
মেহনতি মানুষের মূল লক্ষ্য শোষণমূলক পুঁজিবাদী সমাজকে উৎখাত করে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। সেজন্য সমাজের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিতে হবে। পরিবর্তনকে এগিয়ে নিতে চাইলে অর্থনীতির ওপর সমাজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ, অর্থনীতি হচ্ছে সবকিছুর ভিত্তি। তাহলে প্রবৃদ্ধি সংকট এড়ানো যাবে। তখন উৎপাদন ব্যক্তিগত মুনাফার বদলে সমাজের ব্যাপক কল্যাণে পরিচালিত হবে। পুঁজিবাদে শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি বেকারত্ব বাড়ায়। এর অবসানের জন্য প্রয়োজন ‘নিয়োজন অংশীদারি’ (Employment Sharing) এবং ‘মুনাফার অংশীদারি’ (Profit Sharing)। এদুটো যথাক্রমে বেকারত্ব হ্রাস ও আয় রক্ষা করতে সহায়ক হবে। পুঁজিবাদে উৎপাদনশীলতার বিপুল উন্নতি সাধিত হলেও কর্মদিবসের দৈর্ঘ্য আট ঘণ্টার নিচে আসেনি বরং নানা কায়দায় বেড়েছে। উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কর্মদিবস হ্রাস বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। শ্রম অংশীদারি ও কর্মদিবস হ্রাস শ্রমিকের আয় হ্রাস করতে পারে। মুনাফার অংশীদারির মাধ্যমে এরূপ আয়হ্রাস এড়ানো যেতে পারে। ফলে মানুষের অবসর সময় বৃদ্ধি পাবে এবং তা জীবনকে উপভোগ করার সুযোগ বৃদ্ধি করবে।
অর্থনীতির ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হবে পরিবেশ সহায়ক: অর্থনীতির ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ পরিবেশ সংকট সমাধানের পথ খুলে দেবে। তখন উৎপাদন কার্যক্রম মুনাফার জন্য না হয়ে সমাজের ব্যাপক কল্যাণে হবে। অর্থায়ন খাতের ওপর সামাজিক মালিকানা নতুন বিনিয়োগকে পরিবেশ সহায়ক ধারায় পরিচালিত করবে। ব্যক্তিভোগের জায়গায় সামাজিক ভোগকে শ্রেয় জ্ঞান করা যাবে, যা বিশ্ব পরিবেশ সংকটকে সহজে মোকাবিলা করবে।
সামাজিক মালিকানা বাস্তবায়নের শর্তসমূহ
ক. বৈজ্ঞানিক উপায় সন্ধান
সামাজিক মালিকানা বাস্তবায়নের সমস্যা বহু ব্যাপক; যা দেখা গেছে বাংলাদেশে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব-ইউরোপের দেশসমূহে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় বৈজ্ঞানিক উপায় খুঁজে বের করতে হবে।
খ. পরিবেশবান্ধব নীতি দৃঢ়ভাবে মানতে হবে
প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব-ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে অর্থনীতির ওপর সমাজের নিয়ন্ত্রণ পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণের নিশ্চয়তা দেয় না। এর উদাহরণ হলো আমু দরিয়া ও সির দরিয়া নদীর গতিমুখ পরিবর্তন। এতে কাজাখাস্তানের তুলা উৎপাদন সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে সর্বনাশ ডেকে আনে। ফলশ্রুতিতে আরল সাগর মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং কাজাখাস্তানে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা সৃষ্টি হয়। অপরদিকে পৃথিবীময় ব্যক্তি উদ্যোগও পরিবেশ সহায়ক বলে বিবেচিত হচ্ছে না।
সুতরাং পরিবেশ সংকট মোকাবিলায় অর্থনীতির ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ যেসব সম্ভাবনা খুলে দেয় তার সরল বাস্তবায়ন-সমস্যা দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় তত্ত্বীয় সমাধান আবশ্যক।
বিশ্ব পরিবেশ সংকট মোকাবিলায় অর্থনীতির ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের যে যুক্তি তা এখনকার সময়ে সমাজতন্ত্রের পক্ষেই যুক্তি। উৎপাদনের বৃহদাকারের সাথে ব্যক্তিমালিকানার অসামঞ্জস্যের যে কথা মার্কস বলেছিলেন তা আজ সপ্রমাণিত পরিবেশ সংকটে। তাই আজকের পরিবেশ সংকট মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সমষ্টিগত প্রয়াস, দেশে দেশে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা, স্বার্থহীনতা যা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে ধারণ সম্ভব।
নতুন উৎপাদন-সম্পর্কের ভ্রুণ
বেকারত্ব, বৈষম্য ও বিশ্ব পরিবেশ সংকট সৃষ্টি, পুঁজিবাদের সীমাবদ্ধতার দিক। দেখার বিষয় হচ্ছে, বেকারত্ব, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ বিভিন্ন ধরনের সংগ্রাম এবং উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। ল্যাটিন আমেরিকার মানুষ বামপন্থিদের
ক্ষমতায় বসাচ্ছেন। বামপন্থি সরকারগুলো সেসব দেশে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। এমন উদ্যোগ প্রসারিত হচ্ছে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশসমূহে, সরকার ও সরকারের বাইরের প্রতিষ্ঠানসমূহের দ্বারাও। এমন উদ্যোগ এখন বিশ্বব্যাপী একটি ‘সামাজিক ও সংহতি অর্থনীতি’ (Social and Solidarity Economy) গড়ে তুলছে যা পুঁজিবাদের বিফলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও প্রচেষ্টা। জাতিসংঘের সামাজিক উন্নয়ন বিষয়ক গবেষণা ইনস্টিটিউট (UNRISD) কর্তৃক আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে পৃথিবীর নানা দেশের গবেষকবৃন্দ ‘সামাজিক ও সংহতি অর্থনীতি’ গড়ার নিজ নিজ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তারপর জাতিসংঘের ২০১৩ সালের ৩০ মের সম্মিলনে এ বিষয়ক ‘জাতিসংঘ আন্তঃসংস্থা কর্ম কমিটি’ (UN Inter-Agency Task Force) গঠিত হয়েছে। ব্রাজিল ও ফ্রান্স ‘সামাজিক ও সংহতি অর্থনীতি’ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেছে। ইকুয়েডর, মেক্সিকো, স্পেন ও গ্রিস এ বিষয়ক আইনগত কাঠামো তৈরির জন্য পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন করেছে। আইএলও ‘সামাজিক ও সংহতি একাডেমি’ প্রতিষ্ঠিত করেছে। ‘সামাজিক ও সংহতি অর্থনীতি’ আন্দোলন এভাবে আন্তর্জাতিকভাবে সাড়া জাগিয়েছে।
সামাজিক ও সংহতি অর্থনীতির উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১. বিভিন্ন রকমের সমবায় ও পারস্পরিক সহায়তামূলক সমিতি ২. সামাজিক বাণিজ্যিক উদ্যোগ ৩. স্ব-সাহায্য দল ৪.ন্যায্য বাণিজ্য নেটওয়ার্ক ৫. অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সমিতি ৬. কমিউনিটি মুদ্রা ৭. শ্রমিক মালিকানাধীন উৎপাদন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। ইউরোপে দ্রুত সামাজিক ও সংহতি অর্থনীতির ব্যাপক প্রসার ঘটছে। এছাড়া ভোক্তা সমবায়, অর্থায়ন সমবায়, ইত্যাদি নানা রকমের সমবায়েরও প্রসার ঘটছে। পুঁজিবাদের বিভিন্ন সাম্প্রতিক সংকটের, বিশেষত ২০০৮ সালের ‘মহা অধগতি’র অভিজ্ঞতা দেখায় যে, সংকট মোকালিায় পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানের সহনশক্তি বেশি।
ন্যায্য বাণিজ্য নেটওয়ার্কের ধারণাটি তুলনামূলকভাবে নতুন। তৃতীয় বিশ্বের উৎপাদকদের এই পন্থা, উন্নত বিশ্বের ভোক্তাদের সাথে সরাসরি সংযোগ ঘটিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের থাবা থেকে বাঁচিয়ে, বেশি মূল্য পেতে সাহায্য করে।
কমিউনিটি মুদ্রার বিষয়টি অপেক্ষাকৃত নতুন। এটি হচ্ছে প্রত্যক্ষ কাজের বিনিময় পন্থা। এর মাধ্যমে বেকাররা কর্মসংস্থানের জন্য পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলে। কেউই যখন কাজ পায় না তখন নিজেদের প্রয়োজনীয় কাজ পারস্পরিকভাবে করে নেয়। কে কী কাজ জানে তা জানার জন্য মহল্লায় একটি ক্লেয়ারিং হাউজ গড়ে ওঠে, এবং ‘স্থানীয় মুদ্রার’ আবির্ভাব ঘটে। কমিউনিটি মুদ্রা একটি কুপনের মতো, যেমন প্রতি ঘণ্টা শ্রমের জন্য একটি কুপন। শ্রম বিনিময়ের মাধ্যমে সব ধরনের মানুষের মধ্যে এক ধরনের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে এ ধরনের মুদ্রার কোনো পৃথক মূল্য সৃষ্টি হয় না এবং তা কোনো মুদ্রাস্ফীতির সম্মুখীন হয় না।
সামাজিক ও সংহতি অর্থনীতি নিয়ে দুটি প্রশ্ন রয়েছে। এটি কি পুঁজিবাদী অর্থনীতির অংশ হিসেবে চালু থাকবে, না সমষ্টিবাদের মতাদর্শ ভিত্তিক নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একটি অন্তর্বর্তী পর্যায় হবে? সমবায় ও ন্যায্য বাণিজ্যের সাথে পুঁজিবাদের কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু পারস্পরিক সহায়তা সমিতি, স্ব-সাহায্য দল, কমিউনিটি মুদ্রা, শ্রমিক মালিকানাধীন উৎপাদন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি উদ্যোগ আরো গভীর চরিত্রের। এগুলো পুঁজিবাদের মৌল ভিত্তিটাকে প্রত্যাখ্যান করে। তবে এসব উদ্যোগ স্বল্প পরিসরে সম্ভব, আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রশ্নবোধক।
সহমর্মিতা ও নিঃস্বার্থবোধ সম্পন্ন নৈতিকতার উপস্থিতি পুরনো কৌম সমাজে বিরাজিত ছিলো। তবে লক্ষণীয়, প্রযুক্তির বিকাশের মধ্য দিয়ে বর্তমান সময়ে ‘সামাজিক ও সংহতি অর্থনীতি’ এই নৈতিকতার পুনরায় আবির্ভাবের বস্তুগত ভিত্তি সৃষ্টি করতে পারে। কৌম সমাজের ছোট আকার ও উৎপাদন উদ্বৃত্তের অনুপস্থিতি এমন মূল্যবোধের জন্য দায়ি ছিলো। উদ্বৃত্ত না থাকায় সেখানে শোষণের সুযোগ ছিলো না (বর্তমানে উৎপাদন যাতে কাক্সিক্ষত মাত্রায় থাকে, উদ্বৃত্ত না হয় এমনটা করা হচ্ছে, যেমন আমেরিকায় সরকার কৃষকদের প্রতি বছর বহু বিলিয়ন ডলার দেয় যাতে তারা উৎপাদন কম করে)। একই কারণে ব্যক্তি মালিকানা গড়ার সুযোগও ছিলো না। একইভাবে বর্তমান সময়ে একই মূল্যবোধের জন্ম দেয়া যেতে পারে। এটাও মার্কসের ‘নিরাকরণের নিরাকরণ’ সূত্রের আরেকটা উদাহরণ হতে পারে। মার্কস প্রাচুর্যের ভিত্তিতে সাম্যবাদের ‘চাহিদা অনুযায়ী বিতরণ’ প্রস্তাব করেছিলেন। অভিজ্ঞতা দেখায় এটি গড়ে উঠছে।
কোনো বিষয়ের বস্তুগত ভিত্তি গড়ে উঠার সাথে সাথে মতাদর্শগত পরিবর্তন ঘটতে বাধ্য। সামাজিক ও সংহতি অর্থনীতির মধ্যে তারই প্রতিফলন খোঁজে পাওয়া যেতে পারে। লক্ষণীয় যে, নতুন সমাজের জন্য নতুন মতাদর্শের প্রয়োজন হয়। আর পুরাতন সমাজের ভেতরেই নতুন সমাজের কৃৎকৌশলগত ভিত শুধু নয়, নতুন সমাজের উৎপাদন-সম্পর্কও ভ্রƒণাকারে বিকশিত হয়। সামন্তবাদী সমাজের ভেতরেই পুঁজিবাদী অর্থনীতি বিকশিত হয়েছিলো। পুঁজিবাদী সমাজের অভ্যন্তরে সমাজতান্ত্রিক সমাজের অর্থনীতি বিকশিত হতেই পারে। ‘সামাজিক ও সংহতি অর্থনীতি’র বিকাশ এটাই দেখায়। নতুন সমাজকে গড়ে উঠতে হবে পুঁজিবাদী সমাজে সৃষ্ট সাম্যের উপাদানের ওপর ভিত্তি করেই। যেমন- বৃহদাকার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনা, সামাজিক ও সংহতি অর্থনীতির সহমর্মিতা এবং নিঃস্বার্থবোধের নৈতিকতা হচ্ছে পুঁজিবাদের মধ্যেই পরবর্তী নতুন সমাজের ভ্রƒণ।
পুঁজিবাদ উৎপাদিকা শক্তির বিপুল বিকাশ করেছে, মার্কস সেটা স্বীকার করেছেন এবং এ বিকাশ এখনো অব্যাহত আছে। পুঁজিবাদ একটি বিশ্ব ব্যবস্থা। এই বিকাশ ক্রমশ জাতি ভিত্তিক রাষ্ট্রীয় সীমানার গুরুত্বকে লঘু করে দিচ্ছে। এর মাধ্যমে বিশ্বমানবতাবাদের ভিত্তি গড়ে ওঠছে।
আমাদের এখনকার কথা হচ্ছে-
১। উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে পুঁজিবাদের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পারাই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব-ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পতনের সুগভীর কারণ। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি যে কোনো পদ্ধতিতে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশকে বর্তমান সময়ের মূল কর্তব্য নির্ধারণ করেছে। সেটাকে যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন অনেকেই।
২। মার্কসের ‘নিরাকরণের নিরাকরণ’ তত্ত্বের মাধ্যমে পুঁজিবাদ পরবর্তী সময়ের অভ্যুদয়কে ইতিহাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিতে দেখতে হবে। সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণ একটি শোষণভিত্তিক সমাজ থেকে আরেকটি শোষণভিত্তিক সমাজে উত্তরণ। কিন্তু পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ একটি শোষণমূলক সমাজ থেকে শোষণহীন সমাজে উত্তরণ।
এ দুটো বিষয় এক না। সামাজিক মালিকানার সমাজে উত্তরণ অনেক মৌলিক চরিত্রের। তাই একে দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিতে দেখতে হবে।
৩। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সমন্বয়ে বাজারের ভূমিকাকে গুরুত্বের সাথে নিতে হবে; ‘এক অফিস এক কারখানা’ পরিকল্পনা নয়।
৪। পুঁজিবাদের ব্যর্থতাই নতুন সমাজের আকাঙ্ক্ষা মানুষের মনে জাগিয়ে রেখেছে এবং পুঁজিবাদকে বাদ দিয়ে নতুন সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। এই প্রেক্ষিতে উন্নত এবং অনুন্নত দেশগুলোতে সামাজিক ও সংহতি অর্থনীতি গড়ে ওঠছে। চীন-ভিয়েতনাম-কিউবার সংস্কার বিকল্প চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করছে।
৫। সমাজ পরিবর্তন মানুষের সচেতন কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে সংঘটিত হয়। এটা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণ ব্যক্তিস্বার্থে হয়েছে। সমাজতন্ত্রে উত্তরণ হবে সমষ্টির স্বার্থে। এখানে চেতনার বিকাশ একটি কঠিন বিষয়।
৬। পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজে একটা মানস কল্পনা গড়ে ওঠেছিলো। সমাজতন্ত্র উন্নত শোষণহীন সমাজ, সেজন্য আরো যুক্তিসিদ্ধ মানস কল্পনা গড়ে উঠতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান এবং পতন পুঁজিবাদ পরবর্তী সমাজ গঠনে অনেক অভিজ্ঞতা সরবরাহ করেছে। চীন-ভিয়েতনাম-কিউবার চলমান অভিজ্ঞতাও সমাজতন্ত্রের জন্য মানস কল্পনা গঠনে কাজে লাগবে। যেমন-
ক. সমাজতন্ত্র বাজারের ভূমিকাকে বাতিল করে না। পুঁজিবাদের ইতিহাস কয়েক শতাব্দির, কিন্তু বাজারের ইতিহাস বহু সহস্রাব্দের। সুতরাং পুঁজিবাদের আগেও বাজার ছিলো, এবং পুঁজিবাদের পরেও বাজার থাকবে। আবার পরিকল্পনাও থাকবে। পরিকল্পনা ও বাজার যাতে পরিপূরক ভূমিকা পালন করতে পারে সেজন্য উপযুক্ত কাঠামো সৃষ্টি করতে হবে।
খ. অর্থনীতির ওপর সমাজের নির্দিষ্ট মাত্রার নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। সামাজিক মালিকানাকে নিরঙ্কুশ বা একচ্ছত্র হওয়ার প্রয়োজন নেই। এই মালিকানা ‘নিয়ন্ত্রণমূলক উচ্চস্থানে’র জন্য সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। এই উচ্চস্থান কোন কোন খাত হবে সেটা আলোচনার বিষয়, তবে মূল অর্থনৈতিক খাত এর মধ্যে পড়ে।
গ. রাষ্ট্রীয় মালিকানাকে যথার্থ সামাজিক মালিকানা হতে হবে। রাষ্ট্র একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত থাকতে পারবে না, সোভিয়েত ইউনিয়নে যে জন্য পুঁজিবাদের পুনরুত্থান হতে পেরেছে।
ঘ. সমাজতন্ত্রের জন্য গণতন্ত্র শুধু একটি রাজনৈতিক প্রয়োজন না, একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজনও। সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক সমতা রাজনৈতিক গণতন্ত্রকে আরো অর্থবহ করবে, পুঁজিবাদে যা সম্ভব হয় না। সমাজতন্ত্রকে মুক্তচিন্তার সমার্থক হতে হবে।
ঙ. সমাজতন্ত্রকে বিশ্বমানবতার প্রবক্তা হতে হবে। পুঁজিবাদের বড় অবদান হচ্ছে পৃথিবীর অর্থনীতিকে একত্রে বাঁধা, যেজন্য মানবতার বস্তুগত ভিত্তি সৃষ্টি হয়েছে। সমাজতন্ত্রকে তা এগিয়ে নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, কোনো ক্ষেত্রেই যান্ত্রিকীকরণ করা যাবে না, সমাজতন্ত্র বিনির্মাণে উক্ত প্রস্তাবসমূহের বৈচিত্র্যের সম্ভাবনাকে মানতে হবে। সব শেষে বলতে চাই আগামী দিনের নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজের জন্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বের করে আনার দায়িত্ব পৃথিবীর সকল সাম্যবাদীদের। মনে রাখতে হবে, ঊনবিংশ শতাব্দি আর একবিংশ শতাব্দি এক নয়। মার্কসবাদ কোনো আপ্তবাক্য নয়, একটি গতিশীল বৈজ্ঞানিক দর্শন, যা সব পরিস্থিত বিশ্লেষণে সহায়ক। মার্কসবাদকে অনুসরণ করা মানে বিজ্ঞানকে অনুসরণ করা। বিজ্ঞানের পথই মেহনতি মানুষের একমাত্র পথ। মানবতার বিজয় ও অগ্রগতি সুনিশ্চিত।