হাওরের পারে পারে কাঁদছে কৃষক

জুয়েল বিশ্বাস

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
হাওর অধ্যুষিত তিনটি জেলা নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের কৃষকের সারা বছরের স্বপ্ন বোরো ধান তলিয়ে গেছে কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে। ধান হারিয়ে অসহায় কৃষকের ঘরে ঘরে দেখা দিয়েছে হাহাকার। কৃষক বধূর বোবা কান্নায় ভিজছে শাঁড়ির আঁচল। ভবিষ্যতের চিন্তায় দুই চোখে অন্ধকার দেখছেন তারা। এক ফসলি এই বোরো ধান হারানোর ফলে তাদের মধ্যে যেমন খাদ্য সংকট দেখা দিবে; তেমনি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া। খড়ের অভাবে পানির দরে বিক্রি করে দিতে হবে গরু-বাছুর। বিভিন্ন এনজিও ও দাদনের ঋণ শোধ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হবে তাদের। এরই মধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে তিনটি জেলায় মোট ১৯ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তবে কৃষকদের দাবি এর পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। এই তিনটি জেলার মধ্যে নেত্রকোনার হাওর অধ্যুষিত পাঁচ উপজেলা মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুড়ি, আটপাড়া ও কলমাকান্দায় তিন হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। তবে কৃষকদের দাবি এর পরিমাণ অন্তত পাঁচ হাজার হেক্টর হবে। গত ১ মে নেত্রকোনা উপজেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার সুয়াইর ইউনিয়নের ডিঙ্গাপোতা হাওরের মল্লিকপুর এলাকা সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, টানা তিনদিনের বৃষ্টির পর রোদ উঠলেও পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কৃষক। কেউ কেউ শেষ ভরসা হিসেবে তলিয়ে যাওয়া আধাপাকা ধান কেটে নৌকায় তুলছেন। কৃষক রতন সরকার বলেন, ‘টানা তিন-চার দিনের বৃষ্টিতে আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। যদিও এ ধান কোনো কাজে আসবে না, তবু কষ্ট করে নিয়ে যাচ্ছি।’ মোহনগঞ্জ উপজেলার করচাপুর গ্রামের কৃষকবধূ জ্যোৎস্না সরকার বলেন, “ডিঙ্গাপোতা হাওরে আমার স্বামী প্রায় ২০ কাঠা জমিতে বোরো ধান চাষ করছিল। খরচার সবটা টাকাই লগ্নি করে আনছে। ধান তুলে পরিশোধ করার কথা। কিন্তু শেষ নাগাদ যে পরিমাণ ধান আধা পাকা তুলে আনতে পারছে, তা দিয়ে দুই মাসের খোরাকই হবে না। শোধের টাকা কই থেকে দিব।” মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক ক্ষিতিশ দেবনাথ বলেন, “আমার গোয়াল ঘরে পাঁচটি গাইগরু আছে। প্রায় এক আড়া জমিতে ধান চাষ করছিলাম। ধানতো দূরের কথা এক মুইট খেরও (খড়) আনতে পারিনি। বাইষ্যা মাসে খের ছাড়া গরু পালন সম্ভব নয়। তাই শেষ পর্যন্ত গরুগুলো বেইচ্ছাই দিতে অইব পানির দামে।” খালিয়াজুড়ি উপজেলার নগর গ্রামের বাসিন্দা আকতার আকন্দ বলেন, “হাওর ১০ কাটা জমিতে ধান চাষ করছিলাম। সব ধানেই পানির তলে গেছে। এবার খোরাকতো নাইই। আমার চার সন্তানের লেহাপড়াও বন্ধ অইব।” নেত্রকোণা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত হাওরের ৬৮ ভাগ বোরো ফসল কাটা হয়েছে। মাইকিং করে ডুবন্ত ধান কাটার জন্য কৃষকদের বলা হচ্ছে। তবে উপরের জমির ধানের কোনো ক্ষতি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। গত ২৬ এপ্রিল টানা বৃষ্টিপাত শুরু হলে হাওরের পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। এ সময় পানি কম থাকলেও শ্রমিক সংকটে ধান কেটে আনা সম্ভব হয়নি। বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত শুরু হলে পাঁচদিনে আট কৃষক নিহত হওয়ায় হাওরে বজ্রপাত আতঙ্ক শুরু হয়। ফলে টানা বৃষ্টিপাতে সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার হাওরে বেশির ভাগ ধান ডুবে গেছে। পানির নিচে থাকা সে ধান কেটে আনতে পারেননি কৃষক। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, জেলার ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে জামালগঞ্জ, মধ্যনগর, ধর্মপাশাসহ বিভিন্ন উপজেলার হাওরে ৯ হাজার ৫৭ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে। এদিকে কিশোরগঞ্জ জেলার ইঠনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন হাওরে টানা বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২১ হাজার কৃষক। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, মাঠপর্যায়ের তথ্যমতে ১ মে পর্যন্ত ছয় হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমি পানির নিচে রয়েছে। এর মধ্যে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..