অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে কবে মুক্তি পাবে মানুষ?

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
দুই বছর সময়ের মধ্যে দেশে একে তিন তিনটি সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেছে। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি পাতানো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ যখন টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে, তখন দেশের অর্থনীতিতে চরম সঙ্কট চলছিল। শেখ হাসিনার সরকার ওই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোন পথও দেখাতে পারছিল না। অর্থনীতির সেই ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যেই ওই বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসন অবসানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সংস্কারের মাধ্যমে দেশে ইতিবাচক পরিবর্তনের আওয়াজ দিলেও দেড় বছরের শাসনে ইউনূস সরকার মানুষকে কোনো আশা দেখাতে পারেনি। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান সঙ্কট দূর করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনে চরম সঙ্কট নেমে এসেছে। ড. ইউনূস সরকারের আমলে দেশে নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দেয়। কাক্সিক্ষত মাত্রায় বিদেশি বিনিয়োগ না আসা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়। কর-জিডিপি অনুপাত (জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার) উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যা দেশের অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল করে তোলে। ব্যাংক খাতে চরম বিশৃঙ্খলা ও বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ অর্থনীতিকে চাপে ফেলে। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেনি। শুধু তাই নয়, অন্তর্বর্তীকালীণ সরকার এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা শুধু অর্থনৈতিকভাবেই পরনির্ভরশীলতা বাড়িয়ে তুলেনি সার্বিকভাবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও হুমকির মুখে ফেলেছে। জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনযোগ না দিয়ে দেশের গুরুত্ব¡পূর্ণ চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনার ভার বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে দেশের স্বার্থবিরোধী। সেইসঙ্গে ঋণের কিস্তি পাওয়ার জন্য তারা আইএমএফের সঙ্গে সমঝোতা করেছে। সেখানে ড. ইউনূসের সরকার যেসব শর্ত মেনে নিয়েছে সেগুলো আওয়ামী লীগের আমলে করা চুক্তির আওতাধীন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ড. ইউনূসের সরকার এসে ‘ফ্যাসিস্ট আমলের’ অনেক আইন-কানুন, বিধি-বিধান, সিদ্ধান্ত-উদ্যোগ বাতিল করে। কিন্তু আইএমএফের সঙ্গে দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থবিরোধী চুক্তির ক্ষেত্রে তারা শেখ হাসিনার পথেই হেঁটেছে। এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। ইতোমধ্যেই এই সরকার সাড়ে চার মাস পার করেছে। তবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এখনো ইতিবাচক কোনো পরিবর্তনের ধারা তৈরি করতে পারেনি। বরং জিনিসপত্রের দাম মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে। মূলত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেয়া মুনাফামুখী বাজার অর্থনীতিই বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনীতিতে চলমান সঙ্কটের মূল কারণ। অতীতে তাদের চাপিয়ে দেয়া নানা শর্ত মানতে গিয়ে একদিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বোঝা বেড়েছে, অন্যদিকে একের পর এক শিল্প কারখানা বন্ধ ও ছাঁটাইয়ের কারণে বেকার হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সঙ্কোচিত হয়ে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ইতোমধ্যে দেশে দেশে ব্যর্থ প্রমাণ হওয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেয়া নীতি থেকে সরে এসে যখন গণমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কার্যকর করা জরুরি, তখন বার বার তাদের শর্তের জালেই জড়িয়ে পড়ছে সরকার।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..