অর্থনৈতিক লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এগিয়ে চীন

বেন এ ভেগেল ও স্টিফেন জি ব্রুকস

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

অধিকাংশ হিসাব-নিকাশই বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক লড়াইয়ে বর্তমানে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে চীন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ওয়াশিংটন চীনের ওপর ভারী শুল্ক আরোপ করার পর, বেইজিং বিরল আর্থ-খনিজের ওপর রপ্তানি বিধিনিষেধ জারি করে পাল্টা জবাব দেয়। বেইজিংয়ের এই চালেই মূলত ট্রাম্প প্রশাসন পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। এরপর ২০২৬ সালের মে মাসে বেইজিংয়ে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের নেতা সি চিন পিং বৈঠক করেন, তখন আমেরিকান প্রতিনিধিদল তাদের খুব সীমিত লক্ষ্যগুলো অর্জন করতেও ব্যর্থ হয়। ওই সম্মেলন থেকে ট্রাম্পের একমাত্র উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল বেইজিংয়ের ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার সম্মতি, যদিও বেইজিং সফরের আগে তিনি ৫০০টি বিমান বিক্রির বড় দাবি করেছিলেন। তখন থেকেই অনেক বিশ্লেষক ধারণা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দিন দিন আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে এই নৈরাশ্যবাদের অন্তরালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধা এখনো অনেক বেশি। ওয়াশিংটন দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে ২০২৫ সালের শুরু থেকে বেইজিংয়ের কাছে নতিস্বীকার করছে, বিষয়টি এমন নয়। বরং চীন তার সীমিত অর্থনৈতিক হাতিয়ারগুলো দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন তার শক্তিশালী ভান্ডার থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহারে ব্যর্থ হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, বেইজিংয়ের ওপর ওয়াশিংটনের কিছু মৌলিক ও কাঠামোগত সুবিধা রয়েছে। এর বড় কারণ হলো উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রাংশ আমদানি এবং চীন তার রপ্তানিভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বাজার বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল। চীনের হাতে কিছু শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্র রয়েছে। ২০২৫ সালের মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধে বেইজিং তার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারগুলোই ব্যবহার করেছিল, যার মধ্যে বিরল খনিজ রপ্তানি বন্ধের বিষয়টি অন্যতম। ২০২৫ সালের এপ্রিলে বিরল খনিজের ওপর প্রথম বিধিনিষেধ আরোপের পর থেকে বেইজিং দর–কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে এগুলোকে কখনো কঠোর, আবার কখনো শিথিল করেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে এক যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে চীন কিছু বিধিনিষেধ স্থগিত করেছিল, কিন্তু ২০২৬ সালের জুনে এসে তারা চাপ আরও বাড়ায়। বিশ্বের বিরল খনিজ উত্তোলনের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতার ৯০ শতাংশই বর্তমানে চীনের দখলে। যার অর্থ, এসব কাঁচামালের জন্য ওয়াশিংটন পুরোপুরি বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে চীনের বিরল খনিজ রপ্তানির বার্ষিক মূল্য ১০০ কোটি ডলারের কম, তবুও এই সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প সংকটে পড়ে। এ ছাড়া চীন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য সয়াবিন আমদানিও স্থগিত করেছিল। ২০২৪ সালে মার্কিন সয়াবিন রপ্তানির অর্ধেকের বেশি গিয়েছিল চীনে। কিন্তু ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত চীন আকস্মিকভাবে সয়াবিন কেনা বন্ধ করে দিলে বার্ষিক প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি (১৩ বিলিয়ন) ডলারের রাজস্ব ঝুঁকিতে পড়ে। এর সরাসরি আঘাত গিয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কৃষিপ্রধান রাজ্যগুলোতে। যুক্তরাষ্ট্রের যেসব পণ্য চীনা ক্রেতাদের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল, তার মধ্যে সয়াবিন সবার ওপরে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা তামার স্ক্র্যাপের রপ্তানি ২০২৪ সালে ছিল মাত্র ২৮০ কোটি ডলার। তা ছাড়া চীনের কাছে সয়াবিন কেনার জন্য ব্রাজিলের মতো বিকল্প অনেক দেশ রয়েছে। তবে বিরল খনিজ ও সয়াবিন হলো সামগ্রিক মার্কিন-চীন অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার চিত্রের ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এই দুটি ক্ষেত্রে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পেরেছে। তবে এসব অস্ত্র স্বল্পমেয়াদে খুব কার্যকর হলেও একবার প্রয়োগ করা হলে তা দিন দিন দুর্বল হতে থাকে। মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা বহু আগেই জানতেন যে চীন যেকোনো সময় বিরল খনিজের এই সুবিধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু তারা এই হুমকি কমানোর জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেননি। তবে এখন ওয়াশিংটন বিকল্প সরবরাহকারী গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা নিজ দেশে এবং বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোতে বিরল খনিজ উৎপাদকদের তহবিল বাড়িয়ে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে মার্কিন পেন্টাগন উত্তর আমেরিকার প্রধান বিরল খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ‘এমপি ম্যাটেরিয়ালস’-এ ৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর পর থেকে বরাদ্দ কেবল বেড়েছে। অবশ্য বিরল খনিজের নতুন সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। তিন দশক ধরে চীন প্রক্রিয়াজাতকরণে নিজেদের আধিপত্য গড়ে তুলেছে। এই খাতে বিশেষায়িত জ্ঞান এবং সুনির্দিষ্ট উৎপাদন–সুবিধা অর্জন করা হুট করে সম্ভব নয়। তা ছাড়া বেইজিং এসব উৎপাদকদের বিপুল ভর্তুকি দিতে রাজি ছিল এবং এর মাধ্যমে সৃষ্ট ভয়াবহ পরিবেশগত ক্ষতি মেনে নিয়েছিল, এক টন বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাত করলে প্রায় ২,০০০ টন বিষাক্ত বর্জ্য তৈরি হয়। চীনের ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ কাজে না লাগিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন উল্টো পথে হেঁটেছে। তারা নিজের মিত্রদের ওপরই চড়া শুল্ক আরোপ করেছে এবং অনেককে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে বাধ্য করেছে। ওয়াশিংটন চীনের ওপর চাপ না বাড়িয়ে নিজের বন্ধুদের ওপরই আঘাত কষছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়েছে এবং চীনকে একা মোকাবিলা করতে গিয়ে তারা হিমশিম খাচ্ছে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলো এত বড় মূল্য বা পরিবেশগত ক্ষতি সহজে মেনে নেবে না। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর আইনি ও পরিবেশগত অনুমোদন প্রক্রিয়াও এখানে বড় বাধা। নতুন খনি ও কারখানার অনুমোদনের জন্য বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকে, যা বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিরল খনিজ ছাড়াও অনেকেই চীনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, যেমন লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ও ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনে চীনা আধিপত্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে এসব খাতকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা বেইজিংয়ের জন্য খুব একটা সহজ হবে না। চীন তখন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোর হাতে বাজার ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদিত শত শত ওষুধের জন্য প্রয়োজনীয় অন্তত একটি করে রাসায়নিক উপাদান চীন থেকে আসে। কিন্তু চীন চাইলে সহজেই এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে না। কারণ, চীনের অধিকাংশ ওষুধের সক্রিয় কাঁচামাল (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট-এপিআই) প্রথমে ইউরোপ ও ভারতে যায় এবং সেখানে ওষুধ তৈরির পর তা বিশ্বজুড়ে ছড়ায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ বন্ধ করতে গেলে সারা বিশ্বেই এর আঁচ লাগবে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে কাঁচামাল মজুত রেখে যেকোনো সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ তৈরি করে নিতে পারে, যা চীনের প্রভাব কমিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চীনের প্রভাবের দিকে নজর দিতে গিয়ে বেইজিংয়ের নিজস্ব দুর্বলতাগুলোকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। প্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে জটিল অংশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো একক আধিপত্য ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক উচ্চপ্রযুক্তি খাত থেকে অর্জিত মোট লাভের ৫৮ শতাংশই গেছে মার্কিন ফার্মগুলোর পকেটে। আর ন্যাটো মিত্র ও পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারদের পকেটে গেছে আরও ২৬ শতাংশ লাভ। এর বিপরীতে হংকংসহ চীনের সব প্রতিষ্ঠান মিলে বিশ্বব্যাপী উচ্চপ্রযুক্তি খাতের লাভের মাত্র ৮ শতাংশ অর্জন করতে পেরেছে। উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চীনের চেয়ে অনেক এগিয়ে। চীন সরকারের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাদের সামগ্রিক উৎপাদন খাতের আমদানিকৃত মধ্যবর্তী পণ্যের (ইন্টারমিডিয়েট গুডস) ওপর নির্ভরতা। এক দশক ধরে স্বাবলম্বী হওয়ার জোর চেষ্টা চালানো সত্ত্বেও বেইজিংকে এখনো বিদেশ থেকে প্রচুর মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি করতে হয়। যেহেতু চূড়ান্ত পণ্য তৈরির জন্য এই উপাদানগুলো আবশ্যক, তাই এর জোগান বন্ধ হলে চীনের সম্পূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল অচল হয়ে পড়তে পারে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..