
চব্বিশের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের প্রধান শেখ হাসিনার পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়া ও সরকার পতনের এক বছর পার হলো গত ৫ আগস্ট। জুলাই মাসজুড়েই তীব্র আন্দোলন ও ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিনকে ‘৩৬ জুলাই’ও বলা হয়ে থাকে। ৫ আগস্ট সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ প্রকাশ করেন। এ ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিস্বরূপ সংবিধানের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলেও ঘোষণা করা হয়। ইতোমধ্যে ‘জুলাই সনদ’ও প্রকাশ হওয়ার পথে। বলে রাখা ভালো, এখানে অভ্যুত্থান সম্পর্কিত বিশাল কোনো আলোচনায় যাবো না।
৫ আগস্টের পূর্বাপর ঘটনাবলিকে আমরা কিভাবে দেখছি, তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবি রাখে। এ কথা সত্য, মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে নবগঠিত বাংলাদেশে শ্রমিক-কৃষক মেহনতিসহ সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে আন্দোলন সংগঠিত হয়ে আসছিলো। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী এরশাদীয় শাসনের পতন হলেও জনগণ কাক্সিক্ষত ফলাফল পেতে ব্যর্থ হয়। ২০০৭ সালে বিএনপি সরকারের বিরূদ্ধে এক বিশাল গণজাগরণ সৃষ্টি হলেও সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে তা স্তিমিত হয়ে যায়। যা ১/১১ সরকার হিসেবে খ্যাত হয়ে থাকে। ২০০৮ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। যদিও এই নির্বাচন সম্পর্কেও যথেষ্ট অনিয়মের অভিযোগ আছে। এরপর ২০২৪ পর্যন্ত একটানা ১৬ বছর ক্ষমতা আকড়ে থাকলেও ৫ আগস্ট পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার ও শেখ হাসিনা গণবিরোধী ও কর্তৃত্ববাদী সরকার হিসেবে আবির্ভূত হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিলো দীর্ঘ ১৬ বছরের অপশাসন, কুশাসন, দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট, ভোটাধিকার হরণ, গুম-খুন-অপহরণ, বিচার বহির্ভূত হত্যা, অত্যাচার-নির্যাতন, অগণতান্ত্রিক আচরণসহ সবধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে ছাত্র ও গণমানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বিএনপি ও বাম সংগঠনসহ প্রায় সকল বিরোধী দল ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরূদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে আসছিলো। আর সেই সংগ্রামের চলমানতায় প্রথমে ২০১৮ এবং পরবর্তীতে ২০২৪-এ ছাত্রদের কোটাবিরোধী অরাজনৈতিক আন্দোলন স্ফূলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠে, যার শেষ পরিণতি হয় ১ দফা এবং ৫ আগস্ট সরকার পতন।
দেশব্যাপী ঐক্যবদ্ধ ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, ফ্যাসিস্ট সরকারের গণহত্যা, ফ্যাসিস্টদের পালিয়ে যাওয়া ও ভারতে আশ্রয় গ্রহণ, ইত্যাদি ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ আমাদের শিক্ষা দিয়েছে অনেক। কিন্তু এসব লাগাতার ঘটনাপ্রবাহকে ইতিহাস কী হিসেবে আখ্যায়িত করে, তা গভীর বিশ্লেষণের ওপরেই নির্ভর করছে বাংলাদেশে মানুষের আলোর মুখ। সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের বাস্তবতা ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উপরেই নির্ভর করে সমাজের চলমান গতিপ্রকৃতি। সেটাই ইতিহাস। সেই ইতিহাসই সমাজের চালিকাশক্তি। এখানে তথ্য-উপাত্ত বা বিশ্লেষণের ঘাটতি বা বিভ্রান্তি সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত করতে পারে। এই মুহুর্তের রাজনৈতিক সংকট তারই ঘনীভূত বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে।
কেমন করে এক দফা এলো। ছাত্রসমাজের কোটাবিরোধী অরাজনৈতিক আন্দোলন কেমন করে রাজনৈতিক “এক দফা” আন্দোলনে পরিণত হলো, লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এলো, ঘর থেকে নারীরাও বেরিয়ে এলো রাজপথে, ধনিকশ্রেনীর সন্তান বলে খ্যাত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও বেড়িয়ে এলো ক্লাসরুম থেকে, অসীম সাহস দেখিয়ে সামনে এলো শ্রমজীবী মানুষ, বুক পেতে নির্বিচার গুলি বরণ করে এক দফার আন্দোলনে সামিল হলো দেশব্যাপী কোটি কোটি মানুষ। আর ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হলো স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশের চিরায়ত রাজনৈতিক দলগুলো ওপর জনগণের আস্থাহীনতা আজ নতুন নয়। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো তা অস্বীকার করে আসছে। ২০০৭ সনে ১/১১ সরকার আমলে বিরাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনাও হয়েছিলো। রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থাহীনতার কতগুলো কারণও পরিলক্ষিত ছিলো। ক্রমেই দেশের রাজনীতি হয়ে আসছিলো জনসেবার পরিবর্তে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের আধারস্থল। তাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দিয়েছিলো ছাত্র ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। রাজনীতি সম্পর্কে ঘৃণা প্রকাশ করতে থাকে তরুণ প্রজন্ম। পারম্পরিক অবিশ্বাস বা আস্থাহীনতা ব্যক্তি ও সমাজকে অধঃপতিত করতে পারে। ব্যক্তি মানুষকে বিভ্রান্ত করে। গুজবের প্রাধান্য বাড়তে থাকে। আস্থাহীনতার অভাবে দেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। মৃত্যুর আগে খ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলী খান দেখিয়েছিলেন, ভারত পাকিস্তান নেপাল ভুটানের চেয়েও বাংলাদেশে আস্থাহীনতার পরিমান বেশি। ছাত্র-তরুণ সমাজের মধ্যে এই আস্থাহীনতার জায়গা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাজনীতির বাইরে ছাত্র তরুণদের ২০১৮ সনে কোটা বিরোধী আন্দোলন, নো ভ্যাট আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন, ইত্যাদি ব্যাপক সাড়া পড়েছিলো। স্বাধীনভাবে এসব আন্দোলন পরিচালনা করেছিলো একগুচ্ছ তরুণ নেতৃত্ব। দেশব্যাপী একটা নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিলো তরুণ নেতৃবৃন্দের মধ্যে। একটা দৃঢ় সাহস সৃষ্টি হয়েছিলো। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান পর্যালোচনা করলে মনে হয়, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সেইসব আন্দোলনসমূহ ছিলো ধারাবাহিক রিহার্সাল।
কেউ কেউ বলেছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে তেমন কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছিলো না। কথাটার আংশিক সত্যতাও আছে। কোনো কোনো নেতৃত্ব বিনয়ের সাথে তা স্বীকারও করেছেন। এ কথা সত্য যে, শুরু থেকেই যারা আন্দোলন সংগঠিত করছিলো, তারা বৃহৎ কোনো রাজনৈতিক দলের সংগে সংযুক্ত ছিলো না। আর যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রারম্ভিক কাজ শুরু করেছিলো, তারাও দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলের অংগ বা সহযোগী সংগঠন নয়। তবে যারা শুরু করেছিলো, তারা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক তরুণ ছাত্র, তা মোটেই নয়। আমার জানা মতে, তারাও পাঠচক্র পরিচালনা করতো। স্বাধীন ছাত্র সংগঠন পরিচালনা করতো। আন্দোলন সগ্রাম ও প্রগতিশীল ধারায় রাষ্ট্র কাঠামো বিনির্মান নিয়ে নিয়মিত রাজনৈতিক চর্চ্চা করতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলন সংগ্রামের সাথেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলো। চব্বিশের কোটা আন্দোলনের সুচনাপর্বেই তারা সক্রিয় যোগাযোগ স্থাপন করে বাম প্রগতিশীল গনতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে। পরবর্তীতে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ বিরোধী ডান ও সাম্প্রদায়িক শক্তিসহ সকল শক্তির সাথেই যোগাযোগ স্থাপিত হয়। কোটা আন্দোলন পর্বে সরকারি তিরস্কার, হামলা, নির্যাতন ও গুলিবর্ষণ আন্দোলনের মাত্রা সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের মাত্রার এই পরিবর্তন কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়নি, এটা সত্য। অনেকক্ষেত্রে তা সম্ভবও হয়নি। তব্ওু আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি কোনদিকে যাচ্ছে বা সরকারের পতন ঘটলে কি করতে হবে, এসব বিষয়ে সম্ভবত পুর্বপরিকল্পনা করাও সম্ভব হয়নি। কোনো কর্মসূচি জনগণের মধ্যে প্রচারিত হয়নি। তবে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই দেশব্যাপী অংকিত গ্রাফিতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে রাজপথের লড়াকু সৈনিকদের। সৃজনশীল বুদ্ধিদীপ্ত গ্রাফিতিই হয়ে উঠে আন্দোলনের মৌলিক পরিকল্পনা। গ্রাফিতির শ্লোগানই মূর্ত হয়ে উঠে চব্বিশের ছাত্র গন অভ্যুত্থানের মৌল চেতনা। শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ও শক্তি ছাড়াও অরাজনৈতিক দাবি নিয়ে জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণে অভ্যুত্থানের মাধ্যমেও যে রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তন সম্ভব, জুলাই গণঅভ্যুত্থান তা প্রমাণ করেছে।
সমস্যা হচ্ছে, অভ্যুত্থান পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি নিয়ে। এখানে কেউ কেউ ‘বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থান’ ধারণা করে কিংবা নিজেদের বিপ্লবের নেতৃত্ব মনে করে বিপ্লবী কর্মসূচি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। মনে রাখা দরকার, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ডানপন্থি বামপন্থি ও সাম্প্রদায়িক শক্তিসহ সকল পেশাজীবী এবং সকল আপামর জনগণই সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে। এক দফা দাবি সরকারের পতনের লক্ষ্য নিয়ে সকল শক্তি একযোগে রাজপথে অংশ নিলেও মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ছিলো প্রকট। আর সেকারনেই বিপ্লবী অভ্যুত্থান নামকরণ করে বিপ্লবী সংস্কার মেনে নিতে পারছে না অনেকেই। রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার, সংবিধান বিলুপ্তিকরন, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের মতো বিপ্লবী সংস্কার প্রশ্নাতীত থেকে যাচ্ছে। ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বলে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকেও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করা হয়েছে। রাজপথের ঐক্যে তৈরী হয়েছে বিভাজন। “গণ-অভ্যুত্থান” ও “বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থান” এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য আছে। অভ্যুত্থানের ইতিহাসও তাই বলে। ‘গণঅভ্যুত্থান’ রাষ্ট্র ও সরকারের যেকোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠা বিশাল গনসমাবেশ গণ-অভ্যুত্থানে পরিনত হতে পারে, যা সরকারের পতনকেও তরান্বিত করতে পারে। কিন্তু ‘বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থান’ এর বিষয়টি অত্যন্ত পরিকল্পিত ও কর্মসূচিভিত্তিক। বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করার জন্য একটা নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংগঠিত সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি, রণনীতি ও রণকৌশলগত বিষয়সমূহ, রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তনে পূর্বপরিকল্পনা ও কর্মসূচি এবং একটি গণভিত্তিক মতাদর্শিক বিপ্লবী পার্টির নির্দেশনা বিশেষ বিবেচনা করতে হয়। সেরকম নীতিনিষ্ঠ সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চব্বিশের অভ্যুত্থানে ছিল না। সেদিক বিবেচনায় চব্বিশের জুলাই “গণঅভ্যুত্থান” বলাই শ্রেয়।
মনে রাখতে হবে, এটা সংবিধানের নিয়মিত সরকার নয়, এটা সাংবিধানিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সরকার গঠিত হয়েছে প্রধান বিচারপতির পরামর্শে, দেশের রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে এবং সাংবিধানিকভাবেই শপথ নিয়েছেন। সেই অর্থে এটা পরিষ্কার যে, এ সরকার সাংবিধানিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। একটা বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট নিয়ে এ সরকার গঠিত হয়নি। সুতরাং সরকারের সময়কাল, কর্মপরিধি, কর্মসূচি, কর্মপরিকল্পনা এবং কর্মোদ্দেশ্য যথাযথ হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
লেখক : জাতীয় পরিষদ সদস্য, সিপিবি