রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটকের রাজনৈতিক দর্শন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: রবীন্দ্রনাথের নাটকে আমরা যে রাজাদেরকে পাচ্ছি তারা সকলে এক রকমের নয়। ‘মুক্তধারা’র রাজা রণজিৎ-এর রাষ্ট্রশাসনে ঔপনিবেশিকতা আছে, ‘তাসের দেশ’-এর রাজা নিজের দেশে প্রচলিত আইনকানুন বিধিনিষেধে নিজেই বন্দি। ‘অচলায়তন’-এর রাজা তেমন শক্তিশালী নয়। গোবিন্দমাণিক্যের স্বভাব অনেকটা রাজর্ষিও মতো। ‘ডাকঘর’-এর রাজা অনুপস্থিত। ‘রক্তকরবী’র মকররাজ পুঁজিবাদের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি। ‘রথের রশি’তে রাজা বড়ই অসহায়। কিন্তু ‘রাজা’ (১৯১০) নাটকের রাজাকে নিয়ে সমস্যা আছে ব্যাখ্যায়। এই নাটকে রাজা থাকেন অন্ধকার ঘরে। রানী সুদর্শনার সঙ্গে তাঁর মিলন অন্ধকারেই। রানী নানাভাবে চেষ্টা করেন রাজার চেহারা দেখতে। অনুরোধ, অভিমান, রাগ কোনো কিছুতেই কাজ হয় না, রাজা রানীর সমানে আলোতে আসতে রাজি হন না। সুরঙ্গমা রাজার দাসী, সে রাজাকে দেখতে পায় সেবার মধ্য দিয়ে, ঠাকুরদা’র সঙ্গে রাজার বন্ধুত্ব, তিনিও রাজাকে চেনেন। চেনে না শুধু রানী, রাজাকে সে একান্ত আপন ও নিজের মতো করে পেতে চায়। সুদর্শনা অস্থির। তাকে রূপের নেশায় পেয়েছে। রাজাকে সে দেখতে চায়, বুঝতে চাইবার আগ্রহটা তার নেই। রাজা জানেন চঞ্চল সুদর্শনা তাঁর রূপটাকে সহ্য করতে পারবে না। এর আগেই বিভিন্ন দেশের রাজারা এসে হাজির হয়েছে, তারা রানী সুদর্শনাকে দেখতে চায়। কাঞ্চীরাজ ষড়যন্ত্র করে রানীর প্রাসাদে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, রানী যাতে বেরিয়ে আসে, কিন্তু রানী বেরিয়ে আসে না, রাজা আগুন নেভানোর ব্যবস্থা করে ফেলে, এবং রানীর বারংবার অনুরোধে রাজা শেষ পর্যন্ত তাকে দেখা দেন। তিনি জানতেন যে রানী কেবল রূপকেই দেখবে, অরূপকে নয়; রাজার নিষ্ঠুরতার দিকটা চোখে পড়বে, ভালোবাসার দিকটা রয়ে যাবে অপ্রকাশ্য। রাজার যে রূপ রানী দেখতে পায় সেটা তার কাছে এমনই অপ্রত্যাশিত এবং কালো যে তাকে ভীষণভাবে হতাশ হতে হয়। রানীর ইচ্ছা করে দূরে চলে যেতে, রাজা বাধা দিলে কী হতো বলা যায় না, কিন্তু রাজা বলেন, ‘ঝড়ের মুখে ছিন্ন মেঘ যেমন অবাধে চলে তেমনি তুমি অবাধে চলে যাও।’ রানী সুদর্শনা চলে যায় তার পিতা কাণ্যকুজ রাজার গৃহে। সুদর্শনার পিতা দুর্বল এবং ভীষণ রকমের পিতৃতান্ত্রিক। তার বিশ্বাস সুদর্শনা যেহেতু আপন প্রতিষ্ঠা থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে তখন সংসারে সে ভয়ংকর বিপদ হয়ে দেখা দেবে। সেই বিপদটা ঠিকই আসে। আশেপাশের সাত রাজা তৎপর হয়ে ওঠে, তারা সুদর্শনার পিতৃগৃহে গিয়ে হানা দেয়। অসহায় কাণ্যকুজ রাজাকে তারা লাঞ্ছিত করে, এবং সুদর্শনাকে বাধ্য করে স্বয়ংবর সভায় উপস্থিত হতে। কিন্তু রাজা তো রয়েছেন, অলক্ষ্যে থেকে তিনি সবটা দেখছেন। সেনাপতির দায়িত্বসহ ঠাকুরদাকে তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন রাজাদেরকে বিতাড়িত করতে। ঠাকুরদা যোদ্ধৃবেশে প্রবেশ করেন। কিন্তু কোনো যুদ্ধ হয় না, কেননা নরপতিদের কেউ অনিশ্চিত পুরস্কারের জন্য যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিল না। তারা মোটেই লড়াইয়ের দিকে চোখ রাখে নি, পরস্পরের দিকেই চোখ রেখেছিল। একজন কিছুটা লড়ে, কিন্তু সে-ও আহত হয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। রাজাকে দেখা না-দেখা, এবং রাজার রূপ-অরূপ নিয়ে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব, এবং তা যে দেয়া হয় নি এমনও নয়। তবে রাজার অদৃশ্য থাকার প্রবণতা ও রাজ্য শাসনপ্রণালীর ভেতর রাষ্ট্রীয় রাজনীতিও রয়েছে। ওই রাজ্যের রাষ্ট্রীয় রীতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় কয়েকটি বিষয় থেকে। প্রথমত, নাগরিকদের গান, যেটা অনেকটা জাতীয় সঙ্গীতের মতো, গানের ভেতর দিয়ে তারা বলছে : ‘আমরা সবাই রাজা/আমাদের এই রাজার রাজত্বে/নইলে মোরা রাজার সনে মিলব কি স্বত্বে।’ আরো বলা হচ্ছে, ‘আমরা নই বাঁধা নই দাসের রাজার ত্রাসের দাসত্বে;’ এবং “রাজা সবারে দেন মান/সে মান আপনি ফিরে পান/মোদের খাটো করে রাখে নি কেউ কোনো অসত্যে।’ বোঝা যাচ্ছে রাজ্যে বৈষম্য নেই, রয়েছে সমানাধিকার ও স্বাধীনতা। এখানে ত্রাস নেই; রাজা নিজে কারো দাস নন, অন্যকেও তিনি দাস বানাতে চান না, সকলের জন্যই রয়েছে সমান সম্মান। এই রকমের একটি কল্পলোকে রাজা যদি প্রকাশ্য হয়ে পড়েন তাহলে বিপদের আশঙ্কা থাকে। কেননা তখন পক্ষপাতের প্রশ্ন আসবে, বিপরীতে দেখা দেবে কারো কারো প্রতি অপক্ষপাত। কেউ আশা করবে পুরস্কার, কাউকে দিতে হবে শাস্তি। চলবে আবেদন নিবেদন ও তোষামোদি। রাজা তাই পথে বের হওয়াটা পছন্দ করেন না, অথচ তিনি সর্বত্রই আছেন-সূর্য যেমন থাকে। নাগরিকদের গানে এটাও বলা আছে, ‘আমরা চলব আপন মতে/শেষে মিলব তারি পথে।’ পথের ব্যাপারটাও লক্ষ্য করবার মতো। এ রাজ্যে পথচলার কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, সবাই চলে আপন মতে, কিন্তু সব পথই রাষ্ট্রীয় পথ, কোনোটাই ব্যক্তিগত নয়। কয়েকজন বিদেশি এসেছে বসন্ত পূর্ণিমার উৎসবে যোগ দিতে। তারা রাস্তা খোঁজে। প্রহরী বলে, ‘এখানে সব রাস্তাই রাস্তা। যেদিক যাবে ঠিক পৌঁছাবে। সামনে চলে যাও।’ বিস্মিত এক বিদেশি জানায়, ‘আমাদের দেশে তো রাস্তা নেই বললেই হয়-বাঁকাচোরা গলি, সেতো গোলক ধাঁধা। আমাদের রাজা বলে, খোলা রাস্তা না থাকলেই ভালো; রাস্তা পেলেই প্রজারা বেরিয়ে চলে যাবে। এদেশে উল্টো, যেতেও কেউ ঠেকায় না, আসতেও কেউ মানা করে না-তবু মানুষও তো ঢের দেখছি-এমন খোলা পেলে আমাদের রাজ্য উজাড় হয়ে যেত।’ এই রাজ্য অচলায়তন নয়, এখানে সবকিছু খোলোমেলা। এবং খোলা বলেই কেউ রাজ্য ছেড়ে চলে যায় না। ঠাকুরদা’র বক্তব্যও ব্যাপারটাকে তুলে ধরে; নাগরিকদেরকে তিনি বলেন, ‘রাজা নেই, তোমরাই আছে। তাঁর সবই তো তোমাদের জন্যেই।’ এখানে তথাকথিত আইনের শাসন খুব একটা জরুরি নয়। সুদর্শনার উদ্দেশ্যে রাজার গান আসলে নাগরিকদের ক্ষেত্রেও খাটে : ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব।’ কিন্তু রাজা তো ননীর পুতুলটি নন, তাকে রাজ্য শাসন করতে হয়। শাসনের ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর হতে হয় বৈকি। ভয় দেখানোরও প্রয়োজন পড়ে। ওই রাজ্যের নাগরিকদের একজনই তো মন্তব্য করছে, শুনি আমরা, ‘সকল দেশেই রাজাকে দেখে দেশসুদ্ধ লোকের আত্মপুরুষ বাঁশপাতার মতো হী হী করে কাঁপতে থাকে।’ রাজাকে দেখে লোকে ভয় পাক, আঁতকে উঠুক, কাঁপতে থাকুক, এবং বিরূপ হয়ে বলতে থাকুক তিনি কেমন ভয়ঙ্কর বিদঘুঁটে, কুৎসিত-রাজা তা চান না। তিনি যে অপরূপ, অনুপম, সেটা বুঝতে অনুশীলনের প্রয়োজন, যেটা সুদর্শনার ছিল না। সে জন্যই তার কাছে দৃশ্যমান হতে রাজার আপত্তি। এমনকি সুরঙ্গমার কাছেও তো এক সময়ে রাজা ছিলেন ভীষণ ভয়ঙ্কর। তার কারণ সুরঙ্গমা রানী সুদর্শনাকে জানিয়েছে। সুরঙ্গমার বাবা মদ খেতো আর জুয়া খেলতো। রাজ্যের যত যুবক সঙ্গে এসে জুটতো। রাজা সুরঙ্গমার বাবাকে শাস্তি দিয়েছিলেন, তাকে নির্বাসিত করেছিলেন। সুরঙ্গমা জানাচ্ছে, ‘খুব রাগ হতো। ইচ্ছে হয়েছিল যদি কেউ রাজাকে মেরে ফেলে তো বেশ হয়।’ বাপের থেকে ছাড়িয়ে এনে সুরঙ্গমাকে রাখা হয়েছিল। সুরঙ্গমার বর্ণনায়, ‘আমি নষ্ট হবার পথে গিয়েছিলুম। বাবা ইচ্ছে করেই আমাকে সে পথে দাঁড় করিয়েছিলেন। আমার মা ছিল না।’ সুরঙ্গমার তখন কী কষ্ট। আমাকে যেন ছুঁচ ফোঁটাতো, আগুন পোড়াতো, কেননা আমি নষ্ট হবার পথে গিয়েছিলুম। সেই পথ বন্ধ হতেই মনে হলো আমার যেন কোনো আশ্রয় রইলো না। আমি খাঁচায় পোরা বুনো জন্তুর মতো কেবল গর্জে বেড়াতুম এবং সবাইকে আঁচড়ে কামড়ে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করতো। উঃ কী নিষ্ঠুর। কী নিষ্ঠুর। কী অবিচলিত নিষ্ঠুরতা।’ তারপরে, ‘সমস্ত দুরন্তপনা হার মেনে একদিন মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। তখন দেখি যত ভয়ানক ততই সুন্দর।’ দেখবার এই চোখটা সুদর্শনার থাকবার কথা নয়; ছিলও না। রাজা চেয়েছিলেন ক্রমে ক্রমে রানীর কাছে নিজেকে প্রকাশ করবেন। সুদর্শনার বিলম্ব সয় নি, অপ্রস্তুত অবস্থায় রাজদর্শনের বিড়ম্বনা তাই তাকে সহ্য করতে হয়। নানা রকমের দুর্যোগ, দুর্ভোগ ও আশঙ্কা পার হয়ে শেষ পর্যন্ত রাজার সঙ্গে রানীর মিলন ঘটে, রাজপ্রাসাদে নয়, রাস্তায়। সুদর্শনা জানায়, ‘আজ আমার সেই ধূলোমাটির রাজার সঙ্গে পদে পদে এই ধূলোমাটিতে মিলন হচ্ছে-এ সুখের খবর কে জানতো।’ এ নাটকের রাজনৈতিক তাৎপর্যটি লক্ষ্য করা জরুরি। দেশের শাসক, এক্ষেত্রে রাজা, যতই অপ্রত্যক্ষ থাকেন ততই দেশের জন্য মঙ্গল। রাজা থাকবেন, তিনি লক্ষ্য করবেন সমস্ত কিছু, কিন্তু প্রয়োজন না-হলে আত্মপ্রকাশ করবেন না। আদর্শ রাষ্ট্রে রাজার হস্তক্ষেপও ঘটবে কম, সেখানে নাগরিকেরা সবাই সমান, ব্যবস্থাটা গণতান্ত্রিক। সকলেই সম্মানিত এবং সবার মধ্যেই এই ভাবটা থাকবে যে রাজ্য তাদের সকলের, মালিকানা তাদেরই। রাজা রইবেন অটল, যে জন্য তাঁকে মনে হবে নিষ্ঠুর, এমনও ভ্রম ঘটবে যে তিনি বীভৎস, কিন্তু আসলে তিনি অপরূপ, অনুপম। একটা বন্ধন থাকবে, কিন্তু সেটা দরকার হবে অন্য কারণে নয়, মুক্তির প্রয়োজনে। লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..