গ্রামসি’র বুদ্ধিজীবী ও ‘মর্ডার্ন প্রিন্স’

অভিনু কিবরিয়া ইসলাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
গ্রামসিকে নিয়ে মার্কসবাদী ও একাডেমিকদের এখনো বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আধিপত্যকারী শ্রেণি যখন তাদের কর্তৃত্বকে নিরংকুশ করতে রাষ্ট্র্রের বলপ্রয়োগের উপাদানগুলোকে ব্যবহারের পাশাপাশি তাদের শাসন-শোষণ ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে জনসমাজে প্রাধান্য বিস্তার করে চলছে, তখন গ্রামসি আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন। গ্রামসিকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, বিশেষ করে তাঁর ‘প্রিজন নোটবুক’ এর বিভিন্ন রচনার উল্লেখ আমরা হরহামেশাই দেখতে পাই। ফ্যাসিস্ট কারাগারের ভেতরে থেকে এই ‘প্রিজন নোটবুক’ যখন তিনি লিখছেন, তখন কর্তৃপক্ষের চোখ এড়াতে অনেক শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁকে কৌশলী হতে হয়েছে। মার্ক্সিজমকে তাই তিনি উল্লেখ করেছেন ‘ফিলোসফি অব প্রাক্সিস’ হিসেবে, প্রলেতারিয়েত না লিখে তিনি লিখেছেন ‘সাবঅল্টার্ন’, শ্রেণির জায়গায় ‘সামাজিক গোষ্ঠী’ ইত্যাদি। এই শব্দগুলো ব্যবহার করায় একদিকে মার্ক্সবাদকে আত্মস্থ করার ক্ষেত্রে তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় যেমন মেলে, আবার এইসব পরিভাষার বিভিন্নরকম ব্যবহার করে গ্রামসিকে তাঁর মূল রাজনৈতিক দর্শন থেকে বিচ্যুত করে দেখার প্রবণতাও দেখা যায়। এটা ঠিক, গ্রামসির ‘প্রিজন নোটবুক’-এর রচনাগুলো তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি। তবে গ্রামসির জেলজীবন পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ড ও রচনাবলী থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে তাঁর চিন্তাগুলোকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার অবকাশ থেকে যায়। গ্রামসি ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির আমলে ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, আমৃত্যু তাঁকে জেল খাটতে হয়েছে, এবং জেলের মধ্যে একরকম বিনা চিকিৎসায় তাঁকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। তাঁর বিচারের সময় যখন তাঁকে তাঁর ‘অপরাধে’র দায় স্বীকার করতে বলা হয়, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘কমিউনিস্ট হওয়ার জন্য যেসব দায়-দায়িত্ব বর্তায়, তার সব দায়িত্ব আমি গ্রহণ করছি...যাবতীয় একনায়কত্বই একসময়, সে আগে হোক বা পরে, যুদ্ধের মাধ্যমেই ভেঙে পড়ে। সেটি যখন ঘটবে তখন প্রলেতারিয়েতই শাসকশ্রেণির স্থলাভিষিক্ত হয়ে ক্ষমতার রাশ হাতে তুলে নিয়ে জাতিকে আবার নতুন করে গড়ে তুলতে চেষ্টা করবে...।’ গ্রামসির চিন্তায় এই যুদ্ধ, বিশেষত শ্রমিকশ্রেণি কর্তৃক ক্ষমতা দখলের প্রশ্নটি বরাবরই গুরুত্ব পেয়েছে। এ কারণেই তিনি প্রতিপক্ষ শ্রেণির ক্ষমতার উৎসগুলোকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, আধিপত্যকারী শ্রেণির ক্ষমতার উৎস কেবল রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক সমাজের বলপ্রয়োগের যন্ত্রের মধ্যেই নয়, জনসমাজ বা নাগরিক সমাজেও এই ক্ষমতা আধিপত্য বা হেজিমনিরূপে হাজির হয়। রাজনৈতিক সমাজ ও জনসমাজ পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত। রাষ্ট্র যখন বিপদে পড়ে, জনসমাজে শাসকশ্রেণির প্রতিষ্ঠানগুলো তাকে রক্ষা করে। অপরদিকে রাষ্ট্রক্ষমতা বা উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর কর্তৃত্ব লাভ জনসমাজে আধিপত্যকারী শ্রেণির মতাদর্শের আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করে। সুতরাং শ্রমিকশ্রেণিকে শাসকশ্রেণি হয়ে উঠতে হলে, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পূর্বে যেমন জনসমাজে তার আধিপত্যকে বিস্তৃত করতে হবে ও শাসকশ্রেণির আধিপত্যকে খর্ব করতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরেও জনসমাজে তার মতাদর্শিক আধিপত্য টিকিয়ে রেখে জনসম্মতি আদায় করতে হবে। এই আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রয়োজন শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক দল বা পার্টি। জেলজীবনের আগের রচনাগুলোতে তো বটেই, কারারচনাতেও বিভিন্ন প্রবন্ধে রাজনৈতিক দল, বিশেষত শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক দল, সেই দলের বৈশিষ্ট্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁর ভাবনাগুলো প্রকাশ পেয়েছে। রাজনৈতিক দল ও তার কর্মকাণ্ড, সমাজকাঠামোর আমূল পরিবর্তনে পার্টির ভূমিকা নিয়ে গ্রামসির চিন্তার গভীরতা ও ব্যপ্তি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। যদিও, গ্রামসিকে নিয়ে আলোচনায় তার রাজনৈতিক দল সংক্রান্ত আলোচনার চাইতে অনেক বেশি পরিমাণে ‘বুদ্ধিজীবী শ্রেণি’, ‘নিম্নবর্গ’, ‘নাগরিক/জন সমাজ’, ‘আধিপত্য’, ‘নিষ্ক্রিয় বিপ্লব’, ‘পরিখা যুদ্ধ’ ইত্যাদি পরিভাষার বিস্তৃত ব্যাখ্যা ও উল্লেখ দেখা যায়। অথচ, গ্রামসির রচনায় উল্লিখিত এসব পরিভাষা ও ধারণার প্রতিটির সাথেই রাজনৈতিক দলের ভূমিকার প্রশ্নটি জড়িয়ে আছে। গ্রামসির কারারচনার মধ্যে ‘বুদ্ধিজীবী’ সংক্রান্ত আলোচনাটি বহুল পঠিত ও আলোচিত। গ্রামসি একদিকে সব মানুষকেই বুদ্ধিজীবী বলছেন, কেননা ‘এমন কোন মানবিক ক্রিয়া নেই, যার মধ্যে বুদ্ধিগত অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নেই’। আবার গ্রামসিই বলছেন, সমাজে সকল মানুষকে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা পালন করতে হয় না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলছেন, সকলেই নিজ প্রয়োজনে কখনো ডিম ভাজি করেছেন বা জামা রিপু করেছেন, কিন্তু তাই বলে আমরা সকলকে রাঁধুনি বা দর্জি বলি না। এর অর্থ দাঁড়ায়, অ-বুদ্ধিজীবী কেউ না হলেও, সামাজিক ভূমিকার ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবী বলে পৃথক এক বর্গকে চিহ্নিত করা যায়। তাহলে বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতদের কাজ কী? গ্রামসি বলছেন, ‘অর্থনৈতিক উৎপাদনের জগতে কোনো আবশ্যিক ভূমিকার মৌল ক্ষেত্র অবলম্বন করে যখনই কোনো সামাজিক গোষ্ঠী (শ্রেণি) আবির্ভূত হয়, তখনই সেই গোষ্ঠী তার নিজের ভেতর থেকে বুদ্ধিজীবী শ্রেণির এক বা একাধিক বর্গের জন্ম দেয়। এই বুদ্ধিজীবীরা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ঐ গোষ্ঠীকে সমজাতীয়তার বোধ (শ্রেণিচেতনা) দেয় এবং তার ভূমিকা সম্পর্কে তাকে সচেতন করে তোলে।’ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পুঁজিবাদ বিকাশ লাভের ফলে এর সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এবং নতুন সংস্কৃতির উপযোগী সাংস্কৃতিক সংগঠক সৃষ্টি হয়েছে। এ পর্যায়ে গ্রামসি শ্রেণিগতভাবে জৈব বুদ্ধিজীবী ও প্রথাগত বুদ্ধিজীবীর প্রভেদ করেন। সমাজে নতুন শ্রেণির বিকাশের সাথে সাথে তার সাথে জৈবিকভাবে সম্পর্কিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির তৈরি হয়। আবার সমাজে প্রথাগত বুদ্ধিজীবীরাও (যেমন লেখক-সাহিত্যিক-দার্শনিক-চিন্তক) থাকেন, যারা সাধারণভাবে আধিপত্যকারী শ্রেণির সাথে সম্পর্কিত হন। শাসকশ্রেণি জনসমাজে আধিপত্য বিস্তার করতে তাদের নিজস্ব বর্গের বুদ্ধিজীবী ও প্রথাগত বুদ্ধিজীবীদের ব্যবহার করে। এখানেই গ্রামসি রাজনৈতিক দলের প্রসঙ্গটি এনেছেন। গ্রামসির মতে, কোন রাজনৈতিক দল যে সামাজিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে, সেই সামাজিক গোষ্ঠীর জৈব বুদ্ধিজীবীদের সাথে প্রথাগত বুদ্ধিজীবীদের ‘সুদৃঢ় সম্বন্ধবন্ধন’ সৃষ্টি করা সেই রাজনৈতিক দলের কাজ। গ্রামসি এই প্রসঙ্গে আরো এগিয়ে গিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলের মূল দায়িত্ব হলো, যে সামাজিক গোষ্ঠী সমাজে একটি ‘অর্থনৈতিক গোষ্ঠী’ হিসেবে জন্মেছে ও বিকশিত হয়েছে, তাকে যোগ্য রাজনৈতিক ‘বুুদ্ধিজীবী’ হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে সে একটা সমাজের বিকাশে যাবতীয় কর্মকাণ্ডের অগ্রগামী নেতা ও সংগঠক হয়ে উঠতে পারে। গ্রামসি বলছেন, একটা রাজনৈতিক দলের সব সদস্যই বুদ্ধিজীবী, এই কথা শুনলে আপাতদৃষ্টিতে হাস্যকর মনে হলেও, গভীরভাবে ভাবলে এটি ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দের যথার্থ প্রয়োগ, কেননা রাজনৈতিক দলের সদস্যরা জনসমাজে ‘নিয়ামক’, ‘সাংগঠনিক’, ‘মননধর্মী’ ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক সমাজে রাষ্ট্র ব্যাপকতর মাত্রায় যে ভূমিকা পালন করে, জনসমাজে রাজনৈতিক দল সেই ভূমিকা পালন করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমাদের দেশে ক্ষমতাসীন শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে যেমন রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর দখল কায়েম করেছে ও এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, ঠিক তেমনি সেই শ্রেণির পক্ষে রাজনৈতিক দল হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও প্রথাগত বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্নভাবে ‘উন্নয়ন’ প্রচারের মাধ্যমে, ‘পারসোনালিটি কাল্ট’ সৃষ্টির মাধ্যমে, দলীয় বিভিন্ন বয়ান ও কর্মসূচির মাধ্যমে জনসমাজে আধিপত্য বিস্তার করছে। জনসমাজে অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশেষত নিম্নবর্গের রাজনৈতিক দলের প্রচারণার বিপরীতে তাদের আধিপত্যমূলক প্রচারণা শাসকশ্রেণির ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখছে। রাজনৈতিক দল নিয়ে, বিশেষত শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক দল নিয়ে গ্রামসি বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছেন তার ‘পলিটিকাল নোটস’ এর অন্তর্ভুক্ত ‘দি মডার্ন প্রিন্স’ রচনায়। ম্যাকিয়াভেলির বিখ্যাত রাজনৈতিক ক্ল্যাসিক ‘দি প্রিন্স’ পড়ে ও তাকে তাঁর সময় ও সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষিতে বিবেচনা করে গ্রামসি বলছেন, একজন প্রিন্স নতুন ধরনের রাষ্ট্র গঠনে কীভাবে জনগণকে নেতৃত্ব দিতে পারেন তা অত্যন্ত বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুক্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে ম্যাকিয়াভেলি তুলে ধরেছেন। জনগণকে নেতৃত্ব দিতে হলে নিরংকুশ ক্ষমতাচর্চার পাশাপাশি কী করে বা কেন জনগণের কাছে প্রিন্সকে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে হবে তা ম্যাকিয়াভেলি লিখেছেন। গ্রামসির মতে, আধুনিক যুগে প্রিন্স কোন ব্যক্তি নয়, বরং ঐতিহাসিক বিকাশের এই পর্যায়ে মর্ডার্ন বা আধুনিক প্রিন্স হলো রাজনৈতিক দল। গ্রামসি কখনো তার রচনায় রাজনৈতিক দল বোঝাতে মর্ডার্ন প্রিন্স প্রত্যয়টি ব্যবহার করেছেন, কখনো কমিউনিস্ট পার্টিকে বোঝাতে ব্যবহার করেছেন। আজকের যুগে, মর্ডার্ন প্রিন্স হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টিই এই সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের মূল নায়ক, যার লক্ষ্য হচ্ছে নতুন ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। মর্ডার্ন প্রিন্সের বিভিন্ন অধ্যায়ে, বিশেষত ‘রাজনৈতিক দল’ অধ্যায়ে, গ্রামসি রাজনৈতিক দল, এর মধ্যেকার বিভিন্ন উপাদান, তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও মতাদর্শিক প্রশ্ন ও পার্টির ভূমিকা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন, যার সবটা এ প্রবন্ধের পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয়। গ্রামসির মতে প্রতিটি রাজনৈতিক দল একটি নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর প্রতিভূ হলেও, অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠী বা শ্রেণির সাথেও নিজ শ্রেণিস্বার্থে তা সম্পর্ক বজায় রাখে। নিজের শ্রেণিস্বার্থের বিকাশের সাথে সংগতিপূর্ণভাবে অন্যান্য মিত্রশ্রেণির কিছু স্বার্থকেও সে বিবেচনা করে সেই শ্রেণির সহযোগিতা লাভ ও জনসমাজে সম্মতি উৎপাদনের প্রয়োজনে। ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে সাধারণ স্বার্থসংবলিত সামাজিক গোষ্ঠীর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থাকলেও ইতিহাসের নির্ধারক মূহূর্তে তা এক লক্ষ্যে পরিচালিত হয়ে ‘হিস্টোরিকাল ব্লক’ তৈরি করে। শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন বিভাজনের ক্ষেত্রে তার মত হলো, ঐতিহাসিক নির্ধারক মূহূর্তে এই বিভাজন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে। তিনি মনে করেন, কখনো কখনো কোন শ্রেণির সাধারণ বৌদ্ধিক উদ্দেশ্য তার বিভাজিত রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বারা প্রতিফলিত নাও হতে পারে, আবার কখনো কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা সংকুচিত হয়ে আসে। তখন ‘অরাজনৈতিক’ বলে পরিচিত বিভিন্ন পত্রিকা বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান জনসমাজে ঐ শ্রেণির চিন্তা বা তৎপরতাকে অগ্রসর করে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। গ্রামসি বলছেন, সেসময়ে রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো লুকিয়ে থাকে সাংস্কৃতিক তৎপরতায়। গ্রামসি বলছেন, রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোন কোনটি (যেমন- এনার্কিস্ট দল) নিজেদের পুরোপুরি শিক্ষামূলক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকায় দেখে, সরাসরি তারা কোন প্রয়োগমূলক কর্মকাণ্ডে যেতে চায় না। যারা প্রয়োগমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয় তাদের মধ্যে দু’ধরনের পার্টি পাওয়া যায়। এক ধরনের পার্টি হলো সেসকল মানুষ দ্বারা গঠিত, যারা বিভিন্ন মহান আন্দোলনে সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক নেতৃত্ব হিসেবে ভূমিকা রাখে। আরেক ধরনের পার্টি হলো এক ধরনের জনগণ দ্বারা গঠিত, যারা একটা রাজনৈতিক কেন্দ্রের প্রতি একটা সেনাবাহিনীর সৈনিকের মত তাদের অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ করে, এবং বিভিন্ন আবেগীয় সুড়সুড়ি এবং সোনালী সময়ের মিথে বিশ্বাস স্থাপন করে (ফ্যাসিস্ট দল)। আধুনিক রাজনৈতিক দলের সংগঠন কাঠামো নিয়েও ‘মর্ডার্ন প্রিন্স’-এ গ্রামসি আলোচনা করেছেন। তার মতে, যদিও কোন রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য হতে পারে (যেমন-কমিউনিস্ট পার্টি) শ্রেণির অবসান ঘটিয়ে শাসক-শাসিতের মধ্যে ব্যবধান ঘুচিয়ে ফেলা, তবুও বাস্তবতা হলো রাষ্ট্রে যেমন শাসক-শাসিত আছে, রাজনৈতিক দলেও তেমনি নেতৃত্বের একটি ভূমিকা থাকে, যার কাজ পার্টির সাথে সম্পৃক্ত সাধারণকে নেতৃত্ব দেওয়া। গ্রামসির মতে রাজনৈতিক দলে তিন ধরনের উপাদান থাকে। একটি উপাদান হলো তার গণউপাদান, যা সাধারণ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হয়, যারা শৃঙ্খলা ও বিশ্বস্ততার সাথে দলের সাথে যুক্ত থাকে, কিন্তু সেভাবে সৃজনশীল সাংগঠনিক তৎপরতা পরিচালনা করে না। এটা সত্য যে, এদের ছাড়া পার্টি টেকে না, তবে এও সত্য যে, পার্টি ছাড়া এদের সংগঠিত কোন অস্তিত্ব নেই। দ্বিতীয় উপাদান হলো, একত্রিত করার মৌল উপাদান, যা দলের সকলকে একত্রিত করার, কেন্দ্রীভূত করার ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষমতা রাখে। এই ‘কোহেসিভ এলিমেন্ট’ ছাড়া প্রথম উপাদানটি ছন্নছাড়া অবস্থায় থাকে এবং সংগঠিত অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে না। তৃতীয়টি হলো মধ্যবর্তী উপাদান, প্রথম ও দ্বিতীয় উপাদানের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে ও যোগাযোগ স্থাপন করে, সরাসরি এবং নৈতিক ও বৌদ্ধিক উপায়ে। গ্রামসির মতে, প্রতিটি পার্টিতে এই তিন উপাদানের নির্দিষ্ট অনুপাত আছে। গ্রামসি একথা অস্বীকার করেন নি যে, রাজনৈতিক দলে এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রণমূলক’ ভূমিকা থাকে, যা তার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নীতিকে রক্ষা করে। কিন্তু এই ‘নিয়ন্ত্রণমূলক’ ভূমিকা কীভাবে পালন করা হচ্ছে, তাও গুরুত্বপূর্ণ। এই ভূমিকা প্রগতিশীল হতে পারে, যখন তা প্রতিক্রিয়াশীল উপাদানকে বর্জন করতে ব্যবহৃত হয় এবং পশ্চাদপদ জনগণকে নতুন চেতনায় উন্নীত করে। আবার এই ভূমিকা নিবর্তনমূলক হতে পারে, যখন তা ইতিহাসের গতিকে পেছনে টেনে ধরে ইতোমধ্যেই পুরনো হয়ে যাওয়া কাঠামো বা চেতনাকে অনৈতিহাসিকভাবে আঁকড়ে ধরে রাখে। পার্টি যদি গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তবে তার নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা প্রগতিশীল চরিত্রের হয়, আর যদি আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তবে সে ভূমিকা হয় নিবর্তনমূলক। গ্রামসি গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে পার্টি, বিশেষত নিম্নবর্গের পার্টি পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। তার মতে গণতান্ত্রিক কেন্ত্রিকতা ‘অর্গানিক’ হয়ে ওঠে যখন তা, সত্যিকারের বাস্তব আন্দোলনের সাথে সংগতিপূর্ণভাবে সংগঠনকে গড়ে তুলতে পারে, নিচের চাহিদার সাথে উপর থেকে প্রেরিত নির্দেশ সংগতিপূর্ণ হয় এবং নিচের কর্মীবাহিনী থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাকে নেতৃত্বের কাঠামোর মধ্যে ধারাবাহিকভাবে আত্মীকরণ করা হয়। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা ‘অর্গানিক’ কেননা এটি আন্দোলনকে প্রাধান্য দেয়, যে আন্দোলন ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে ধারণ করে এবং একইসাথে তা সংগঠনকে আপেক্ষিকভাবে স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতা প্রদান করে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। উল্লিখিত প্রসঙ্গগুলো ছাড়াও গ্রামসির কারারচনার বিভিন্ন প্রবন্ধে ও নোটে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক দল এবং তার সাথে শ্রেণি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। নিম্নবর্গের রাজনৈতিক দল বা মর্ডার্ন প্রিন্সকে যেসকল প্রবণতা ও মতাদর্শের মোকাবিলা করতে হয়, যেমন– ব্যক্তিবাদ ও গোষ্ঠীতন্ত্রের মাধ্যমে বিরাজনীতিকরণ, এনার্কিজম, অর্থনীতিবাদ ইত্যাদি নিয়ে গ্রামসি লিখেছেন। এছাড়া পার্টিতে ধারাবাহিকতা ও ঐতিহ্য রক্ষার প্রসঙ্গ, আমলাতান্ত্রিকতা, স্বতঃস্ফূর্ত ও সচেতন নেতৃত্ব, ইচ্ছাবাদ ও হিরোইজম– এরকম নানামাত্রিক প্রসঙ্গে তার লেখাগুলো এখনো প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। শুধু কারারচনা নয়, জেলজীবনের পূর্বে শ্রমিকশ্রেণিকে সংগঠিত করে সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের বিষয়ে গ্রামসির অন্যান্য রচনাতেও রাজনৈতিক দল ও তার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা পাওয়া যায়। অথচ, গ্রামসি সংক্রান্ত আলোচনায় এ প্রসঙ্গগুলো কম চর্চিতই থেকে গেছে। আমাদের প্রথাগত বুদ্ধিজীবীদের সাথে জৈব বুদ্ধিজীবীর সংযোগহীনতার ফলে সৃষ্ট ‘বিরাজনীতিকরণ’ ও ‘পার্টি বিমুখতা’ই কি এর কারণ? ‘নিঃসন্দেহে, প্রত্যেক শ্রমিকই যে মানবসভ্যতা বিকাশে শ্রমিকশ্রেণির জটিল ও কার্যকরী ভূমিকার বিষয়টি পুরোপুরি আয়ত্তে আনতে পারবে, এমনটি নয়। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আগেই সমগ্র শ্রমিকশ্রেণির সচেতনতার আমূল পরিবর্তন ঘটে যাবে, এমনটি ভাবা হবে ইউটোপিয়ান চিন্তা। কেননা, এধরণের শ্রেণি সচেতনতা তখনই বদলায় যখন তার জীবনধারণের বাস্তব উপাদানগুলোও বদলাতে থাকে। এটি তখনই সম্ভব, যখন শ্রমিকশ্রেণি আধিপত্যশীল শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে, উৎপাদনের উপায়ের উপর কর্তৃত্ব করেছে এবং রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে। কিন্তু পার্টিকে অবশ্যই সম্পূর্ণভাবে অগ্রসর সচেতনতার প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। এছাড়া পার্টি জনগণের মাথা নয়, বরং লেজে পরিণত হবে। এটি তখন আর জনগণকে নেতৃত্ব দিতে পারবে না- বরং জনগণের পেছনেই পড়ে থাকবে।’ -আন্তনিও গ্রামসি (১৯২৫, ফর দি আইডোলজিক্যাল প্রিপারেশন অব মাসেস) লেখক : শিক্ষক, যবিপ্রবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..