এখনই সময় মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবার
শ. ম. কামাল হোসেন
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখে থাকে। এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ববাদী শাসনের যেমন পতন ঘটেছে, তেমনই রাজনীতিতে এসেছে গুণগত পরিবর্তন। পাশাপাশি রাজনীতিতে একটি শূন্যতাও তৈরি হয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ শূন্যতা বাম-গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো কাজে লাগাতে পারেল একটি নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ সম্ভব হবে। নয়তো এই জায়গা দখল করে নেবে চরম ফ্যাসিবাদী উগ্র সাম্প্রদায়িক দক্ষিণপন্থি শক্তি।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে বামপন্থি ও কমিউনিস্ট শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ জোরালো ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় আপসহীন ও সক্রিয় হওয়ার সময় এটি। সব বাম ও সমমনা শক্তিকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী বিকল্প রাজনৈতিক ধারা তৈরি করার সময় এখনই। শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতিকে তীব্রতর করার মাধ্যমে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের স্বাধীন ও বলিষ্ঠ অবস্থান নিশ্চিত করার সময় এখনই। সমতাভিত্তিক সমাজ গঠন, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া সময় এখনই। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সব ধরনের ধর্মান্ধ ও রাজনৈতিক উগ্রবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন ও স্পষ্ট বক্তব্য তুলে ধরার উপযুক্ত সময় এখনই। বামপন্থিদের এই সময়ে বিভ্রান্ত হওয়া বা বিভক্ত থাকার অর্থ হলো- উপযুক্ত সময়কে হাতছাড়া করা।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে যে গুণগত পরিবর্তন এসেছে সেই গুণগত পরিবর্তনের আলোকে এবং জনগণের ক্ষোভকে বিপ্লবে রূপান্তর করতে হলে, ব্যবস্থা বদলের কথা বলার পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট, গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর বিকল্প শাসনব্যবস্থার রূপরেখা মানুষের সামনে হাজির করা কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের প্রচলিত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমে জনমনে অসন্তুষ্টি ও হতাশা রয়েছে। তবে বিপ্লব বা বিকল্প রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বামপন্থি দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অনৈক্য, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং জনভিত্তির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠার বিকল্প নেই। কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের সম্ভাবনার এই সময়টাতে ডান ও দক্ষিণপন্থি এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আতঙ্কিত হয়ে পরেছে। কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের বিভাজিত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের কুৎসা ও অবিশ্বাসের ঘৃণা ছড়াচ্ছে।
লাল ঝাণ্ডার উত্থান ঠেকাতে, সমাজকে তীব্রভাবে আমরা বনাম ওরা এই দুই ভাগে বিভক্ত করতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদম ও ট্রল আর্মিরা কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের বিরুদ্ধে ‘বামাতি’ ও ‘লাল বদর’ শব্দ দু’টিকে সামাজিকভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থায় কিছু এনজিও সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের মধ্যে বিপ্লবের তত্ত্ব ফেরি করে বেড়াচ্ছেন। মার্ক্সবাদ বিহীন মার্ক্সবাদ শিখাচ্ছেন। শ্রেণিসংগ্রাম ও শ্রমিকশ্রেণির একনায়কতন্ত্র বিবর্জিত সমাজ বদলের শান্তিপূর্ণ পথ বাতলাচ্ছেন। এই সকল বর্ণচোরা সাম্রাজ্যবাদী এজেন্টদের প্ররোচনায়, দূর্বল মনোচিত্তের কোনো কোনো কমিউনিস্ট ও বামপন্থি এই অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে পরছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অজ্ঞতাবশত আমদের পরীক্ষিত কমিউনিস্ট বামপন্থিরাদের মধ্যে কেউ যদি সেই ট্রলে গা ভাসিয়া দেন, তবে এরচেয়ে দুঃখজনক ও আত্মঘাতী বিষয় আর কিছু হতে পারে না।
“বামাতি ও লালবদর” শব্দ দুটির উৎপত্তি এবং এগুলো ব্যবহারের পিছনের মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট মূলত ২০২৪ সালের ছাত্র জনতার গণ অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত মেরুকরণের সাথে জড়িত। বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামী ঘরানার রাজনৈতিক পক্ষ- কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের প্রধান প্রতিপক্ষ বানিয়ে তাদের ঘায়েল করতে এবং আদর্শিক লড়াইয়ে নিজেদের ঘরানার আধিপত্য বজায় রাখতে, কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের বিরুদ্ধে এই শব্দগুলো ব্যবহার করছেন।
‘বামাতি’ শব্দটি একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভাষা। এটি মূলত বামপন্থি এবং জামাতি শব্দ দুটির একটি ব্যঙ্গাত্মক মিশ্রণ। অন্যদিকে ‘লালবদর’ শব্দের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তাকারী ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে জড়িত বাহিনীর নাম ছিল “আল-বদর”। ‘’লাল” রঙটি সাধারণত বামপন্থি বা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক। এই বিপরীতধর্মী মতাদর্শিক শব্দের মিশেলে সৃষ্ট শব্দ দুটির ব্যবহারের মধ্য দিয়েই অনুমান করা যায়, আওয়ামীপন্থিরা কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের বিরুদ্ধে কতটা উগ্র হয়ে উঠেপরে লেগেছে। ওদের ভাষায়, “যদি তুমি কাওকে যুৎসই আক্রমণ করতে চাও, ধ্বংস করতে চাও, তবে তাকে সামাজিকভাবে ঘৃণিত কতে তোলো।” কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠীর পাশাপাশি আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা সেই একই মিশনে নেমেছে।
এটা সকলেরই জানা, ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বামপন্থি ও ইসলামপন্থিরা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর বাসিন্দা কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনে, বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের লক্ষ্যে দেশের প্রায় সকল ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শিক ধারার রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার মানুষজন একবিন্দুতে সমান্তরালে সরব হয়ে উঠেছিলো। জুলাই আগস্টের হাজারো মানুষের হত্যাযজ্ঞ এই আন্দোলনকে আরো তীব্রতর করে তুলেছিলো। আওয়ামীপন্থিরা এই আন্দোলনে কমিউনিস্ট বামপন্থিদের অংশগ্রহণকে ভালোভাবে নেয়নি। তারা চেয়েছিল বামপন্থিরা আওয়ামী লীগের সকল অপকর্মের “দায়মুক্তি” দেবে। পুষ্যিপুত্তুরের মতো ভূমিকা রাখবে। কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা “উড়হ’ঃ উরংঃঁৎন অধিসর খবধমঁব” সবসময় এই নীতিতে অবস্থান করবে। কিন্তু এবারই প্রথম কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা আওয়ামী লীগের অপকর্মের বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সাথে স্বাধীন অবস্থান নিয়ে, সরকার পতনের আন্দোলনে গণমানুষের কাতারে অবতীর্ণ হয়েছে। আর এতেই আওয়ামীপন্থিরা বেজায় ক্ষেপেছেন!
ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আওয়ামীপন্থি নেটিজেনরা, বামপন্থিদের আক্রমণ করতে উপরোক্ত শব্দ দু’টির ব্যবহার শুরু করে। আওয়ামীপন্থিরা প্রচার করতে চাইছে, কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা দক্ষিণপন্থি দলগুলোর সাথে সুর মিলিয়ে দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক এজেন্ডাকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছে। অর্থাৎ কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা এখন আর কমিউনিস্ট নেই, তারা দক্ষিণপন্থি হয়ে গেছে। জামাতের বেহেশতের টিকিট দেয়ার মতো করে, আওয়ামী লীগ এখন কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা আদৌও কমিউনিস্ট কি-না সেই সার্টিফিকেট দিতে শুরু করেছে। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো- আওয়ামীলীগ তাদের ১৬ বছরের শাসনামলে প্রায় প্রতিটি নেতাকর্মী তাদের চলনে-বলনে খাটি ধার্মিকের বিজ্ঞাপন দিয়ে বেড়িয়েছে। কার্যত যা ছিলো বক ধার্মিকতার নামান্তর। ধর্মান্ধ জঙ্গিদের সাথে সখ্যতা রেখে কওমি জননী উপাধি নিয়েছে। কওমি সনদকে মাস্টার্স-এর সমমর্যাদা দিয়েছে। হেফাজতের ১৩ দফার দাবির প্রেক্ষিতে পাঠ্য কারিকুলাম থেকে বিজ্ঞানমনস্ক লেখকদের লেখা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ২৭৬৫ টি বৃহৎ পরিসরের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশের মাদ্রাসাগুলোকে তিনগুণ অনুদান বাড়িয়ে দিয়ে দেশে ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদের চাষ করেছে। গণমানুষের দাবি অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মডেল হাসপাতাল নির্মাণ না করে, প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মডেল মসজিদ বানিয়েছে। কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রচলিত আদালতে বিচারের মাধ্যমে “জামাতে ইসলাম”-কে দল হিসাবে নিষিদ্ধ না করে, জামাতের সাথে ইঁদুর বিড়ালের খেলা খেলেছে। এসবের মধ্য দিয়ে কার্যত দলগতভাবে আওয়ামীলীগ নামের এই দলটি নিজেরাই দক্ষিণপন্থি দলে রূপান্তরিত হয়ে পরেছিলো। এর বহিঃপ্রকাশ ২৪-এর গণ আন্দোলনেও দেখা গেছে। এই আন্দোলনে আওয়ামী ঘরানা পরিবারের ছেলেমেয়েদের একটা বড়ো অংশ আওয়ামী সরকার বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিলো। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই ছেলে মেয়েগুলো কমিউনিস্ট বা বামপন্থিদের সাথে এককাট্টা না হয়ে বরং জামাত ও হেফাজতপন্থিদের সাথে অবস্থান নিয়ে এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। এর প্রধান কারণ হলো, পারিবারিকভাবে ১৬ বছরের ধর্মান্ধতার শিক্ষা।
তাছাড়া, দেশের গণমানুষকে রুষ্ট করে এক দলীয় প্রচারে বিভোর থেকেছেন। রাজাকারকে মন্ত্রী সভায় ঠাই দিয়েছেন। রাজাকারের ছেলের কাছে নিজের একমাত্র কন্যার বিয়ে দিয়েছেন। দখলবাজী, চাঁদাবাজী, গুম-খুন, ঘুষ-দুর্নীতি, সিন্ডিকেট, বালিশ কাণ্ড, চামুচ কাণ্ড, ক্যাসিনো কাণ্ড, গণতন্ত্রহীনতা, এক দলীয় পার্লামেন্ট, দিনের ভোট রাতে করিয়ে নেয়ার মতো ঘটনা তো আছেই। সেই আওয়ামী লীগ যদি কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের দক্ষিণপন্থি ‘ট্যাগ’ দেয় তবে সেটি হাস্যকর নয় কি?
সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক যুক্তিতর্কে পেরে না উঠে, প্রতিপক্ষকে খুব সহজে ঘায়েল করতে একটা নির্দিষ্ট নেতিবাচক ‘ট্যাগ’ বা তকমা দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করাই আওয়ামীপন্থিদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই উদ্যেশ্যে জামাত, হেফাজত, চরমোনাইসহ সকল দক্ষিণপন্থি অপশক্তি কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের “নাস্তিক” ও “শাহাবাগী” বলে ‘ট্যাগ’ দিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে উদীচী, ছায়ানটের কার্যালয়ে আগুন দিয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির কার্যালয়ে অনবরত হামলার হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে। কমিউনিস্ট, বামপন্থি ও প্রগতিশীলদের সাধারণ কোনো আয়োজনেও মব সৃষ্টি করছে। এই দুই দিকের বিরোধিতায় এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঠিক পথেই হাটছে। কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা দেড়িতে হলেও সমাজের প্রধান দ্বন্দ্বিক অবস্থানে থাকা ডান ও দক্ষিণপন্থিদের বিরুদ্ধে সমান্তরালভাবে লড়ে যাচ্ছে। এটা লুটেরা পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলোর কারোরই পছন্দ নয়। বিশেষ করে আওয়ামীপন্থিদের তো নয়-ই। আওয়ামীপন্থিরা চায়, বিপ্লব-টিপ্লবের খাটি মতাদর্শ বাদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা আওয়ামীলীগের সহযোগী বা বি-টিম হয়ে-ই থাকুক। তারা মনে করে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের স্বাধীন অবস্থান নেয়ার মানেই হলো, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করা, আওয়ামী লীগের সাথে বেঈমানী করা। অবশ্য আওয়ামী লীগের এমনটা ভাববার পিছনে কিছু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেও আছে বৈকি। কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের কিছু ঐতিহাসিক ভুল এর জন্য দায়ী। সমস্যা হলো, কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা মেরুদণ্ড সোজা করে স্বাধীন অবস্থান নিয়ে, কমিউনিস্ট নেতৃত্ব যখন শ্রেণিসংগ্রামের ভাবনায় নিজেদের প্রস্তুত করছেন, তখনই এনজিও ঘরানার ও তথাকথিত আওয়ামী প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা আতংকিত হয়ে পরছেন। তারা নির্লজ্জ অপপ্রচার করছেন যে, কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র বর্তমান নেতৃত্ব এন্টি আওয়ামী অবস্থান নিয়ে কার্যত দক্ষিণপন্থিদের স্বার্থ রক্ষা করছেন। মজার ব্যাপার হলো, আওয়ামী শাসনামলের দীর্ঘ ষোল বছর সম্পর্কে এই বুদ্ধিজীবীদের কথোপকথনে, বক্তৃতা বিবৃতিতে কিংবা লেখালেখিতে একটা অভিযোগও নেই। আমাদের বুঝতে হবে, কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের জন্য এন্টি-আওয়ামী অথবা প্রো-আওয়ামী উভয় ঝোকই মারাত্মক ক্ষতিকারক। ক্ষমতাসীনদের গদি বদলের রাজনীতি করা প্রধান দায়িত্ব নয়, বরং কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের প্রধান দায়িত্ব হলো- সমাজ বদল, তথা ব্যবস্থা বদলের রাজনীতি করা। কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) দক্ষতার সাথে সে দায়িত্বই পালন করে যাচ্ছে।
এমতাবস্থায় সমাজের মৌলিক দ্বন্দ্ব ও প্রধান দ্বন্দ্বের পার্থক্য বুঝে উঠতে না পারলে রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবে। আমরা পিছিয়ে পড়বো। যেহেতু শ্রেণিদ্বন্দ্বই সমাজের মৌলিক দ্বন্দ্ব সুতরাং এই দ্বন্দ্ব থেকে উত্তরণের জন্য শ্রেণিসংগ্রামকে তীব্রতর করার লক্ষ্য নিয়েই পার্টির সকল কর্মসূচি সাজাতে হবে। এর জন্য (১) স্বদেশী লুটেরা পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণী (২) জঙ্গিবাদ এবং (৩) সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্যারালাল লড়াই করে যেতে হবে। কারণ, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এই তিন পক্ষ কার্য্যত একই পক্ষ অর্থাৎ বাংলাদেশের সমজ ব্যবস্থার প্রধান দ্বন্দ্ব। সুতরাং কাউকে আগে কাউকে পরে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কিন্তু মার্ক্সবাদ বিহীন মার্ক্সবাদীরা, শ্রেণিসংগ্রাম ও শ্রমিকশ্রেণির একনায়কতন্ত্র বিবর্জিত সাম্রাজ্যবাদী এজেন্টরা তথা বর্ণচোরা কমিউনিস্টরা স্বদেশি লুটেরা পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণির ও সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা আপাতত স্থগিত রেখে শুধুমাত্র জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধের লড়াইটাকে-ই প্রধান রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হিসেবে গ্রহণ করার জন্য দেশের কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের বুঝানোর দায়িত্ব নিয়ে মাঠে নেমেছে। ইতঃপূর্বে ওয়ার্কার্স পার্টি ঘরানার নেতৃত্ব যে শুয়োর তত্ত্ব হাজির করে আওয়ামী লীগের সাথে জোট সরকার গঠন করিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টিকে ধ্বংস করেছে, নতুন করে সে-ই একই তত্ত্ব হাজির করে এবার কমিউনিস্ট পার্টিকে ধ্বংসের পায়তারা করছে। এটা যে কমিউনিস্ট বিরোধী প্লাটফর্ম, সেটা কোনো কোনো কমিউনিস্ট ও বামপন্থি কমরেড বুঝে উঠতে পারছেন না। ফলে এতে অনেকে বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায়, কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা সমাজের শ্রেণিদ্বন্দ্বকে মৌলিক দ্বন্দ্ব নির্ধারণ করে যখন লুটেরা পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণীকে প্রধান রাজনৈতিক দ্বান্দ্বিক শক্তি বিবেচনা করে, লুটেরা পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে লড়াইতে অবতীর্ণ হয়েছে, তখনই দক্ষিণপন্থিদের মতো আওয়ামীপন্থিরাও এই শ্রেণিসংগ্রামের পক্ষ শক্তি- কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য নানাভাবে ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় পরিহাস করছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও তাদের ঘরানার অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের “বামাতি” ও “লাল বদর” বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। কিন্তু এরা জানেনা যে এই শব্দগুলো-ই আজ কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের জন্য ‘সাপে বর’ হতে চলছে। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে যে সকল কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের মধ্যে ন্যূনতম আওয়ামী দুর্বলতা ছিলো, সেই সকল কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরাও সকল প্রকার দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে শ্রেণিসংগ্রামকে শাণিত করতে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শুরু করছে। দূর্বল মনোচিত্তের কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরাও বুঝতে শুরু করেছে, এই লড়াইয়ে উত্তীর্ণ হতে হলে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের মধ্যে স্পাত কঠিন ঐক্য গড়ার বিকল্প নেই। এই ঐক্যে সমাজের ধর্ম-বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা-গোত্র, আদিবাসী, সমতলের সকল শ্রেণি-পেশার গণমানুষকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রশিক্ষিত করে বৃহত্তর বলয় গড়ে তুলতে হবে। এই মানুষগুলোর দৈনন্দিন জীবনের সংকটকে প্রাধান্য দিয়ে গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
“বামপন্থি কমিউনিজম ও শিশুসুলভ বিশৃঙ্খলা” গ্রন্থে লেনিন বলছেন- “কিছু কমিউনিস্ট মুখে বড় বড় বিপ্লবী কথা বলেন, যেন তারাই হলো বিশুদ্ধ কমিউনিস্ট। এরা উন্নাসিক। অ-কমিউনিস্ট কারুর সাথে কাজ করলে তাদের জাত যাবে। তারা কোনো রকম নমনীয় রণকৌশল গ্রহণ করার বিরোধী। তারা ভুলে যায়, এটা একটা যুদ্ধ। এখানে বিশেষ মুহূর্তে বাস্তব পরিস্থিতি অনুসারে, নমনীয় রণকৌশল নিতে হতে পারে।”
কমিউনিস্ট বামপন্থিদের মধ্যে যারা ‘কার্ফিউ ভঙ্গ’, ‘প্রতিবাদী গানের মিছিল’ কিংবা ‘দ্রোহ যাত্রা’সহ স্বৈরাচার বিরোধী অসংখ্য কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা সচেতনভাবে লেনিনের এই সূত্র-কে অনুসরণ করেই অংশ নিয়েছিলেন।
লেনিন তার “কি করিতে হইবে” গ্রন্থে স্পষ্ট করে বলেছেন, “যারা গণ আন্দোলনে গণমানুষের সাথে সম্পৃক্ত হয় না, তারা গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।” আর সে জন্যই কোনো অর্জন হবেনা জেনেও, লেনিন তাঁর বলশেভিক পার্টির সর্বস্তরের নেতা কর্মিদের নিয়ে ১৯০৫ সালে পাদ্রী জর্জি গ্যাপনের নেতৃত্বের আন্দোলনে ব্যপকভাবে অংশ নেয়ার নির্দেশ দিয়ে ছিলেন। এই আন্দোলনে অংশ নিতে যেয়ে অনেক বলশেভিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন তবু আন্দোলন থেকে পিছু হটেননি। বলশেভিক পার্টি সর্বশক্তি নিয়ে এই আন্দোলনে যুক্ত থাকার ফলে, দেশজুড়ে বলশেভিক পার্টির গ্রহণযোগ্যতা ও সামাজিক ভিত্তি গড়ে উঠে। দ্রুতই পার্টির সদস্য সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। এর ফলেই মাত্র ১২ বছরের মাথায় লেনিনের বলশেভিক পার্টি রাশিয়ায় বিপ্লব করতে সামর্থ্য হয়। কমিউনিস্ট, বামপন্থি ও প্রগতিশীলরা নিশ্চয়ই এসব ইতিহাস জানেন কিন্তু আমার ধারণা বর্তমান বাস্তবতায় এবং আওয়ামী ঘরানার অপপ্রচারে কেউ কেউ বিভ্রান্ত হচ্ছেন। একথা ঠিক যে, দেশ বিরোধী ঘৃণিত রাজাকারের দল বিরোধী দলের আসন নিয়েছে। মাজারে হামলা, তৌহিদী জনতা নামে মব সৃষ্টি, কবর থেকে লাশ তুলে পোড়ানো, নারী নিপীড়নের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি নিশ্চয়ই জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে! পূর্বেই বলেছি এর দায় ধর্মাশ্রিত সকল লুটেরা শাসকশ্রেণির পাশাপাশি আওয়ামী সরকার প্রধান কওমী জননী শেখ হাসিনা কোনোভাবেই এঁড়াতে পারেন না।
যাইহোক, এটা এখন প্রমানিত যে, স্বাধীনতার ৫৫ বছরে ধর্মাশ্রিত লুটেরা পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলোর সকল পক্ষই দেশ চালাতে ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং আগামীর লড়াই লুটেরা পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে গণমানুষের শক্তির লড়াই। আগামীর লড়াই ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক মুক্তবুদ্ধি চর্চার লড়াই। আগামীর লড়াই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বায়নের লড়াই। আগামীর লড়াই সমাজতন্ত্র বিরোধী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সকল শত্রু শিবিরের বিরুদ্ধে লড়াই। প্রিয় কমরেডস এ এক অনিবার্য লড়াই।
সুতরাং সকল ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে এখনই সময়, মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবার। শ্রেণিসংগ্রামকে তীব্র থেকে তীব্রতর করতে আজই আওয়াজ তুলুন- “শ্রম যার, সম্পদ তার” (His wealth, whose labor)। “সকল ক্ষমতা চাই শ্রমজীবী মানুষের হাতে” (All power to the working people)। নিশ্চয়ই আগামীর বাংলাদেশ কমিউনিস্টদের।
লেখক: সংগঠক, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন