নাচোলের ‘রাণীমা’ ইলা মিত্র

তোমার চরণ পানে নয়ন করি নত

লক্ষ্মী চক্রবর্তী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ইলা মিত্র আমার কাছে একজন পরম শ্রদ্ধেয় নেত্রী, যিনি গ্রামবাংলার মাটির মানুষের জন্য লড়াই করে গেছেন। ইলা মিত্র রাজশাহীর নাচোল অঞ্চলের রাণী মা। তেভাগা আন্দোলনের বিপ্লবী সাঁওতালদের অভিভাবক, আপনজন। তিনি গরিব কৃষকদের জমিদার, জোতদার এবং মহাজনদের শোষণ-বঞ্চনা-অত্যাচার থেকে মুক্ত করার জন্য কঠিন লড়াই করেছেন। বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে আমাদের দেশের বিপ্লবী নারীদের ভূমিকা ছিল অনন্য। বরিশালের সুফিয়া কামাল, মনোরমা মাসিমা, সিলেটের জোবেদা খাতুন চৌধুরী, সুহাসিনী মাসিমা, হেনা দাস, রাণী ভট্টাচার্য, চট্টগ্রামের প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, শান্তি ঘোষ, সুনীতি চৌধুরী, রমা দত্ত, বৃহত্তর ময়মনসিংহের সুসং দুর্গাপুরের রাশিমণি হাজং, কুমুদিনী হাজং, রনিলা বানোয়ারী, মজিরন নেছা, জ্যোৎস্না নিয়োগী প্রমুখ নারীরা সমাজে স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিভিন্ন অবদান রেখেছেন। ’৯০-এর দশকে ১২-১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫-এ ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের কুরুক্ষেত্রে অনুষ্ঠিত হয় ভারতীয় মহিলা ফেডারেশনের চতুর্দশ মহাসম্মেলন। এই সম্মেলনের আহ্বান ছিল ‘মেয়েরা, জীবন ও জীবিকার সংগ্রামে জোট বাঁধো’। ইলা মিত্রকে প্রথম দেখি কলকাতার পদ্মপুকুরে সরকারি কোয়ার্টারে। আমি এবং রথীন চক্রবর্তী একসাথেই যাই প্রথমে লেনিন স্কুলে রণেশদাকে দেখতে, পরে ইলাদির বাসায়। কিন্তু যে বিষয়টি বলছি সেটি হলো, উক্ত সম্মেলনে সারা পশ্চিমবঙ্গের নারীরা হাওড়া স্টেশনে বড় ঘড়ির সামনে সমবেত হয়েছে। ট্রেনে কালকা মেইলে দিল্লি হয়ে হরিয়ানা যেতে হবে। বিপ্লবী ইলাদিকে দেখলাম ছোট-বড় তিনটি ব্যাগ হাতে-কাঁধে। সঙ্গত কারণে আমি এগিয়ে গেলাম ব্যাগ ধরতে। তিনি বললেন, যতদিন পারি ততদিন নিজেই নিজের কাজ করবো। আমি অবাক হলাম, ভাবলাম, এখনও এই বয়সে কত সাহস, কত শক্তি! ভারতে কোনো ট্রেন যাত্রী স্বাধীনতা সংগ্রামী হলে তার সাথে একজন যেতে পারে। আমি ছিলাম তৎকালীন লোকসভার সদস্য কমিউনিস্ট ও নারীনেত্রী গীতা মুখার্জীর রেল পাসের সহযাত্রী। ইলাদির প্রসঙ্গে আসা যাক। ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়ি ছিল ঝিনাইদহে। তাঁর বাবা ছিলেন সরকারি এ জি বেঙ্গলের একাউন্টেন্ট ও পরে ডেপুটি একাউন্টেন্ট জেনারেল হয়েছিলেন, নগেন্দ্রনাথ সেন। ইলা মিত্রের মা, মনোরমা সেন। ইলাদি ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। ইলা মিত্র মেধাবী ছিলেন। ১৯৩৬ সাল থেকে ১৯৪২ পর্যন্ত তিনি ক্রীড়া জগতকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। তিনি পারদর্শী খেলোয়াড় ও দক্ষ সাঁতারু ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার কারণে ১৯৪০ সালে অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তাঁর বাবার চাকরির কারণে বেথুন স্কুল, বেথুন কলেজ ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। কলেজপড়ুয়া ইলা মিত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৪৩ সালে বিএ সম্মান ক্লাসের ছাত্রী অবস্থায় কমলা মুখার্জী ও মনিকুন্তলা সেনের সহযোগিতায় মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সদস্য হন এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৫ সালে রমেন মিত্রের সাথে বিয়ে হলে রাজশাহীর রামচন্দ্রপুর চলে আসেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি স্বামী রমেন মিত্রের সাথেই থেকে গেলেন। বিয়ের পর কলকাতায় ‘ইলা সেন’ ‘ইলা মিত্র’ নামেই পরিচিতি লাভ করলেন। তাঁর স্বামী রমেন্দ্রনাথ মিত্রের সাথে হাতে হাত রেখে গরিব চাষীদের কাতারে কৃষক আন্দোলনের নেমে গেলেন। রমেন মিত্রের বাবা ১৭০ বিঘা জমি আমবাগানসহ কৃষকদের দান করে দিলেন। তখন দেশজুড়ে কৃষক আন্দোলন চলছিল। জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে উৎপাদিত ফসলের মধ্যে চাষীদের ভাগে তিন ভাগের দুই ভাগ চাষীর প্রাপ্য আর এক ভাগ মালিকের প্রাপ্য—এই আন্দোলনের নামকরণ হয় ‘তেভাগা আন্দোলন’। এদিকে ইলা মিত্র কৃষক অঞ্চলে সকলের মাঝে স্থান করে নিয়েছিলেন, যেন তিনি তাদেরই একজন। ১৯৪৬ সালে দেশে তখন ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়, সারা দেশ আতঙ্কিত হয়। তখন পূর্ববঙ্গের নোয়াখালীতে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়। কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে দাঙ্গা-বিরোধী সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য আহ্বান জানানো হয়। এদের সেবা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বেও ইলা মিত্র ছিলেন। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন তখন তুঙ্গে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারত ছাড়তে বাধ্য হলো। স্বাধীনতা পেল ভারতবাসী। দেশ দ্বিখণ্ডিত হলো। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হলো। তখন দমন-পীড়ন বাড়তে থাকলো। ইলা মিত্র ও রমেন মিত্র তখন আত্মগোপনে চলে যান। এখানে উল্লেখ্য, দেশভাগে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচিতি নিলো। রমেন মিত্র ও ইলা মিত্রের বাড়ি রামচন্দ্রপুর পূর্ববাংলার অংশে পড়ে গেলো। চাঁপাইনবাজগঞ্জের নাচোল অঞ্চলে সাঁওতাল সম্প্রদায়-হিন্দু-মুসলিম তো ছিলই, এছাড়া মাহাতো, সর্দার, রাজবংশী, মুড়িয়াল ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর লোকও ছিল। বর্গাচাষীরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বেশেষে অসীম সাহসিকতার মাধ্যমে লড়াই করেছিল। ইলা মিত্র কৃষক অঞ্চলের সকলের সাথেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। সকলে তাঁকে রাণীমা বলে ডাকতো। তিনি গরিব চাষীদের সন্তানদের পড়ালেখার জন্য বিদ্যালয় চালু করেছিলেন। তেভাগার দাবিতে উত্তরবঙ্গে যখন আন্দোলন শেষের পথে তখন নাচোলে শক্তিশালী তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তর রাজশাহী জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জে নাচোলে তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন ইলা মিত্র। কিন্তু ১৯৮৪-১৯৪৯ সাল পর্যন্ত আত্মগোপনের ফলে সরাসরি নেতৃত্ব দিতে না পারলেও ভেতর থেকে আন্দোলনের দলটিকে সুচারুরূপে পরিচালনা করেন। তাঁদের একটা নিয়ম ছিল, আন্দোলনে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লে লম্বা বাঁশের মাথায় লাল পতাকা নিয়ে বের হবে, সাথে সাথে ঢাল, সড়কি, তীর-ধনুক, বল্লম ইত্যাদি নিয়ে নারী-পুরুষ মারমুখী হয়েছিল। তখন সদ্য জন্মলাভ করা পাকিস্তানী সরকার ও জমিদাররা গুলি-বন্দুক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী নিয়ে। অনেককে পিটিয়ে হত্যা করে। গ্রামে গ্রামে বাড়িগুলোতে আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ১৯৫০-এর ৫ জানুয়ারি দুটি লড়াইয়ে সেনা-পুলিশ হতাহত হয় ও অস্ত্রও কেড়ে নেওয়া হয়য়। এর পরবর্তীতে নেত্রীবৃন্দ মনে করলেন, তাঁদের স্থান ত্যাগ করা জরুরি। ইলা মিত্র সাঁওতাল পোশাকেই ছিলেন। ৭ জানুয়ারি তাঁরা রোহনপুর স্টেশনে ছিলেন সীমান্ত পার হবার জন্য। ইলা মিত্র পুলিশের দৃষ্টি এড়াতে পারেননি। তাঁর চোখ দেখে চিনে ফেলে। ইলা মিত্র ও বৃন্দাবন সাহাসহ অনেকে গ্রেফতার হন। তাঁদের নাচোল থানায় নিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়। এর মধ্যে একটু অন্য কথায় যাই, ঐ এলাকায় পার্টির কাজে অনেকেই ব্যস্ত। হরেক নামে এক ছেলেকে গুরুত্বপূর্ণ একটা দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সে সেই কাজটি করতে পারেনি তার গরু হারিয়ে যাবার জন্য। এজন্য দলে অনেক গাল-মন্দ, তিরস্কার শুনতে হয় তাকে। হরেক রেগে গিয়ে বলেছিল, একটা কাজ করতে পারিনি; কিন্তু পার্টির জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত থাকবো। ধরা পড়ার দলে হরেকও ছিল। তার থেকে কথা বের করার জন্য এমনভাবে নির্যাতন করা হয়, একপর্যায়ে সে মারা যায়। এটি ইলা মিত্রকে আরও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করলো, আরও নির্যাতন সহ্য করার। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, আমরাও নির্যাতন সহ্য করবো, মরে যাবো, তবুও দলের কথা পুলিশকে বলবো না। ইলা মিত্রকে চারদিন নাচোল থানায় নির্যাতন করার পর তাঁকে ও অন্যদের নেওয়া হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থানায়। তাঁর পায়ে পেরেক ফুটিয়ে দেওয়া হয়। পেটে লাথি মারা হয়। ইলা মিত্রের জবানবন্দিতে নির্যাতনের বিবরণ বিস্তারিত রয়েছে। এই বীভৎসতা পড়াও যায় না! চোখ বন্ধ হয়ে আসে। মনের মধ্যে যন্ত্রণা শুরু হয়। ইলা মিত্রকে খুব গুরুতর অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল থেকে ঢাকা মেডিকেলে স্থান্তরিত করা হয় এবং উন্নত চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু এমন নির্যাতনের ফলে সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে বিলম্ব হয়। দেশে প্রগতিশীল শক্তি এবং ভারতের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ফলে ইলা মিত্রকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে কলকাতা মেডিকেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। কঠিন নির্যাতন থেকে সুস্থ হয়ে ইলা মিত্রের কর্মযজ্ঞ থামেনি। তিনি সমাজের বাতিঘর, মাইলফলক। ১৯৪৭ সালে ইলা মিত্র এমএ পাস করেন। ১৯৫৮ সালে কলকাতা সিটি কলেজ সাউথে অধ্যাপনায় যোগ দেন। তিনি জীবিকার প্রয়োজনে অনেক বই অনুবাদ করেছেন। ইলা মিত্র ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত চারবার মানিকতলা নির্বাচনী এলাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৬৭ ও ১৯৭২ সাল পর্যন্ত বিধান সভার কমিউনিস্ট পার্টির ডেপুটি লিডার ছিলেন। তিনি ১৯৬২ সাল থেকে পাঁচবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট মেম্বার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ভারতীয় মহিলা ফেডারেশনের জাতীয় পরিষদ সদস্য ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ মহিলা সমিতির সহ-সভানেত্রী ছিলেন। ইলা মিত্রের কারাগারের সময় কাল: পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫০-১৯৫৪ সাল পর্যন্ত কারাগারে থেকেছেন। পশ্চিমবঙ্গে নানা আন্দোলনে কারাগারে যেতে হয়েছে। ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৭১, ১৯৭২ সালে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকতে হয়েছে। ইলা মিত্র ভারতের সাংস্কৃতিক সহযোগিতা ও মৈত্রী সমিতি (ইসকাফ) সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদিকা ছিলেন। পরবর্তীতে সংগঠনের কার্যকরী সহ-সভাপতি ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ইলা মিত্র ১৯৭০ সালে ইসকাফের উদ্যোগে এসপ্ল্যানেড অঞ্চলে লেনিন মূর্তি স্থাপনের ভূমিকায় সহায়ক হিসেবে কাজ করেছেন। ইলা মিত্র ‘হিরোশিমার মেয়ে’ বইটির জন্য সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘মনে প্রাণে’, ‘লেনিন জীবনী’ ও ‘রাশিয়ার ছোটগল্প— চাপায়েভ’। ইলা মিত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র সৈনিক ও তাম্রপত্র পেয়েছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারতে অবস্থানরত শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। বাংলাদেশের নারী সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাথে আজীবন যোগাযোগ রক্ষা করে সুহৃদের ভূমিকা পালন করেছেন। তেভাগা আন্দোলনের পুণ্যভূমি বরেন্দ্র অঞ্চলে সাঁওতাল বসত অঞ্চলে আজও ইলা মিত্রের পদধ্বনি ও তাঁর সংগঠিত আন্দোলনের দৃঢ়কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয়। পরিশেষে আকণ্ঠ বিপ্লব-পিয়াসী ইলা মিত্রের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি জন্মশতবার্ষিকী পূর্তিতে। লেখক : সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..