হাওরের মানুষের বাঁচার পথ কী?

জলি তালুকদার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
হাওর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদে ভরপুর। কিন্তু সেই হাওরের মানুষের বাঁচার সংগ্রাম চলে নিরন্তর। ছয় ঋতুর অপরূপ রূপবৈচিত্র বারবার বদলে দেয় হাওরের চেহারা। প্রকৃতি যেন দু’হাত ভরে হাওরকে সাজিয়ে রাখে। আবার সেই প্রকৃতির বিরুদ্ধেই হাওরের মানুষকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম চালিয়ে বাঁচতে হয়। অন্যদিকে হাওরের ধ্বংসযজ্ঞের মত্ত এক শ্রেণির লোভী ও ভোগবাদী কায়েমি গোষ্ঠীর সৃষ্ট দুর্যোগের বিরুদ্ধেও প্রতিনিয়ত লড়াই চালাতে হয় হাওরের মানুষদের। হাওর এলাকায় দেশের মোট ধানের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ উৎপাদিত হয়। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা এখানকার সাহসী ও সংগ্রামী মানুষগুলো সারা দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান দেয়। অথচ যারা মানুষের খাবারের জোগান দেয়, সেই কৃষকের মরা-বাঁচার প্রশ্নে কথা বলার মানুষ খুব কম। এবারের হাওর বিপর্যয়ের পর সেখানকার কৃষকেরা অনাহার ও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা নিয়ে দিন গুনছে। আসলে পুরো হাওরাঞ্চল যেন এক নীরব দুর্ভিক্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই কৃষিতে কর্পোরেটের থাবা, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে গৃহীত নীতির কারণে কৃষকের জীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিদ্যমান এই ব্যবস্থা কৃষককে সর্বস্বান্ত করে ফেলেছে। তার ওপর কৃষকের উৎপাদিত ফসলের দামের চেয়ে উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। এ রকম এক পরিস্থিতিতে এবার পুরো হাওর এলাকার ধান পানির নিচে তলিয়ে গেল। আমাদের চোখের সামনেই যেন ভাটি এলাকার কৃষক ও কৃষি ব্যবস্থাকে গলা টিপে ধ্বংস করা হয়েছে। বিএডিসির সরবরাহ করা নিম্নমানের বীজের কারণে চাষাবাদ ২৩ দিন পিছিয়ে যায়। ফলে এবার ধান কাটার আগেই পুরো ফসল পানির নিচে চলে গেছে। উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে চৈত্র মাসের শেষ ও বৈশাখের প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই কৃষকেরা ধান কাটা প্রায় শেষ করেছিল। অথচ এবার বৈশাখের শেষে এসেও ধান কাটার মতো উপযুক্ত হয়নি। অত্যন্ত দু:খের বিষয় হলো হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য মাথায় রেখে উপযোগী ধান গবেষণা ও বীজ সরবরাহ করা হয় না। বীজের কর্পোরেট বাণিজ্য কৃষকের বীজ সংরক্ষণের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে এবং কৃষককে করেছে সর্বস্বান্ত। অন্যদিকে, বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে দুর্নীতির কারণে হাওরে জমে থাকা বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেতে পারেনি। ফলে পানিতে ডুবে ধানগাছ পচে গেছে। এর ফলে শুধু মানুষের খাদ্য সংকটই নয়, গবাদিপশুর খাবারেরও তীব্র সংকট দেখা দেবে। এর আগে আমরা দেখেছি, আগাম বন্যায় ধানগাছ পচে তৈরি হওয়া অ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে মাছ, হাঁসসহ অসংখ্য জলজ প্রাণী মারা যায়। এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে তিন মাসের ক্ষতিপূরণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই বরাদ্দ কৃষকের হাতে পৌঁছালেও তা দিয়ে কৃষকের জীবন নির্বাহ করা কঠিন। অথচ যেসব কার্যকর পদক্ষেপ নিলে হাওরের মানুষের বাঁচার পথ তৈরি হতে পারে, সেসব বিষয়ে সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে। হাওরের মানুষের অভিজ্ঞতা হলো প্রকৃতি কখনো একসঙ্গে সবকিছু কেড়ে নেয় না। কিন্তু মানুষের তৈরি করা বিপর্যয় হাওরের সহজ-সরল মানুষগুলো কীভাবে মোকাবিলা করবে? যাদের বাঁধ রক্ষার দায়িত্ব ছিল, তারা বরাদ্দের টাকা লুটপাট করেছে। হাওরগুলো আজ পানি উন্নয়ন বোর্ড, ফসল রক্ষা বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি), দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা, অসৎ ঠিকাদার, লুটেরা জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এই লুটপাটই এবারের অকাল বন্যার অন্যতম কারণ। এছাড়া নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, পাহাড়ে অতিরিক্ত গাছ কাটা এবং পাথর অপসারণের ফলে পাহাড়ি ঢলের পানি অসময়ে সরাসরি হাওরে নেমে আসে। এবারের বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সাধারণভাবে জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক পর্যন্ত ছয় মাস হাওরে পানি থাকে, আর অগ্রহায়ণ থেকে বৈশাখ পর্যন্ত সময় থাকে শুকনো। অথচ এবার যে সময় হাওর শুকনো থাকার কথা, সেই সময়েও হাওরে পানি রয়ে গেছে। চাষাবাদ শুরু করতেও দেরি হয়েছে।এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করে কৃষক পেয়েছে শুধু “নয়নভাগা”। পাকা ধান যখন পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন অসহায়ের মতো সেই দৃশ্য দেখা ছাড়া কৃষকের আর কিছুই করার থাকে না। গভীর কষ্টবোধ থেকেই কেউ এই অবস্থার নাম দিয়েছিল “নয়নভাগা”। এবার হাওরের নিঃস্ব কৃষকের সেই নয়নভাগা বহুগুণ বেড়েছে। হাওরের মাছ এদেশের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ করে। অথচ যাদের জমির ওপর হাওর গড়ে উঠেছে, তাদেরই সেখানে মাছ ধরার অধিকার বহুদিন ধরে নেই। এবার মাছ ধরে বিক্রি করতে না পারলে সাধারণ মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। হাওরের উন্মুক্ত পানিতে মাছ ধরার সুযোগ পায় না ভাটি এলাকার মানুষ। ইজারাদারদের দৌরাত্ম্যের কাছে সাধারণ মানুষ সত্যিই অসহায়। তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে মানুষের। এ এলাকার মানুষের বাড়ি, জমি ও হাওরের ওপর রাজত্ব করছে বাইরের প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী, যারা “ওয়াটারলর্ড” নামে কুখ্যাত। হাওর এলাকায় তাদেরই রাজত্ব চলে। না খেয়ে মরলেও নিজের জমিতে মাছ ধরার অধিকার নেই ভাটির মানুষের। জমিদারি প্রথা বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু ওয়াটারলর্ডদের অত্যাচারে ভাটি এলাকার মানুষের জীবন আজও দুর্বিষহ। ইজারা ব্যবস্থার নামে রাষ্ট্রক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য লুটপাটের বিরাট ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। সরকার যত একর জলমহাল ইজারা দেয়, তারা তার মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকে না। ইজারাদারদের দৌরাত্ম্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ কৃষকের জমি, এমনকি বাড়ির ঘাট পর্যন্ত দখল হয়ে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ কৃষক বা জেলে নিজের জমিতে তো দূরের কথা, বাড়ির আশপাশের পানিতেও মাছ ধরতে পারে না। মাছ ধরতে গেলে ইজারাদারদের লাঠিয়াল বাহিনী জাল কেড়ে নেয় এবং হামলা চালায়। হাওরাঞ্চলে এবারের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর জনদাবির ভিত্তিতে জলমহালের ইজারা স্থগিত করা উচিত। ফসলহারা কৃষক ইজারাদারদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে চায়। উল্লেখ্য, আশির দশকে কমিউনিস্ট পার্টি ও ক্ষেতমজুর সমিতির নেতৃত্বে ভাটি অঞ্চলে ইজারা প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠলে বহু হাওর সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করতে বাধ্য হয়েছিল প্রশাসন। পরবর্তীতে বিভিন্ন বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের চক্রান্তে সেগুলো আবারও ইজারাদারদের হাতে চলে যায়। যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, সেই দলের প্রভাবশালী নেতারাই জলমহালগুলো ভোগদখল করেছে। এবার মাছ ধরার অধিকারের প্রশ্নে হাওরবাসী আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সোচ্চার। জলমহালের ইজারা বাতিল করে ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকারের দাবিতে আজ ভাটির ঘরে ঘরে আওয়াজ উঠছে। ধান ও মাছের পাশাপাশি গবাদিপশুরও বিরাট আধার এই ভাটি এলাকা। খাদ্যাভাবে গবাদিপশু পানির দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে গৃহস্থরা। হাওরের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছেড়ে কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। এবারের অকাল বন্যায় হাওরের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত হিসাব নিয়ে কেউ কথা বলতে চায় না। হাওরের অসহায় মানুষের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব গোপন করে সরকার ও তার প্রতিষ্ঠানসমূহ নিজেদের ভাবমূর্তি ও তথাকথিত উন্নয়নের চিত্র রক্ষা করতে চাইছে। সরকার এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কৃষিঋণ, এনজিও ঋণ ও মহাজনী ঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেয়নি। সরকারের ভুলনীতি, দুর্নীতি ও লুটপাটের ফলে ভাটির দুই কোটি মানুষ আজ এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। তাছাড়া মেঘালয় পাহাড়ে অপরিকল্পিত কয়লা, পাথর ও ইউরেনিয়াম খনির ফলে ভাটির উর্বর ভূমি ও জলাভূমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নত ও উচ্চফলনশীল ধান উৎপাদনের নামে হাওরের নিজস্ব ধানের জাত ধ্বংস হয়েছে। অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়েছে। ফলে আজ হাওরের প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য গভীর হুমকির মুখে। এবারের হাওর বিপর্যয়ের পর থেকেই বাঁধের টাকা লুটপাটকারী সরকারি কর্মকর্তা, অসৎ ঠিকাদার ও লুটেরা গোষ্ঠীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, পর্যাপ্ত ত্রাণ সরবরাহ, ত্রাণ সরবরাহে লুটপাট বন্ধ এবং ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকারের দাবি জোরালো হয়েছে। হাওরের সমস্যা মূলত রাজনৈতিক। লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী ও কর্পোরেট স্বার্থের কবল থেকে হাওরকে বাঁচাতে হবে। হাওরের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই সংগ্রামী। তাদের লড়াকু বৈশিষ্ট্যের কারণেই একমাত্র ফসল বারবার নষ্ট হওয়ার পরও তারা সাহস নিয়ে নতুন করে বীজ বুনে। কিন্তু আজ হাওরবাসীর সামনে বাঁচা-মরার প্রশ্ন। লক্ষ লক্ষ হাওরবাসীর জন্য সরকার কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেনি। উল্টো হাওর ইজারা দিয়ে তাদের বাঁচার শেষ অবলম্বনটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আজ হাওরের মানুষ নিজেদের জমিতেও মাছ ধরতে পারে না। তাই ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকার আদায়ে আবারও মরণপণ লড়াইয়ে নামতে প্রস্তুত হাওরবাসী। মানবসৃষ্ট দুর্যোগে নিঃস্ব হতে চলা হাওরের কৃষকের পাশে দাঁড়ান। আওয়াজ তুলুন -বিএডিসির বীজ নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। কৃষকের সরকারি, বেসরকারি, এনজিও ও মহাজনী সব ধরনের ঋণ মওকুফ করতে হবে। হাওরের ইজারা বাতিল করে সাধারণ মানুষের মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সকলকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। হাওরে পশুখাদ্য ও কৃষকের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে এবং হাওরের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন বাঁচাতে ক্ষতিপূরণ ও উপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..