‘মিট দ্য কমরেডস’ : সাংগঠনিক সাক্ষাৎ ও প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি

জলি তালুকদার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

সারা দেশে ব্যাপক উৎসাহের সাথে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সিপিবির সাংগঠনিক কর্মসূচি ‘মিট দ্য কমরেডস’। এই কর্মসূচি মূলত তৃণমূল পর্যন্ত পার্টি সদস্যদের সাথে ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দের দেখা-সাক্ষাৎ। এই কার্যক্রম কমিটি সভা কিংবা কর্মীসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সব পর্যায়ে সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পার্টি সদস্যদের উদ্দেশে রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও সাংগঠনিক করণীয় বিষয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির চিঠি প্রকাশিত হয়েছে। সেই চিঠি নিয়েই কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সর্বত্র যাচ্ছেন। পার্টির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ শুধু জেলা বা থানা নয় একেবারে ইউনিয়ন পর্যায়েও ইতিমধ্যে পৌঁছেছেন। খুব আন্তরিক পরিবেশে কমরেডদের সাথে খোলামেলা আলাপ আলোচনা হচ্ছে। গত ত্রয়োদশ পার্টি কংগ্রেসের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী সময়ে পার্টির স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, সদস্য, কর্মী ও সমর্থকদের মনে জমে থাকা বহু বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। সমালোচনা-আত্মসমালোচনা ও পর্যালোচনাও হচ্ছে প্রচুর। এই নিবিড় ধরনের কর্মসূচিটি আমাদের সামনের দিনের রাজনৈতিক সংগ্রামকে জোরদার করবে এটাই এখন পর্যন্ত তলার কমরেডদের সাধারণ প্রতিক্রিয়া। রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক উভয় কারণেই ‘মিট দ্য কমরেডস’ কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশে আবারও নতুন দ্বিদলীয় ধারার সূচনা হয়েছে, যা একইসঙ্গে নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতি ও মৌলবাদী শক্তিকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। এই নতুন দ্বিদলীয় ধারার বিরুদ্ধে কী ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে, তার একটি রূপরেখা আমরা এই কর্মসূচির মাধ্যমে কমরেডদের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছি। নিঃসন্দেহে এ কর্মসূচির ধারাবাহিক ফলো-আপ অব্যাহত রাখতে হবে। পরবর্তী পর্যায়ে জেলা নেতৃত্বের উদ্যোগে শাখা পর্যায় পর্যন্ত এ ধরনের কর্মসূচি নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন। গত মে মাসে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সিপিবির সহস্রাধিক শাখার সকল পার্টি সদস্যকে ত্রয়োদশ কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে আরও সক্রিয় করে তোলা। আমরা আশা করছি জুন মাসের মধ্যেই সকল কমরেডের কাছে এ কর্মসূচির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বার্তা আমরা পৌঁছে দিতে সক্ষম হব। যেসব পার্টি সদস্য এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, তাঁদের সঙ্গে পরবর্তী পর্যায়ে জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করার উদ্যোগ নেবেন এটাই নির্দেশনা। ইতিমধ্যে দেশের প্রায় ২০০টির অধিক স্থানে ‘মিট দ্য কমরেডস’ কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে। সভা গুলোতে কমরেডরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিষয়ে আলোচনা অংশগ্রহণ করেছেন এবং মতামত দিয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কয়েকটি শাখা যৌথভাবে সভার আয়োজন করেছে। এছাড়া যেখানে উপজেলা বা থানা কমিটি রয়েছে, সেখানে একাধিক উপজেলা বা থানা কমিটি যৌথভাবে সাধারণ সভার আয়োজন করেছে। যেসব থানা ও উপজেলা কমিটির অধীনে শাখা ও সদস্যসংখ্যা বেশি, সেখানে সংশ্লিষ্ট কমিটির উদ্যোগেই পৃথক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কর্মসূচির ফলে সারাদেশে পার্টির সদস্য ও শাখাগুলোর মধ্যে কর্মতৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্মসূচির জন্য প্রস্তুত করা ‘রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক করণীয় সম্পর্কে সকল পার্টি সদস্যদের প্রতি কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বান’ শীর্ষক চিঠিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক। এর মাধ্যমে পার্টির প্রত্যেক সদস্য রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষেত্রে তাঁদের করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করবেন এবং সৃজনশীলভাবে নিজেদের কর্মক্ষমতাকে কাজে লাগাতে সক্ষম হবেন। স্থানীয় পার্টি সদস্যদের আলোচনা, প্রশ্ন, সমালোচনা, নানা বিষয়ে প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বক্তব্য সব মিলিয়ে সভাগুলো একেকটি কর্মশালায় পরিণত হয়েছে, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এমনই। বিশেষ করে, পার্টির ত্রয়োদশ কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নকে সামনে রেখে ‘নয়া যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের কাজ কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, তার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা এতে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যমান নানান বিভ্রান্তি ও তথ্যের ঘাটতি দূর করে এই বিষয়ে কমরেডদের স্পষ্ট ধারণা দেয়া সম্ভব হচ্ছে। কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক লাইন ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ‘নয়া যুক্তফ্রন্ট’ সম্পর্কে পার্টির সদস্যদের সঠিক ধারণা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি ও প্রাথমিক কাজ। এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের লড়াইয়ে রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে অপরাপর বামপন্থী, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি প্রগতিশীল গণসংগঠন, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, হরিজন-রবিদাসসহ দলিত সম্প্রদায়, সালাফি মতবাদ ও উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হাতে নিপীড়নের শিকার সুফিবাদী ও বাউল ধারার অনুসারী মানুষ, চা-জনগোষ্ঠীসহ সমাজের বিভিন্ন নিপীড়িত অংশ, ট্রেড ইউনিয়ন ও পেশাজীবী আন্দোলন ইত্যাদি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংগঠিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ‘মিট দ্যা কমরেডস’ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এ সকল রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক লক্ষ্য অভিমুখে কেন্দ্র থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কতটুকু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তার নিয়মিত মূল্যায়ন করা এবং পরিকল্পনাসমূহের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে একটি সুস্পষ্ট ফলো-আপ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। ইতিমধ্যে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা বিক্রি করে দেয়ার যে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে তা বাতিলের দাবিতে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছি। নতুন সরকারের প্রস্তাবিত প্রথম জাতীয় বাজেট প্রমান করে দিয়েছে, মুখে তারা যতই মধুর প্রতিশ্রুতি দিক না কেন, এই সরকারের পক্ষে আইএমএফ নির্ভর, গণবিরোধী অর্থনৈতিক নীতির বাইরে পথ চলা অসম্ভব। এখন ‘মিট দ্যা কমরেডস’ কর্মসূচির মাধ্যমে সারাদেশের কমরেডদের যে মতামত আমরা পেলাম, তার ভিত্তিতে জরুরি ও জনজীবন সংশ্লিষ্ট সব দাবিনামা আরও সুনির্দিষ্ট করে একটি শক্তিশালী জাতীয় আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে এই মুহূর্তে শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের দাবি এবং নারী ও শিশু ধর্ষণ ও নিপীড়নে বিরুদ্ধে শক্তিশালী লড়াই স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে গড়ে তোলা দরকার। এই সকল লড়াইকে একইসাথে রাজনৈতিক ক্ষমতা অভিমুখীও করতে হবে, এটাই সময়ের দাবি। এছাড়াও চলমান সভাগুলোতে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, স্থানীয় দাবি দাওয়ার আন্দোলন (খড়পধষ চধৎঃরধষ গড়াবসবহঃ), গণসংগঠন গড়ে তোলা, ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করা, কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন নারী গণসংগঠন প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গড়ে তোলার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর হতে জোরালো তাগিদ দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পার্টির বিকাশের জন্য সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়েও সভাগুলোতে বিশেষ গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হচ্ছে। দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এখনই সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পিত কর্মপন্থা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ‘মিট দ্য কমরেডস’ কর্মসূচির মাধ্যমে সারাদেশে কমরেডদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়া রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মতৎপরতার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। পার্টিকে শক্তিশালী করতে হলে সকল স্তরের কমরেডদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের যৌথতা নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হলে পার্টির প্রতিটি সদস্যের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আসুন, নতুন দ্বিদলীয় চক্কর থেকে দেশকে রক্ষা করি এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে আরও বেগবান করি। লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..