হিরোশিমা-নাগাসাকির ৭৫ বছর: মানব অস্তিত্ব এখনও হুমকিতে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : কোভিড-১৯ পেনডামিকের আঘাতে সমগ্র বিশ্ব আজ বিপর্যস্ত। মৃত্যু হচ্ছে লাখ-লাখ মানুষের। আক্রান্ত হচ্ছে কোটি-কোটি মানব সন্তান। অসহায় আতংকে দিন কাটাচ্ছে বিশ্ববাসী। এই দুর্যোগের কবে শেষ হবে, সে কথাও কারো জানা নেই। বর্তমানে এরকম এক ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করা সত্বেও, একথা কারও ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, বিশ্ববাসী আজ এর থেকে আরও ভয়ঙ্কর এক 'মানুষ্যসৃষ্ট' বিপদের আশঙ্কা মাথায় নিয়ে চলছে। সে বিপদ হলো আনবিক-পারমাণবিক যুদ্ধে মানব জাতির নিশ্চিহ্ন ও বিলুপ্ত হওয়ার বিপদ। আজ থেকে ৭৫ বছর আগে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহর দু’টির ওপর ‘এটম বোমা’ নিক্ষেপ করেছিল আমেরিকা। এটি ছিল ইতিহাসের একটি ভয়ঙ্কর অপরাধের ঘটনা। সেটিকে শুধু 'যুদ্ধাপরাধ' কিম্বা 'গণহত্যা' বললে কম বলা হবে। এই অপরাধের ঘটনা ভুলে থাকাটা হবে মহাপাপ। মনে রাখতে হবে— ইতিহাসকে ভুলে গেলে ইতিহাস তার প্রতিশোধ নিতে ভুল করে না। সে দিনের সে ঘটনার কথা বার বার মনে করা উচিত। তা নিয়ে কিছু তথ্য-কথা তাই আবার তুলে ধরছি। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট রাত ভোর হওয়ার আগে ঠিক ২টা ৪৫ মিনিটে মেরিয়ানার টিনিয়ান দ্বীপ থেকে ‘এনোলা গে’ নামের আমেরিকার একটি বি-৫৯ বোমারু বিমান জাপান অভিমুখে রওনা দিয়েছিল। বিমানটির বিশেষভাবে নির্মিত বোমার খাঁচায় ছিল ‘লিটল বয়’ সাংকেতিক নামের ৯ ফুট লম্বা, ২ ফুট ব্যাসের ও ৯ হাজার পাউন্ড ওজনের একটি আণবিক বোমা। স্থানীয় সময় ৮টা ১৬ মিনিটে হিরোশিমার মাটি থেকে প্রায় ২ হাজার ফুট উপরে থাকা অবস্থায় বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। বোমাটি ছিল পরিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম-২৩৫ দ্বারা তৈরি। ইউরেনিয়ামের প্রধান একটি বড় খণ্ড থেকে কয়েক ফুট দূরে, বোমার অপর মাথায়, তার আরেকটি ছোট অংশ রাখা ছিল। ছোট অংশটিকে ট্রিগারের সাহায্যে বড় অংশে প্রবেশ করানো মাত্র ইউরেনিয়ামের ‘ক্রিটিক্যাল ম্যাস’ অতিক্রম করায় সেখানকার ১৪০ পাউন্ড ইউরেনিয়ামে পারমাণবিক 'ফিশন' প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। এই ইউরেনিয়ামের ০.০২১ আউন্স ম্যাস E=mc2 ফর্মুলা অনুসারে মুহূর্তের মধ্যে গতি, তাপ, আলো প্রভৃতি ধরনের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে অভাবনীয় তীব্রতা সম্পন্ন এক বিস্ফোরণের জন্ম দিয়েছিল। বিস্ফোরণের শক্তি ছিল ১৫ হাজার টন টিএনটি-র সমান। বিশাল ব্যাঙের ছাতার মতো কুণ্ডলী হিরোশিমার আকাশকে ছেয়ে ফেলেছিল। চোখের নিমেষে মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল শহরের ৯০ শতাংশ অঞ্চল। মুহূর্তেই মৃত্যু হয়েছিল ৭৫ হাজার মানুষের। পরবর্তী ৪ মাসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ৬৬ হাজারে। হিরোশিমায় বোমাবর্ষণের তিন দিনের মাথায় ‘বকস্কার’ নামের অপর একটি আমেরিকান বি-২৯ বোমারু বিমান দক্ষিণ-পশ্চিম জাপানের কাইউসু দ্বীপের কোকুরা অভিমুখে উড়ে এসেছিল। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সে তার গতিপথ পরিবর্তন করে নাগাসাকি শহরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। সে বহন করছিল ‘ফ্যাট ম্যান’ সাংকেতিক নামের আণবিক বোমা। এই বোমার ‘কোর’-টিতে ছিল তেজস্ক্রিয় প্লুটোনিয়াম। সেটির চতুর্দিকে ছিল তার দিয়ে সংযুক্ত শক্তিশালী বিস্ফোরক পদার্থ। এসব বিস্ফোরক একসাথে বিস্ফোরিত হওয়ার সাথে সাথে ‘কোরের’ প্লুটোনিয়ামে পারমাণবিক 'ফিশন'-এর চেইন রিএ্যাকশন শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং বৃহত্তর আণবিক বিস্ফোরণটি ঘটেছিল। লম্বায় ১২ ফুট ও ব্যাসে ৫ ফুট আয়তনের ‘ফ্যাট ম্যান’ বোমাটিকে স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ২ মিনিটে বিস্ফোরিত করা হয়েছিল। ০.০৩৫ আউন্স প্লুটোনিয়াম ম্যাস বিভিন্ন ধরনের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। সেই বিস্ফোরণের মাত্রা দাঁড়িয়েছিল ২২ হাজার টন টিএনটির বিস্ফোরণ-শক্তির সমান। হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত বোমার চেয়ে শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও নাগাসাকির ভৌগোলিক কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম ছিল। তবুও নিমিষে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৪০ হাজার। গুরুতর আহত হয়েছিল ৭৫ হাজার মানুষ। এটম বোমা দু'টি যেখানে নিক্ষেপ করা হয়েছিল সেই টার্গেট এলাকার কেন্দ্রে তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল কয়েক হাজার সেলসিয়াসে। মানব দেহসহ সবকিছু মুহূর্তে সম্পূর্ণ ‘নাই’ হয়ে গিয়েছিল। ভূ-পৃষ্ঠের পাথরে বা কংক্রিটে কেবল মানব-মানবীর দেহ অবয়বের একটি অস্পষ্ট ছায়াচিহ্ন থেকে গিয়েছিল। চতুর্দিকে চোখ ধাঁধানো আলো ও মহাপ্রলয়ঙ্করী ঝড় বয়ে গিয়েছিল। ছাই-ভস্মসহ সবকিছু উড়ে গিয়েছিল ঊর্ধ্বাকাশে— এটম বোমার বিস্ফোরণের সিম্বল- ব্যাঙের ছাতা আকৃতির ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলীতে। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত শুধু এদু’টি বোমাতেই লক্ষাধিক মানুষ নিমিষে প্রাণ হারিয়েছিল। দেড় লক্ষাধিক মানুষ গুরুতর আহত হয়েছিল। কয়েকদিনের মধ্যে মৃত্যু হয়েছিল তাদেরও। তাছাড়াও, বোমার তেজস্ক্রিয়তা বিকিরণের ফলে অচিরেই আরো দুই লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল। হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আমেরিকা দ্বারা সংঘটিত এই কুকীর্তির বোঝা সত্তর বছর পরে আজও বয়ে চলেছে সেখানকার সন্তান-সন্ততিরা। প্রতিটি মাকে ভয়ে ভয়ে দিন গুনতে হয় এই আশংকায় যে, যে সন্তানটি তার ভূমিষ্ঠ হবে সে বিকৃত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অবয়ব নিয়ে জন্মাবে না তো! হিরোশিমা-নাগাসাকির বীভৎস ধ্বংসযজ্ঞের কথা বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পেরেছিল সেখানে এটম বোমা নিক্ষেপের ঘটনার চার সপ্তাহ পরে। এটি যে একটি তেজস্ক্রিয় এটম বোমা ছিল সেকথা আমেরিকা অনেকদিন পর্যন্ত গোপন রেখেছিল। ফলে, আণবিক তেজস্ক্রিয়তা থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করার সুযোগ থেকেও অগণিত মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে বঞ্চিত করেছিল আমেরিকা। এ কারণে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। বোমার আঘাত ছিল বীভৎস! কিন্তু তার চেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল আমেরিকান এহেন ‘গোপনীয়তার’ ফলাফল। অস্ট্রেলিয়ার সাংবাদিক উইলফ্রেড গ্রাহাম বুর্চেট এটম বোমা নিক্ষেপের চার সপ্তাহ পর ২ সেপ্টেম্বর টোকিও থেকে হিরোশিমা পৌঁছেছিলেন। পরে তিনি তার চোখে দেখা বিবরণ নিউজ ডিসপ্যাচ আকারে পত্রিকায় প্রকাশের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। সেই ডিসপ্যাচে বুর্চেট লিখেছিলেন, "৩০তম দিনে হিরোশিমা থেকে যারা পালাতে পেরেছিলেন তারা মরতে শুরু করেছেন।... চিকিৎসকরাও কাজ করতে করতে মারা যাচ্ছেন। বিষাক্ত গ্যাসের ভয়। মুখোশ পরে আছেন সকলেই।" তিনি আরো লিখেছিলেন, "হিরোশিমাকে বোমা বিধ্বস্ত শহর বলে মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, দৈত্যাকৃতির একটি রোলার যেন শহরটিকে পিষে দিয়ে গেছে।... পঁচিশ বা তিরিশ বর্গমাইল জুড়ে একটিও অট্টালিকা দাঁড়িয়ে নেই। ---- বোমায় অক্ষত থাকা মানুষগুলো দিন কয়েক পরে অসুস্থ বোধ করতে শুরু করে ও হাসপাতালে যেতে থাকে। চিকিৎসকরা তাদের শরীরে ভিটামিন-এ ইনজেকশন দেয়। দেখা গিয়েছিল যে, ইনজেকশনের জায়গায় মাংস পচতে শুরু করেছে। এমন মানুষদের একজনও বাঁচেনি।" হিরোশিমা-নাগাসাকিতে তাড়াহুড়া করে আমেরিকার এটম বোমা নিক্ষেপের পেছনে একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, 'ইয়ালটা চুক্তি' অনুসারে ইউরোপে যুদ্ধ শেষের পর সোভিয়েত রেড আর্মি যেন এশিয়ার যুদ্ধে প্রবেশ করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। রেড আর্মি জাপানে বড় রকম অপারেশন শুরু করার আগেই আমেরিকার কাছে একতরফা জাপানি আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছিল। এশিয়াকে 'কমিউনিজমের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার' প্রয়াসে মার্কিনিরা সেদিন লাখ লাখ নিরপরাধ জাপানি বেসামরিক নাগরিককে নিমিষে বলি দিতে কুণ্ঠিত হয়নি। ১৯৪৫-এর আগস্টের কিছুদিন আগেই, জুলাইয়ের শেষ দিকেই, আমেরিকানদের বিধ্বংসী বোমাবর্ষণে জাপানের সামরিক শক্তি প্রায় সম্পূর্ণরূপে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। মে মাসেই জার্মানি পরাজয় মেনে নিয়ে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছিল। মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট ইতালির বিলুপ্তি হয়েছিল। ইউরোপে যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘রেড আর্মি’ ইউরোপে বিজয়ী হয়ে, পশ্চিম রণাঙ্গন ত্যাগ করে দুর্জয় সমরনায়ক মার্শাল জুকভের নেতৃত্বে জাপানের ভূ-খণ্ডে যৌথ অভিযানের জন্য রওনা হয়ে গিয়েছিল। জাপানের সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য ২৬ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছিল। জাপানের হাইকমান্ড আত্মসমর্পণের কথা ভাবতে শুরু করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ বা সেই যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য হিরোশিমা ও নাগাসিকিতে আনবিক বোমা নিক্ষেপের কোনো দরকার ছিল না। তা সত্বেও আমেরিকা তার নব উদ্ভাবিত আনবিক বোমা ব্যবহার করেছিল এই মারণাস্ত্রের মনোপলি প্রদর্শন করে, সোভিয়েত (ও বিশ্বের অন্যান্য সব দেশকে) ব্ল্যাকমেইল করার মাধ্যমে, বিশ্ব-রাজনীতিতে তার আধিপত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াসে। কিন্তু সে পরিকল্পনা বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। অচিরেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আরো শক্তিশালী আনবিক ও পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছিল এবং আমেরিকার আনবিক একাধিপত্ব ভেঙে দিয়েছিল। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট যে হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আমেরিকা সেদিন ‘টেন টু দি পাওয়ার ফাইভ’ (অর্থাৎ ১ লাখ) মানুষকে হত্যা করার মতো 'এটম বোমা' নিক্ষেপ করেছিল যুদ্ধ জয়ের প্রয়োজনে নয়। তা করেছিল যুদ্ধ পরবর্তী 'ঠাণ্ডা যুদ্ধে' জয়ী হয়ে, হিটলারের শুরু করা 'কমিউনিজমের কবর দেয়ার' অসমাপ্ত কাজটি সমাপ্ত করার জন্য। তাদের এই পরিকল্পনা সফল হয়নি। একথা ঠিক যে, প্রথম 'এটম বোমা' হামলার পর গত ৭৫ বছরে এ রকম হামলা আর হয়নি। কিন্তু পৃথীবির কয়েকটি দেশের কাছে আজ হাজার-হাজার 'এটম বোমা' এবং তার চেয়ে আরো ভয়ঙ্কর ধরনের 'পারমাণবিক বোমা' মজুদ হয়ে আছে। এগুলো বিষ্ফোরিত হলে ধরিত্রির প্রাণ-প্রকৃতি-অস্তিত্ব সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। অনেকে বলার চেষ্টা করেন যে, সব পক্ষের হাতে 'এটম বোমা' থাকায় কেউ এটি ব্যবহার করতে সাহসী হবে না। এটিকে 'ডেটারেন্ট' (অর্থাৎ, অপরকে নিবৃত্ত রাখার) তত্ত্ব বলে আক্ষায়িত করা হয়। কিন্তু আসলে এই তত্ত্ব হলো একটি আত্মহননের বিপদবাহী 'উন্মাদ' তথা MAD (Mutually Assured Destruction)-এর তত্ত্ব। আণবিক বোমাসহ অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠা, তথা পরিপূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া ভূ-মণ্ডল ও বিশ্ব সভ্যতাকে বিপদমুক্ত করা যাবে না। ইতিহাস এই স্বাক্ষ্য দেয় যে, পুঁজিবাদ বহাল থাকলে সেটি সম্ভব নয়। তাই, সমাজতান্ত্রিক-সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও বিশ্বশান্তির জন্য সংগ্রাম সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..