ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন প্রসঙ্গ
মোহাম্মদ আলতাফ হোসাইন
ব্রিটিশ শাসনামলে পাক-ভারত উপমহাদেশে কৃষকদের যতগুলি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে বিংশ শতাব্দিতে চল্লিশের দশকের শেষ ভাগে (১৯৪৬-৪৭ সালে) তেভাগা আন্দোলন ছিল অন্যতম ও ঐতিহাসিক। এই আন্দোলনের যেমন ছিল ব্যাপকতা তেমনই লড়াকু তাৎপর্য। তেভাগা আন্দোলন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের উত্তরের জলপাইগুড়ি জেলা থেকে শুরু করে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থিত খুলনা জেলা পর্যন্ত বৃহত্তর প্রায় ১৯টি জেলাব্যাপী বিস্তৃত ছিল। আজকের আলোচনায় কেবল তৎকালীন বৃহত্তর দিনাজপুর জেলায় এই আন্দোলনের ব্যাপকতা কতটুকু বিস্তার লাভ করেছিল তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবো।
সূচনালগ্নে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথার বদৌলতে দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় দোদণ্ড প্রতাপশালী জমিদারদের নিয়োগকৃত তালুকদার ও জোতদার শ্রেণির দৌরাত্ম্য ও জুলুম-নির্যাতনের যে সীমাহীন নজির সৃষ্টি হয়েছিল তারই ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয়েছিল এই তেভাগা আন্দোলন। ব্রিটিশ শাসনামলের পূর্ব পর্যন্ত কৃষিজমির ওপর মালিকানা কৃষকদের হাতেই ন্যস্ত ছিল। রাজা, বাদশা বা সম্রাটরা একটা বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে জমির খাজনা হিসেবে সামান্য অংশ গ্রহণ করত। কিন্তু ব্রিটিশরা ক্ষমতা দখলের পর এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে জমির মালিকানা ন্যস্ত করা হয় জমিদারদের ওপর। আর সেই থেকে জমিদারেরা তাদের জমিদারি ব্যবস্থার অধীনে তালুকদার, জোতদার ইত্যাদি নানা স্তর তৈরি করে প্রকৃত কৃষকদের ওপর চড়াও হয় বহুমাত্রিক জুলুম ও অত্যাচার নিয়ে। জমি আবাদে কৃষকরা নিজেদের হাল, বলদ এবং গাই গরুর গোবর সার ব্যবহার করলেও জোরদাররা সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে কেবল জমির মালিকানার জোরে কৃষকের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগই নিয়ে নিতো। মাত্র এক ভাগ রাখা হতো কৃষকের জন্য। এরা এই সময়ে নানা কোরালী বা সুদের ব্যবসার ফাঁদ তৈরি করে কৃষকদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে শুরু করে। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের মাত্র এক ভাগ নিয়ে সারাবছর চলতে পারতো না। তার উপরে তখন এই জোরদাররা খুলে বসেছিল তাদের সুদের ব্যবসা। এক মণে দেড় মণ, কখনো কখনো তা দুই মণে উন্নীত হতো। আর এর ফলে ফসল উৎপাদন শেষে জোতদারদেও কোরালী সুদের দেনা পরিশোধ করে কৃষকের হাতে শুধু তার হাতের ডালি আর কুলা ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকতো না। এর বাইরেও জোতদারের খোলানের ভাড়া, ঘোড়ার খাওয়া বাবদ ধান, পূজা-পার্বণ বাবদ চাঁদা ইত্যাদি নানা তেলেসমাতি কায়কারবার প্রতি ফসলের মৌসুমে লেগেই থাকত। ফলে ফসল মাড়াইয়ের পর কৃষককে শুধু ডালি আর কুলা নিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে হতো। আর এর ফলে ফসল মাড়াইয়ের সাথে সাথেই কৃষককে পুনরায় জোতদারের কাছে গিয়ে ধর্না দিতে হতো নতুন করে ধার কর্জের জন্য। আর তাই তেভাগা আন্দোলনের দাবিগুলিই ছিল জমিদার ও জোতদারদের এইসব জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য।
তেভাগা আন্দোলনের বেশ কয়েকটি দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো “আধি নয় তেভাগা চাই, নিজ খোলানে ধান তোল, কর্জ ধানের সুদ নাই”- ইত্যাদি।
আগামী ৪ জানুয়ারি তেভাগা আন্দোলনের প্রথম শহীদ সমিরউদ্দিন ও শিবরাম মাঝির আত্মত্যাগের এক গৌরবোজ্জ্বল দিন। প্রতি বছর এই দিনটি স্মরণে দিনাজপুরের সকল বাম গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ঘরানার মানুষ একত্রিত হয়ে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কারণ, ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের প্রথম সূচনা হয়েছিল তৎকালীন বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার (বর্তমানে পঞ্চগড় জেলার অন্তর্ভুক্ত) আটোয়ারী উপজেলায় এবং এই আন্দোলন করতে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে রক্ত ঝরিয়ে প্রথম শহীদের মর্যাদা অর্জন করেছিলেন জেলারই দুজন কৃতি সন্তান। বিংশ শতাব্দির চল্লিশের দশকে তেভাগা আন্দোলন যখন সূচনা পর্ব পেরিয়ে একটা উত্তাল ডেউ নিতে শুরু করেছিল ঠিক এমনই এক পর্যায়ে দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার ভিয়াইল ইউনিয়নের বাজিতপুর ও তালপুকুর গ্রামের সঙ্গমস্থলে চেন্দুর বটতলায় ঘটেছিল এই লোমহর্ষক ঘটনা। জোতদাররা ভেবেছিল এ আর কী, এক তুড়িতেই নিপীড়িত কৃষকদের উড়িয়ে দেয়া যাবে। তাই তারা সাহায্য নিয়েছিল ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ বাহিনীর। শহর থেকে পুলিশ এনে কৃষকদের তারা কঠিন শায়েস্তা করতে চেয়েছিল। কিন্তু একটা দীর্ঘদিনের জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়ে কৃষকরা যে ঘুরে দাঁড়াতে ভেতরে ভেতরে সংঘটিত হতে শিখেছে এটা হয়তো তাদের হিসাবের মধ্যেই ছিলো না। তাদের ধারণা ছিল ভুখা-নাঙ্গা এই অশিক্ষিত কৃষকদের আর কীইবা করার শক্তি আছে। দু-চারটা কৃষককে পুলিশ দিয়ে দাবড়ানি দিলেই সব ঠান্ডা হয়ে যাবে। কিন্তু কৃষকরা যে আর সেই অবস্থানে নেই, তারা যে এখন সচেতন এবং সংগঠিত সে কথা জোতদাররা অনুমানই করতে পারে নাই। তাই তারা দুজন কৃষককে গ্রেফতার করে দড়ি দিয়ে বেঁধে থানায় নিয়ে যেতে উদ্যত হয়েছিল। খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই শত শত কৃষক সেদিন পুলিশের এই কর্মকাণ্ডকে বাধা দিতে সংগঠিত হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে পুলিশের একগুঁয়েমি আচরণের কারণে সেইদিন অকালে ঝরে যায় দুই কৃষকের তাজা প্রাণ। তাদের বুকের রক্তে লাল হয় চেন্দুর বটতলার জমিন।
তবে এই আন্দোলনের লড়াকু রূপ যেমন দিনাজপুর জেলা, একই ভাবে আন্দোলন করতে গিয়ে জেলার নানা স্থানে শহীদের মর্যাদাও অর্জন করেছিলেন সেখানকার বাসিন্দারা। জেলার খাপুর নামক এলাকায় (বর্তমানে এই স্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় অবস্থিত) এই লড়াই করতে গিয়ে সর্বমোট ২২ জন কৃষক শহীদ হয়েছিলেন। এই জেলার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নেতাদের মধ্যে গুরুদাস তালুকদার, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, বরদাভূষণ চক্রবর্তী, রুপনারায়ণ রায়, কালী সরকার, খাপড়া ওয়ার্ডে নিহত কম্পরাম সিং, হেলকেতু বর্মণ, এই রকম আরো অসংখ্য নেতাকর্মীর নাম জড়িত। হাজী মোহাম্মদ দানেশ এর নামে এই জেলায় অবস্থিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়েছে। যা হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত। এই আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্বের দিকটি হলো শ্রেণিচেতনা ও শ্রেণিসংগ্রামের দিক থেকে একটি শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে একটি শোষিত শ্রেণির জীবন সংগ্রামের লড়াই। এছাড়াও এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি প্রগতিশীল লড়াই।
তেভাগা আন্দোলনে প্রথম কোনো কৃষকের শহীদ হওয়ার ঘটনাটি এবং ঘটনাস্থলকে স্মরণীয় করে রাখতে চিরিরবন্দর উপজেলার চেন্দুর বটতলায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতি বছর ৪ জানুয়ারি সকালে শহীদদের স্মরণে নির্মিত ঐ স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। শহীদ বেদীর পাদদেশে হয় আলোচনা সভা। গত বছর প্রথমবারের মতো এই আলোচনা সভাটি ঐদিন সন্ধ্যায় দিনাজপুর শহরে অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে শহরের মানুষের মাঝে তেভাগা আন্দোলনের চেতনাকে নতুন করে ছড়িয়ে দেয়ার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন