মাতঙ্গিনী হাজরা

আশিষকুমার মুখ্পোধ্যায়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আমার যে সব দিতে হবে সে তো আমি জানি- আমার যত বিত্ত প্রভু, আমার যত বাণী, সব দিতে হবে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণকারী নারীদের মধ্যে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, শান্তি ঘোষ, সুনীতি চৌধুরী, কল্পনা দত্ত, বীণা দাশ ও উজ্জ্বলা মজুমদার প্রভৃতির নাম যেমন অমর হয়ে আছে, তেমনি সন্ত্রাসবাদ পরিহার করেও যেসব বীরাঙ্গনারা জ্বলন্ত দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের দৃষ্টান্তে দেশবাসীদের উদ্বুদ্ধ করে গেছেন মাতঙ্গিনী হাজরা ছিলেন তাঁদেরই অন্যতম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও ভারতের নারীদের মুকুটমণি স্বরূপা- ‘ঞযব ঔড়ধহ ড়ভ অৎপ ড়ভ ওহফরধ’ খ্যাত ৪২ এর অগাস্ট আন্দোলনে মাতঙ্গিনীর মূলমন্ত্র ছিলো- ‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে’ (করো, না হয় মরো)। স্বীকার করতেই হয় যে মাতঙ্গিনী জীবন বিসর্জন দিয়ে এই মন্ত্রের আরাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। ছোট্ট গ্রাম হোগলা। মেদিনীপুর জেলার তমলুক থানার এলাকাধীন। ওই গ্রামে অতি গরিব এক চাষি পরিবারে ১৮৭০ সালের ১৭ নভেম্বর জন্মেছিলেন মাতঙ্গিনী। ঐতিহাসিকেরা অনেক চেষ্টা করে বের করেছেন তাঁর জন্মের সালটি। তাঁর বাবার নাম ছিল ঠাকুরদাস মাইতি। মা ভগবতী মাইতি। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্রের বাবা ও মায়ের নামের সঙ্গে আশ্চর্য রকমের মিল। এগারো বছর বয়সেই মাতঙ্গিনীর বিয়ে হয় পাশের আলিনান গ্রামের পাত্র ত্রিলোচন হাজরার সঙ্গে। বিবাহিত জীবনও বেশিদিন স্থায়ী হলো না। মাত্র আঠারো বছর বয়সেই স্বামীকে হারালেন। ছেলে-মেয়েও কিছু হয়নি। এই অকাল বৈধব্যে তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করলেন দেশকে বিদেশির শাসনমুক্ত করে দেশবাসীর মুখে হাসি ফোটানোর চেয়ে বড়ো ধর্ম আর কিছুই থাকতে পারে না। ১৯৩০ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে শুরু হল লবণ সত্যাগ্রহ আইন অমান্য আন্দোলন। মেদিনীপুরের কাঁথিতেই প্রথম লবণ তৈরি শুরু হলো। খবর পেয়েই পুলিশ গ্রামে ঢুকল। ঘর-বাড়ি সব জ্বালিয়ে দিলো। নানান অত্যাচার শুরু করে দিলো। তবুও মেদেনীপুর শায়েস্তা হলো না। শাসককুল চাইলো লবণ তৈরির একচেটিয়া অধিকার তাদের হাতে থাকুক। কিন্তু দেশের মানুষ চাইলো লবণ তৈরির ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা। আইন অমান্য আন্দোলনে মাতঙ্গিনীও ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে আলিনান গ্রামের আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠল। খবর পেয়েই পুলিশ এলো। মাতঙ্গিনী গ্রেপ্তার হলেন। সঙ্গে রইলেন অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবকরাও। তাঁরাও গ্রেপ্তার হলেন। এর পর মাতঙ্গিনীকে ছেড়ে দেয়া হলো। পরবর্তী ঘটনাটি ১৯৩৪/৩৫ সালের। অবিভক্ত বাংলার লাটসাহেব মি. অ্যান্ডারসন গোঁ ধরেছেন তমলুকে দরবার করবেন। হৈ হৈ রৈ রৈ কাণ্ড। মেদিনীপুরবাসীরা লাটসাহেবকে দরবার কিছুতেই করতে দেবে না। তারা দেখিয়ে দিতে চায় আর কিছুতেই ইংরেজদের গোলামি করতে রাজি নয়। ইংরেজ সরকারও তাদের সংকল্পে অটল। সংঘাত অনিবার্য হলো। লাটসাহেব এলেন জেদের বশে। এমন সময় হাজার কণ্ঠে ধ্বনি উঠল– ‘লাটসাহেব তুমি ফিরে যাও- ফিরে যাও। তোমার কোনো কথা আমরা শুনতে রাজি নই। ঢের হয়েছে। তোমাদের দাসত্ব আর আমরা সহ্য করতে পারছি না। আমরা চাই তোমাদের হাত থেকে মুক্তি। বন্ধ করো তোমাদের শোষণ ও লুণ্ঠন। বন্ধ করো তোমাদের পুলিশি জুলুম। লাটসাহেব তুমি ফিরে যাও।’ আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠল, ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে। শোভাযাত্রা এগিয়ে চলল দরবারের দিকে। শত শত পুলিশও রুদ্ররূপে হাজির। শোভাযাত্রার পুরোভাগেই ছিলেন মাতঙ্গিনী। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করল। মাতঙ্গিনী দুমাস সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেন। বিচারের রায় ঘোষণার পর মাতঙ্গিনী হাসিমুখে বলেছিলেন-‘দেশের জন্য, দেশকে ভালোবাসার জন্য দণ্ডভোগ করার চেয়ে বড়ো গৌরব আর কী আছে?’ মাতঙ্গিনীকে অমর করে রেখেছে ১৯৪২ সালের অগাস্ট বিপ্লব। ১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট তারিখে ওই আন্দোলনের গুরুত্ব উপলব্ধি করে মহাত্মাজি-‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দেন। দেশনায়ক সুভাষচন্দ্রের প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত হলো জাতির জনকের আবেগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজেহাল ইংল্যান্ডকে ক্ষমতাচ্যুত করার একটা সুবর্ণসুযোগ দেখা দিলে সাফল্যের সম্ভাবনা ব্যর্থ হয়। ১৯৪২-এর ২৯ সেপ্টেম্বর। অগাস্ট বিপ্লবের জোয়ার তখন মেদিনীপুরে আছড়ে পড়েছে। ঠিক হয়েছে একসঙ্গে তমলুক, মহিষাদল, সুতাহাটা ও নন্দীগ্রাম থানা আক্রমণ করে দখলে নেয়া হবে। মাতঙ্গিনী স্বেচ্ছাসেবকদের বোঝালেন গাছ কেটে ফেলে রাস্তা-ঘাট সব বন্ধ করে দিতে হবে। টেলিফোন ও টেলিগ্রাফের তার কেটে দিতে হবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতে হবে। পাঁচদিক থেকে পাঁচটি শোভাযাত্রা নিয়ে গিয়ে তমলুক থানা এবং একই সঙ্গে সমস্ত সরকারি অফিসগুলি দখল করে নিতে হবে। ২৯ সেপ্টেম্বর পাঁচটি দিক থেকে পাঁচটি শোভাযাত্রা এগিয়ে চলল তমলুক অধিকার করতে। হাজার হাজার মেদিনীপুরবাসী শামিল হয়েছিলেন ওই শোভাযাত্রায়। হাতে তাদের জাতীয় পতাকা। মুখে গর্জন ধ্বনিত ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো- করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে- বন্দে মাতরম্’। গুর্খা ও ব্রিটিশ গোরা সৈন্যরা তৈরি হলো অবস্থার মোকাবিলার জন্য। হাঁটু মুড়ে বসে গেলো তারা। তারপরই তাদের বন্দুকগুলো গর্জে উঠল। মারা গেলেন পাঁচজন। আহত হলেন আরও বেশ কয়েকজন। আহত রামচন্দ্র বেরার দেহটা টানতে টানতে থানার সামনে এনে ফেলে রাখল কোলো এক ব্রিটিশ। জ্ঞান ফিরে আসতেই সবার অলক্ষ্যে রামচন্দ্র বেরা বুকে ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে হেঁটে হেঁটে থানার দিকে এগিয়ে চললো। থানা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেই উল্লসিত ফেটে পড়ে বলে উঠলেন- ‘থানা দখল করেছি’। তারপরই তাঁর শরীর নিথর নিস্পন্দ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। উত্তর দিক থেকে আসছিল মাতঙ্গিনীর দলটি। তারা থানার কাছাকাছি আসতেই পুলিশ ও মিলিটারি অবিরাম গুলিবর্ষণ শুরু করে দিল। বিদ্রোহীদের মধ্যে থেকে বেশ কয়েকজন কিছুটা পিছু হটে গিয়েছিল। তাদের সতর্ক করে দিয়ে মাতঙ্গিনী বললেন- ‘থানা কোন্ দিকে? সামনে, না পেছনে? এগিয়ে চলো। হয় থানা দখল করো, নয়ত মরো। বলো- ‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে’-‘বন্দে মাতরম্।’ একটি বুলেট পায়ে লাগতেই হাতের শাঁখটি মাটিতে পড়ে গেল। দ্বিতীয় বুলেটের আঘাতে বাঁ-হাতটা নুয়ে পড়ল। কিন্তু ওই অবস্থাতেও ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ভারতীয় সৈনিকদের উদ্দেশ্য করে মাতঙ্গিনী বলে চলেছেন- ‘ব্রিটিশের গোলামি ছেড়ে গুলি ছোঁড়া বন্ধ করো- তোমরা সব আমাদের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে হাত মেলাও।’ প্রত্যুত্তরে উপহার পেয়েছিলেন কপালবিদ্ধ করা তৃতীয় বুলেটটি। প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। কিন্তু জাতীয় পতাকাটি তখনও তাঁর হাতের মুঠোয় ধরা ছিল। ১৯৪২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের এই দিনটিতেই ব্রিটিশের বুলেটকে বুকে ধারণ করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মাতঙ্গিনী। তথ্যসূত্র ১. ইতিহাসের পাতা থেকে (প্রথম খণ্ড), প্রথম প্রকাশ- জানুয়রি, ২০০৮, মিত্রম্ প্রকাশনী, কলকাতা। ২. বিপ্লবীদের কথা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..