কৃষকের সংকটের উৎস এবং লড়াইয়ের প্রশ্ন

অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সেলিম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মুঘল আমলে বাংলার কৃষকদের জমি ও কৃষি ফসলের ওপর অধিকারের বিশ্বস্ত দলিল ছিলো “আইন-ই-আকবরি”। এই দলিল বলে মুঘল সরকার ও রায়তের (কৃষক) মধ্যে মধ্যবর্তী কোনো শ্রেণির অস্তিত্ব ছিল না। তবে প্রত্যেক গ্রামে মাতব্বরের সহযোগিতায় সরকারের সাথে কৃষকদের সরাসরি যোগাযোগ হতো। রাজা ও কৃষকের মধ্যে দেশে উৎপাদিত ফসল বণ্টনের মূলনীতির ভিত্তিতে মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। মূলত, কৃষকরা সরকারকে যা প্রদান করতো তা ছিলো ভূমি রাজস্ব, খাজনা নয়। সরকারকে ফসলের যে অংশ দেয়া হতো, তাকে মনে করা হতো সার্বভৌমত্বের পুরস্কার অর্থাৎ কৃষকের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষায় রাজার বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের পুরস্কার। তখন উৎপাদিত ফসলের একটা নির্দিষ্ট অংশ ছাড়া জমিতে রাজার কোনো অধিকার ছিলো না। জমিতে কৃষকের দখলি স্বত্বের বিষয়ে আইন-ই-আকবরিতে সুস্পষ্ট উল্লেখ ছিলো, ‘কৃষকরা তাঁদের জমিতে দখলি স্বত্বের অধিকার ভোগ করিবে’। কৃষক যতক্ষণ রাজস্ব প্রদান করতো ততক্ষণ তাকে জমি থেকে উচ্ছেদ করা যেতো না। কৃষকদের এই অধিকার ছিল অলঙ্ঘনীয়। মোদ্দাকথা হলো, রাজা ছিলেন রাজস্বের মালিক, কৃষক ছিলেন জমিতে দখলি স্বত্বের অধিকার বলে জমির মালিক। এজন্য মোঘল ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা কোনো বংশানুক্রমিক জমিদারি স্বত্বের জন্ম দেয়নি এবং জমির ওপর দখলী স্বত্বের ভিত্তিতে মোঘল আমলে কোনো অভিজাত শ্রেণি গড়ে ওঠেনি। তবে কৃষকের কোনো কোনো অধিকারের ক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধতা ছিলো, তা হলো কৃষকের ইচ্ছায় জমির পরিত্যাগ বা বিক্রি করার অধিকার ছিলো না। এ সময়ে মোঘল শাসনে ভূমি রাজস্ব নীতিতে এ ধরনের কাঠামো থাকা সত্ত্বেও তার মধ্যে কিছু কিছু ব্যতিক্রম ঘটতে থাকে। প্রথমত, অনেক রাজারা নিজেদের এলাকাকে এমন স্বাধীনভাবে শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করতেন, যাতে মোঘল সরকারের শুধু বাৎসরিক কর আদায় ব্যতীত আর কিছু করার থাকতো না। দ্বিতীয়ত, অনেক সময় মোঘল সরকার নিজেদের কর্মচারীদের মাসিক বেতন-ভাতা নগদ প্রদান না করে এর পরিবর্তে কোনো একটি এলাকার রাজস্ব আদায়ের অধিকার প্রদান করতেন। ফলে মোঘল কর্মচারীরা তাদের নিজ নিজ এলাকায় স্বাধীনভাবে রাজস্ব আদায় করতেন। তৃতীয়ত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার গ্রাম্য মাতব্বরের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের কর্মচারীদের দিয়ে কৃষকের ফসল উৎপাদন তদারকি ও সরাসরি রাজস্ব আদায় করে কেন্দ্রীয় কোষাগারে জমা দিতো। এভাবে ভূমি ব্যবস্থাপনার মধ্যে কিছু কিছু ব্যতিক্রম দেখা দিলেও ভূমির ওপর জমিদার জাতীয় কোনো শ্রেণির দখলি স্বত্ব ছিল না। সে সময়ে যাদের জমিদার বলা হতো, তারা ছিলেন মূলতঃ রাজস্ব আদায়ের এজেন্ট মাত্র, ভূস্বামী জমির মালিক নয়। মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের শেষ দিকে এই ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা অনেকাংশে শিথিল হয়ে পড়ে এবং ভূমি শাসন ব্যবস্থায় অরাজকতা দেখা দেয়। এসময় উপরে বর্ণিত তিন শ্রেণির কর আদায়কারীরা কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতা এবং অক্ষমতার সুযোগ নিয়ে, নিজ নিজ এলাকায় ইচ্ছেমতো রাজস্ব আদায় করতে থাকে এবং কৃষকদের ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করে। এমনকি শুধু কৃষকদের ওপর নয়, নিজেদের এলাকার অন্তর্গত নগর এবং গ্রামের কারিগর ও ব্যবসায়ীদের ওপর তারা অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতার সাথে এই আধিপত্য জারি রাখে। এসময়ই ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মোঘল সম্রাটের কাছ থেকে দেওয়ানী লাভ করে বাংলাদেশে রাজস্ব আদায়ের অধিকারপ্রাপ্ত হয়। কোম্পানি ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে তার রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীদের প্রতি এক নির্দেশনায় বলেন, “কৃষকদের বুঝানো দরকার কর বৃদ্ধি করা কোম্পানির উদ্দেশ্য নয়, তাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, নির্যাতনকারী ও কৃষকদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নির্যাতনের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করা, কিন্তু দেখা গেছে দেওয়ানী প্রাপ্তির পরে ঐ নির্যাতনের মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুনাফা লুণ্ঠন করাই ছিল একমাত্র উদ্দ্যেশ্য। কোম্পানির কর্মচারীরা যথেচ্ছভাবে চারদিকে ব্যক্তিগত মুনাফা আদায় এবং লুটতরাজ শুরু করে। তাদের মুনাফা শিকারের পদ্ধতি ছিল, চাল কিনে গুদামজাত করে রাখা। কৃষকরা তাদের প্রাণপাত করা পরিশ্রমের ফসল এভাবে অপরের গুদামে মজুদ হতে দেখে চাষাবাদ সম্মদ্ধে উদাসীন হয়ে পড়ে। ফলে দেখা দেয় খাদ্যাভাব। খাদ্যের পরিমাণ যত কমতে থাকে দাম তত বাড়তে থাকে। শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষের চির দুঃখময় জীবনের ওপর পড়ে দুর্যোগের প্রথম আঘাত। এভাবে তাদের জীবনে নেমে আসে বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা ব্যাপক ও ভয়াবহ এক দুর্ভিক্ষ-ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। বাংলা ১১৭৬ সালে এই দুর্ভিক্ষ হয় বলে একে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বলা হয়। দুর্ভিক্ষের মধ্যে খাদ্যাভাবের এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে বাংলা ও বিহারের সমস্ত ইংরেজ বণিক-সকল আমলা-গোমস্তা-রাজস্ব বিভাগের সকল কর্মচারী যে যেখানে নিযুক্ত ছিল সে সেখানেই দিবারাত্র অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ধান, চাল ক্রয় করে গুদামজাত করতে থাকে। এই জঘন্যতম ব্যবসায় বিপুল পরিমাণ মুনাফা হয়। তখন নবাব দরবারের এক কর্মচারী এই ব্যবসা করে ষাট হাজার পাউন্ড (তৎকালীন দেড় লক্ষাধিক) টাকা ইউরোপে প্রেরণ করে। মহা দুর্ভিক্ষে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হলেও এসময়ে তাদের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্ভিক্ষের পূর্বে ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় ছিল ১,৫২,০৪,৮৫৬ টাকা। কিন্তু দুর্ভিক্ষের পরে ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১,৫৭,২৬,৫৭৬ টাকা। তখন ইংরেজ বণিকদের ভূমি রাজস্ব নীতি কতখানি নির্মম ছিল তা অর্ধমৃত কৃষকদের কাছ থেকে বর্ধিত হারে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ থেকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়। কিন্তু বর্ধিত হারে রাজস্ব আদায় সত্ত্বেও কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিখাত আদায় এবং নানা নির্যাতনের ফলে রাজস্ব ব্যবস্থাকে একটা সুষ্ঠু ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভবপর হয়নি। প্রথম দিকের “একশালা বন্দোবস্ত” ব্যর্থ হবার পর ১৭৭২ সালে তারা পাঁচশালা বন্দোবস্ত করে কিন্তু ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের ধাক্কায় সেই বন্দোবস্ত ব্যর্থ হয়। এভাবে “একশালা” “পাঁচশালা” এবং পরে “দশশালা” বন্দোবস্ত কোম্পানির ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থাকে একটা নিশ্চিত ও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে ব্যর্থ হওয়ার পর গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিশ নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। নানা আলোচনা পর্যালোচনার পর তিনি ভূমি রাজস্ব সংক্রান্ত এক নতুন ব্যবস্থার প্রস্তাব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পেশ করেন এবং কোম্পানি তা ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে অনুমোদন দেয়। ভারতের এই ভূমি ব্যবস্থাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন, যখন ভূমির নতুন মালিকরা কোম্পানি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পায় তখন তারা নিজেরাই দেশের আনাচে-কানাচে ছোট ছোট উৎপীড়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়। এরাই ক্রমান্বয়ে মোঘল আমলে প্রাপ্ত কৃষকদের অধিকারগুলো একে একে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। স্মরণাতীতকাল থেকে ভোগ করে আসা সেসব অধিকার হারিয়ে কৃষকরা নতুন অবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে অস্বীকার করে। ১৭৬৫-১৭৯০ সময়কালে মধ্যস্বত্বভোগী উৎপীড়কদের বিভিন্ন মাত্রার উৎপীড়ন, জবরদস্তি ও প্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে গণঅবাধ্যতা এমনকি মাঝে মাঝে গণবিদ্রোহ দেখা দেয়। জমিদার, ইজারাদার, পত্তনিদার প্রভৃতি মধ্যস্বত্বভোগী শোষকরা তাদের রাজস্ব সংগ্রহের জন্যে কী অপূর্ব কৌশল এবং কৃষক নির্যাতন পরিচালনার কী অদ্ভূত নৈপুণ্য প্রকাশ করেছেন, তার ধরনটি ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সেসব নির্যাতনের দৃষ্টান্ত ছিল এরকমের। এক, দণ্ডাঘাত ও বেত্রাঘাত; দুই, চর্মপাদুকা প্রহার; তিন, বাঁশ ও কাষ্ঠ দিয়ে বক্ষশূল দলন; চার, খাপরা দিয়ে নাসিকা কর্ণ মর্দন; পাঁচ, মাটিতে নাসিকা ঘর্ষণ; ছয়, পিঠে হাত বেঁকিয়ে বেঁধে বংশদণ্ড দিয়ে মোড়া দেওয়া; সাত, গায়ে বিছুটি দেওয়া; আট, হাত-পা নিগড় বদ্ধ করা; নয়, কানে ধরে দৌড় করানো; দশ, ফাটা দু’খানা বাঁধা বাখারি দিয়ে হাত-পা দলন করা; এগারো, গ্রীষ্মকালে ঝাঁ-ঝাঁ রৌদ্রে পা ফাঁক করে দাঁড় করিয়ে পিঠ বেঁকিয়ে পিঠের ওপর ও হাতের ওপর ইট চাপিয়ে রাখা; বারো, প্রচণ্ড শীতে জলমগ্ন করা ও গায়ে জল নিক্ষেপ করা; তেরো, গোনীবদ্ধ করে জলমগ্ন করা, চৌদ্দ, বৃক্ষে বা অন্যত্র বেঁধে লম্বা করা; পনের, ভাদ্র-আশ্বিন মাসে ধানের গোলায় পুরে রাখা; ষোল, চুনের ঘরে বন্ধ করে রাখা; সতের, কারারুদ্ধ করে উপোস রাখা; আঠার, গৃহবন্দি করে লঙ্কা মরিচের ধোয়া দেওয়া। উনিশ শতকের মধ্যভাগে অবিভক্ত বাংলার কৃষকদের ওপর যে বর্বর নির্যাতনের উদ্বৃতি তত্ত্ববোধনী পত্রিকায় ফুটে উঠেছে তা ১৯৭০ এর পূর্ব বাঙলার ক্ষেত্রেও ঠিক সমানভাবেই প্রযোজ্য ছিল। ১৭৮৩ সালে রংপুরে সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ ছিল তাদের অধিকারের চরম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কৃষকদের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। জমিদাররা এখানে থেমে থাকেনি। মোঘল শাসনের অরাজক পরিস্থিতির সুযোগে তারা নিয়ে আসে দশশালা বন্দোবস্ত ও পাট্টা ব্যবস্থা। জমিদাররা পাট্টাকে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করে এবং প্রমাণ করতে চায় জমির ওপর কৃষকদের কোনো অধিকার নেই। কৃষকরাও পাট্টা ব্যবস্থার বিরোধিতা করে প্রবল সংগ্রাম চালায়। তারা বাধ্য হয়ে সশস্ত্র লড়াইয়ের মনস্থির করে, এখন আর তারা পাট্টা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নয়, জমিদারদের জমিদারি ত্যাগে বাধ্য করার মরণপণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে পাট্টার বিধিবিধান বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রথম দিকে একশালা বন্দোবস্ত পরে আটশালা বন্দোবস্তও ব্যর্থ হয়। এমনকি দশশালা বন্দোবস্ত কোম্পানির ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থাকে একটা দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে ব্যর্থ হওয়ার পরে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিশ নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন এবং তিনি ভূমি-রাজস্ব সংক্রান্ত এক নতুন ব্যবস্থার প্রস্তাব ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পেশ করেন। কোম্পানি যা ১৭৯৩ সালে অনুমোদন দেয়। এই ব্যবস্থাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। (চলবে) লেখক : সভাপতি, বরিশাল জেলা কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..