কমিউনিস্ট পার্টি ও নারী আন্দোলন

রেখা চৌধুরী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রাম ও অভ্যুত্থানে নারী সমাজের রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এ অঞ্চলের রাজনীতির বলিষ্ঠ উপাদানই হচ্ছে প্রগতিশীল তথা কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি। এই রাজনীতির মূল ধারার সাথে নারী সমাজ অতপ্রোতভাবে জড়িত শুরু থেকেই। তাই জাতীয় মুক্তি আন্দোলন ও নারীমুক্তি আন্দোলন দুটোই পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে চলে আসছে। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগের বহু আগে থেকেই অবিভক্ত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন শুরু হয়, মূলত বিশের দশক থেকেই। ১৯২৫ সালে যখন প্রথম র্সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয় তারও আগে থেকেই এই অঞ্চলে কাজ শুরু করেন কমিউনিস্টরা। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে ব্রিটিশ শাসকদের অসহনীয় নির্যাতন, জুলুম ও অত্যাচারের প্রতিবাদে দফায় দফায় কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনগণসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায় মিলে যে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন, সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল তার ভেতরে থেকে তাদের সংগঠিত ও সংঘবদ্ধ করেছিল তৎকালীন কমিউনিস্ট কর্মীরা। এর ফলে দেখা গেল, ত্রিশের দশকের শেষার্ধের মধ্যেই এই অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হতে থাকে। অবিভক্ত ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট আন্দোলন একটি জোরদার ও শক্তিশালী আন্দোলনে পরিণত হতে থাকে। যদিও ১৯৪২ এর আগস্ট পর্যন্ত ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছিল। আইন সিদ্ধ হবার পর ’৪২ থেকে ’৪৭ এর দেশ ভাগের আগ পর্যন্ত এই পার্টির উদ্যোগে বিভিন্ন কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের পাশাপাশি নারী আন্দোলনও গড়ে ওঠে। তৎকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলির গভীর প্রভাব অবিভক্ত ভারতের নারী আন্দোলনের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিক এর সাথে ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজ সংস্কারকরাও নারী আন্দোলনকে বেগবান করেছেন। এক্ষেত্রে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বেগম রোকেয়ার নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণযোগ্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও নারী আন্দোলনের নির্দিষ্ট রূপরেখা দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগ্রাম দ্বারাই নির্ধারিত হয়েছিল। অবিভক্ত বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনে নারীর ভূমিকা স্মরণ করতে গেলে আজ বিস্ময়াভূত হয়ে ভাবতে হয় যে, বিংশ শতাব্দীর আগে যে বাংলার মেয়েরা লেখাপড়া শেখাই শুরু করেনি সেই বাংলায় শ্রমিক আন্দোলনের মতো কঠিন, গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গি আন্দোলনের সূচনা ঘটালো কতিপয় নারী নেত্রী। সময়কাল (১৯২০-১৯৪০) এঁরা হলেন, সন্তোষ কুমারী দেবী, ড. প্রভাবতী দাশ গুপ্ত, সুধা রায়, সুলতানা মোয়াজ্জেদা। ১৯২৭ এর ৬ মাসব্যাপী বেঙ্গল নাগপুর রেল শ্রমিক আন্দোলনের পুরো ভাগে ছিলেন সন্তোষ কুমারী দেবী। শ্রমিকরা ভালবেসে তাকে ডাকতো ‘মাইরাম’। ১৯২৮ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত কলকাতায় ধাঙড়দের ন্যায্য দাবি দাওয়া আদায়ের জন্য তাদের সংগঠিত করে আন্দোলন গড়ে তুলতেও পূর্ণ নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন দুই মহিলা। কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম মুসলিম মহিলা অ্যাড. মার্কসিস্ট সাকিনা সুলতানা মোয়াজ্জেদা এবং গ্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী নেত্রী ড. প্রভাবতী দাশ গুপ্ত। ১৯৪০ সালে একজন নির্দলীয় প্রার্থী হেসেবে কমিউনিস্টদের সমর্থনে সাকিনা সুলতানা কালকাতা কর্পোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯২০-১৯৪০ পর্যন্ত আরেক উল্লেখযোগ্য শ্রমিক নেত্রী মার্কসবাদী সুধা রায়। ’৩৪ সালের কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ডক ওয়ার্কাস ইউনিয়নের নেতৃত্বে তিন সপ্তাহব্যাপী ধর্মঘটে সুধা রায়ের ভূমিকা আজও অবিস্মরণীয়। ১৯২০ থেকে ’৪৩ এই সময়কালে ভারতের অবস্থা ছিল একদিকে উপমহাদেশের মধ্যপন্থি জাতীয়তাবাদী, আপসকামী নেতৃত্বের আন্তঃবিরোধ ঠিক এমনি ক্রান্তিকালে এ উপমহাদেশের সাধারণ দরিদ্র জনগণের মধ্যে থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংগঠিত হয়েছিল বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থা ও শ্রেণি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অসাধারণ কিছু সংগ্রাম। যার পরোক্ষ নেতৃত্বে ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, চব্বিশ পরগনাসহ বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে গর্জে ওঠা কৃষক বিদ্রোহ যা তেভাগা আন্দোলন বলে খ্যাত। সিলেটের নানকার বিদ্রোহ, ময়মনসিংহের টংক আন্দোলন যা হাজং বিদ্রোহ। এর প্রত্যেকটি আন্দোলন, বিদ্রোহে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বদান ছিল ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য দিক। অবিভক্ত বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে যে নারী সংগঠনটি প্রথম আত্মপ্রকাশ করে, তার নাম মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে এক সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে, যুদ্ধকালীন ফ্যাসিস্ট আক্রমণ ও দুর্ভিক্ষের কবল থেকে আত্মরক্ষা, নারী সমাজের আর্থ-সামাজিক সমস্যা ও পশ্চাৎপদতা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে এই সমিতি গড়ে ওঠে। মূলতঃ মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি ছিল তৎকালীন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির যুদ্ধকালীন জরুরি সমিতি জনরক্ষা সমিতির একটি নারী শাখা। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সকল দলমত-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মহিলাদের নিয়ে একটি মহিলা গণ-সংগঠন সড়ে তোলাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং মজুতদার ও চোরাকারবাদীদের অশুভ তৎপরতার ফলে ১৯৪৩-৪৪ সালের মধ্যে বাংলায় লক্ষ-লক্ষ নর-নারী-শিশু মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। যা পঞ্চশের মন্বন্তর বলে খ্যাত। দেশের এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি। গড়ে তুলে দুর্বার খাদ্য আন্দোলন। এই সময়েই তৎকালীন পূর্ব বাংলার আনাচে-কানাচে কমিউনিস্টদের সহযোগিতায় ব্যাপকভাবে এই মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গড়ে ওঠে। এই উপমহাদেশ জুড়ে এই সময়কাল সংগঠিত হওয়া বিভিন্ন শ্রেণি ভিত্তিক আন্দোলন যেমন- নানকার আন্দোলন, টংক আন্দোলন বা হাজং বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আন্দোলন, কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে নারী আন্দোলন আরো জোরদার, শক্তিশালী ও বেগবাম হতে থাকে। এ সময়ের বিশিষ্ট নারী নেত্রীবৃন্দ হচ্ছেন, রেনু চক্রবর্তী, মুঁইফুল রায়, মণি কুন্তলা সেন, কমলা চ্যাটার্জি, হেনা দাস মনোরমা বসু, জোবেদা খাতুন চৌধুরানী, ইলা মিত্র, জোছনা নিয়োগী, কল্পনা দত্ত, নিবেদিতা দাস, তহমিনা বিবি, কালুই বিবি প্রমুখ। এছাড়া অবিভক্ত বাংলার বিস্তৃর্ণ এলাকা জুড়ে তৃণমূল পর্যায়ে অসম সাহসিকতার সাথে যে সকল কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ নারীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের দীপশ্বরী সিং, দিনাজপুরের বালিয়াডাঙ্গির জয় মণি ও রোহিনী, দেবীগঞ্জ থানার বুড়িমা পূন্যশ্বরী দেবী, যশোর নড়াইলের সরলাদি, জলপাইগুড়ির দুই বোন, পোকো ও মহারানী ওরাঁও, মেদিনীপুরের বিমলা মাজী, সুন্দরবন এলাকার চার গর্ভবতী শহীদ নেত্রী অহল্যা-উওমী, সরোজিনী ও বাতাসী। হাজং নেত্রী রাস মণির নাম করে নেত্রী কালুই বিবি, তহমিনা বিবি, যশোদা রানী প্রমুখের নাম বাংলার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে যায়। দেশ ভাগের সাথে সাথেই অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিও ভাগ হয়ে যায়। পার্টির মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারতে গড়ে ওঠা সমস্ত সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নারী সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়ন সংস্থাগুলো দু’ভাগ হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ এই অঞ্চলের পার্টির নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি। নব গঠিত ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই পার্টি কর্মীদের ওপর শুরু করে অমানবিক নির্যাতন ও দমন নীতি। এই উগ্র-সাম্প্রদায়িক তৎপরতার মূল কারণ ছিল– অমানবিক দমন-পীড়ন-নিযাতনের ফলে যাতে এ অঞ্চলে আর কখনই কোনেও গ্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু হতে না পারে। যেন কখনই মাথাচাড়া না দেয় বাঙালির নিজস্ব অধিকার আদায়ের প্রশ্নটি। আর দ্বিতীয় কারণটি হলো জাতিগতভাবে বাঙালিকে নেতৃত্বের শূন্যতায় ঠেলে দেওয়া। তাই ভয়াবহ মাদ্রার উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিস্তারের ফলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ধীরে ধীরে দেশত্যাগে বাধ্য হয়। এতে করে কমিউনিস্ট পার্টিও তছনছ হয়ে যায়। এবং নারী আন্দোলনের গতি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়। পাকিস্তান সরকার ১৯৪৮ সালে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপরেও কিছু কিছু নারী নেতৃবৃন্দ যারা এদেশে থেকে গেলেন, মনোরমা বসু, লীলা নাগ, মুঁইফুল রায়, হেনা দাস, জোছনা নিয়োগী প্রমুখ আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হলেন। তবে আত্মগোপনে তারা কেউই নীরব-নিষ্ক্রিয় থাকেননি। ঐ অবস্থায়ই তাঁরা ছদ্মনাম (মুসলিম নাম) ধারণ করে আবারো নারী আন্দোলনকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। জেল-জুলুম নির্যাতনের ভয় থাকা সত্ত্বেও তাঁরা নব উদ্যোগে যে যার মত করে মুক্তচিন্তার মুসলিম মেয়েদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে নারী আন্দোলনের বীজ বুনতে থাকেন। মূলত: এই সময়েই লীলা নাগ, আশালতা সেন, সুফিয়া কামাল, মিসেস মোতাহারা হোসেন, হেনা দাস, মনোরমা বসু, নিবেদিতা নাগ, মর্জিনা খাতুন প্রমুখ নেত্রীদের উদ্যোগে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি। কিন্তু পাক-সরকার এই সমিতি ও নেত্রীবৃন্দকে কখনই সু-নজরে দেখেনি এবং স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি। ১৯৪৮-৪৯ সালে সিলেট এলাকায় সংঘটিত হয় নানকার আন্দোলন। নানকার শব্দের অর্থ রুটি। এই খাদ্য বা রুটির বিনিময়ে যারা কাজ করে তাদের নানকার বলে অভিহিত করা হতো। ২/৪ বিঘে জমি ও একটুখানি বসত ভিটের বিনিময়ে গরিব মানুষেরা পরিণত হতো জমিদার তালুকদারদের কেনা দাসে। নানকার মেয়েরা ছিল ক্রীতদাসী। এদের কোনো শ্রমঘণ্টা ছিল না। তেমনি শ্রমের কোনো মূল্যও ছিল না। জমিদারদের ইচ্ছা মাফিকই সব হতো। ব্রিটিশ ভারতেই এই অমানবিক নানকার প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে এবং তা পাকিস্তান পর্যায় পর্যন্ত চলে। এই আন্দোলনে নানকার নারীদের সংগঠিত করে জন্মসূত্রে এক নানকার নারী কালুই বিবি। এছাড়াও এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত থেকে নেতৃত্ব দেন হেনা দাস, তহমিনা বিবি, অপর্ণা, অসিতা, সুষমাসহ আরও অনেক নারী। ’৪৯ সালে সর্বশেষ নানকার মিছিলে পাক-পুলিশ বাহিনী বর্বর জঙ্গি হামলা চালায়। অপর্ণা-অসিতা-সুষমাকে পুলিশ বেধড়ক পেটায়। পুলিশের লাঠিচার্জ ও বুটের লাথি। গর্ভবতী অপর্ণার গর্ভপাত ঘটে। অন্যতম নেত্রী হেনা দাস তখন আত্মগোপনে ছিলেন। পুলিশি নির্যাতনে অপর্ণা প্রায় পঙ্গু হয়ে যান। এই নানকার আন্দোলনকারীরা অধিকাংশই ছিল গরিব মুসলমান। সেই সময়ের পুলিশের নির্মম অত্যাচার ও গ্রেফতারি এড়াতে গ্রামের অনেকের সাথে কালুই বিবিও গ্রাম ছেড়ে আসামে পালাতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে এই জঙ্গি নারী নেত্রীর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। ১৯৩৮ সালেই কমিউনিস্ট কর্মী ও বামপন্থিরা মিলে সিলেট কাছাড় চা বাগান মজদুর ইউনিয়ন গড়ে তোলেন। এই চা বাগান মজদুর ইউনিয়নের শ্রমিকদের মাঝে থেকে কাজ করা ও আন্দোলন গড়ে তোলা ইত্যাদি কাজে উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় মহিলা কমরেডরাও যুক্ত ছিলেন অতপ্রোতভাবে। এদের মধ্যে কমরেড হেনা দত্ত, কমরেড লখিয়া, অনিমা সিংহ, শশী প্রভাদের নাম উল্লেখ্য। চা শ্রমিক লখিয়া সংগঠিত করে ছিলেন নারী চা শ্রমিকদের। ১৯৪৯-৫০ সাথে কমরেড হেনা দত্ত ঊষা এই ছদ্ম নাম চা শ্রমিকদের মাঝে কাজ করেছেন। শুরু থেকেই চা বাগানের নারী-পুরুষ শ্রমিকদের মাঝে বৈষম্য ছিল, রেশনিং, মজুরি ভাতা ইত্যাদি বিষয়ে। এই বৈষম্য ধরিয়ে দেয় কমিউনিস্ট কর্মীরা। পার্টি কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই এ সকল সহজ-সরল ও নিরক্ষর শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে নামে।এই সময়েই সারা বাংলা জুড়ে সংঘটিত হয় উত্তাল কৃষক বিদ্রোহ যা ইতিহাসে তেভাগা আন্দোলন রূপে খ্যাত। দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে প্রথম তেভাগা আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করে। এছাড়াও নীলফামারী, রংপুর, যশোর, নড়াইল, ময়মনসিংহ, মেদিনীপুর, হুগলি হাওড়া, জলপাইগুড়িসহ বাংরার ব্যাপক এলাকায় তেভাগা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে কৃষক রমনীরা এতে স্বতঃফূর্তভাবে শরিক হয়। এখানে লক্ষণীয় যে, তৎকালীন বাংলার তৃণমূল পর্যায়ের আদিবাসী, নিম্নবর্ণের হিন্দু, নিরক্ষর দরিদ্র, কৃষক মেয়েরা নিজেদের ভেতরের তাগিদ থেকেই, দীর্ঘদিনের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সমবেত হয়েছিল। এবং এদের মধ্যে থেকেই বেরিয়ে এসেছিল দুর্র্ধষ, কৌশলী নারী নেতৃত্বও। তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কৃষক রমনীদের অভূতপূর্ব সক্রিয় অংশগ্রহণ। এসময় অনেক নারী শহীদও হন। দেশ ভাগের পর (১৯৪৮-’৪৯) সালে বৃহত্তর রাজশাহী জেলার চাপাই নবাবগঞ্জের নাচোলে কৃষক আন্দোলনের নেতা কমিউনিস্ট রমেন মিত্র-ইলা মিত্রের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক তেভাগা সংগ্রাম সংঘটিত হয়। এই সংগ্রামে হাজং নারী রাস মণি তার দুর্র্ধষ সাহসিকতা, কৌশলী নেতৃত্বের গুণেই তার এলাকায় বীর মাতা বলে পরিচিত হন। রাস মণি টংক আন্দোলনের পাশাপাশি কিছু কিছু সামাজিক আন্দোলনও গড়ে তোলেন। ফসল সঞ্চয়ের জন্য ধর্মগোলা ও কুটির শিল্প কেন্দ্র স্থাপন করেন। রাস মণির উদ্যোগেই হাজং পল্লীর প্রথম নৈশ ও বয়স্ক বিদ্যালয় চালু হয়। ১৯৪৬ সালে ৩১ জানুয়ারি অর্তকিতে সেনাবাহিনী হাজং গ্রাম ঘেরাও করে হাজং নারীদের ওপর বর্বর আক্রমণ চালায়। বীর মাতা রাস মণি এই সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন ও শহিদী মৃত্যু বরণ করেন। বীর্যবতী নেত্রী রাস মণির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে টংক আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ে প্রাণ দিয়েছেন, নীলমণি, পদ্মমণি, শঙ্খমণি, বেরতীসহ বহু হাজং বীর নারী ও পুরুষ। লক্ষণীয় যে, ইতিহাসের স্মরণযোগ্য আন্দোলনসমূহের অধিকাংশই সংগঠিত ও পরিচালিত হয়েছিল ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে। এ সকল আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ব্যাপক গণমানুষের মাঝে আন্দোলনের কর্মী পৌঁছানোর সাথে সাথে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা সমাজের স্বাধিকার প্রেক্ষাপটে। শত শত নারীকে স্বতঃফূর্তভাবে আন্দোলনে শরিক করা ছিল সত্যিই বিরল ব্যাপার।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..