আশা-নিরাশার দোলাচলে নির্বাচন
কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই দেশে সাধারণ নির্বাচনের সময় ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা বলেছেন, নির্ধারিত সময় অর্থাৎ আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে। জামাত ও এনসিপিসহ কতগুলো রাজনৈতিক দল বাদ দিলে বিএনপি, বামপন্থি দলসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। তা সত্ত্বেও এদেশের মানুষের মনে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। গ্রাম-শহর-বাজারে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে–নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হবে তো? কেন সাধারণ মানুষের মধ্যে এ সংশয় তৈরি হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়েছে চব্বিশের আগস্টে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। হাসিনার শাসনামলে দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার, গুম, খুন, নিপীড়ন-নির্যাতন, জনগণের ভোটের অধিকার হরণসহ নানাবিধ কারণে এদেশের সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দানা বেঁধেছিল। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সহস্রাধিক মানুষের জীবনের বিনিময়ে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। পতন ঘটে হাসিনা সরকারের।
এই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যবিরোধী একটি সমাজ গড়ে তোলার পাশাপাশি মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা। শেখ হাসিনার শাসনামলে তিনটি নির্বাচনে সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারেনি। জোর করে শেখ হাসিনা ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল। সাধারণ মানুষ এ থেকে পরিত্রাণ চাইছিল। এই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নানা শক্তি তাদের নিজস্ব আদর্শ, নীতি কৌশল থেকে অংশগ্রহণ করেছিল, যে কোনো গণঅভ্যুত্থানে এটাই স্বাভাবিক। গণঅভ্যুত্থানোত্তর পরিস্থিতিতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে নানা শক্তির উত্থান। রাষ্ট্রের সংস্কারের দাবি উত্থাপিত হলো। আমরা কমিউনিস্ট বামপন্থিরা পুরো সমাজব্যবস্থারই সংস্কারের পক্ষে। সেই সংস্কার এমন হতে হবে যেন শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি সংস্কারের নামে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ১২টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হলো। সেখানে আমরাও আমাদের বক্তব্য দিয়েছি। এ বিষয়ে আমরা যেভাবে উত্থাপন করেছি তা হলো–যে সংস্কারই হোক না কেন তা আগামীতে যারা নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাবেন সেই সংসদই সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে কোনো সংস্কারই বাস্তবায়ন করা যাবে না। তাদের সে দায়িত্বও জনগণ দেয় নাই। সংবিধান ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার এটাই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসছে। জামাত এবং এনসিপিসহ কতগুলো রাজনৈতিক দল দাবি তুলেছে সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হবে না, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা ছাড়া নির্বাচন হবে না। নানা ধরনের বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেয়া হচ্ছে না। এগুলো থেকে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় তৈরি হচ্ছে নির্বাচন যথাসময়ে হবে কি না। নানা দেশি-বিদেশি শক্তির নির্বাচনকে ঘিরে চক্রান্তও অব্যাহত আছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, অগণতান্ত্রিক শক্তিও নির্বাচন বানচালের চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও কঠিন করে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে না, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। সেনাবাহিনী, অন্তর্বর্তী সরকার, সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। চারদিক থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে চক্রান্তের জালে আবদ্ধ করে তোলা হচ্ছে। জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এদেশের বাম গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তিসমূহ শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনা করেছে। এখনো এই রাজনৈতিক শক্তিগুলো দ্রুত একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার রয়েছে। বিএনপিসহ বাম গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তিগুলো প্রয়োজনীয় সংস্কার করে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে।
তা সত্ত্বেও দেশকে চক্রান্তের জাল থেকে বের করে একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনই পারে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাতে। যদিও নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র ফিরে আসবে চক্রান্ত বন্ধ হবে তাই ভাবার কোনো কারণ নেই। কেননা দেশ পরিচালনা করছে এবং করবে সেই সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী বুর্জোয়া শক্তিগুলোই।
জামায়াত, এনসিপিসহ কতগুলো রাজনৈতিক দল নির্বাচন প্রলম্বিত করার চেষ্টা করছে। নানা ধরনের সাংবিধানিক বিতর্ক সৃষ্টি করেই চলেছে। এদিকে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সীমানা নির্ধারণের কাজও চলছে। নির্বাচনের আচরণবিধিও প্রস্তুত করা হয়েছে। যতই প্রস্তুতি নেয়া হোক না কেন নির্বাচন কখন হবে সেটি নির্ভর করবে রাজনৈতিক শক্তি এবং তাদের দেশি-বিদেশি মুরব্বিদের ওপর। এটি বিবেচনায় নিয়ে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। নির্বাচনের বিষয়টি বামপন্থি গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সামনে নিয়ে এসে লড়াই সংগ্রাম জোরদার করতে হবে। সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে বলতে হবে আমরাও সংস্কারের পক্ষে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করবে আগামী দিনের নির্বাচিত সংসদ। জামাত, এনসিপিসহ যারা নির্বাচনের শর্তজুড়ে দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে হবে। সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতির (পিআর) বিষয়টি বামপন্থিরাই প্রথম তুলেছিল। কিন্তু তা করতে পারে নির্বাচিত সংসদ। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হলো একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেয়া।
ষড়যন্ত্র চক্রান্ত থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। দেশে নির্বাচিত সরকার আসার সম্ভাবনার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে একটি গোষ্ঠীর কুশীলবরা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। করণ, তারা সব হারানোর আতঙ্কে আঁতকে উঠে। গত এক বছরে চাঁদাবাজি করে কোটিপতি বনে যাওয়া ‘হঠাৎ রাজনীতিকরাও’ ক্ষিপ্ত হয় নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণায়। বিদেশি শক্তির তল্পিকলে কোনো কোনো এনজিও জনমত ভয় নামে নিজেদের উর্বর মস্তিস্কের খায়েশ প্রকারান্তরে প্রকাশ করছে। বলা হচ্ছে জনগণ নাকি সংস্কার ছাড়া নির্বাচন চায় না। নির্বাচন প্রশ্নে প্রতীয়মান হয় প্রধান উপদেষ্টার সদিচ্ছার অভাব যে নেই তা বটে। তবে সরকারের মধ্যেও রয়েছে নির্বাচন যাতে না হয় এমন কুশীলবরা। তাকে মোকাবিলা করতে সাহস এবং শক্তিরও সঞ্চয় করতে হবে বামপন্থি গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে। কেননা চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা বৈষম্যহীন সমাজ ও ভোটাধিকারসহ গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এটাই সামনে নিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিকভাবেই এই ষড়যন্ত্রকারী শক্তিগুলোকে মোকাবিলা করতে হবে। দেশে যদি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তাহলে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে জোরদার করা যাবে। রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনের যে লড়াই তা এগিয়ে নেওয়া যাবে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির একটি উপাদান হলো অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন।
এই নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন লড়াই সংগ্রাম জোরদার করা এই সময়কালের অন্যতম প্রধান কতর্ব্য। সাধারণ মানুষের মাঝে কেন নির্বাচন এই মুহূর্তে প্রয়োজন তা ব্যাখ্যা করা জরুরি। সাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ধর্মান্ধ শক্তি যে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না তাও মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। এই সংগ্রাম যেমন করতে হবে পাশাপাশি শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামও অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের গণবিরোধী নীতির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। এই সংগ্রামে ব্যাপক শক্তির সমাবেশ ঘটাতে হবে। যারা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে দেশের ভিত্তি মনে করে, গণতান্ত্রিক সংস্কারে বিশ্বাস করে সেই শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করা জরুরি প্রয়োজন। এ উদ্যোগ বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকেই নিতে হবে।
প্রথম পাতা
আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া আকরাম আপিলে খালাস
চাকরিপ্রার্থী ৩৮ জনের কেউই জাতীয় সংগীত পারলেন না
গণ-অভ্যুত্থানের গণ-প্রত্যাশা পূরণের জন্য নতুন পর্বের সংগ্রাম শুরু হোক
‘আঁধার’
বিপ্লবের লাল ফুল কমরেড তাজুল
বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাস
উদীচীর সাবেক সভাপতি সফিউদ্দিন আহমদের মৃত্যুতে শোক
ফেব্রুয়ারিতেই দেশে ১১ বার ভূমিকম্প, বাড়ছে উদ্বেগ
সিপিবির ‘ডায়েরি-২০২৬’সংগ্রহ করুন
২০ রোজার মধ্যে ঈদ বোনাস ও বকেয়া পরিশোধ করতে হবে
গরিব মানুষের জন্য সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের দাবি ক্ষেতমজুর সমিতির
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন