মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থিদের অবদান

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

[তৃতীয় অংশ] (দ্বিতীয় অংশ একতা ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের ২১তম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে) একাত্তরের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতের মিত্র বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর কাছে একাত্তরের ২৬ মার্চ এই হানাদার শক্তি নির্শতভাবে আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত ৯ মাস ধরে এই যুদ্ধ চলেছিল। এই ৯ মাসজুড়ে সামরিক কর্মকাণ্ডই ছিল প্রধান কাজ। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি রচনার দীর্ঘকালীন সংগ্রামের ক্ষেত্রে যেমন, এক্ষেত্রেও তেমনি, দেশের কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা কৃতিত্বপূর্ণ ও গৌরবদীপ্ত ভূমিকা পালন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন অস্থায়ী সরকারের অধীনে। সেই সরকারে ন্যাপ বা কমিউনিস্ট পার্টির কোনো স্থান ছিল না। মুক্তি সংগ্রামে নিয়োজিত সব শক্তির সমন্বয়ে ‘জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট’ ও ‘সর্বদলীয় বিপ্লবী সরকার’ গঠনের জন্য ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি আহ্বান জানিয়েছিল আওয়ামী লীগ তা অগ্রাহ্য করেছিল। পরবর্তীতে, নানা বিবেচনায় তিন বামপন্থীদের নেতা মওলানা ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদকে অস্থায়ী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আওয়ামী লীগ তার শ্রেণিগত স্বার্থেই বামপন্থীদের শক্তির বিপুল সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার না করে একা চলার সংকীর্ণ পথ প্রস্থান করেছিল। এ ধরনের সমস্যা সত্ত্বেও মে মাসে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন ‘বিশেষ গেরিলা বাহিনী’ গঠন করেছিল। অন্যদিকে, শুরু থেকেই প্রবাসী সরকার ও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ঐক্য ও সংহতির ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। জুলাই মাসে গঠিত বিএলএফ বা মুজিববাহিনী তাজউদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত প্রবাসী সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা ও জোট পাকাতে শুরু করেছিল। এসময় নাজুক অবস্থায় পারষ্পরিক মনোমালিন্য ও বিরোধ দূর করে মুক্তিযুদ্ধে শরিক সমস্ত শক্তিকে একত্র রাখতে কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ প্রভৃতি বামপন্থী দলগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। সেক্টর কমান্ডার ও তাদের অধীনস্থ বাহিনীর সাথে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভুল বুঝাবুঝি ও দ্বন্দ্ব নিরসনেও তারা সচেষ্ট হয়েছিল। অক্টোবর মাসে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধের ঐক্য সমুন্নত রেখে যুদ্ধ প্রয়াস জোরদার করার জন্য যৌথভাবে একটি ঘোষণা ও আহ্বান প্রকাশ করেছিল। একই সময়ে এফএফ, বিএলএফ, বিশেষ গেরিলা বাহিনী প্রভৃতি পৃথক পৃথক গেরিলা যোদ্ধা দলের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলার একটা কাঠামোগত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি অংশ আমেরিকার সাথে দহরম-মহরম শুরু করেছিল। তাদের মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের সাথে ‘কনফেডারেশন’ গঠনের মাধ্যমে ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’র বিশ্বাসঘাতকতামূলক ষড়যন্ত্রেও তারা তৎপর হয়েছিল। কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দৃঢ় সংগ্রাম চালিয়েছিল। আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহযোগিতা সংগ্রহের ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টি ছিল একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া পূর্বাপর সমস্ত ঘটনাবলী ব্যাখ্যা করে বিশ্বের সব কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর কাছে তারা একটি বিশেষ চিঠি পাঠিয়েছিল। জাতিসংঘে, বিশ্বশান্তি পরিষদের সম্মেলনে, সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহে, বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের বিভিন্ন দেশে তারা প্রতিনিধি দল ও বিশেষ বার্তা প্রেরণ করেছিল। তাদের প্রচেষ্টায় একথা পরিষ্কার করা সম্ভব হয়েছিল যে, ‘পূর্ব পাকিস্তানে’ যা ঘটছে, তা সাম্রাজ্যবাদ অথবা স্থানীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের প্ররোচিত কোন ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’ নয়। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্বব্যাপী প্রগতিবাদী শক্তির সংহতি ও সমর্থন শক্তিশালী করা সম্ভব হয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল, যা ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যকে অনুকূল করার ক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এই মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের পর, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র সরবরাহের পরিমাণ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এফ এফ বাহিনী ও গেরিলা বাহিনীর ইনডাকশন ও সশস্ত্র এ্যাকশন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বামপন্থীরা সাহসের সাথে ‘নন-কমব্যাটাল্ট কাজগুলোও এগিয়ে নিয়েছিল কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা দেশের অভ্যন্তরে শক্তিশালী সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছিল। মুক্ত এলাকা ছাড়াও শত্রু প্রভাবিত এলাকাতেও তারা যোগাযোগের কেন্দ্র বজায় রাখতে সচেষ্ট হয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টি তার শক্তির যে অংশকে দেশেই রেখে গিয়েছিল, শত্রু অধিকৃত ভয়ঙ্কর বিপদজনক পরিস্থিতির মধ্যে বাস করে হলেও তারা সারা দেশে যোগাযোগের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছিল। পরবর্তীকালে প্রশিক্ষিত গেরিলা দলগুলো দেশে প্রবেশ করার পর তারাই সেই যোদ্ধাদের আশ্রয় ও অন্যান্য তৎপরতায় সহায়তা প্রদানের একটি প্রধান অবলম্বন রূপে কাজ করতে সক্ষম হয়েছিল। দেশের মুক্তাঞ্চলগুলোতে জনগণের মাঝে কিভাবে কাজ করতে হবে কমিউনিস্ট পার্টি সে নির্দেশনাসমূহ ‘ইশতেহার’ আকারে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছিল। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নামে একটি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ভারতের জনগণকে দৃঢ়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আনতে। ‘মুক্তির গানে’র দল পরিচালনায়, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কার্যক্রম ও অনুষ্ঠানমালা প্রচারে, স্বাধীন দেশের জন্য ভবিষ্যত পরিকল্পনার রূপরেখা প্রণয়নে– এরূপ বহুমাত্রিক গুরুত্বপূর্ণ সব কাজে বামপন্থী চিন্তাধারার ব্যক্তি ও শক্তি প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছিল। ৯ মাসের প্রধান কর্মকাণ্ড তথা প্রত্যক্ষ সশস্ত্র একশনের ক্ষেত্রেও বামপন্থীদের অবদান ছিল বলতে গেলে বিশাল। প্রথম দিন থেকেই দেশের ভেতরে যেখানে যতোটা সম্ভব সেই মতো সশস্ত্র প্রতিরোধের চেষ্টায় তারা নিয়োজিত হয়েছিল। যেখানেই সম্ভব সেখানেই পুলিশ, ইপিআর, বেঙল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সদস্যদের সহায়তায় তারা সক্রিয় হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব প্রাথমিক প্রতিরোধ প্রক্রিয়াই পরবর্তীতে শক্তিশালী স্থানীয় বাহিনীর দুর্জয় শক্তি হিসাবে গড়ে উঠেছিল। এপ্রিল-মে মাসে তরিৎভাবে স্বল্প প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত যে ‘মুক্তিবাহিনী’ গঠন করা হয়েছিল। তাতে বামপন্থী তরুণ কর্মীরা দলে দলে যোগ দিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। পরে সেক্টর কমান্ডারদের অধীনে এফএফ (ফ্রিডম ফাইটার) বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। এই বাহিনীতে বামপন্থীদের প্রবেশের পথে নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। অনেক সময় তাদের জীবনের ওপর হুমকিও সৃষ্টি হতো। এসব বাধা অতিক্রম করে বামপন্থী তরুণরা নানা কায়দায় এফএফ বাহিনীতে যোগ দিয়ে বীরত্বের সাথে লড়াই করেছিল। ঢাকার দুর্ধর্ষ ক্র্যাক প্লাটুনের দুঃসাহসী অভিযানগুলোসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ঐতিহাসিক সাহসী অপারেশনগুলোতে বামপন্থী তরুণরা তাদের সাহস, দেশপ্রেম, দক্ষতা ও নিষ্ঠার প্রমাণ রেখেছিল। মেরিন গেরিলা বাহিনীর বিভিন্ন অপারেশনে বামপন্থীরা অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়ে বিপুল গৌরব অর্জন করেছিল। সদ্য গড়ে ওঠা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীতেও তারা কৃতিত্বের সাথে অংশ গ্রহণ করেছিল। এসব বাহিনী ছাড়াও, কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীসহ দেশের ভেতরে স্থানীয়ভাবে ট্রেনিং দিয়ে গড়ে তোলা বিভিন্ন আঞ্চলিক বাহিনীতে বামপন্থী চিন্তার তরুণদের অবদান ছিল প্রশংসাযোগ্য। ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ ও মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করতে সক্ষম ও আগ্রহী বামপন্থী তরুণ কর্মীদের জন্য অনেকগুলো ‘ইউথ ক্যাম্প’ স্থাপন করা হয়েছিল। ৩/৪ মাসের মধ্যে এসব ক্যাম্পে সমবেত হয়েছিল ২৫/৩০ হাজার তরুণ। তাদের জন্য সেখানে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রাথমিক ধরনের সামরিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখান থেকে বাছাই করে ‘বিশেষ গেরিলা বাহিনীতে’ রিক্রুটমেন্ট করা হতো এবং সুযোগ পেলে অনেককে এফএফ বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীতে যোগ দিতে সহায়তা করা হতো। তার পর পরেই একসময় আওয়ামী ঘরানার ক্যাডারদের নিয়ে বিএলএফ (‘মুজিব বাহিনী’ নামে অধিক পরিচিত) গঠন করা হয়েছিল। আসামের তেজপুরের নিকটবর্তী সালোনবাড়ি নামক স্থানে একটি বিশেষ ক্যাম্প স্থাপন করে মে মাসের ২৮ তারিখে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের ‘বিশেষ গেরিলা বাহিনী’র প্রথম ব্যাচের ২০০ জনের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। চার সপ্তাহ পরে এদের মধ্য থেকে ৫০ জনকে বিশেষ ট্রেনিং-এর জন্য নেফা এলাকার ভালুকপং-এর নিকটস্থ একটি দুর্গম ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সমস্ত ট্রেনিং কার্যক্রম ছিল দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধের কায়দা-কৌশলভিত্তিক। সবাইকে রাইফেল, স্টেনগান, এলএমজি, মর্টার প্রভৃতি অস্ত্র সম্পর্কে ট্রেনিং, ফায়ারিং প্র্যাক্টিস, ফিল্ড ক্র্যাফট, বুবি ট্র্যাপ, ডিসেপশন, অপারেশন প্ল্যানিং, রেইড, এমবুশ, ক্যামেফ্লেজ, ডেমোলিশন, গ্রেনেড থ্রোইং ইত্যাদি বিষয়ে নিবিড় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এদের থেকে বাছাই করা ৫০ জনকে নিয়ে এলাকায় নিয়ে সপ্তাহের স্পেশাল ট্রেনিং দেয়া হয়। সেখানে ভেহিকুলার এ্যামবুশ, ফুট এ্যামবুশ, গ্রুপ মুভমেন্ট, এয়ার রেইড, এয়ার রিসেপশন, আরসন, উন্নততর মর্টার, উন্নততর ডেমোলিশন ইত্যাদি বিষয়ে হাতে নাতে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ১১ জুলাই মোট ৬ সপ্তাহের প্রশিক্ষণ শেষ হয়। ২০০ জনের প্রথম ব্যাচে খুবই আকর্ষণীয় ক্রেডেন্সিয়ালসম্পন্ন ব্যক্তিরা ছিলেন। প্রশিক্ষণে তাদের উচ্চমান দেখে পরবর্তী ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থীদের সংখ্যা ডবল করে ৪০০ করা হয়েছিল। এভাবে তৃতীয় এবং চতুর্থ ব্যাচেরও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছিল। ট্রেনিং শেষে ‘বিশেষ গেরিলা বাহিনী’ ত্রিপুরার বাইকোরার একটি নির্জন স্থানে তাদের ‘বেইস ক্যাম্প’ স্থাপন করেছিল। এখান থেকে ‘অপারেশন প্ল্যানিং কমিটি’র পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে গেরিলাদের দেশের ভেতর প্রেরণ করা ‘ইনডাকশনে’র কার্যক্রম ও গেরিলা অপারেশনসহ সামরিক তৎপরতা চলতে থাকে। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ইনডাকশন শুরু হয়। কষ্টসাধ্য ক্যামোফ্লেজ সহযোগে প্রচুর অস্ত্র, গোলা-বারুদ, গ্রেনেড, একএপ্লাসিভ ইত্যাদিসহ ছোট ছোট গেরিলা গ্রুপ একে একে তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে থাকে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে ছোট ছোট অপারেশন শুরু হয়ে যায়। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে অপারেশনের সংখ্যা ও কার্যকারিতাক্রমে বাড়তে থাকে। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে একথা ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে উঠতে থাকে যে যুদ্ধ হয়তো তেমন একটা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বড় রকম শো-ডাউন আসন্ন। এই অবস্থায় অপারেশনের মাত্রা আরো জোরদার করার জন্য সব গেরিলা ইউনিটগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়। সেই অনুযায়ী এ্যাকশনের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়তে থাকে। দখলদার বাহিনী ও তাদের ‘কোলাবোরেটরদের’ বিরুদ্ধে তীব্রতর হতে থাকে। মুক্ত এলাকার বিস্তৃতি ঘটে। যেসব এলাকায় বিশেষ গেরিলা বাহিনীর উল্লেখযোগ্য একশন পরিচালিত হয় সেসবের মধ্যে কয়েকটি হলো– রায়পুরা, মনোহরদী, শিবপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বৃহত্তর বরিশাল প্রভৃতি। ১১ই নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধের সুমহান গৌরবগাঁথায় যুক্ত হয়েছিল একটি উজ্জ্বল রত্নকণিকা। দেশপ্রেম ও সাহসের রক্তিম আল্পনায় আত্মদানের এক অমর অধ্যায় রচিত হয়েছিল কুমিল্লার বেতিয়ারায়। ‘বিশেষ গেরিলা বাহিনী’র একটি সশস্ত্র যোদ্ধা দলের সাথে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর একটি তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা অনেকটাই ‘হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাট’-এর মতো মুখোমুখি সেই যুদ্ধে গেরিলা দলের বীর যোদ্ধা কমরেড আজাদ, মুনীর, বশির, দুদু মিয়া, সহিদুল্লা, আওলাদ, কাইউম, সফিউল্লা ও কাদের–এই ৯ জন শহীদ হয়েছিলেন। অমৃতের এই বীর সন্তানেরা সেদিন বেতিয়ারার শ্যামল মাটিতে বুকের রক্ত ঢেলে এক অমর বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস রচনা করেছিলেন। নভেম্বরের শেষ দিকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে যুদ্ধ তার চূড়ান্ত পর্বে চলে এসেছে। তখন সব গেরিলা ইউনিটকে তখন এই মর্মে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, পাকিস্তানি সেনারা যেন ক্যাম্পের বাইরে মুভমেন্ট করতে না পারে সেজন্য বিশেষ মনোযোগ দিয়ে তাদেরকে অপারেশনের পরিকল্পনা করতে হবে। সেই সাথে, গেরিলা কায়দা অনুসরণের বদলে যুদ্ধের কনভেনশনাল কলাকৌশল অবলম্বন করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। আরো পরে, সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে সব ইউনিটকে যতো দ্রুত সম্ভব ঢাকার কাছাকাছি পৌঁছে ঢাকাকে ঘেরাও-এর মধ্যে চেপে রাখতে বলা হয়েছিল। সে অনুযায়ী, ট্রেনিংপ্রাপ্ত যে কয়েক শ’ গেরিলা দল নিয়ে অনেকটা ফোর্সড-মার্চের কায়দায় অতি দ্রুত ঢাকার দক্ষিণাঞ্চলে এসে সাময়িক ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছিল। ১৩ ডিসেম্বরের মধ্যে ‘বিশেষ গেরিলা বাহিনী’র শত-শত যোদ্ধা দোহার, নবাবগঞ্জ, শ্রীনগর, গজারিয়া ইত্যাদি এলাকায় জমায়েত হয়ে ঢাকা অভিমুখে অগ্রসর হয়েছিল। ১৪ ডিসেম্বর অস্ত্রসজ্জিত ও সমর-সম্ভারসহ গেরিলা দলের ঢাকায় প্রবেশের অভিযান শুরু হয়েছিল। গেরিলা ইউনিটগুলো ঢাকা শহরের কেন্দ্রে পৌঁছার আগেই ১৬ ডিসেম্বর হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। পরদিন ১৭ ডিসেম্বর রাজধানীর উপকণ্ঠে থাকা ‘বিশেষ গেরিলা বাহিনী’র এই বড় দলটি রাতে ভোর হওয়ার আগেই মার্চ শুরু করে সকালের মধ্যে ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে গিয়েছিল। বিধ্বস্ত শত্রুমুক্ত ঢাকা শহরে প্রথম প্রবেশ করা শহীদ মিনারে রাইফেল উঁচিয়ে শপথ নেয়ার যে ছবিটি দেশ-বিদেশে বহুল প্রচারিত, তা ছিল ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের এই ‘বিশেষ গেরিলা বাহিনী’র।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..