রাষ্ট্র, পুঁজি, নাগরিক সমাজ ও রাস্তার পাঠ

ওয়াংচুককে ছাড়িয়ে বামপন্থার সামনে প্রকৃত প্রশ্ন

অচিন্ত নারায়ণ চৌধুরী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সোনম ওয়াংচুক বা দীপকের রাজনৈতিক অতীত নিয়ে সন্দেহ থাকা অস্বাভাবিক নয়। একজন দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে আপসের রাজনীতি করেছেন কি না, অন্যজনের রাজনৈতিক অবস্থান কতটা সুসংহত–এসব প্রশ্ন অবশ্যই তোলা যায়। কিন্তু ইতিহাসের বস্তুবাদী পাঠ আমাদের শেখায়, ইতিহাস ব্যক্তির ইচ্ছায় চলে না; ইতিহাস চলে বস্তুগত সামাজিক দ্বন্দ্বের গতিতে। বহু আন্দোলনই এমন হয়েছে, যেখানে নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে জনগণ নিজস্ব রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তুলেছে। দিল্লির রাস্তায় যা ঘটছে, তার গুরুত্ব ওয়াংচুকের ব্যক্তিত্বে নয়; বরং রাষ্ট্রের চরিত্র উন্মোচিত হওয়ায়। যখন রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে নিয়ন্ত্রণ, দমন বা অপরাধীকরণের পথে হাঁটে, তখন সে নিজের শ্রেণিচরিত্রকেই প্রকাশ করে। মার্কসবাদ রাষ্ট্রকে কখনও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেনি; রাষ্ট্র হলো শ্রেণিশাসনের সংগঠিত রূপ। যে রাষ্ট্র কর্পোরেট পুঁজির সঞ্চয়কে রক্ষা করে, সে প্রয়োজনে নাগরিক স্বাধীনতার পরিসরও সংকুচিত করে। কিন্তু এখানেই আরেকটি বিপজ্জনক সরলীকরণ কাজ করে। আজকের ভারতে বিজেপি-বিরোধিতাকেই যদি রাজনীতির একমাত্র মানদণ্ড বানানো হয়, তাহলে শ্রেণি-সংগ্রামের প্রশ্ন আড়ালে চলে যাবে। শাসকদলের বিরোধিতা অবশ্যই গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার অংশ হতে পারে, কিন্তু পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক, সম্পদের কেন্দ্রীভবন, শ্রমের অনিশ্চয়তা এবং কর্পোরেট আধিপত্যের প্রশ্নকে বাদ দিয়ে কেবল সরকার-বিরোধিতা শেষ পর্যন্ত উদারপন্থি ক্ষমতা-পরিবর্তনের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। গ্রামশি আমাদের শিখিয়েছিলেন, শাসকশ্রেণি কেবল পুলিশ, সেনা বা আদালতের মাধ্যমে শাসন করে না; সে শাসন করে হেজিমনি বা সম্মতি নির্মাণের মাধ্যমে। সংবাদমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্কৃতি, এনজিও, সামাজিক মাধ্যম, এমনকি প্রতিবাদের ভাষাও কখনও কখনও এই হেজিমনির অংশ হয়ে উঠতে পারে। ফলে কোনো আন্দোলন গণতান্ত্রিক দাবি নিয়ে শুরু হলেও, তার রাজনৈতিক দিকনির্দেশ কোন শ্রেণির স্বার্থে গিয়ে দাঁড়াবে–সেই প্রশ্ন সবসময় খোলা থাকে। এই কারণেই প্রতিটি গণআন্দোলনকে দুটি প্রশ্নে বিচার করতে হবে। প্রথমত, এটি কি রাষ্ট্রের দমনমূলক প্রবণতার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক পরিসর বিস্তৃত করছে? দ্বিতীয়ত, এটি কি পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে জনগণের সংগঠিত শক্তি তৈরি করছে, নাকি শেষ পর্যন্ত আরেক ধরনের উদারনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য সামাজিক অসন্তোষকে ব্যবহার করছে? এই দ্বিতীয় প্রশ্নটিই আজ সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত। বিশ্বপুঁজিবাদ আজ কেবল বাজারের মাধ্যমে নয়, “গণতন্ত্র”, “মানবাধিকার”, “গভর্ন্যান্স”, “সুশাসন”, “নাগরিক সমাজ”–এই ভাষাগুলোকেও নিজেদের কৌশলের অংশ করে তুলেছে। এর অর্থ এই নয় যে মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের দাবি ভুয়া; বরং এই দাবিগুলিকে কোন শ্রেণি, কোন রাজনৈতিক প্রকল্প এবং কোন অর্থনৈতিক স্বার্থ ব্যবহার করছে, সেটাই বিশ্লেষণের বিষয়। কোনো নির্দিষ্ট আন্দোলনকে প্রমাণ ছাড়া “বিদেশি চক্রান্ত” বলে দাগিয়ে দেওয়া যেমন রাজনৈতিকভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন, তেমনি কোনো আন্দোলনকে প্রশ্নাতীত নৈতিকতার প্রতীক বানানোও সমানভাবে অবৈজ্ঞানিক। ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী প্রায়শই প্রতিটি ভিন্নমতকে “বিদেশি শক্তির প্ররোচনা” বলে চিহ্নিত করতে চায়। অন্যদিকে, উদারপন্থি রাজনীতির একটি অংশ মনে করে কেবল নির্বাচন, সংবিধান ও প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার হলেই সংকটের সমাধান হবে। কিন্তু মার্কসবাদী দৃষ্টিতে–দুটি অবস্থানই অসম্পূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রক্ষমতার রূপ বদলালেও যদি উৎপাদনের উপায়ের ওপর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ অটুট থাকে, তবে শোষণের ভিত্তি অপরিবর্তিত থাকবে। এই জায়গায় শিক্ষক সমাজের আত্মসমালোচনা অনিবার্য। বিশ্ববিদ্যালয়কে কর্পোরেট বাজারের যুক্তিতে পরিচালিত করা হয়েছে; স্থায়ী চাকরি কমেছে; চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বেড়েছে; গবেষণাকে বাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়েছে; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষকসমাজের বড় অংশ নিরাপদ নীরবতার আশ্রয় নিয়েছে। ছাত্ররা যে ঝুঁকি নিয়েছে, শিক্ষকরা তার অল্প অংশও নেননি। শ্রেণিকক্ষ রাজনৈতিক সমালোচনার জায়গা হওয়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রে চাকরি বাঁচানোর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এখানেই বামপন্থিদের ব্যর্থতাও স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটি অংশ সংসদীয় অঙ্কে এতটাই আবদ্ধ হয়েছে যে স্বাধীন শ্রেণি-রাজনীতির ধার কমে গেছে। আবার অন্য অংশ গণআন্দোলনের ভেতরে প্রবেশ না করে কেবল মতাদর্শগত বিশুদ্ধতা রক্ষায় ব্যস্ত থেকেছে। ফলে ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক, আদিবাসী, দলিত, নারী ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামকে একটি ঐক্যবদ্ধ শ্রেণি-ফ্রন্টে রূপান্তর করার ঐতিহাসিক কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। আজ কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর করণীয় কী? প্রথমত, রাষ্ট্রের দমননীতি, নাগরিক অধিকার হরণ এবং শিক্ষাঙ্গনের সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভেতরে শ্রম, জমি, বেকারত্ব, কর্পোরেট একচেটিয়া পুঁজি, বেসরকারিকরণ এবং বৈষম্যের প্রশ্নকে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করা। তৃতীয়ত, উদারপন্থি নাগরিক সমাজের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা করা যেতে পারে, কিন্তু কখনোই স্বাধীন শ্রেণি-রাজনীতিকে তার মধ্যে বিলীন করা যাবে না। বামপন্থার শক্তি তার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কর্মসূচি, শ্রমিক-কৃষকভিত্তিক সংগঠন এবং বিকল্প সমাজদৃষ্টিতে। চতুর্থত, গ্রামশির ভাষায় “ওয়ার অব পজিশন”–অর্থাৎ নাগরিক সমাজের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সংগ্রাম—নতুন করে শুরু করতে হবে। কেবল নির্বাচনে নয়; স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্য, থিয়েটার, বিজ্ঞানচর্চা, ডিজিটাল পরিসর, ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক সংগঠন–সবখানেই বিকল্প হেজিমনি নির্মাণের লড়াই গড়ে তুলতে হবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ওয়াংচুক বা দীপক নন। প্রশ্ন হলো–এই আন্দোলন কি এমন এক রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেবে, যা মানুষকে কেবল শাসক বদলের নয়, শাসনের শ্রেণিগত ভিত্তি বদলানোর সংগ্রামে নিয়ে যাবে? যদি সেই চেতনা জন্মায়, তবে রাস্তা আজকের শ্রেণিকক্ষ হয়ে উঠবে। আর যদি না জন্মায়, তবে ক্ষোভকে পুঁজিবাদ তার নিজস্ব রাজনৈতিক বিন্যাসের মধ্যেই শোষণ করে নেবে। বামপন্থার ঐতিহাসিক দায়িত্ব তাই স্পষ্ট–রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদকে প্রতিরোধ করা, কিন্তু একই সঙ্গে উদারনৈতিক পুঁজিবাদের সীমাবদ্ধতাকেও উন্মোচিত করা; গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াইকে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করা; এবং জনগণকে শেখানো যে, প্রকৃত স্বাধীনতা কেবল ভোটের অধিকার নয়–উৎপাদন, সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর জনগণের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত। য় লেখক : সিপিআই সদস্য

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..