এমন নয়, বাড়িতে এবং কমিউনিটিতে এ ব্যবস্থা থাকতে হবে। এজন্য শিক্ষায় পরিবারের অর্থায়ন বৃদ্ধি করা এবং স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে কমিউনিটিতে শিক্ষামূলক পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে। কমিউনিটির ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এ কাজে সহায়তা করতে পারেন। শিক্ষা ক্ষেতে বিদ্যমান রুগ্ন দশা দূরীকরণে মেডিকেল বোর্ডের মতো সকল রাজনৈতিক দলের শিক্ষা বিষয়ক দায়িত্ব প্রাপদের নিয়ে একটি কমন সিদ্ধান্তে আসার প্রয়োজন। শিক্ষার সংকট দূরীকরণে শিক্ষার দর্শন, ব্যবস্থাপনা এবং অর্থায়ন নিয়ে আলাচনাটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা দরকার। শিক্ষার দর্শন/মনস্তাত্তিক ভিত্তি: গ্রামীণ প্রবাদে আছে গড়নের কালে যার ইস্পাত হয় চুরি বালি দিলে ধার ওঠেনা খালি লোহার ছুরি। অথবা গোল ছাচে লম্বা পিঠা হয় না । শিক্ষা ব্যবস্থার গলদ রেখে ডিগ্রিধারী কিছু প্রাণী পাওয়া গেলেও মানুষ পাওয়া যাবে না। এই ব্যবস্থার মধ্য থেকেও কিছু মানুষ বের হলেও দলবাজির কারণে তাদের কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়টি বন্ধে শিক্ষার দর্শন বা ভিত্তিকে শক্ত করে ধরতে হবে এবং কারিকুলাম এবং সিলেবান প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য শিশুর বয়স সামর্থ্য ধারণক্ষমতা আগ্রহ বা ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে কারিকুলাম তৈরি, এবং সে বিষয়ে পাঠদানের জন্য শিক্ষকদের বাছাই নিয়োগ ধারাবাহিকভাবে প্রশিক্ষণ মনিটরিং পদোন্নতি পদাবনতি, আইনগত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এমনকি কাজ করতে সক্ষম না হলে চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। শিশুর শারীরীক ও মানসিক বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা, দেশ ও জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্যকে ভিত্তি ধরে শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্ধারণ এবং সেটা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় কমিটমেন্ট প্রয়োজন। শিশুদের প্রশ্ন করা, স্বাধীন চিন্তা করা, বলার সুযোগ দেওয়া খেলাধুলাসহ সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করা, মুখস্ত শেখানোর বিষয়টি পরিহার করা, বিষয় সম্পর্কে সাধারণ ধারণা দেওয়া, গল্পের আদলে পড়ানো, ভ্রমণ কাহিনীর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আত্মীয়-পরিজন এবং প্রতিবেশীদের সাথে সামাজিকরণ বা মেশার অভ্যাস করানোর কাজটি শিক্ষকদের সাথে সাথে বাবা-মা ও পরিবারের লোকজন করাবেন। শিশুকাল থেকেই শিশুরা যেন বিভাজন আর সংকীর্ণ চিন্তায় আকৃষ্ঠ না হয় তার জন্য সতর্ক থাকা দরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী বিদ্যালয়মুখী হওয়া এবং নতুন নতুন বিষয় সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি করতে পারলেই পরবর্তীতেও দেশ জাতি আর বিশ্বায়নের আলোকে কারিকুলাম তৈরি করতে পারলে এবং সে অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের গড়তে পারলে আমাদের সন্তানদের বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় টিকানো সম্ভব। এজন্য বিজ্ঞান যুক্তি ও দর্শনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সিলেবাস প্রণয়ন করা জরুরি। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে যেন কারিকুলাম পরিবর্তন না হয় সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া, শিক্ষাবিদদের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া যেতে পারে। শিক্ষা ব্যবস্থাপনা: পড়াশোনার পরিবেশ তৈরিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক গভর্নিং বডি, কমিউনিটি শিক্ষা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়টা জরুরি। শিক্ষা প্রশাসনের মধ্যে রয়েছে, প্রতিষ্ঠান প্রধান, গভর্নিংবডির সদস্যবৃন্দ (যার মধ্যে শিক্ষক, অভিভাবক, দাতা প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষা অনুরাগী) থানা, জেলা,আঞ্চলিক কর্মকর্তা অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে প্রতিষ্ঠান প্রধানরাই মূল কাজ করেন অন্যেরা নীতিমালা তৈরি এবং দেখভাল করে থাকেন। প্রতিষ্ঠানেটিকে পাঠদানের উপযোগী করেন গভর্নিংবডি থেকে উপরের স্তরের সবাই তবে মূল কাজ পাঠদান এ কাজটি করেন শিক্ষকরা। ভালো পাঠদানের জন্য ভালো ও জীবন্ত শিক্ষক প্রয়োজন। জীবন্ত শিক্ষক মানে যিনি পড়বেন তারপর পড়াবেন, পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সাথে সমন্বয় করে নতুন নতুন তথ্যে শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ করবেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করবেন এবং জানার সেই আগ্রহকে নিবৃত্ত করবেন, মনে রাখতে হবে এটা কোন চাকুরি নয় তপস্যা বা কর্তব্য পালন। এওর জন্য নৈতিক দায়বদ্ধতা প্রয়োজন, যেটা নাকরা পর্যন্ত তার ঘুম হবে না, এরকম কর্তব্যবোধসম্পন্ন শিক্ষকের খুবই প্রয়োজন। এ ধরনের শিক্ষক পেতে এবং তৈরি করতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে সরকারি বেসরকারি সকল সেক্টরে। সকল স্তরের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ও দলীয়করণের পরিবর্তে পাবলিক সার্ভিস কমিশন অথবা অনুরূপ বিকল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা করা, সকল শিক্ষা জাতীয়করণের মাধ্যমে গভর্নিং বডির বিলুপ্তি ঘটানো, যতদিন সকল শিক্ষা জাতীয়করণ না হয় ততোদিন গভনির্ংবডি থাকতে পারে তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় গভনির্ং বডিতে সভাপতি মনোনয়নের বিষয়টি না রাখা এবং সকল প্রকার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গভনির্ংবডিকে যুক্ত না রাখার বিষয়টি গুরত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ভালো শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতা পেশা আনার জন্য বেতন স্কেলসহ আর্থিক সুবিধা ও সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষায় অর্থায়ন: নাগরিক অধিকার বাংলাদেশের সংবিধান, ইউনেস্কো ঘোষিত প্রত্যেক দেশের বাজেটের (জিডিপি) ৭ ভাগ, ২০০৬ সালে সাইপ্রাসে অনুষ্ঠিত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে জিডিপির ৬ ভাগ আর ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শিক্ষা ফোরামের সম্মেলনে গৃহীত এসডিজিতে, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার খরচ রাষ্ট্র সরবরাহ করবে, যার আলোকে মাধ্যমিক পর্যায়ের তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে সরকারিকরণ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের শিক্ষার্থীদের মাত্র ১০-১৫ ভাগ শিক্ষার্থীকে পড়ানোর সুযোগ আছে। সরকারি প্রাইমারি এবং বেসরকারি এমপিও এবং নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতন ভাতার করুণ অবস্থা। প্রাইমারি স্কুলে ৯৭০০ টাকা আর মাধ্যমিক পর্যায়ে ১২৫০০ টাকার স্কেল পরিবর্তন প্রয়াজন। কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকদের শুরুর স্কেলটা ঠিক আছে, তবে চাকরিজীবনে দুটি পদোন্নতির মাধ্যমে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ না রাখা যোক্তিক বলে মনে হয় না। কতোগুলি শর্তসাপেক্ষে অধ্যাপক পর্যন্ত পদোন্নতির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বৈষম্যবিরোধী সংস্কার আন্দোলনেরও বছর পেরিয়ে গেল, কত দাগী আসামি মাফ পেল, অনেকের ট্যাক্স মাফ হলো, শিক্ষকদের জন্য এই কালাকানুন বাদ হচ্ছে না। ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, ১০০০ টাকা বাড়ি ভাড়া অধ্যক্ষ থেকে অফিস সহায়ক সবার জন্য। ২৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ উৎসব বোনাস। বকরাদ্দকৃত শিক্ষা খাতের টাকা প্রতিরক্ষা খাতে না দিলে অব্যবহৃত টাকা কাজে লাগালে, প্রকল্পের নামে হরিলুট বন্ধ করলে বরাদ্দকৃত টাকায় আরো কিছু করা সম্ভব। অবসর গ্রহণের তিন/চার বছর পরও যখন তার কর্তনকৃত টাকা পেতে ৩/৪ বছর লাগে, টাকার অভাবে চিকিৎসা ছাড়া স্ত্রী/স্বামীর মারা যাচ্ছেন, তখন তার গগন বিদারী আত্মচিৎকারের সান্ত¡না কী এবং কে দেবেন। দায়িত্বশীলরা যদি আরেকটু উদ্যোগী হোন তাহলে এই মানুষগুলোর বড় উপকার হতে পারে। লেখক : অধ্যক্ষ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..