দলীয় নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন ভোটে মানুষের সাড়া বেশি

রুহুল আমিন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১১টি। এর মধ্যে দলীয় সরকার বা ক্ষমতাসীনদের অধীনে ৭ টি এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ৪টি। বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত একাদশ সংসদ নির্বাচন বাদ দিলে দলীয় সরকারের অধীনে গড় ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, পক্ষান্তরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে গড় ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। দলীয় সরকারের চেয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোটার উপস্থিতি ২৬ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। নির্বাচন কমিশন আগামি ৭ই জানুয়ারি ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। অন্যদিকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল। ইশতেহার ঘোষণার পরদিন তা প্রত্যাখ্যান করে, তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচনেরে দাবিতে অর্ধবেলা হরতাল পালন করে বাম গণতান্ত্রিক জোট। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি ও তার শরিকরা লাগাতার হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে। সংবিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর আওয়ামী লীগ, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অনড় বিরোধীপক্ষ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে কোন দেশের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হারকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। বিগত ১১টি নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোটার উপস্থিতির হার অনেক বেশি। ৭ই মার্চ ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয় লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সরকার গঠন করে। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে এগারোটি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। মোট ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ। দলীয় সরকারের অধীনে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ সালে। নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জয় লাভ করে; তারা জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন লাভ করে। আওয়ামী লীগ ৩৯ টি আসন লাভ করে। মোট ভোট সংগৃহীত হয়েছিল ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ। দলীয় সরকারের অধীনে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৭ই মে ১৯৮৬ সালে । নির্বাচনে মোট ১, ৫২৭ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করে। জাতীয় পার্টি ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসন নিয়ে জয় লাভ করে। আওয়ামী লীগ ৭৬ টি আসন লাভ করে। মোট ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬১ দশমিক ১ শতাংশ। দলীয় সরকারের অধীনে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৩ মার্চ ১৯৮৮ সালে । নির্বাচনটি দেশের অধিকাংশ প্রধান দলই বর্জন করেছিল; যেমন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (মুজাফ্ফর) এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। নির্বাচনে জাতীয় পার্টি জয় লাভ করে, তারা ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৫১টি আসন লাভ করে। মোট ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ। ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে ৮৪টি আসনে। এছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ৫টি আসনে, জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসনে এবং জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে জয়লাভ করে। এই নির্বাচনে বিজয়ী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি। তবে নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় কোন দল সরকার গঠনের জন্য একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। বিএনপির সাথে আলোচনা করে একপর্যায়ে জামায়াতে ইসলামী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠির মাধ্যমে বিএনপিকে সমর্থন দেবার কথা জানায়। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিএনপি সরকার এক বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করে। দেশের সবকটি বড় রাজনৈতিক দল সে নির্বাচন বয়কট করেছিল। নির্বাচনের দিন বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতায় অন্তত ১০ জনের নিহত হবার খবর প্রকাশিত হয় সংবাদপত্রে। ৩০০ আসনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৫০টি আসনে। ৪৬টি আসনে একাধিক প্রার্থী না থাকায় বিএনপির প্রার্থীরা ভোটের আগেই নির্বাচিত হয়ে যান। ভোটার উপস্থিতি ছিল ২০ শতাংশ। পরবর্তীতে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় সরকার। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ই জুন ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৪৬ টি আসন এবং বিএনপি পেয়েছিল ১১৬টি আসন। এছাড়া জাতীয় পার্টি ৩২টি এবং জামায়াতে ইসলামী তিনটি আসনে জয়লাভ করেছিল। সরকার গঠন করার জন্য কোন দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এর মাধ্যমে ২১ বছর পরে ক্ষমতার মঞ্চে ফিরে আসে দলটি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনা জানান, নির্বাচনে ৭৩ শতাংশ ভোট পড়েছে এবং নির্বাচনে কারচুপির কোন সুযোগ ছিল না। ১৯৯৬ সালের ১৯ শে মার্চ বাংলাদেশে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের প্রথম যে অধিবেশন শুরু হয়, তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা। অধিবেশনের চতুর্থ কার্যদিবস অর্থাৎ ২৪শে মার্চ রাতে জাতীয় সংসদে সংবিধানে যুক্ত করার জন্য বাছাই কমিটির রিপোর্টসহ বিলটি উত্থাপন করা হয়। ২৬ শে মার্চ ভোররাতে বহুল আলোচিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল সংসদে পাশ হয়। জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে ১৯৯৬ সালের ২৩ শে জুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। ২০০১ সালে মেয়াদ শেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে আওয়ামী লীগ সরকার। ১ অক্টোবর ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত অস্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী জোটবদ্ধ হয়ে এই নির্বাচনে অংশ নেয় এবং জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমদ ও সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে সেনা শাসন পেরিয়ে ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২৩০টি আসন। অন্যদিকে বিএনপি পেয়েছিল মাত্র ৩০টি আসন। পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশে সর্বশেষ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। সে নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ গত ১৫ বছর যাবত একটানা ক্ষমতায় রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের হিসেব অনুযায়ী ২০০৮ সালের সাধারন নির্বাচনে ৮৬.২৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালে । এ নির্বাচনটি নবম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ অধিকাংশ দলই বর্জন করে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্রসহ ১৭টি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এছাড়াও নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় নির্বাচনটি নিয়ে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বাকি আসন গুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৪৭ শতাংশ। দলীয় সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২৫৮টি আসনে জয়লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে শেখ হাসিনাকে প্রধান করে সরকার গঠন করে এবং জাতীয় পার্টি ২২টি আসনে জয়লাভ করে বিরোধীদলের মর্যাদা পায়। এই নির্বাচন ঘিরে জনমনে নানা বিতর্ক রয়েছে। কোন কোন জায়গায় ১০০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি, মৃত মানুষের আইডি দিয়ে ভোট, দিনের ভোট রাতে অনুষ্ঠিত হওয়া, কেন্দ্র দখলসহ নানা অভিযোগে বিতর্কিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। সামগ্রিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় দলীয় সরকারের অধীনে যেখানে ভোটারের গড় উপস্থিতি ৪৮ শতাংশ, সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোটারের গড় উপস্থিতি ২৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ দেশের মানুষ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে দলীয় সরকারের চেয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপরে বেশি আস্থা রাখে। দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ। রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘাতপূর্ণ অবস্থানের সুযোগ নিচ্ছে বিদেশী শক্তিগুলো। দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে, গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে ভোটাধিকারের কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন নাগরিক সমাজ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..