সমাজতন্ত্র গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা

সরদার ফজলুল করিম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

সরদার ফজলুল করিম ছিলেন ব্রাত্যজনের লোকায়ত শিক্ষক, দার্শনিক ও বন্ধু। সাপ্তাহিক একতা পত্রিকার সঙ্গেই ছিল তার আত্মিক সম্পর্ক। তাই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ সংখ্যায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক একটি লেখা পুর্নমুদ্রণ করা হলো। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জীবনের আওয়াজ হচ্ছে: সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা কেউ বলি ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র। আমরা কেমন করে সাজিয়ে বলব? আগে ধর্মনিরপেক্ষতা বলব, তারপরে গণতন্ত্র এবং শেষে সমাজতন্ত্র? না সমাজতন্ত্রকে আগে বসাব? প্রশ্নটা কৌতুককর মনে হতে পারে। এ লক্ষ্য যদি কেবল শব্দের কারসাজি হয় তাহলে আমরা তা নিয়ে কৌতুক করতে পারি। দাঁড়িপাল্লা দিয়ে ওজন করে তার ভাবের তারতম্যে সাজাবার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু তেমন করে কি আমরা পারি আমাদের সর্বজনীন ও জাতীয় লক্ষ্যের আওয়াজ নিয়ে খেলা করতে? না, আমরা তা পারিনে। জীবনকে নিয়ে আমরা ইচ্ছামত খেলা করতে পারিনে। তার অনিবার্য পর্যায়ক্রমে আমরা ওলট পালট করে দিতে পারিনে। পাকিস্তানী শাসকচক্র বিগত ২৪ বছর ধরে আমাদের জীবন নিয়ে খেলা করার চেষ্টা করেছিল। ইতিহাসের রথের চাকাকে ওরা ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছিল। বিংশ শতাব্দির পরে উনবিংশ। তারপর অষ্টাদশ। এমনি করে ওরা আমাদের একেবারে মধ্যযুগের গভীর অন্ধকারে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কারণ ওরা ইতিহাসের নির্মম গতিকে বুঝতে পেরেছিল। বুঝতে পেরেছিল ১৪ই আগস্ট, ১৯৪৭ সালেই। বাংলাদেশ ইতিহাসের নির্যাতিত দেশ। কৃষকপ্রধান দেশ। আবহমান কাল থেকে সে অত্যাচারিত হয়ে এসেছে। জমিদারের হাতে। জোতদারদের হাতে। মুক্তি চেয়েছিল সেই মানুষ এই অত্যাচার থেকে। স্বাধীন হতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের নিজস্ব শ্রেণির চেতনা ও সংগঠনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সামন্তবাদী নেতারা বুঝিয়েছিল হিন্দুরাই তোমার শত্রু। তোমরা মুসলমান। নির্ভেজাল মুসলমান রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেই তোমরা মুক্তি পাবে। বাংলাদেশের মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছিল। ঠিক আছে। জমিদার, জোতদার, মহাজনের অত্যাচার থেকে ‘মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ’ বললে যদি আমরা মুক্তি পাই, তবে আমরা বলছি মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ। মুসলিম লীগের আওয়াজ তুললে যদি জমি পাই তবে তুলছি সেই আওয়াজ। বলছি-নারায়ে তকবীর... এই আওয়াজের জোরেই এসেছিল ১৪ই আগস্ট, ১৯৪৭। কিন্তু ১৪ই আগস্টের পরে তো মুসলমানী আওয়াজের অবকাশ ছিল না। এবার তো হিসাব নিকাশের পালা। কোথায় আমাদের মুক্তি? আমাদের লাঙ্গল? আমাদের জমি? আমাদের কারখানা? আমাদের ভাষা? আমাদের সংস্কৃতি? সামন্তবাদী মুসলিম লীগ নেতৃত্ব বুঝেছিল: এবার সিংহ খাঁচামুক্ত। বিভ্রান্তির শেকল ছেঁড়া। এবার যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আর আপোষের জায়গা নেই। বাঁচার উপায় নেই। তাই ১৪ই আগস্টের পরে সাম্প্রদায়িকতার বিলোপ ঘটলো না। পাকিস্তান সরকার ধর্মীয় গোঁড়ামীকে পুনর্জাগরিত করার অধিকতর সচেতন চেষ্টায় নেমে পড়ল। আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের সমস্ত শক্তি সে নিয়োগ করল বাংলাদেশের মানুষের মনে ধর্মীয় কুসংস্কার সৃষ্টি করতে। মুক্তবুদ্ধি তরুণের সব প্রতিবাদ আর হুঁশিয়ারীকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র আঁটতে শুরু করল। চেষ্টা করল সে বাঙ্গালীর মন থেকে দেশীয় ঐতিহ্য মুছে ফেলতে। চেষ্টা করল তার মনে আত্মধিক্কার আর হীনমন্যতা সৃষ্টি করতে। কিন্তু সিংহ তখন খাঁচামুক্ত। এবার সে আওয়াজ তুলল: দেশের শাসক আমরা। দেশের রাজধানী সিব আমাদেরী অংশে। দেশের শাসনতন্ত্রে আমাদের প্রয়োজনের প্রতিফলন ঘটবে। দেশের সেনাবাহিনী আমরা গড়ব। দেশের শিল্প আমরা তৈরি করব। পাকিস্তানী শাসক চক্র বুঝল-এবার শেষ মোকাবিলার পালা। ইতিহাসের চাকা ঘর ঘর শব্দ তুলছে। ও অগ্রসর হবেই। তবু যেমন করে পার ওকে ঠেকাও। বিভ্রান্তিতে না পারো অস্ত্র ধরো। গুলি করো। আগুনের বুকে গুলি করো। কিন্তু সে গুলিতে আগুন নিভল না। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। এখানকার টুকরা ছড়িয়ে পড়ল ওখানে। সেখানে। সব খানে। পাকিস্তানী সরকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছ থেকে সর্বাধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত হতে লাগল। সিয়াটোর নামে। সেন্টোর নামে। কমিউনিস্ট বিরোধিতার নামে। এক ইউনিট তৈরি করল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এককাট্টা হওয়ার জন্য। আসলে ওরা তৈরি হচ্ছিল ২৫শে মার্চের জন্য। ওরা জানত একুশে ফেব্রুয়ারি ক্রমান্বয়ে বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হবে। সে ৫৪, ৬২, ৬৬, ৬৮, ও ৬৯ এর পথ ধরে ৭০-এর ঢেউ তুলে ৭১-এ উত্তাল হয়ে উঠবে। মিত্রের চেয়ে শত্রুর কানই খাড়া বেশি। সে কানে সমুদ্রের উচ্ছ্বাস ধরা পড়ছিল। তাই ওদের কাঁপুনি। তাই ওদের ভয়ার্ত চিৎকার। তাই ওদের ২৫শে মার্চ রাত্রির অন্ধকারে অন্ধ বর্বরতায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া। মূর্খ ভাবল নিশ্চিহ্ন করে দেবে বাঙালি জাতিকে। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করে। আমরা মরেছি লক্ষে লক্ষে মরেছি। কিন্তু ইতিহাসে মৃত্যুর চেয়ে জীবন বড়। তাই লক্ষ কোটির মৃত্যুর ওপর দিয়েও ইতিহাস অগ্রসর হয়। ইতিহাস বর্বর পাকিস্তানকে তার মূর্খতা আর বর্বরতাসহ ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছে। ২৪ বছরের প্রতি মুহূর্তে তিক্ত অভিজ্ঞতার ভিতরে বাংলার শ্রমিক, কৃষক আর গরিব মধ্যবিত্ত এবং তাদেরই সন্তান-সন্ততি জন্ম দিয়েছে তিনটি আওয়াজের, তিনটি শ্লোগানের: সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতা। এ আওয়াজ কোন ব্যক্তি বা দলের কল্পনাবিলাস নয়, বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়, দয়ার দান নয়। এ আওয়াজ নিয়ে খেলা করার উপায় নেই। এদের পর্যায়ক্রমকে যেমন ইচ্ছা তেমন করে সাজাবার অধিকার নেই। না কোন ব্যক্তির, না দলের কিংবা রাষ্ট্রশক্তির। কথাটা এই নয় যে, সমাজতন্ত্র আসবে ক্রমান্বয়ে এবং সব শেষে। পৃথিবী গ্রহের সেই অষ্টাদশ শতকীয় জীবন আজ মৃত। সমাজতন্ত্র আজ বাঙালির জীবনে কোন পরিণাম নয়, এ তার অনিবার্য বর্তমান। এই বর্তমানের উপরই মাত্র অপর সব কিছুর আগমন। সমাজতন্ত্র কি? কোন্ রকমের সমাজতন্ত্র? ডেমোক্রাটিক না অটোক্রাটিক? এ প্রশ্নের খেলায় কোন লাভ নেই। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির জীবনের সমস্যার বাস্তব সমাধানের উপরই সমাজতন্ত্র। সেই সমাধানের নামই সমাজতন্ত্র। কেউ একে ঠেকাবার চেষ্টা করতে পারে। একে পাশ কাটাবার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হবে না। ২৪ বছরের শোষণে তারা আজ মানুষেতর পর্যায়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সংকট মুহূর্তে। বাংলার স্বাধীনতার সংগ্রাম এই শোষিত মানুষেরই মুক্তির সংগ্রাম। রক্তের যে নদী বয়েছে তাতে উচ্ছাস এনেছে তাদেরই বুকের রক্ত। সেই মানুষের বেঁচে থাকা আর বিকাশের জন্য সমাজতন্ত্রবাদের বিকল্প কোন পথ নেই। তার কৃষির সমস্যা সমাধানের জন্য জোতদারীর সম্পূর্ণ উচ্ছেদ ঘটাতে হবে। জমির পরিমাণ কৃষকের নিজস্ব শ্রেণীসংগঠনের প্রস্তাব মতো পরিবার প্রতি হ্রাস করতে হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য যৌথ চাষের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্র প্রয়োগ করতে হবে। জাতীয় শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে। জমির ওপর থেকে মানুষের চাপ কমাতে হবে। বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিক জানে আলাউদ্দীনের প্রদীপ হাতে নিয়ে কেউ তার ভাগ্য বদলে দেবে না। কিন্তু এ বিকাশের জন্য আপসহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ-আলাউদ্দীনের চেরাগের কারসাজী নয়। সে সিদ্ধান্তে কোন দ্বিধা কিংবা বিলম্বের অবকাশ নেই। সমাজতান্ত্রিক বিকাশের এই সিদ্ধান্ত এবং প্রতিমুহূর্তে তার দৃঢ় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই বিকাশ লাভ করবে রাজনৈতিক গণতন্ত্র: ক্ষেতে-খামারে, মাঠে-ময়দানে, বিদ্যালয়ে-কলেজে এবং নির্বাচিত পরিষদে সর্বত্র সর্বমুহূর্তে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আলোচনায়, কর্মপন্থা নির্ধারণে, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজনীয় পুনর্বিন্যাসের প্রচেষ্টায়, শাসনতন্ত্র তৈরিতে সর্বজনের সর্বক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে অংশ গ্রহণের সুযোগে। ধর্মনিরপেক্ষতা দৃঢ়মূল হবে সমাজতন্ত্রের বিকাশে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠায়। বিকাশের অবাধ সুযোগে ব্যক্তি আর ব্যক্তিকে শত্রু মনে করবে না। সম্প্রদায় সম্প্রদায়কে নিজের উন্নতির পথে প্রতিবন্ধক বলে বিবেচনা করবে না। অতীতের মোহের মধ্যে নয়, সমাজতন্ত্র থেকে সাম্যবাদে উত্তরণের মহৎ স্বপ্নে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে বিভেদ নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সমগ্র জনশক্তির ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে বাঙালী নূতন মানবিক মূল্যে বলিয়ান হয়ে উঠবে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীতে নতুন আত্মশক্তির বোধে সে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠবে। ধর্মীয় বিশ্বাস তখন ব্যক্তির মানসিক শান্তির উপায় হিসেবে লালিত হতে পারবে। সে আর শোষণ কিংবা ত্রাসের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। শ্রেণী হিসাবে মধ্যবিত্ত দোদুল্যচিত্ত। সহজ সমাধানের আলেয়া তাকে মোহগ্রস্ত করতে চায়। ব্যক্তিগত সম্পদের আকর্ষণ তাকে আপোষ আর নীতিবিচ্যুতির পিচ্ছিল পথে ঠেলে দিতে চায়। তার অহমিকার উপর প্রশংসার প্রলেপ বুলিয়ে তাকে মোহিত করতে চায় আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী দুষ্টচক্রের দল। কিন্তু শ্রমিক ও কৃষকের ঐক্যবদ্ধ শক্তির দ- মধ্যবিত্তকে সংগ্রামের কাতারে জনতার বৃহত্তর স্বার্থের সড়কে অবিচল রাখতে পারে। জনতার সংগঠিত শক্তিই তার চালক। জনতার চেতনাই তার বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারী। বাংলাদেশের ন্যায় স্বাধীন কিন্তু অনুন্নত দেশের সম্মুখে সমাজতান্ত্রিক বিকাশের মহাসড়ক আজ উন্মুক্ত। এ সড়ক উন্মুক্ত হয়েছে সতের সালের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সংঘটনে এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে তীব্রতম আঘাতের মধ্যেও তার আত্মরক্ষা এবং বিজয় লাভের মাধ্যমে। দুনিয়া আজ সমাজতন্ত্র ও সম্রাজ্যবাদের দুটি শক্তিতে বিভক্ত। স্পষ্টতঃই শতাব্দির গোড়াতে যে শক্তির উদ্বোধন ঘটেছে শতাব্দীর শেষে তার চূড়ান্ত বিজয়ের আভাস। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, যন্ত্রের কৌশলে, শিল্পকৃষির বিকাশে, শিক্ষা সংস্কৃতির সর্বজনীনতায় সমাজতান্ত্রিক শিবির আজ সাম্রাজ্যবাদের এক কালের ভীতিপ্রদ একচ্ছত্র শক্তিকে অতিক্রম করে গেছে। শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়। প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ক্ষেত্রেও সাম্রাজ্যবাদ নিজেকে আজ আর অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনা করতে সাহস করে না। বাংলাদেশের মুক্তির সংকটজনক পর্যায়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সপ্তম নৌ বহরের বঙ্গোপসাগরে আবির্ভাব যেমন আকস্মিকভাবে ঘটে নি, তার অন্তর্ধানও তেমনি বিনা কারণে ঘটে নি। ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীর ভিত্তিতে সোভিয়েটের রক্তচক্ষুর সামনে সাম্রাজ্যবাদকে নতি স্বীকার করতে হয়েছে। ঘটনাটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সমাজতান্ত্রিক বিকাশের মহৎ ইচ্ছায় উদ্বুদ্ধ কোনো জাতি আজ অসহায় নয়। মিত্রহীন নয়। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্যে একদিন বিশ্বের বিবেকবান মানুষ কেঁদে উঠেছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের সৌভাগ্যে সে নিশ্চয়ই ঈর্ষাবোধ করবে, গর্বে স্ফীত হয়ে উঠবে। (ঈষৎ সংক্ষেপিত) লেখক : বিশিষ্ট দার্শনিক, শিক্ষাবিদ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..