যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা

চুক্তি তো না, করদ রাজ্য বানানোর প্রস্তুতি!

ঐশ্বর্য সৌরভ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বিশ্ব বাণিজ্যে দিন দিন চীনের কাছে পিছিয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন ভালো ফন্দি এঁটেছে। নিজেদের গড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে দিয়ে এখন সরাসরি আলাদা আলাদা দেশের সঙ্গে আলাদা আলাদা চুক্তির পথে হাঁটছে। যদিও আদতে বোঝা যাচ্ছে যে তারা বিভিন্ন দেশের বাজারে চীনকে দুর্বল করে নিজেদের আধিপত্য জোরদার করতে চায়। এক্ষেত্রে দুনিয়াদারির কোনো নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা তারা করবে না। এক সময় সম্পদের জোরে, কোথাও কোথাও সরকারকে রেখে বা নামিয়ে, নানান বাণিজ্যিক সুবিধাদি, লোভ-প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন দেশকে কব্জায় নিত তারা। পরে অস্ত্রের জোর দেখিয়ে ছদ্ম-দখলে রাখার ব্যবস্থা করতো। এখন গোপন লেনদেন, বা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে কাজ হচ্ছে না, তাই সরাসরি বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে জোরজবরদস্তি নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার উদ্যোগ হাতে নিয়েছে তারা। ব্রিকসকে নিয়ে ভয় পেয়ে তার ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে। মিত্র-শত্রু সবাইকে শুল্ক নিয়ে দৌড়ের ওপর রেখেছে। হিসাব পরিষ্কার, তাদের পণ্যের জন্য অন্যদের বাজার খুলে দিতে হবে, কিন্তু তারা ঠিকই অন্যদের ওপর শুল্ক আরোপ করে যাবে। দুই দিক থেকেই যাবতীয় সম্পদ ও লাভ নিজেদের ভূখণ্ডে, নিজেদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হাতে নিয়ে যেতে চায় তারা। এভাবে দুনিয়ায় ‘এককেন্দ্রীক’ জমিদারি প্রথা বলবৎ রাখা হবে। শক্তিশালী দেশগুলো তাও যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে একে অন্যের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে, কোনো কোনো পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মেনে, বাজার অন্যদিকে সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু ছোট অর্থনীতির দেশগুলো? এদের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন নিয়েছে পিষে ফেলার নীতি। যার উদাহরণ বাংলাদেশকে দেওয়া তাদের সাম্প্রতিক প্রস্তাব। এই প্রস্তাব নিয়ে যেন দেশের ভেতরে কেউ আলাপ-আলোচনা না করতে পারে সেই ‘এমবার্গোও’ দেওয়া হয়েছে। আলোচনার সবকিছু থাকবে গোপন। তাও করা হচ্ছে কাদের সঙ্গে? অনির্বাচিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে, যাদের পরে আর জবাবদিহিতার মধ্যে পাওয়া যাবে না। এমন এক ‘ফাটা বাঁশের চিপা’ অবস্থায় বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। কি কি প্রস্তাব দিয়েছে তারা, চলুন দেখি- বাংলাদেশকে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম আমদানিতে অগ্রাধিকার দিতে এবং চীনের সামরিক পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে বলা হয়েছে। জাতীয় বিমান সংস্থা বিমানের মাধ্যমে মার্কিন বেসামরিক উড়োজাহাজ ও যন্ত্রাংশ কেনার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি খাতে, বিশেষ করে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে বলা হয়েছে, যাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর স্থায়ী বাজার নিশ্চিত হয়। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে (যেমন খাদ্য সহায়তা) যুক্তরাষ্ট্রের গম আমদানি বাড়ানোর শর্ত আছে। সামরিক বাহিনী ও সরকারি সংস্থাগুলোর জন্য মার্কিন সয়াবিন তেল আমদানির শর্ত রয়েছে এবং এসব তেল সংরক্ষণের জন্য মার্কিন কোম্পানির অংশীদারিত্বে অবকাঠামো গড়ার কথাও বলা হয়েছে। জাহাজ নির্মাণ ও শিপিং খাতে মার্কিন সমমানের কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করতে হবে, যেন নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে মার্কিন স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা হয়। চীনের তৈরি লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার লগিংক, যা পণ্য পরিবহনের তথ্য ও গতি ট্র্যাক করতে ব্যবহৃত হয়, তা ব্যবহার নিষিদ্ধ করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য সংস্থা বিআইএসের (ব্যুরো অব ইন্ড্রাস্টি অ্যান্ড সিকিউরিটি) পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো মার্কিন পণ্য রপ্তানি বা পুনঃরপ্তানি করা যাবে না— এর জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও কাঠামো গড়তে হবে। মার্কিন উৎপাদিত ও নিয়ন্ত্রিত পণ্যের কাস্টমস সংক্রান্ত সব তথ্য মার্কিন কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ করতে হবে, যেন তারা লেনদেন শনাক্ত করতে পারে। বাংলাদেশকে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করতে বলা হয়েছে, যাতে আইন ভাঙলে সিভিল ও ক্রিমিনাল ব্যবস্থা নেওয়া যায়, এবং প্রয়োজনে এসব প্রয়োগে যুক্তরাষ্ট্রকে অংশীদার করতে হবে। এছাড়া, যেসব সফটওয়্যার বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়াতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশকে আরও বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা কাঠামো সিবিআরপি (ক্রস বর্ডার প্রাইভেসি রুলস) এবং পিআরপির (প্রাইভেসি রিকগনিশন ফর প্রসেসরস) স্বীকৃতি দিতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াকরণের নীতিমালা প্রণয়নে মার্কিন সরকার এবং দেশটির বেসরকারি খাতের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাইবার অপরাধে আরও কঠোর সাজা নিশ্চিত করতে হবে। ২০২১ সালের ওটিটি (ইন্টারনেটভিত্তিক ভিডিও সেবা) নীতিমালা বাতিল বা সংশোধন করতে হবে, যাতে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনযুক্ত সেবাগুলোর ক্ষেত্রে শনাক্তকরণ বা নজরদারির শর্ত না থাকে। আরও বলা হয়েছে, ৬০০ থেকে ৭০০ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ এলপিআই (লো পাওয়ার ইনেডার) ও ভিএলপিআই (ভেরি লো পাওয়ার ইনডোর) ব্যবহারকারীদের জন্য খুলে দিতে হবে— যাতে প্রযুক্তি খাতে মার্কিন ডিভাইস ও সেবা সহজে প্রবেশ করতে পারে। এগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে যে তিন ধরনের শুল্ক (কাস্টমস ডিউটি, সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি ও রেগুলেটরি ডিউটি) আরোপ করা হয়, সেগুলো কমাতে বলা হয়েছে, যাতে মার্কিন পণ্য সস্তায় ও অবাধে বাংলাদেশি বাজারে প্রবেশ করতে পারে। শ্রম ও পরিবেশ খাতে ভালো ভালো কিছু শর্তের কথা বলা হলেও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতে-যেমন ওষুধ, কৃষি, খাদ্য, মোটরগাড়ি, যন্ত্রাংশ, পুনঃউৎপাদিত পণ্য-মার্কিন পণ্যের প্রবেশে যেন কোনো নিয়মগত বাধা না থাকে, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। চিকিৎসা যন্ত্রপাতিতে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফডিএ-র সনদ বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করতে হবে এবং বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সংগঠন আইএমডিআরএফের সদস্য হতে হবে। ওষুধ খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর কোনো তদারকি বা প্রশ্ন তোলার সুযোগ না রেখে এফডিএ সনদকে বৈধতা দিতে হবে। মোটরগাড়ি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে কোনো বাড়তি পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা মানদণ্ড প্রয়োগ করা যাবে না; শুধু মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএমভিএসএসের সনদ থাকলেই চলবে। পুনঃউৎপাদিত (রি-ম্যানুফ্যাকচার্ড) পণ্যে কোনো বাড়তি লাইসেন্স বা শর্ত বসানো যাবে না। কৃষি খাতেও মার্কিন স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করতে বলা হয়েছে, এমনকি হালাল সার্টিফিকেটও মার্কিন সংস্থার দেওয়া সনদ অনুযায়ী মানতে হবে। আমদানি সনদের নিয়ম দ্রুত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে জানাতে হবে এবং মার্কিন কৃষি ও খাদ্যপণ্য আমদানিতে কোনো পূর্বানুমতি বা লাইসেন্স চাওয়া যাবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, বাংলাদেশে মেধাস্বত্ব আইন আইপিআর সঠিকভাবে মানা হয় না এবং এর ফলে নকল পণ্যের বিস্তার ঘটছে। এখন তারা সরাসরি ১৩টি আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কনভেনশনে যুক্ত হওয়ার শর্ত দিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে- ব্রাসেলস কনভেনশন, মাদ্রিদ প্রটোকল, প্যাটেন্ট আইন চুক্তি, মারাকেশ চুক্তি, সিঙ্গাপুর চুক্তি, হেগ এগ্রিমেন্ট, বুদাপেস্ট এগ্রিমেন্ট ইত্যাদি। বাংলাদেশে যেসব সেবা কোম্পানির জন্য বাধ্যতামূলক পুনঃবিমার (রি-ইন্স্যুরেন্স) নিয়ম রয়েছে, তা বাতিল করতে হবে। এছাড়া, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সার্ভিস ডমেস্টিক রেগুলেশন কাঠামোতে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। মার্কিন কোম্পানিগুলোর যেসব পাওনা আছে তা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে এবং তাদের লাভ দেশে ফিরিয়ে নিতে কোনো বাধা রাখা যাবে না। তেল, গ্যাস, টেলিকম, ইনস্যুরেন্স—এই খাতে মার্কিন মালিকানার অংশীদারিত্ব বাড়ানোর জন্য বিদ্যমান মালিকানা সীমা শিথিল করতে হবে। মার্কিন ব্যবসায়ীরা যেন সহজেই অনুমতিপত্র বা এনওসি পায়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। আমরা যদি এসব শর্ত পূরণ করি তাহলে শুল্ক বাদ হবে ব্যাপারটা এমন নয়, কিছুটা কমে আসবে। অন্যদিকে আমাদের নিজস্ব বা আঞ্চলিক নিয়মকানুনের আর কোনো কাঠামোই থাকবে না। আদতে বাণিজ্য ও কর কাঠামো পুরোটাই যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে চলে যাবে। দেশীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বলে কিছু থাকার সুযোগই থাকবে না। এখন সরকার হয়তো বলবে, এগুলো তো ওদের প্রস্তাব, আমরা কিছু মানবো, কিছু মানবো না। কিন্তু বাণিজ্য, কর, সেবা, আইটি খাতে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, তার একটিও কী আমাদের মেনে নেওয়ার সুযোগ আছে? বিন্দুমাত্র ছাড় দিলেও নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তো দূর, এত দুর্নীতি-এত অনিয়মের মধ্যেও যেসব শিল্প খানিকটা হলেও উঁকিঝুঁকি মারছিল সেগুলোও নিঃশেষ হয়ে যাবে। আমরা পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বো, সরাসরি রাজ্য করবে না তারা, হবো করদ রাজ্য। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, যেসব শর্ত আমাদের ওপর চাপানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সব রাজ্যেও এতসব নিয়ম কানুন মানে না। প্রবণতা পরিষ্কার, আমাদের তত্ত্বাবধায়করূপী এই সরকারের নিমরাজি ভাবও স্পষ্ট। যে কর্মকর্তা এই গোপন (অবশ্যই দেশবিরোধী) চুক্তি সংক্রান্ত নথি ফাঁস করে দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়ে গেছে। তাহলে এত যে স্লোগান হচ্ছে, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা-ঢাকা’, ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা-ঢাকা’ সেইসব হট্টগোলের মধ্যে আমরা তবে ওয়াশিংটনের মুঠোয় ঢুকে যাবো?

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..