ধর্ষণে কেন সম্ভ্রম হারায়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

সুমাইয়া সেতু: ‘সম্ভ্রম’ শব্দটির অর্থ গুগলে সার্চ করলে পাওয়া যায়- মান, মর্যাদা, সম্মান, গৌরব, সমাদর, ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা। এই শব্দগুলো সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি শোনা যায় কোনো ধর্ষণ-কাণ্ডের সঙ্গে। তখনই মনে প্রশ্ন জাগে- ধর্ষণে কি তাহলে আমার সম্মান শেষ হয়ে যায়? নাকি আমার তিলে তিলে গড়ে তোলা মর্যাদা আমার শারীরিক যন্ত্রণার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে ধ্বংস করে দেয় আমার অস্তিত্ব? বহু কাল পূর্ব থেকেই ‘ধর্ষণ’ ও ‘সম্ভ্রম’ এই শব্দ দুটিকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু কেন করা হচ্ছে তার কোনো উত্তর নেই কারো কাছে। ধর্ষণের মতো একটা জঘন্যতম অপরাধ কর্মের সঙ্গে জড়িতকে কি ধর্ষক বলে পরিচিত করাই সমীচীন নয়? কেন শ্লীলতাহানি, সম্ভ্রমহানি ইত্যাদি নানা ইউফেমিজম শব্দ ব্যবহার করে ধর্ষিতাকে করা হচ্ছে অপমান? ছোটবেলা থেকেই সমাজে সকল মানুষের মুখে এই শব্দগুলি আমরা শুনে থাকি। পত্রপত্রিকা, টিভি, মিডিয়াতেও এই ধর্ষণ শব্দ দ্বারাই তুলে ধরা হয় ঘটনা। কোনো কোনো হেডলাইন ভিকটিমকেই করে তোলে অপরাধী। এমনকি সচেতন প্রগতিশীল মহলেও হরহামেশা এই কথা শোনা যায়। আমরা অনেকেই বলি মুক্তিযুদ্ধে ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা এই স্বাধীন দেশ পেয়েছি। অর্থাৎ এই ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত, সম্মান, শ্রদ্ধা সবকিছুই সেই শারীরিক নির্যাতনে শেষ হয়ে গেছে? আসলেই কি ব্যাপারটি এমন? নাকি সেই নির্যাতন তাদের করেছিল সম্মানিত, যার ফলে আমরা এই মুক্ত দেশটি পেয়েছি। তাহলে বার বার এই শব্দগুলো ব্যবহার করে আমরা তাদের শুধু অপমানিত কেন করি? আমাদের গোটা সমাজব্যবস্থাটাই এমনভাবে সাজানো যেখানে ধর্ষিতাকেই হতে হয় অপরাধী। এমনকি তাকে কয়েক দফা ধর্ষিত হতে হয় তদন্তের প্রশ্নে। ফলে এই শব্দগুলো তার জীবনকে করে তুলে আরো দুর্বিষহ। ইজ্জত একটি ভিন্ন ব্যাপার, এটি কখনোই কারো শরীরে থাকতে পারে না। কখনো কি আমরা ভেবে দেখেছি যে, আমাদের এই একটা শব্দ চয়ন ধর্ষিতাকে উৎসাহিত করে আত্মহত্যার দিকে। ছোটবেলা থেকেই যে জানতে পারে যে, ধর্ষণে ধর্ষিতা হয় সম্ভ্রমহীন, এই সমাজে তার আর কোনো গ্রহণযাগ্যতা থাকে না, এমন কোনো ঘটনায় কি সিদ্ধান্ত নিতে পারে সেই নারী? এই সমাজ তাকে প্রতিনিয়ত বলে দিচ্ছে যে তার এই ধর্ষণের ফলে তার মান, সন্মান, গৌরব সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে আর এই ভাবনা তাকে ধাবিত করে আত্মহত্যার দিকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যদি বেঁচেও থাকে তবুও বাইরের জগতের মুখোমুখি হওয়ার সাহস থাকে না সেই নারীর। একটা সময় শারীরিক অসুস্থতা কাটিয়ে উঠতে পারলেও মানসিকভাবে সে হয়ে পড়ে অসুস্থ। আর এই অসম্মানিত হওয়ার ভয়ে হাজারো ধর্ষণের ঘটনা চেপে যায় নারীরা। পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। এবং সমাজের পুরুষেরাও ধর্ষিত নারী সম্পর্কে এই একই মনোভাব পোষণ করে। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থায় নারীকে অবদমিত করে রাখার প্রয়াসে ধর্ষণকে একটা নিষিদ্ধ বিষয়ে পরিণত করে থাকে এই সমাজ। তাই এই শব্দ চয়নে আমাদের হতে হবে সতর্ক, যাতে আমাদের এই ভুলের কারণে আর কোনো মানুষকে মাশুল গুণতে না হয়। যেদিন থেকে আমরা ধর্ষণকে একটা নির্যাতন হিসেবে দেখতে পারবো সেদিন থেকে ভুক্তভোগীও এই বিষয়টিতে অন্তত কিছুটা সহজ হতে পারবে। জীবন দিয়ে দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত সে আর নেবে না। যখন কোনো মানুষরূপী হায়েনা আমার হাত ভেঙে দেয় অন্যায়ভাবে, আমি তো লড়াই করি তার শাস্তির দাবিতে। তাহলে কেন সেই একই হায়েনা আমাকে পাশবিকভাবে নির্যাতন করলে আমি আত্মহত্যার পথ বেছে নেবো? কেন আমি আমার সমস্তটা দিয়ে লড়াই করে যাবো না? দীর্ঘ সময়ে গড়ে তোলা আমার সম্মান আমার শরীরের সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই, তা কী করে নিমিষেই শেষ হয়ে যেতে পারে? এই অভ্যাসটা যেহেতু দীর্ঘ দিনের তাই হয়তো একদিনে বদলে দেয়া সম্ভব হবে না। তবে আমরা শুরুটা করতে পারি। নারীকে হাজারো প্রতিকূলতা পাড়ি দিতে হয় এই সমাজে। সারাক্ষণ ভাবতে হয় তার শরীরের সুরক্ষা নিয়ে। হতে হয় নির্যাতিত, আবার সামাজিক পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করে জীবন দিয়ে অপরাধীদের বাঁচিয়ে দিয়ে যেতে। এ সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাটা এখন সময়ের দাবি। তাই লড়াই চলুক ধর্ষকের বিরুদ্ধে। নারী জানুক- এতে অসম্মানিত হওয়ার কিছু নেই, জীবন দেয়ারও কিছু নেই, ধর্ষণ শুধুই ধর্ষণ, একটি পাশবিক শারীরিক নির্যাতন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..