নয়া ফ্যাসিবাদ বিপদ ও বিকল্প

শান্তনু দে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

গতবছর লোকসভা নির্বাচনে তাৎপর্যপূর্ণ ধাক্কা খেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। গণরায়ের গণতান্ত্রিক বার্তা স্পষ্ট: মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছেন স্বৈরতন্ত্রকে। জনাদেশ কেড়ে নিয়েছে বিজেপি-র গরিষ্ঠতা, যা তারা পেয়েছিল ২০১৪ এবং ২০১৯ সালে। মুখ থুবড়ে পড়েছে আবকি বার ৪০০ পার স্লোগান। ৩৭০ তো দূরঅস্ত, তিনশ’ পর্যন্ত পেরোতে পারেনি বিজেপি। এমনকি ২৭২-ও নয়। উনিশের নির্বাচনের তুলনায় ৬৩টি আসন কম পেয়ে থেমে গিয়েছে ২৪০-এ। আসন সংখ্যা কমেছে ২০ শতাংশের বেশি। ২০১৪ এবং ২০১৯। পরপর দু’বার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর এবার হারিয়েছে গরিষ্ঠতা। এটিই সবচেয়ে বড় ধাক্কা। এককভাবে গরিষ্ঠতার চেয়ে ৩২টি আসনে পিছিয়ে। অবশ্য তার সহযোগী দলগুলি ৫২টি আসন জেতায় এনডিএ-র রয়েছে ২৯২টি আসন। যা প্রয়োজনীয় গরিষ্ঠতার চেয়ে ২০টি বেশি। অন্যদিকে, শক্তি অনেকটা বাড়িয়ে সংসদে এখন মজবুত বিরোধীরা। একথা যেমন ঠিক, তেমন এ-ও ঠিক ক্ষমতায় বিজেপি। এককভাবে গরিষ্ঠতা না পেলেও বিজেপি এখনও একক-বৃহত্তম দল। পেয়েছে ৩৬.৫৭ শতাংশ ভোট। পাঁচবছর আগের তুলনায় ভোট কমেছে এক শতাংশেরও কম, ০.৭৩ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রীর তৃতীয় ইনিংসে নরেন্দ্র মোদী। হিন্দুত্ব-কর্পোরেট এবং স্বৈরাচারী অ্যাজেন্ডা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া থেকে বিজেপি-কে নিরস্ত করা যায়নি। নয়া উদারনীতি ছাড়াও হিন্দুত্ব-কর্পোরেট আঁতাতের স্বার্থসিদ্ধির জন্য চলছে ত্রিমুখী অভিযান: ১. হিন্দুত্বের অ্যাজেন্ডা, ২. জাঁকিয়ে বসছে স্বৈরতন্ত্র এবং ৩. খর্ব করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে। দেশের সামনে বিপদ তাই কাটেনি। বর্তমান পরিস্থিতির তিনটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এই ত্রিমুখী অভিযান। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছে অযোধ্যায় রাম মন্দিরের উদ্বোধন। বারানসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ এবং মথুরার ইদগা-সহ বিভিন্ন মুসলিম ধর্মস্থান নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিতর্ক এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও রামনবমীর মতো শোভাযাত্রাকে ব্যবহার করে হিংসায় প্ররোচনা দেওয়া– এসবই এই সময়ের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে হিংসার ঘটনায় জড়িত থাকায় অভিযুক্ত মুসলিমদের বসতবাটি প্রকাশ্যে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বুলডোজার দিয়ে। এই সবকিছুর লক্ষ্যই আসলে হিন্দুত্ববাদ-কে রাষ্ট্রের মতাদর্শ (স্টেট ইডিওলজি) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এবং ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিবর্তিত করা। আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল একটা পুরোদস্তুর কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা গড়ে তোলার সর্বাত্মক প্রয়াস। খর্ব করা হচ্ছে সংসদের গুরুত্বকে। দুর্বল করা হচ্ছে উচ্চতর বিচারালয়কে। খর্ব করা হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন সত্তা। কমিশনের ভূমিকা আর থাকছে না স্বাধীন। বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে ইউএপিএ এবং পিএমএলএ-র মত দানবীয় আইন। এমনকি গ্রেপ্তার করা হয়েছিল দুই মুখ্যমন্ত্রীকেও। এইসবই নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নজরদারি কাঠামো শক্ত করতে এবং স্বাধীন মিডিয়াকে খর্ব করতে পাস করা হচ্ছে বিভিন্ন আইন। তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হল সাধারণতন্ত্রের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর আঘাত। বিজেপি সরকার সমস্ত রকম ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করছে। রাজ্যগুলির বর্তমান অধিকারকে খর্ব করছে। আর্থিকভাবে বঞ্চনা করছে। রাজ্যপালের দপ্তরকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিজেপির দলীয় স্বার্থে। নয়া-ফ্যাসিবাদী প্রবণতা এই পরিস্থিতিকে সিপিআই(এম) বলছে ‘নয়া-ফ্যাসিবাদী’ প্রবণতা। এবছর এপ্রিলের গোড়ায় মাদুরাই শহরে হয়েছে পার্টির ২৪তম কংগ্রেস। ওই কংগ্রেসে পার্টি এই প্রথম ‘নয়া-ফ্যাসিবাদী’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছে। এর আগে পার্টির ২২তম কংগ্রেসে কর্তৃত্ববাদী এবং হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক আক্রমণগুলিকে আমরা ‘উদীয়মান ফ্যাসিবাদী প্রবণতা’ বলে উল্লেখ করেছিলাম। ২৩তম কংগ্রেসে বলেছিলাম, মোদী সরকার আরএসএস-এর ফ্যাসিবাদী কর্মসূচিগুলিকেই বাস্তবায়িত করছে। কেন নয়া-ফ্যাসিবাদ? এই শব্দবন্ধটি বিশেষত ব্যবহার করা হয়েছে ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদ থেকে একে আলাদা করে বোঝানোর জন্য। ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদের উত্থান হয়েছিল ইউরোপে দু’টি যুদ্ধের মাঝখানের পর্বে। যেমন ইতালিতে মুসোলিনী ও জার্মানিতে হিটলারের অধীনে। এটি ছিল সেই যুগ, যখন বিশ্ব পুঁজিবাদের সংকটের পরিণতিতে ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে দেখা দিয়েছিল মহামন্দা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যেকার দ্বন্দ্ব হচ্ছিল তীব্র। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ– দু’টিই ছিল সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের পরিণতি। ক্ষমতা দখলের পর ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে উচ্ছেদ করেছিল। এবং যুদ্ধকে ব্যবহার করেছিল অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি উপায় হিসাবে। এই সব দেশে একচেটিয়া পুঁজি পুরোপুরি মদত দিয়েছিল ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলিকে। এবং সংকটকে মোকাবিলার লক্ষ্যে চরম পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য এই শক্তিগুলির ওপর নির্ভর করেছিল। আমরা সবাই ফ্যাসিবাদের এই পুরাতন চরিত্রের সঙ্গেই পরিচিত। এটা ঠিক, নয়া ফ্যাসিবাদের কিছু উপাদান বিশ শতকের প্রথম ভাগের ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এগুলি হল উগ্র জাতীয়তাবাদ, যার ভিত্তি ইতিহাসের কিছু ঘটনাকে এক অংশের মানুষের অন্যায় ও অবিচার বলে ধরে নিয়ে এক কল্পিত অনুভূতি তৈরি, সেইসঙ্গেই সেইসমস্ত অপর (আদার)-কে নিশানা করা, ‘বহিরাগত’ বলে আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত করা– তা দেশে-দেশে হতে পারে বর্ণভিত্তিক, ধর্মভিত্তিক কিংবা জাতিগত সংখ্যালঘু। প্রচারে তুফান তোলা হয় তোমার সমস্যার জন্য ‘ওরা’ দায়ী। তোমার দারিদ্র, তোমার বেকারত্বের জন্য পুঁজিবাদের নয়া উদারবাদ দায়ী নয়, দায়ী আসলে ‘ওরা’। এই ‘ওরা’ কোথাও হতে পারে কৃষ্ণাঙ্গ, কোথাও মুসলিম, কোথাও-বা হিন্দু, আবার কোথাও ভিনদেশী অভিবাসী। উগ্র দক্ষিণপন্থী/ নয়া-ফ্যাসিবাদী দল অথবা শক্তিগুলির পিছনে থাকে বৃহৎ বুর্জোয়ার সমর্থন। এই নয়া-ফ্যাসিবাদী প্রবণতা যে শুধু ভারতেই দেখা যাচ্ছে এমন নয়। নয়া-উদারবাদের সংকটে নয়া-ফ্যাসিবাদ একটি বিশ্বব্যাপী প্রবণতা। গোটা দুনিয়া জুড়েই উগ্র দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থান দেখা যাচ্ছে। নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা। যার শুরু ২০০৮-উত্তর দীর্ঘায়িত সংকটের মধ্যে দিয়ে। এই প্রবণতার মূল উৎস পুঁজিবাদের সংকট। এবং তার থেকে তৈরি হওয়া সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং বৈষম্য। আজকের নয়া-ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থাগুলি উত্থান সেই প্রেক্ষাপটে, যেখানে আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি– সাম্রাজ্যবাদী শিবিরগুলির নিজেদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বগুলিকে স্তিমিত করে রেখেছে। ১৯৩০-এর দশকের মতো সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব এখন আর তীব্র নয়। আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির উত্থানের সঙ্গেই বরং তা স্তিমিত। ফলে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে নয়া-ফ্যাসিবাদী শাসকেরা এখন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে না। এটা ১৯৩০-এর সময়ের ফ্যাসিবাদের চরিত্র থেকে ভিন্নতর। নয়া উদারবাদী সংকট এবং সেই সংকট থেকে জন্ম নেওয়া জনগণের অসন্তোষকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে উগ্র-দক্ষিণপন্থী ও নয়া-ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি। আর এজন্য তারা জনমোহিনী (পপুলিস্ট) শব্দবন্ধগুলিকে ব্যবহার করছে। কিন্তু একবার ক্ষমতায় এলে সেই নয়া-উদারবাদী নীতিগুলিকেই তারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে। তারা নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতা দখল করছে। এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখছে। কিন্তু বিভিন্ন কর্তৃত্ববাদী কৌশলের সাহায্যে বিরোধীদের দমন করছে। এবং ভিতর থেকেই রাষ্ট্রের পুননির্মাণ করছে। আমরা একথা বলছি না যে মোদী সরকার একটি ফ্যাসিবাদী কিংবা নয়া-ফ্যাসিবাদী সরকার। আমরা ভারত রাষ্ট্রকে নয়া-ফ্যাসিবাদী চরিত্রের রাষ্ট্র হিসাবেও চিহ্নিত করছি না। বলছি নয়া-ফ্যাসিবাদী প্রবণতা। বিজেপি-আরএসএস পরিচালিত সরকার নয়া-ফ্যাসিবাদী বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করলেও এখনও পুরদস্তুর নয়া-ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা বা রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। তবে লক্ষণ স্পষ্ট। এখনই সতর্ক না হলে সমূহ বিপদ। বামপন্থীদের দায়িত্ব বিকল্প নির্মাণ আজকের নয়া-ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই মানে বৃহৎ পুঁজি, জমিদার, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বহুমাত্রিক লড়াইয়ের সমসাময়িক সুনির্দিষ্ট রূপ। এখানেই বামপন্থীদের বিরাট ঐতিহাসিক দায়িত্ব। হাজির করতে হবে একটি সর্বাঙ্গিন বিকল্প। জোরদার করতে হবে সেই বিকল্পের লড়াই। ভারতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তি বিজেপি-র নীতি ও নয়া-ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে সোচ্চার। তবে, গুণগতভাবে এই কর্পোরেট-হিন্দুত্বের শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কমিউনিস্টরাই সবচেয়ে আপসহীন সৈনিক। কিন্তু বাস্তব হলো, এই শক্তিকে মোকাবিলা করার জন্য বামপন্থীদের যতটা পরিমাণগত জোর দরকার, তা পার্টির সর্বত্র নেই। প্রথম কাজ তাই পার্টির নিজের শক্তি বাড়াতে হবে। তারপর বাম শক্তিগুলিকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। পুনরুজ্জীবিত ও শক্তিশালী করতে হবে বাম ঐক্যকে। এবং তারপর বৃহত্তর গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে এর চারপাশে সমবেত করতে হবে। এই যে অনেক শক্তিকে জড়ো করা হবে, সেটি শুধু একটি নির্বাচনী কৌশলের বিষয় নয়। আজকের কর্পোরেট-হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে একটি বিকল্প গড়ে তোলার লড়াই। এটা বহুমাত্রিক। বিকশতি হবে নানা দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে। লেখক : ভারতীয় মার্কসবাদী লেখক ও সিপিআইএম নেতা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..