মহামতি লেনিন ও নেপের পথে সমাজতন্ত্র-যাত্রা হিসাব-নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারের গুরুত্ব
লুৎফর রহমান
নেপের পথে সমাজতন্ত্র-যাত্রা
অভিজ্ঞতা থেকে নেপ নিয়ে লেনিনের দৃষ্টি সুদূরপ্রসারী হয়। সূচনায় নেপকে সাময়িক ‘পেছনে সরে আসা’ বললেও তিনি নেপকে রাশিয়ার সমাজতন্ত্র নির্মাণে এক দীর্ঘ উত্তরণকালীন পর্ব হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এটা যুদ্ধ কমিউনিজমের বিপরীত চিন্তা। নেপের পথে সমাজতন্ত্র-যাত্রায় লেনিন কৃষককে উৎপাদনে স্বাধীনতা দিয়ে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী দৃঢ় করার কথা বলেন। এর পাশাপাশি শিল্পখাতে ও সমগ্র অর্থনীতিতে হিসাব ও নিয়ন্ত্রণ চালু করার কথা বলেন। দক্ষ-উৎপাদন-পরিচালনা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শ্রম-শৃঙ্খলা ও শ্রমিক-প্রণোদনা ইত্যাদি অর্জনে লেনিন হিসেবের গুরুত্ব অনুভব করেন। বিপ্লবের পরপর রাশিয়াকে ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একদিকে কারখানার অভ্যন্তরের ব্যবস্থাপনা, অন্যদিকে বৃহত্তর অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা, অর্থাৎ অর্থনীতির মাইক্রো ও ম্যাক্রো পর্যায়ে কঠোর হিসেব ছাড়া দক্ষ পরিচালনা সম্ভব নয় বিবেচিত হয়। উপর থেকে ব্যবস্থাপক নিয়োগ ও অর্থনীতির জাতীয় পরিষদ গঠনের সাথে হিসেবের প্রয়োজন অনুভব করেন লেনিন, যে সময়টাতে যুদ্ধ কমিউনিজমের প্রভাবে বিনিময়ে মুদ্রার ব্যবহার সংকোচিত হচ্ছিলো। মজার ব্যাপার হচ্ছে বর্তমানেও উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে প্রাত্যহিক বিনিময়ে মুদ্রার ব্যবহার হ্রাস পাচ্ছে, মূলত অর্থনীতির গতি সেদিকেই। তার অর্থ এই না যে হিসাবের একক হিসেবে মুদ্রার ভূমিকা ফুরিয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিতে মুদ্রার চারটি ভূমিকার কথা বলা হয়েছে সেগুলো পরস্পর সম্পর্কিত। যেমন- (১) হিসাবের একক (২) বিনিময়ের বাহন (৩) মূল্যের আধার (৪) পরিশোধের মাধ্যম। এখন বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মুদ্রার ভূমিকা হ্রাস পেলেও হিসাবের একক হিসেবে থেকেই যায়। হিসাবের একক হিসেবে মুদ্রার ভূমিকার লোপ পাওয়ার বিষয়টি অনেক দূরের, এটি জড়িত সাম্যবাদের সাথে। সে জন্য লেনিন কারখানা ও বৃহত্তর অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ মাইক্রো ও ম্যাক্রো উভয় ব্যবস্থপনায় হিসাবের ওপর জোর দিয়েছিলেন। কারখানা ব্যবস্থাপনায় অর্থাৎ মাইক্রো ব্যবস্থাপনায় বিতরণ কীভাবে হবে, এই প্রশ্নের সমাধান করেছেন মার্কস, তিনি বলেছেন সমাজতন্ত্রে বিতরণ হবে ‘শ্রম অনুযায়ী’। লেনিন মনে করেন উত্তরণ পর্বেও তাই হবে। শ্রম অনুযায়ী বিতরণ হলে শ্রমের হিসেব হওয়া প্রয়োজন। এ কারণে লেনিন মজুরি নির্ধারণে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের উত্তরণ পর্বে “পিস রেট’’ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য টেইলর পদ্ধতির সুপারিশ করেছিলেন। পিস রেট হচ্ছে সময় নয় কাজ অনুসারে মজুরি নির্ধারণ চধুসবহঃ নু ৎবংঁষঃ। টেইলর পদ্ধতি হচ্ছে, উপকরণসমূহের সর্বাধিক ব্যবহার, উপকরণসমূহের উন্নয়ন, সম্পর্কের উন্নয়ন, নীতিমালা প্রণয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি; অর্থাৎ সময় বাঁচিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে অধিক উৎপাদন করা। এ দুটো পদ্ধতি বুর্জোয়ারা ব্যবহার করে তাদের স্বার্থে আর সমাজতন্ত্রে ব্যবহৃত হবে শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থে।
কিন্তু বিতরণের আগে প্রতিষ্ঠানটির আয়ও নির্ধারিত হতে হবে। সেটি হবে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত দ্রব্য ও সেবার মূল্যায়ন দিয়ে। মূল্য ঠিক হয় সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রম দিয়ে। কতোটুকু শ্রম সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় সেটা ঠিক হতে পারে দুভাবে। একটি বাজারের আশ্রয় নিয়ে অন্যটি প্রতিনিধিত্বশীল কোনো সংস্থার ওপর দায়িত্ব দিয়ে।
লেনিন, নেপ দীর্ঘ সময়ের জন্য উপযোগী এই বিবেচনা থেকে সামাজিকভাবে প্রয়োজীয় শ্রমের পরিমাণ দিয়ে অর্থাৎ মূল্য নির্ধারণে বাজার পন্থার দিকেই এগোচ্ছিলেন। কিন্তু লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিন এই পদ্ধতি পরিহার করে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা কমিটি গঠন করেন। গঠিত হয় পণ্য ও সেবার দাম নির্ধারণকারী রাষ্ট্রীয় কমিটি এবং উৎপাদনের বস্তুগত উপাদান সরবরাহ করার জন্য কমিটি।
স্ট্যালিনের সময় আরো দুটো বিষয় নিয়ে নেতাদের মধ্যে বিতর্ক হয়। এর একটি সমাজতন্ত্রে পণ্য উৎপাদন সম্ভব কি না? অন্যটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির জন্য বিষয়গত (ঙনলবপঃরাব) নিয়মাবলীর প্রয়োজন আছে কি না? তারপর অস্বীকার করা হয় সমাজতন্ত্রে পণ্য উৎপাদন-সম্ভাবনা ও অর্থনীতির বিষয়গত নিয়মের উপস্থিতিকে। এর ফলে কার্যত সমাজতন্ত্রে ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ শাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা হয়। অবশ্যি বহু পরে স্ট্যালিন ও তার অর্থনীতিবিদরা এর প্রয়োজন অনুভব করেন এবং একটি ‘সমাজতন্ত্রের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ নামক বই লেখা হয়। পণ্য উৎপাদন সম্ভব এটাও স্বীকার করা হয়। কিন্তু ইতোমধ্যে এর বিপক্ষের শক্তিশালী সংগঠনের জন্য বাস্তবে স্ট্যালিন ব্যর্থ হন। ফলে পণ্যের দাম নির্ধারণের জন্য দর কষাকষির প্রয়োজনে বাজারকে ব্যবহার করা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এই ব্যর্থতা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পর্যন্ত বজায় ছিলো।
সমাজতন্ত্রে বাজারের গুরুত্ব:
স্ট্যালিনের শাসনামলে ও পরবর্তিতে এই ব্যর্থতার চলমানতা বিশ্লেষণ করতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি পরিচালনায় বাজারের গুরুত্ব আলোচনা করা প্রয়োজন। ১৯২০ সালে অস্ট্রীয় অর্থনীতিবিদ ভন মিজেস এ আলোচনার সূত্রপাত করেন।
অর্থনীতির নিরঙ্কুশ পরিচালনার সমস্যা: অর্থনীতির নিরঙ্কুশ পরিচালনার মূল সমস্যা হচ্ছে তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং এর ভিত্তিতে সময়মতো উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। আধুনিক অর্থনীতি আকারের দিক থেকে বিশাল। এতে কোটি কোটি মানুষ উৎপাদক ও ভোক্তা। উৎপাদিত হয় কোটি কোটি পণ্য ও সেবা। আছে নির্দিষ্ট সময়ে এসব পণ্যের সুনির্দিষ্ট চাহিদা ও যোগানের বিষয়টি এবং চাহিদা ও যোগানের সতত পরিবর্তনশীলতা। কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার পক্ষে নিত্য পরিবর্তনশীল এই অগণিত পণ্য ও সেবার চাহিদা ও যোগানগত পরিস্থিতি সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং এর ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে উৎপাদকের নিকট পৌঁছানো ও এর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
বাজারের পক্ষে সম্ভব: এই কাজটি করতে পারে শুধু বাজার। বাজারে সৃষ্ট দামের মধ্যেই কোনো নির্দিষ্ট সময়ে একটি পণ্য বা সেবার চাহিদা ও যোগানের তথ্য দ্রুত প্রকাশিত হয়। সংশ্লিষ্ট সবাই এই তথ্যের মাধ্যমে তখন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ভোক্তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এই দামে কোনো পণ্য বা সেবা কিনবেন কিনা এবং কতোটুকু কিনবেন। একইভাবে উৎপাদকরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তারা এই দামে ঐ পণ্য বা সেবা উৎপাদন করবেন কি না এবং কতোটুকু করবেন। দাম বিষয়ক এই তথ্য উৎপাদকদের নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগ করতে এবং নতুন পণ্য বা সেবা উৎপাদনে সিদ্ধান্ত নিতেও উদ্বুদ্ধ করে।
মার্কসীয় ধারণার সাথে সামঞ্জস্য: বাজারের এই ভূমিকা ‘সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রম’ দিয়ে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ বিষয়ক মার্কসের ধারণার সাথে মিলে। সমাজের সদস্যরা বাজারে অংশ নিয়ে সবাই মিলে, কোনো পণ্য কতোটুকু সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রমের দাবিদার, তা ঠিক করে।
অস্কার লাংগে-এর একটি কাল্পনিক প্রস্তাব: এরই মধ্যে স্ট্যালিন সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করেন। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নকালীন সময়ে পুঁজিবাদী বিশ্ব মহামন্দায় আক্রান্ত হয়। তখনকার দৃষ্টিতে মনে হয় ‘কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা’ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার একটি সফল পদ্ধতি। সেটা বাজার পদ্ধতির চেয়ে উত্তম। অনুপ্রাণিত হন পোলিশ অর্থনীতিবিদ অস্কার লাংগে। তিনি ১৯৩৬ সালে ভন মিজেসের প্রস্তাবের বিপরীতে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, কোনো পণ্যের চাহিদা ও যোগানের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপনকারী দাম নির্ধারণ কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অধীনে সম্ভব। প্রথমে পরিকল্পনা কমিশন কোনো পণ্যের দাম ঘোষণা করবেন। এরপর উৎপাদকরা জানাবেন ঘোষিত দামে সে পণ্য কতোটুকু উৎপাদনে তারা প্রস্তুত। একইভাবে ভোক্তারা জানাবেন তারা ঘোষিত দামে সে পণ্য কতোটুকু কিনতে আগ্রহী। চাহিদা, যোগানের কম হলে পরিকল্পনা কমিশন আরো কমিয়ে ঐ পণ্যের দাম ঘোষণা করবেন। পুনরায় উৎপাদকরা জানাবেন সংশোধিত দামে কতোটা উৎপাদন করবেন এবং ভোক্তারা জানাবেন কতোটা কিনবেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশন ঐ পণ্যের ভারসাম্যমূলক দামে উপনীত হবেন।
বাস্তবে দাম নির্ধারণে সাধারণ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দরকষাকষির মাধ্যমে। পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক এভাবে দাম নির্ধারণ একটি রূপকল্প হতে পারে। বাস্তবে তা প্রয়োগ সম্ভব না। যেমন একটি অর্থনীতিতে মোট কয়টি পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে সেটা গণনা করা সম্ভব না। আবার একই পণ্য স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ভিন্ন পণ্য হয় যা গোনা ও তালিকা করা আরো অসম্ভব। চাহিদা-যোগানের সতত পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়ার সাথে পরিকল্পনা কমিশনের পাল্লা দেয়া সম্ভব না। এছাড়া একটি গতিশীল অর্থনীতিতে সবসময় পণ্য অবলুপ্ত হয়ে নতুন পণ্যের উদ্ভব হচ্ছে এবং যে পণ্যের উদ্ভব হয়নি তার দাম পরিকল্পনা কমিশনের নির্ধারণের সুযোগ নেই; প্রশ্নটিতো শুধু বিদ্যমান পণ্যের ভারসাম্যপূর্ণ দাম নির্ধারণে সীমাবদ্ধ নয়। এভাবে দেখলে অস্কার লাংগের রূপকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়ার নয় এবং হয়নি।
মূল্যাশ্রিত চাহিদা-যোগানের ভারসাম্য: আমলাতান্ত্রিকভাবে একতরফা নির্ধারিত দামের দ্বারাই সমাজতান্ত্রিক দেশে নিরঙ্কুশ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছে। আমলারাই ঠিক করেছেন কী পণ্য উৎপাদিত হবে, দাম কী হবে, কোন প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করবে, কারা ব্যবহার করবে। এই প্রক্রিয়ায় জনগণের কোনো প্রকার অংশগ্রহণ ছিলো না। চাহিদা ও যোগানের বিষয়টি এখানে বিবেচ্য ছিলো না। চাহিদা ও যোগানের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে পরিকল্পনাবিদদের মনোযোগ ছিলো বস্তুগত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার দিকে। মার্কস পণ্যের ব্যবহার মূল্য ও বিনিময় মূল্যের পার্থক্য চিহ্নিত করেছিলেন। মূর্ত শ্রম ও বিমূর্ত শ্রমের মধ্যেও সমানভাবে পার্থক্য চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু স্ট্যালিন যুদ্ধ কমিউনিজমের ভাবধারা গ্রহণ করায় ব্যবহার মূল্যের ওপর জোর দেয়াকেই সমাজতন্ত্র সম্মত মনে করেন।ফলে উৎপাদনের প্রাকৃতিক দিকটার ওপর বেশি জোর দেয়া হয়। মূল্যাশ্রিত চাহিদা-যোগানের ভারসাম্যের বদলে বস্তুগত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করণীয় হয়। এই চেষ্টা অনেকাংশে বিফল হয়। পণ্যের দাম নির্ধারণে বাজারের বিকল্প নেই। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পতন এটা প্রমাণ করে।
মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব লেখকের। -সম্পাদক
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন