বৈষম্যমূলক হিন্দু ও বৌদ্ধ উত্তরাধিকার আইন: সরব হওয়া জরুরি কর্তব্য

সুতপা বেদজ্ঞ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বাংলাদেশের বর্তমান হিন্দু ও বৌদ্ধ উত্তরাধিকার আইন নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক, অমর্যাদাকর। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা কিছু বিশ্বাস, কিছু আচার-আচরণ, কিছু কুপ্রথা নিয়েই হিন্দু উত্তরাধিকার আইন। সময়ের প্রয়োজনে মানুষের জীবন-যাপনে, আচরণে পরিবর্তন এসেছে। মানুষ ধীরে ধীরে তা মেনেও নিয়েছে। হিন্দু সমাজও নানা কুপ্রথা-কুসংস্কার বর্জন করে তার যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু নারীর অধিকারের ব্যাপারে বাংলাদেশের হিন্দু সমাজের কিছু পুরুষতান্ত্রিক প্রতিনিধি আজও পরিবর্তনের বিপক্ষে অবস্থান করছে। সাথে সাথে রাষ্ট্রও হিন্দু নারীদের প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ করছে না। শুধুমাত্র আইনের কারণে এখনও এদেশের হাজার হাজার হিন্দু নারী মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। হিন্দু আইনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই দেখা যায় এটা কোনো ধর্মীয় বিধি নয়। এই আইন কেবল আঞ্চলিক ও সামাজিক প্রথার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হিন্দুরা বসবাস করেন। তারা সেই দেশের প্রচলিত আইন ও বণ্টন ব্যবস্থার ভিত্তিতে সম্পত্তির অধিকার লাভ করেন। ভারতেও হিন্দু আইন সর্বত্র একরকম নয়। ভারতের কোনো কোনো প্রদেশে এখনও মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। সেসব ঘরানার প্রথাগত আইন অনুযায়ী মেয়েদেরই সম্পতিতে অগ্রাধিকার। অথচ তারাও হিন্দু ধর্মাবলম্বী। বাংলাদেশের হিন্দু আইন যে কারণে বৈষম্যমূলক: প্রথমত: বাংলাদেশের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী কন্যা সন্তান উত্তরাধিকারসূত্রে পিতার সম্পত্তির কোনো অংশই পান না। অথচ ভারতে ১৯৫৬ সালে হিন্দু আইন ‘Hindu Disposition of Property Act’ পাস হওয়ার পর সেখানে এখন পিতার মৃত্যুর পর সম্পত্তিতে পুত্র ও কন্যা সমান অংশীদার এবং স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী আনুপাতিক হারে সম্পত্তির ভাগ পেয়ে থাকেন। দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশে বিয়ের ক্ষেত্রে নারীদের কোনো সম্মতির প্রয়োজন হয় না। তৃতীয়ত: বিয়ে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক নয়। চর্তুথত: ১৯৮০ সালের ‘গার্ডিয়ান এন্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী পিতা জীবদ্দশায় উইল করে অন্য ব্যক্তিকে নাবালকের অভিভাবকত্ব নিযুক্ত করে গেলে সে ব্যক্তির দাবি অগ্রগণ্য হবে। ১৯৮৫ সালের ‘পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ’ অনুযায়ী মা যদি সন্তানের সম্পত্তির অভিভাবক হতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই তার স্বামীর উইলের মাধ্যমে হতে হবে। পঞ্চমত: বাংলাদেশে কোন হিন্দু নারী তার নিজের জন্য দত্তক নিতে পারে না। ষষ্ঠত: আইনে যা–ই থাক না কেন ‘স্ত্রী ধন’ (যৌতুক বা অন্য যে কোন সূত্রে অর্জিত নারীর সম্পদ বা সম্পত্তি)-এর ক্ষেত্রে নারীর কোনো অধিকার বাস্তবে থাকে না। সপ্তমত: ১৯৫৫ সাল থেকে ভারতে যে হিন্দু বিবাহ আইন প্রচলিত হয়েছে, তাতে যুক্তিসংগত কারণ দেখিয়ে স্বামী বা স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরণের কোনো আইন প্রচলিত নেই। ফলে হিন্দু নারীরা নানাভাবে বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার হয়েও স্বামীগৃহে বসবাস করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে প্রচলিত হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সাংঘর্ষিক: বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ‘রাষ্ট্র এমন কোনো আইন প্রণয়ন করবে না যা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। এ ধরনের কোনো আইন থাকলেও তা বাতিল বলে গণ্য হবে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে-‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না।’ ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে-‘সকল নাগরিকের সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন’, (২) বলা আছে, ‘মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য, নাগরিকের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের দেশের আইনি সব বিধি-ব্যবস্থা সংবিধানের আলোকে পরিচালিত হয়। কেবলমাত্র নারী-পুরুষের সম্পত্তির অধিকার ও পারিবারিক অধিকারের প্রশ্নে ধর্মীয় আইন বলবৎ রয়েছে। বাংলাদেশের গোঁড়ামিপূর্ণ কিছু হিন্দু নেতা গত পঞ্চাশ বছর ধরেই উত্তরাধিকার আইনটি সংশোধনের বিরোধিতা করে আসছেন। তারা বরাবর দুটো যুক্তি দেখিয়ে চলেছেন। এক. এদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীরা বাবার সম্পত্তির অধিকারী হলে তারা সম্পত্তি রক্ষা করতে পারবে না। দুই. মুসলিম ছেলেরা সম্পত্তির লোভে হিন্দু মেয়েদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে বিয়ে করবে। যুক্তি দুটোই উদ্ভট ও পুরুষতান্ত্রিক সামন্তবাদী চিন্তার ফসল। কারণ বর্তমান হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে পরিষ্কার উল্লেখ করা হয়েছে- যদি কেউ ধর্মান্তরিত হয়, সেক্ষেত্রে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশত্যাগ করে চলেছেন বাংলাদেশের মানুষ। সম্ভবত পৃথিবীর কোনো দেশেই এমনকি বর্তমানে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত সমস্যাসংকুল সিরিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবন বাঁচাতে অভিবাসী হচ্ছেন, এ হার তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। স্বাধীনতার পর এদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী ছিল ২৩ শতাংশ। পঞ্চাশ বছরের পরিক্রমায় এ হার এসে দাঁড়িয়েছে ৭ শতাংশে। অর্থাৎ এ সময়কালে প্রতি ১০০ জনে ১৪ জন ভারতে বা অন্য দেশে চলে গেছে। তাহলে ১ কোটিতে ১৪ লক্ষ সংখ্যালঘু দেশত্যাগ করেছেন। এরা কেউই বৈধ পথে দেশত্যাগ করেনি। সঠিক হিসাব বলা না গেলেও এ পর্যন্ত প্রায় এক কোটি হিন্দু জনগোষ্ঠী দেশত্যাগ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ের অন্য একটি হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে ৬৩০ জন দেশত্যাগ করছে। বাংলাদেশে এমন কোনো নগর বা গ্রাম খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে হিন্দু বা সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল হয়নি। এসব পরিস্থিতিতে হিন্দু বা সংখ্যালঘু পুরুষতান্ত্রিক নেতারা কী করতে পেরেছেন! অথচ হিন্দু নারীরা সম্পত্তি পেলেই তা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার জুজুবুড়ির ভয় দেখিয়ে আইন সংশোধনরোধে নানা ফন্দিফিকির করেই যাচ্ছেন। ভারত পেরেছে, নেপাল পেরেছে। বাংলাদেশ কেন পারবে না? যুগ যুগ ধরে চলে আসা হিন্দু সমাজের বিধান সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তিত হয়েছে। ভারতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সম-অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। নেপালে সম-অধিকার রয়েছে। এতে কিন্তু ভারতীয় বা নেপালীয় হিন্দুদের হিন্দুত্ব ক্ষুণ্ন হয়নি। এদেশে হিন্দু ও বৌদ্ধ কন্যাসন্তানদের পিতার সম্পত্তিতে অধিকার না থাকার কারণে যৌতুকের মত কু-প্রথা হিন্দু সমাজে এখনও বলবৎ রয়েছে। অথচ রাষ্ট্রে যৌতুকবিরোধী আইন আছে। মেয়েদের সম্পত্তিতে অধিকার না দিলে সমাজ থেকে যৌতুক প্রথা কাগজে-কলমে বন্ধ হলেও বাস্তবে রোধ করা যাবে না, এখনও যায়নি। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও বাংলাদেশের কিছু পুরুষতান্ত্রিক প্রাচীনপন্থি গোঁড়ামিপূর্ণ নারী বিদ্বেষী হিন্দু বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাদের কাছে এদেশের সমাজ ও রাষ্ট্র জিম্মি হয়ে থাকা মোটেও কাজের কথা নয়। বাংলায় ব্রিটিশ শাসকগণ সম্পত্তি বণ্টন, উত্তরাধিকার ও উত্তরাধিকারক্রম নির্ণয়ের আইনের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেনি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ভারতে হিন্দু আইনের পরিবর্তন ঘটে। ১৯৫৫ সালে ভারতে নতুন বিবাহ আইন প্রচলিত হয়, যাতে বিবাহ পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটে এবং বহুপত্নীর বিধান বিলুপ্ত হয়। বিবাহ-বিচ্ছেদ পদ্ধতিরও পরিবর্তন হয়। ১৯৫৬ সালে অপর একটি ধারাবলে দায়ভাগ বা মিতাক্ষরার মাধ্যমে উত্তরাধিকারক্রম পরিবর্তিত হয়। পিতা বা মাতার মৃত্যুর পর সম্পত্তিতে পুত্র-কন্যা উভয়ের সমান অংশ এবং স্ত্রী বা স্বামীর এক তৃতীয়াংশ পাওনা স্বীকৃত হয়। কিন্তু পাকিস্তানে সেই পুরোনো হিন্দু আইন বলবৎ থাকে। বর্তমান বাংলাদেশ তৎকালীন পাকিস্তানের অংশ হওয়ায় একই আইন পূর্ব-পাকিস্তানে বলবৎ করা হয় যা এখনো বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে কার্যকর রয়েছে। সর্বশেষ মহামান্য হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন সেখানেও কিন্তু সম্পত্তিতে অধিকার দেয়া হয়েছে শর্ত সাপেক্ষ। অর্থাৎ বিক্রি বা বণ্টনের ক্ষেত্রে তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সে কেবল ভোগদখলকারীর অধিকার ভোগ করতে পারবে। সময় এগিয়েছে। ধর্মীয় আচার-আচরণ-প্রথায় পরিবর্তন এসেছে। অনেক কু-প্রথা থেকে আজ হিন্দু সমাজ মুক্ত হয়েছে। সতীদাহ প্রথা, বাল্যবিয়ে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, বিধবা বিয়ে সমাজে বৈধতা অর্জন করেছে। ছুৎ মার্গ, ভেদাভেদ প্রথা মুক্ত হতে হিন্দু সমাজ প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাতে ধর্মের কোনো ক্ষতি হয়নি বরং হিন্দুধর্ম এগুলি ধারণ করতে পারছে বলেই আজও টিকে আছে। রাষ্ট্রের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে নারীর সরব পদচারণা নেই। শুধুমাত্র সম্প্রদায় বিবেচনায় যুগের পর যুগ নারীরা তাদের ন্যায়সংগত অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম। এই পরিস্থিতিতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এদেশের বিবেকবান গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল মানুষ আইনটি পরিবর্তনে সরব হলেই কেবল রাষ্ট্র এগিয়ে আসতে বাধ্য হবে। আমাদের আদরের কন্যা-স্নেহের বোন-ভালোবাসার স্ত্রী ও জন্মদাত্রী মায়েদের স্বার্থে এটুকু নিশ্চয়ই করা আগামীদিনের জরুরি কর্তব্য।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..