অবৈধ, অমানবিক পুশ ইন বন্ধ হোক সার্বভৌমত্বে ছাড় নয়
একতা প্রতিবেদক :
গত কয়েক মাস ধরে হামের সঙ্গে সবচেয়ে বেশিবার গণমাধ্যমে উচ্চারিত শব্দের নাম পুশ ইন। আরও অনেক কিছু এসেছে- রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলার ক্রমাবনতি, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টাদের জমিদারি খায়েশ অনেক অনেক কিছু। কিন্তু এদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে হামে শিশু মৃত্যু আর পুশ ইন।
এমন দুই জিনিস, যার শেষ যেমন দেখা যাচ্ছে না, সহ্যও করা যাচ্ছে না। অথচ গদিতে রাজনৈতিক সরকার বসা। যার আন্তরিকতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কোনো কথা ছিল না।
বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে বড় সীমান্ত অনুমিতভাবেই ভারতের। ৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি। এই দীর্ঘ সীমান্ত দিয়েই ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিশেষ করে গত দুই বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে তাদের ভাষায় ‘বাংলাদেশি নাগরিক’ ও কেনো কোনো ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জোরপূর্বক সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে। এটাই পুশ ইন। বাংলাদেশ এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।
আমাদের বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারত ২ হাজার ৪৭৯ জন মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছিল। তাদের মধ্যে ১২০ জন ভারতীয় নাগরিক এবং ৩৮ জন মিয়ানমারের নাগরিক ছিলেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসা সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জুন মাসের প্রথম ২৪ দিনেই ভারতের দিক থেকে প্রায় ২০টি পুশ ইন চেষ্টা হয়েছে, যাতে কয়েকশ মানুষকে ঠেলে পাঠানোর উদ্যোগ ছিল। এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল সংখ্যার খেলা নয়, এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও মর্যাদা।
গত ২৪ জুন, দিনাজপুরের সীমান্ত থেকে চার সদস্যের একটি পরিবারকে আটক করা হয়। স্থানীয়রা তাদের সন্দেহজনক চলাফেলা দেখে বিজিবিকে খবর দেয়। একই দিনে নওগাঁর সাপাহারে আরও নয়জনকে পুশ-ইন করার চেষ্টা বিজিবি আটকায়। এই মানুষগুলোকে প্রায়শই রাতের অন্ধকারে সীমান্তে নিয়ে আসা হয়। তাদের কাছ থেকে পরিচয়পত্র, টাকা ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। যাদের জাতীয়তা যাচাই করা যায় না, তারা প্রায়শই দুই দেশের মাঝখানে খালি জায়গায় দিনের পর দিন পড়ে থাকেন। সেখানে তাদের খাবার নেই, পানি নেই, চিকিৎসা নেই।
বিজিবি সূত্রে এও জানা গেছে, পুশ ইন হওয়া লোকেদের মধ্যে ২৪৭ জন রোহিঙ্গা রয়েছে, যাদের মধ্যে ১২৩ জন ভারতের জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ে নিবন্ধিত। স্বীকৃত শরণার্থীদের জোরপূর্বক পাঠানো আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যারা নিজ দেশ মিয়ানমারে নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন, তারা আশ্রয় পেয়েছিলেন ভারতে। কিন্তু সেই আশ্রয় কেড়ে নিয়ে তাদের আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
কেবল পুশ ইনই চলছে না, সীমান্তে সমানে গুলিও চলছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের গুলিতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই নিহত হয়েছেন কমপক্ষে আটজন। গত ১২ জুন, মৌলভীবাজার সীমান্তে মুজিব আলী নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে দিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের মাত্র ঘণ্টাখানেক পরে, যেখানে যৌথ বিবৃতিতে ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কী বৈপরীত্য?
তা পুশ ইন নিয়ে কারা কী বলছে। বাংলাদেশ একে অবৈধ, অমানবিক এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে যাচ্ছে। বিজিবির মহাপরিচালক নয়াদিল্লিতে ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে এই অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে এসেছে। বাংলাদেশের মূল যুক্তি হলো, তারা তাদের যেকোনো নাগরিককে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত, তবে তা হতে হবে জাতীয়তা যাচাই-বাছাই ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে সঠিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এর বাইরে একতরফাভাবে মানুষ ঠেলে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে কাকে প্রবেশ করতে দেবে এবং কীভাবে দেবে, তা নির্ধারণের এখতিয়ার তার। অথচ ভারত বাংলাদেশের সাথে কোনো ধরনের সমন্বয় করা ছাড়াই একতরফাভাবে মানুষকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দিচ্ছে, যা এক হিসেবে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন।
ভারতের ভাষ্য, তাদের এ পদক্ষেপ ‘অবৈধ বিদেশি প্রত্যাবাসনের’ অংশ। তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, অবৈধ বিদেশিদের মোকাবিলায় ভারতের আইন রয়েছে এবং তাদের দেশীয় আইন ও দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া অনুসারেই এ বিদেশিদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। নয়া দিল্লির অভিযোগ, তারা ২ হাজার ৮৬০ জনের বেশি সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকের তালিকা যাচাইয়ের জন্য ঢাকায় পাঠালেও তা দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। এই যাচাই প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণেই তারা পুশ ইনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এদিকে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী দাবি করছেন, তারা এরই মধ্যে প্রায় ৫ হাজার অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে দুই পক্ষের অবস্থানে সুস্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেলেও ভারতেরই সুপ্রিম কোর্ট আগে এমন অনেক ঘটনা পেয়েছে যেখানে ভারতীয় নাগরিকদেরই ভুলবশত বাংলাদেশি বলে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। কলকাতা হাইকোর্ট ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এই জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং যারা ভারতীয় নাগরিক ছিলেন তাদের ফেরত আনার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু তাদের আদালতের ওই রায়ও পুশ-ইন থামাতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখি, পুশ-ইন এমন এক প্রক্রিয়া যা ‘ফেরত না পাঠানোর নীতি’ এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের মতো মৌলিক নীতিগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক। মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১৪ নং ধারা অনুযায়ী প্রতিটি মানুষের অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়ার অধিকারও রয়েছে। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী অন্য দেশে ঢোকা প্রতিটি ব্যক্তির আইনি সুযোগ পাওয়ারও অধিকার রয়েছে। পুশ-ইন পদ্ধতিতে ব্যক্তিদের জাতীয়তা যাচাই, আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ বা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানার কোনো প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা হয় না। এটি নির্বিচার ও বৈষম্যমূলক আচরণ, যা মূলত ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে বলেই গণমাধ্যমের দেওয়া তথ্যে বোঝা যাচ্ছে।
এই সংকট কী এভাবেই চলতে থাকবে। কিছু পদক্ষেপ নিলেই সহজে এ বিরোধ ও সংকট মেটানো সম্ভব। প্রথমত, উভয় দেশকে অবশ্যই দ্বিপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ে একটি যৌথ ফোরাম গঠন করা যেতে পারে, যেখানে নিয়মিত আলোচনা হবে। দ্বিতীয়ত, ভারতকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি মেনে চলতে হবে। জাতীয়তা যাচাই না করে বা আইনি প্রক্রিয়া না মেনে কাউকে ফেরত পাঠানো উচিত নয়। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক ফোরামে এই বিষয়টি তুলতে পারে, বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের বিষয়টি। চতুর্থত, বাংলাদেশকে অবশ্যই সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে হবে এবং বিজিবির মাধ্যমে সঠিকভাবে পরিচয় যাচাই করতে হবে। পঞ্চমত, অভিবাসনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে মানবিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক দেশই সীমান্ত সমস্যা সমাধানে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে কাজ করে, যেখানে আইনি প্রক্রিয়া ও মানবিক দিক দুটোকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পুশ ইন কেবল একটি সীমান্ত সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও দু’দেশের সম্পর্কের একটি গুরুতর পরীক্ষা। এই অনুশীলন আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক মূল্যবোধের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মানজনক। রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা নিজ দেশ মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তারা ভারতে আশ্রয় পেয়েছিলেন; কিন্তু সেই আশ্রয় কেড়ে নিয়ে তাদের আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
ভারতের উচিত শনাক্ত, মুছে ফেলো ও নির্বাসন দাও-এই নীতির পরিবর্তে শনাক্ত, যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত-এই নীতি অনুসরণ করা। আদালতের রায় অমান্য করে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পুশ-ইন চালিয়ে যাওয়া কোনো দেশের জন্যই গ্রহণযোগ্য নয়। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, আইনের শাসন ও মানবিক মূল্যবোধ। পুশ ইন এই ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ভারত যদি সত্যিই আইনের শাসনে বিশ্বাস করে এবং প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক চায়, তবে তাদের উচিত তাৎক্ষণিকভাবে এই পুশ ইন বন্ধ করা এবং বাংলাদেশের সাথে সমন্বয় করে আইনি প্রক্রিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা।
দুই দেশের মধ্যে যদি সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়, তবে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। বাংলাদেশ বারবার বলেছে, তারা যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিককে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত, তবে তা আইনি প্রক্রিয়ায়। ভারতেরও উচিত সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়া। যতদিন না এই পুশ ইন বন্ধ হচ্ছে, ততদিন আইন ও মানবতা উভয়ই আটকা পড়ে থাকবে দুই দেশের শূন্য রেখায়, যেখানে কেউ তাদের দায়িত্ব নিতে চায় না, কিন্তু ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই অবৈধ, অমানবিক পুশ ইন বন্ধ হোক। উভয় দেশই মানবিক মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক আইনকে প্রাধান্য দিক।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন