চট্টগাম বন্দরের সামনে রোডমার্চের সমাপনীতে ঘোষণা

দেশবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়ন হতে দিব না

বন্দর নিয়ে সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে ৫ আগস্টের পর নতুন কর্মসূচি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণের’ ডাকা ২৭-২৮ জুন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রোডমার্চের সমাপনী সমাবেশ চট্টগ্রাম বন্দরের সামনে অনুষ্ঠিত হয়
একতা প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনায় বিদেশি কোম্পানিকে যুক্ত করাসহ সব ধরনের ‘দেশবিরোধী’ কর্মকাণ্ড থেকে সরকার পিছু হটবে, এমন প্রত্যাশা নিয়ে শেষ হয়েছে বন্দর অভিমুখে দুই দিনের রোডমার্চ। ২৮ জুন বিকেলে বন্দর ভবনের বিপরীতে ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ’-এর আয়োজনে হওয়া এই রোডমার্চের সমাপনী সমাবেশে বক্তারা এমন আশা প্রকাশ করেন। এ সময় করিডোরের সিদ্ধান্ত বাতিল ও বন্দর বিদেশিদের দেওয়ার সিদ্ধান্ত না পাল্টালে আগামী ৫ আগস্টের পর কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন নেতারা। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে রোডমার্চটি বন্দর ভবনের সামনে পৌঁছায়। চট্টগ্রাম জেলা সিপিবির সভাপতি অশোক সাহার সভাপতিত্বে এবং বাসদের জেলা ইনচার্জ আল কাদেরি জয়ের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক ও বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাসদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চার সমন্বয়ক ও গণমুক্তি ইউনিয়নের সমন্বয়ক নাসিরউদ্দিন আহম্মদ নাসু, বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের আহ্বায়ক শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, বাংলাদেশের সোশ্যালিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম প্রমুখ। রোডমার্চে ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি শাহ আলমসহ বিভিন্ন বাম সংগঠনের বর্ষীয়ান নেতারা। বাম জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা, করিডোর দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলসহ দেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ না করলে ৫ আগস্টের পর কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। এক সেকেন্ড দেরি না করে সরকারকে ঘোষণা করতে হবে- তারা বন্দর লিজ দেবে না। রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আমরা বন্দর বাঁচাতে ও করিডর ঠেকাতে ঢাকা থেকে দুই দিনের রোডমার্চ কর্মসূচি পালন করে চট্টগ্রামে এসেছি। এ সময় পথে পথে আমরা সাধারণ জনগণের সমর্থন পেয়েছি। তাঁরা আমাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। এটি কোনোভাবেই বিদেশিদের ইজারা দেওয়া চলবে না। বন্দর বিদেশিদের দেওয়া থেকে পিছু না হটলে ৫ আগস্টের পর আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাব। আশা করছি, সরকার দেশবিরোধী, সার্বভৌমত্ববিরোধী এসব কর্মকাণ্ড থেকে পিছু হটবে। করিডোর প্রসঙ্গে রুহিন হোসেন বলেন, মিয়ানমার-রোহিঙ্গায় ভুক্তভোগী চট্টগ্রামের জনগণ। জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছিলেন, এখানে বহুপক্ষীয় সমাধান করতে হবে, ওনারা করলেন না। বরং নতুন করে কী বললেন? রাখাইনকে নাকি করিডোর দেবেন, চ্যানেল দেবেন। আমরা বলছি, সেখানে যুদ্ধ চলছে, সেখানে করিডোর দেওয়া মানে বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা। এটা আমরা হতে দেব না। সমাবেশে বক্তারা বলেন, গেল ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে বিতাড়িত করে এ দেশের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। তবে সরকার এখন বিদেশিদের তাঁবেদার হয়ে উঠেছে। দেশপ্রেমিক মানুষ এখন দেখছে ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট দেশের জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। তারা জনমতের তোয়াক্কা না করে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালসহ বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে মেতেছে। আমরা সরকারের দেশবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়ন হতে দিব না। চার দফা দাবিতে হওয়া রোডমার্চের দাবিগুলো হলো- নিউমুরিংসহ চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের হাতে দেওয়া চলবে না, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে পরিচালনা করতে হবে, রাখাইনে করিডোর দেওয়ার ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে; স্টারলিংক, সমরাস্ত্র কারখানা, করিডোরের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ চক্রে জড়ানোর উদ্যোগ বন্ধ করতে হবে; মার্কিন, ভারতসহ ‘সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদী দেশগুলোর’ সঙ্গে বিগত সব সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো প্রকাশ করতে হবে এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী অসম চুক্তি বাতিল করতে হবে। গত ২৭ জুন ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে শুরু হওয়া এই রোডমার্চে প্রায় ৬৫টির অধিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠন বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে কুমিল্লার টাউন হল ময়দানে সমবেত হন তাঁরা। কুমিল্লায় সমাবেশ শেষে শুক্রবার রাত ১১টায় ফেনী পৌঁছান। কর্মসূচির মূল স্লোগান ‘মা মাটি মোহনা, বিদেশিদের দেব না’। রোডমার্চে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীর হাতে ছিল বিভিন্ন স্লোগান-সংবলিত প্ল্যাকার্ড। এসবের মধ্যে রয়েছে- ‘ইন্টেরিম সরকার, সাম্রাজ্যবাদের পাহারাদার’, ‘মার্কিন কোম্পানি স্টারলিংকের সঙ্গে চুক্তি বাতিল কর’, ‘মার্কিন ভারতসহ সকল সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও’, ‘বন্দর-করিডোর, বিদেশিদের দেব না’, ‘চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া চলবে না’। সহস্রাধিক মানুষ এ কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর আগে, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ সমাবেশ-জনসভা-পথসভা করে গত ২৮ জুন সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর হাজারি রোড মোড় থেকে শুরু হয় মিছিল। মিছিলটি মহীপাল হয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ফেনীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে শেষ হয়েছে। পরে সেখানে অনুষ্ঠিত হয় সংক্ষিপ্ত সমাবেশ। সিপিবির ফেনী জেলা সভাপতি বিমল শীলের সভাপতিত্বে ও বাম গণতান্ত্রিক জোট ফেনীর সমন্বয়ক জসীম উদ্দীনের সঞ্চালনায় পথসভায় ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাজ্জাদ জহির, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, বাংলাদেশ বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবীর, বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের সমন্বয়ক শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, গণমুক্তির সমন্বয় নাসির উদ্দিন নাসু, বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন, বাসদের (মাহবুব) মহিউদ্দীন চৌধুরী, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক পাটির নির্বাহী সভাপতি আবদুল আলী, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চের মাসুদ খান, জাতীয় গণফ্রন্টের রজত হুদা প্রমুখ। রোডমার্চের এই কর্মসূচিতে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা বক্তব্য রাখেন। পথসভা ও রোডমার্চে গণসঙ্গীত পরিবেশন করে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য। পথনাটক পরিবেশন করে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় নাটক বিভাগ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..