
গত ২৯ মে হঠাৎ খবর পেলাম আমাদের চন্দন দা আর নেই, এই রকম একটি খবরের জন্য সেই মুহূর্তে প্রস্তুত ছিলাম না। তাঁর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের পঞ্চাশ বছরের সাংস্কৃতিক ও বামপন্থি রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পরিসমাপ্তি হলো। ডা. চন্দন দাশ, যে নামটি শুনলেই যে কেউ বুঝে নেবেন তিনি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ও রাজনীতির বরপুত্র।
অধিকাংশ রোগীর কাছ থেকে ফি না নেওয়া ডাক্তার আমাদের প্রিয় চন্দন দা। আমার সাথে উনার পরিচয় ১৯৭৯ সালে, সম্ভবত ডিসেম্বরের দিকে, বন্দর শ্রমিক ইউনিয়নের শ্রমিক সভার পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল। আমি তখন সদ্য চাকরিতে যোগ দেয়া নবাগত একজন ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী। ঐদিন উদীচী চট্টগ্রামের মূল নেতা প্রয়াত কমরেড মৃদুল সেন, চন্দন দা ও তার বন্ধু রবীন দে এই তিনজনের সাথে পরিচয় হলো। সেদিন শ্রমিক সভার অনুষ্ঠানে, পুরো টিম নিয়ে উদীচী অংশ নিয়েছিল। আমি বন্দরের বেশ বড় একটা স্টাফ বাস নিয়ে উদীচীর শিল্পীদের আনতে গিয়েছিলাম। এতো বড় বাসেও জায়গা হয়নি, তরুণদের অনেককেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। মোটামুটি অনেকের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়ে গেলো। যে তিনজন আমাকে প্রথম দিনেই আপন করে নিলেন তারা তিনজনই আজ প্রয়াত।
এরপর চট্টগ্রামে রবীন্দ্র সংগীত সম্মেলন, অধ্যাপক আবুল ফজলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, বাংলাদেশ সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির উদ্যোগে অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বার্ষিকীসহ পার্টির বিভিন্ন কর্মসূচিতে আসা যাওয়ার মাধ্যমে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠি। চট্টগ্রাম মুসলিম হলে বড় অনুষ্ঠান হলে কোন না কোনোভাবে আমার নামটা কর্মীর তালিকায় যুক্ত থাকেই, সেই সুবাদে পার্টির কর্মী হিসেবে দিনে দিনে তিনজনের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা আরো বাড়তে থাকে।
১৯৮০ সালে একটা নাট্য সংগঠনের সাথে আমি যুক্ত হই। চন্দন দা আমাকে বললেন, মাঝেমধ্যে উদীচীতে আসতে। তখন থেকে উদীচীর প্রায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করতাম। একজন নাট্যকর্মী হিসেবে একসময় উদীচীর সদস্য হই।
১৯৮৫ সালে আমাকে পার্টির (সিপিবি) নগর কমিটির অন্তর্ভুক্ত করে, তখন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত কমরেড আহসান উল্লাহ চৌধুরী। কমরেড মৃদুল সেন ও কমরেড চন্দন দাশও নগর কমিটিতে ছিলেন। সেই থেকে পার্টির বর্তমান জেলা কমিটি পর্যন্ত দীর্ঘ ৪১ বছর একসাথে কাজ করেছি।
১৯৮৮ সালে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিতর্কে আমাদের পার্টিতেও বিতর্ক শুরু হয়। পার্টিকে বিলুপ্ত করার চক্রান্ত শুরু হলে ব্যক্তিগতভাবে আমি এবং চন্দন দাশ দুজনেই যার যার অবস্থান থেকে মতাদর্শগত সংগ্রামে অংশনি।
নিজেদের মধ্যে নানান আলোচনায় আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠি। দুজনে আদর্শিক অবস্থান থেকে আন্ত পার্টির লড়াইয়ে এগিয়ে যাই। চন্দন দার সাথে আমার বহু বিষয়ে ঐকমত্য ছিল।
এরপর ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণআদালতে ঢাকায় মহাসমাবেশ থেকে এসে আমি একটু বেশি আশাবাদী হয়ে উঠি। এবং ভাবতে থাকি শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে বন্দর এলাকায় এনে একটা জনসভা করা যায় কি না। তখন এই আন্দোলনের সাথে মুক্তিযোদ্ধা সংসদও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। বন্দর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অফিসে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
গণআদালতের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে মশাল মিছিল শেষে সিনিয়র নেতারা সবাই মিলে চা খেতে খেতে আমি প্রস্তাবটা রাখলাম, শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে বন্দর এলাকায় এনে জনসভায় করতে পারি কি না। সেই সময় উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বন্দর কমান্ড কাউন্সিলের দায়িত্বে থাকা হাদী হোসেন বাবু (তিনি বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ প্ল্যানিং কর্মকর্তা ছিলেন), আমাদের পার্টির নেতা কমরেড আবদুল মান্নান সিকদার ও কমরেড নজরুল ইসলাম এবং মুক্তিযোদ্ধা শেখ মানিক ভাই সহ অনেকে। সকলের নাম স্মরণ করতে পারছি না। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাদী হোসেন বাবু উচ্চস্বরে বলে উঠলেন (আধা সিলেটি আধা চলিত ভাষায়) আরে মিয়া তোমার মাথায় আসছে এটা এতো এতদিন বল নাই কেন? ওয়ান্ডারফুল প্রস্তাব, উপস্থিত সকলে লুফে নিলেন।
দুই একজনে বললেন তিনি আসবেন কি না? আমি বললাম, সবাই যদি সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তাহলে ঢাকায় যোগাযোগ করতে পারি। সাথে সাথে আলোচনা করে প্রথমিক করণীয় ঠিক হয়ে গেল। এক লক্ষ টাকা বাজেট হয়ে গেল। ঢাকায় যোগাযোগ করার পর শহীদ জননী আসতে রাজি হয়েছেন। সাথে আরো দুইজনও আসবেন; হাসান ইমাম ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ডার আহাদ চৌধুরী। আরো একটি সিদ্ধান্ত হয় মঞ্চে উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করবে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, চট্টগ্রাম।
পরের দিন চন্দন দাকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানোর সাথে সাথে তিনি বলেন উদীচী অবশ্যই অনুষ্ঠান করবে, এতো চমৎকার সিদ্ধান্ত! চন্দন দা খুব উৎসাহিত হয়ে বলেন, এতো বড় খুশির খবরের পর চলেন মিষ্টি খাই। বোর্স ব্রাদার্সে গিয়ে দুইজনে ডাবল মিষ্টি খেতে খেতে ঐদিন কি কি করা যায় তার প্রথমিক পরিকল্পনা হয়ে গেলো। শহীদ জননীর আগমনে বন্দর স্টেডিয়ামের শহীদ মিনারে প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষের সমাগম হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১২ ও ১৩ সালে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের চট্টগ্রামের আহবায়কের দায়িত্ব নিলেন চন্দন দাশ ।
তিনি সাহসিকতার সাথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই দায়িত্বগ্রহণ করেছিলেন।
আমি যখনই চেম্বারে গিয়ে ওনার অ্যাসিসট্যান্টের মাধ্যমে খবর দিতাম, সাথে সাথে রোগী দেখা বন্ধ রাখতেন। আমি ভেতরে গিয়ে বলতাম, দাদা আমি আছি, রোগী দেখা শেষ করার পর আলাপ হবে।
সহযোদ্ধা কমরেড চন্দন দা আমার অগ্রজ ছিলেন, শুধু তা নয়, পরম বন্ধুও ছিলেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৪৫ বছরের সংগ্রামের সহযোদ্ধা ও এক বিশ্বস্ত বন্ধুকে হারালাম।
আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক, সাংস্কৃিতক ও প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে হাজারো মানুষের সাথে চলার সুযোগ হয়েছে, আদর্শিক নীতিনিষ্ঠ যে কয়জন কমরেডকে দেখেছি, তার মধ্যে কমরেড চন্দন দাশ প্রথম কাতারের একজন ছিলেন। একাধারে সৎ, নীতিতে অবিচল, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও বিনয়ী, নৈতিকতার কষ্টিপাথরে নিখাদ একজন কমিউনিস্ট ছিলেন।
এমন একজন বিপ্লবী সূর্য সন্তানকে হারিয়ে চট্টগ্রাম পার্টি তথা দেশের প্রগতির ও সংস্কৃতির সংগ্রামের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। আমরা জানি সময় ও ইতিহাস সামনের দিকে এগিয়ে যাবেই। এই শূন্যতাকে পূরণ করতে তার অনুসারী- সহযোদ্ধারা জোর কদমে এগিয়ে যাবে, এই প্রত্যাশা রাখি।
চন্দন দাশের স্বপ্নের ইতিহাস নির্ধারিত বিপ্লবী ধারার সংস্কৃতি ও সমাজ বদলের সংগ্রাম এগিয়ে যাবেই। কমরেড চন্দন দাশের উজ্জ্বল স্মৃতি আমাদের চেতনায় সর্বদা জাগ্রত থাকবে। রেড স্যালুট, কমরেড।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, সিপিবি, চট্টগ্রাম জেলা কমিটি