জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭
কার বাজেট, কার উন্নয়ন?
আরিফুল ইসলাম নাদিম
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট উত্থাপন করেছেন, তার শিরোনাম “গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা”। শ্রমজীবী মানুষের পক্ষ থেকে, বিশেষত ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক চালকদের অবস্থান থেকে এই বাজেটকে বিচার করলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে–এই বাজেট কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে? প্রতিদিন রাস্তায় নেমে জীবিকা নির্বাহ করা লক্ষ লক্ষ পরিবহন শ্রমিকের বাস্তব সংকটের কোনো প্রতিফলন উত্থাপিত বাজেটে আছে কি? বাজেটের পরিভাষা বা আবরণে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কথার্বার্তা থাকতে পারে, কিন্তু বাজেটটি কোন শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করছে সেটাই আসল কথা। সঙ্গতভাবেই এই প্রশ্নটি চলে আসে–“কার বাজেট, কার উন্নয়ন?”
ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী বাজেট বক্তৃতার প্রথম ছয়টি অধ্যায় মূলত ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী রাজনৈতিক বয়ান, সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক এবং মধ্যমেয়াদি কৌশলগত কাঠামো নিয়ে গঠিত। বাজেটে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের কথা আছে, কিন্তু পরিবহন খাতে শ্রমিকদের নির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দের কথা নেই। এটি অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি নয়–এই বাজেট প্রকৃতপক্ষে লুটেরা-ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী। যে বাজেট লুটেরা ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করে সেই বাজেটে শ্রমজীবী মানুষের কথা না থাকাটাই স্বাভাবিক।
বাজেটে “বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ”, “ব্যবসা সহজীকরণ” (ঊধংব ড়ভ উড়রহম ইঁংরহবংং), “ডিরেগুলেশন” শব্দগুলো বারবার এসেছে। কিন্তু এই ডিরেগুলেশনের সুফল কাদের জন্য? কোম্পানি নিবন্ধন ৪৮ ঘণ্টায়, লাইসেন্স অনুমোদন ৭ দিনে–এসব বিনিয়োগকারী, শিল্পপতি ও কর্পোরেট সংস্থার জন্য তৈরি। অথচ যে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক চালক রাস্তায় পুলিশি হয়রানি, চাঁদাবাজি, লাইসেন্সহীনতা ও আকস্মিক জব্দের শিকার হন প্রতিদিন, তার জন্য কোনো “৭ দিনের মধ্যে ভেকেল ও চালকের লাইসেন্স”-র প্রতিশ্রুতি নেই।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি : গরিবের ব্যাটারিচালিত যানবাহনের প্রতি দ্বিচারিতা বাজেটে ইলেকট্রিক গাড়ি (ঊঠ), ইলেকট্রিক বাস-ট্রাক, প্লাগ-ইন হাইব্রিডের জন্য বিস্তৃত শুল্ক-কর রেয়াত প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ লক্ষ লক্ষ ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইকের প্রসঙ্গ একেবারেই অনুপস্থিত। এই দ্বিচারিতা গুরুত্বপূর্ণ। যে ঊঠ বিত্তবান ক্রেতার জন্য তৈরি, তার আমদানি শুল্ক ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশে আনা হচ্ছে; কিন্তু যে ব্যাটারিচালিত যান শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার অবলম্বন এবং একইসঙ্গে নিম্নবিত্ত মানুষের সাশ্রয়ী গণপরিবহন, তার বিদ্যুৎ সরবরাহ, চার্জিং স্টেশন, ব্যাটারি প্রতিস্থাপন খরচ বা নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট নীতি নেই।বিদ্যুৎ খাতের আলোচনায় দেখা যায়, বিদ্যুতের মূল্য ও সরবরাহ সংকট অব্যাহত আছে এবং ক্যাপাসিটি চার্জের নামে লুটপাটের কথা স্বীকার করা হয়েছে, কিন্তু এই সংকট কীভাবে অসংগঠিত ব্যাটারিচালিত যান চালকদের চার্জিং খরচ ও আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে কোনো কথা নেই। প্রতিদিন ব্যাটারি চার্জের জন্য যে অতিরিক্ত অর্থ এই শ্রমিকদের গুনতে হয়, লোডশেডিং বা মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের প্রকৃত আয় যে সংকুচিত হয়, এই বাস্তবতা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
পরিবহন অবকাঠামোতে অগ্রাধিকার : কার জন্য রাস্তাযোগাযোগ অবকাঠামো খাতে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে–মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল সম্প্রসারণ। এই অবকাঠামো-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি মূলত গাড়িচালিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের চলাচল সুবিধার জন্য তৈরি। অথচ বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থায় ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান বহু বছর ধরে “অনিবন্ধিত” শ্রেণিতে আটকে আছে কোনো সুনির্দিষ্ট লেন, নিবন্ধন কাঠামো বা চলাচলের আইনি অধিকার ছাড়া। ফলে এই শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত পুলিশের জব্দ-তালিকা, জরিমানা ও স্থানীয় প্রশাসনের খামখেয়ালিপনার শিকার হন। বাজেটে “নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা” গড়ে তোলার কথা বলা হলেও, ব্যাটারিচালিত যানের জন্য কোনো আইনি স্বীকৃতি, মান নির্ধারণ বা নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার প্রতিশ্রুতি নেই। জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত যানবাহনের ওপর কর বৃদ্ধি করে পরিবেশবান্ধব বিকল্পে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলা হলেও, সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিবেশবান্ধব যান–ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান–সম্পূর্ণ অদৃশ্য থেকে যায়।
যানজট নিরসন, নগর পরিকল্পনা ও সার্ভিস লেন প্রশ্ন যানজট নিরসন প্রসঙ্গে বাজেটে ঢাকার রিং রোড, রেডিয়াল রোড এবং বিভিন্ন এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এসব পরিকল্পনায় ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইকের জন্য পৃথক সার্ভিস লেনের কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা নেই। বাস্তবতা হলো, যানজট নিরসনের নামে অনেক সময় এই ধীরগতির বাহনগুলোকেই মূল সড়ক থেকে নিষিদ্ধ বা উচ্ছেদ করা হয়, অথচ বিকল্প কোনো নিরাপদ লেন বা পথ, যানবাহন স্ট্যান্ড তৈরি করা হয় না। ফলে “নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুতগতির” সড়ক ব্যবস্থার যে স্বপ্ন বাজেটে দেখানো হয়েছে, তার মূল সুবিধাভোগী ব্যক্তিগত গাড়ি ও দ্রুতগতির যানবাহনের মালিকরা, আর বোঝা গিয়ে পড়ে রিকশা-ভ্যান চালকদের ওপর, যাদের জীবিকাই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। মেট্রোরেল ও ফিডার নেটওয়ার্কের কথা বলা হলেও এসব ব্যবস্থায় ব্যাটারিচালিত যানের সংযোগ বা সমন্বয়ের কোনো রূপরেখা অনুপস্থিত। মূল সমস্যাটি নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিভঙ্গিতেই নিহিত–বাজেটে নগর পরিকল্পনাকে সড়ক-সম্প্রসারণ ও যানবাহনের গতি বাড়ানোর প্রকৌশল সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে, বহুস্তর বিশিষ্ট ও বহু-গতির যানবাহনের সহাবস্থানের পরিকল্পনা হিসেবে নয়। যানজট সমস্যাকে শুধু অবকাঠামোগত প্রকৌশল সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে, শ্রেণিভিত্তিক পরিবহন বৈষম্যের সমস্যা হিসেবে নয়। প্রকৃত সমাধান হতে পারত শহরের প্রতিটি প্রধান সড়কে নির্দিষ্ট সার্ভিস লেন বরাদ্দ, যেখানে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক নিরাপদে ও আইনি স্বীকৃতি নিয়ে চলাচল করতে পারে, কিন্তু এই দাবি বাজেটে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
সামাজিক সুরক্ষা : প্রান্তিক শ্রমিকের জন্য কতটুকু? বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব আছে, যার মধ্যে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ফ্যামিলি কার্ড উল্লেখযোগ্য। কিন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিবহন শ্রমিকদের জন্য–যারা কোনো সাধারণত ট্রেড ইউনিয়ন স্বীকৃতি পায় না, কোনো শ্রম আইনের সুরক্ষা পায় না–তাদের জন্য আলাদা কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ঘোষণা নেই। বেসরকারি কর্মীদের জন্য সর্বজনীন পেনশন ফান্ডের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু রিকশা-ভ্যান চালকরা বাস্তবে এই কাঠামোর আওতায় আসবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। রাষ্ট্র যখন “জীবনচক্র ভিত্তিক সুরক্ষা বলয়” তৈরির কথা বলে, তখন তার লক্ষ্য মূলত লোকদেখানো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং সামাজিক অস্থিরতা প্রতিরোধ–শ্রমিক শ্রেণির ক্ষমতায়ন নয়। প্রকৃত শ্রেণি সংহতি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার বদলে এখানে দাতব্য ও করুণার ভাষায় “ভাতা” দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়, যা শ্রমিকদের নাগরিক অধিকারকে রাষ্ট্রীয় অনুগ্রহের বিষয়ে পরিণত করে।
কর কাঠামো : কার ওপর বোঝা, কার জন্য রেয়াত আয়কর প্রস্তাবে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মাসে প্রায় ৩১ হাজার ২৫০ টাকা আয়ের সমান। একজন ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইক চালকের দৈনিক আয় মাসিক হিসাবে এই সীমার অনেক নিচে থাকে বলে প্রত্যক্ষ আয়করের আওতায় তারা পড়েন না,এটি সত্য। কিন্তু পরোক্ষ করের বোঝা সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প বলে।বাজেটে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ওপর ০.২০ শতাংশ অগ্রিম কর সংগ্রহের প্রস্তাব আছে, যা “অতি নগণ্য” বলে দাবি করা হলেও, এই করের চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে পড়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর হ্রাসের ঘোষণা স্বস্তিদায়ক শোনালেও, প্রকৃত মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পূর্ববর্তী বছরগুলোর ১১.৬৬ শতাংশের তুলনায় শুনতে ভালো হলেও এখনও শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করবে।আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্যে “করভিত্তি সম্প্রসারণ” এর যে কৌশল নেওয়া হয়েছে, তা মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক করের জালে আনার প্রচেষ্টা। যেখানে তাদের আয়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ড নেই এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা বাধা আছে, সেখানে ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব, সেন্ট্রাল ডেটা ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে নাগরিকদের আর্থিক তথ্য সংযুক্ত করার পরিকল্পনা–এসব ভবিষ্যতে অসংগঠিত শ্রমিকদের ওপর প্রশাসনিক জটিলতা ও নজরদারি বাড়াতে পারে।
কর্পোরেট স্বার্থের প্রাধান্য : সরকারের শ্রেণি চরিত্রের স্পষ্ট প্রকাশ বাজেটে কর্পোরেট কর হার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব, ৬০ হাজার কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা যেখানে বড় কলকারখানা ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ, বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ, পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহ প্রদান—এসব নীতি স্পষ্টভাবে দেখায় বাজেটের অগ্রাধিকার কোথায়। ফ্রি ট্রেড জোন প্রতিষ্ঠা, অফশোর ব্যাংকিং, বিদেশি মালিকানার সীমা বিলোপ–এসব পুঁজির অবাধ চলাচল ও অধিক মুনাফার সুযোগ তৈরি করে। এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের শ্রেণিচরিত্রের প্রত্যক্ষ বহিঃপ্রকাশ। বাজেট বক্তৃতায় “অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি”, “বৈষম্যহীন উন্নয়ন” শব্দগুলো বহুবার উচ্চারিত হলেও, বাস্তব নীতি প্রণয়নে পুঁজি বিনিয়োগ, রপ্তানি বৃদ্ধি ও কর্পোরেট মুনাফাকেই কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। শ্রমিকের জন্য যা প্রতিশ্রুত হয়েছে, তা মূলত ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টি’র মাধ্যমে,অর্থাৎ পুঁজির সম্প্রসারণের উপজাত হিসেবে শ্রমিকের কল্যাণ আসবে এই বুর্জোয়া অর্থনৈতিক যুক্তি, যা প্রকৃতপক্ষে শ্রম শোষণের কাঠামোকেই অক্ষুণ্ন রাখে।
ঋণ ব্যবস্থা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি : সহজলভ্যতা প্রশ্ন বাজেটে নারী, তরুণ উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে এবং ব-খড়ধহ-এর মাধ্যমে পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত ডিজিটাল ঋণের সুবিধার ঘোষণা আছে। কিন্তু বাস্তবে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক ক্রয়ের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নেই। এই শ্রমিকরা সাধারণত মহাজনী ঋণ বা উচ্চ সুদের মাইক্রোফাইন্যান্সের ওপর নির্ভরশীল, যা তাদের দৈনিক আয়ের একটি বড় অংশ সুদ পরিশোধে চলে যায়। কৃষক কার্ডের মতো একটি সরাসরি নগদ সহায়তা কর্মসূচি কৃষকদের জন্য চালু হলেও, পরিবহন শ্রমিকদের জন্য সমতুল্য কোনো উদ্যোগ নেই, যদিও সংখ্যাগতভাবে এই খাত বিশাল কর্মসংস্থানের উৎস এবং নগর-গ্রামীণ অর্থনীতির সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শ্রম আইন ও সংগঠনের অধিকারবাজেটে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬ জারির কথা উল্লেখ আছে এবং কর্মক্ষেত্রে নারী নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিবহন শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার, সংগঠিত হওয়ার সুযোগ বা দরকষাকষির ক্ষমতা নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট নীতি নেই। এটি একটি মৌলিক ঘাটতি–শ্রমিকের প্রকৃত ক্ষমতায়ন আসে সংগঠিত শ্রেণি সংগ্রাম ও দরকষাকষির মাধ্যমে, রাষ্ট্রীয় দাতব্যের মাধ্যমে নয়।
উত্থাপিত বাজেট একটি শ্রেণি পক্ষপাতদুষ্ট দলিল সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট মূলত বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্পোরেট মুনাফা সুরক্ষা ও পুঁজিবাজার সম্প্রসারণের ওপর কেন্দ্রীভূত একটি নীতি দলিল। ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক চালকদের মতো বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী, যারা শহর ও গ্রামীণ অর্থনীতির সংযোগ রক্ষা করেন। দরিদ্র মানুষের সবচেয়ে সাশ্রয়ী চলাচলের মাধ্যম সরবরাহ করেন, তাদের জীবন-জীবিকা, আইনি স্বীকৃতি, নগর পরিকল্পনায় স্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও ক্ষমতায়নের প্রশ্ন এই বাজেটে প্রায় অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতি অসচেতনতাজনিত নয়; এটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা নীতির স্বাভাবিক ফলাফল, যেখানে নীতি প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় সংগঠিত পুঁজি ও কর্পোরেট স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব যতটা শক্তিশালী, শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব তার তুলনায় প্রায় নেই বললেই চলে। প্রকৃত শ্রমিক-কৃষক স্বার্থরক্ষাকারী বাজেট কাঠামো তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের শ্রেণিচরিত্র পরিবর্তিত হবে এবং উৎপাদন সম্পর্কের মৌলিক রূপান্তর ঘটবে–যা শুধু বাজেট সংস্কারের মাধ্যমে নয়, বরং সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে। এই বাজেট কার বাজেট, এই উন্নয়ন কার উন্নয়ন? প্রশ্নে তাই বলতে হয়–এই বাজেট ধনিক শ্রেণির বাজেট, এই উন্নয়ন লুটেরাদের উন্নয়ন।
লেখক: সংগঠক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, কেন্দ্রীয় কমিটি ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন