সিপিবি’র দ্বাদশ কংগ্রেসে গৃহীত প্রস্তাবনাবলী
[‘একতা’র গত সংখ্যায় সিপিবি’র দ্বাদশ কংগ্রেসে গৃহীত ৮টি প্রস্তাব প্রকাশিত হয়েছিল। এবারের ‘একতায়’ কংগ্রেসে গৃহীত আরো ১১টি প্রস্তাব প্রকাশিত হলো। কিঞ্চিত সংক্ষিপ্ত আকারে]
৯. বিদেশে কর্মরত শ্রমজীবী সম্পর্কে
দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না করতে পারায়, কর্মপরিবেশ না থাকায় দেশের তরুণ ও নারীদের বিরাট অংশ দীর্ঘদিন ধরে বিদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছে। কর্মসংস্থানের অন্যতম ক্ষেত্র এটি। দক্ষজনশক্তি গড়ে তুলে এই শ্রমবাজারে প্রবেশে পর্যাপ্ত ও প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ না থাকায় বিদেশগামী বড় অংশ ভাগ্যের উপর নির্ভর করে অজানার পথে রওনা হয়। ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়া, বিশ্বের নানা জঙ্গলে হাড়ের সন্ধান পাওয়া, আর মানবেতর জীবনের খবরও এদের থামাতে পারছে না। প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী পৃথিবীর শতাধিক দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদের পাঠানো অর্থ আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। অথচ দেশে-বিদেশে সংকটে পড়লে অথবা তারা দেশে ফিরে আসার পর তাদের স্বার্থ রক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই। বরঞ্চ তারা সর্বক্ষেত্রে প্রতারণা, হয়রানি প্রভৃতির শিকার হচ্ছেন।
এই অবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে কংগ্রেস দাবি করছে যে– দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে প্রয়োজনীয় ও আগ্রহীদের বিদেশে যাওয়া, তাদের যেকোনো সংকটে দায়িত্ব নেয়া এবং দেশে ফিরে এলে বিকল্প কর্মসংস্থান ও কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশ-জীবনের লব্ধ জ্ঞান যেন দেশে এসে কাজে লাগাতে পারে তার জন্য উৎসাহ দেয়া ও কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এয়ারপোর্টে বিশেষ মর্যাদা সহায়তা ও বিদেশে অবস্থানরত অবস্থায় দূতাবাসের সরাসরি সহায়তা প্রদান করতে হবে। বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের দেশীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ধারায় উজ্জীবিত রাখতে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
১০. ক্ষেতমজুর সম্পর্কে
বাংলাদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী ক্ষেতমজুররা আজ সবচেয়ে অবহেলিত বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার। সারাবছর কাজ নেই, ন্যায্য মজুরি নেই। করোনাকালে তারা পর্যদুস্ত হয়ে পড়েছে। দ্বাদশ কংগ্রেস দাবি করছে যে,
১. ক্ষেতমজুর শ্রেণির সারাবছর কাজের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা স্কিম ও ১০০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচি চালু করতে হবে।
২. জাতীয়ভাবে ক্ষেতমজুরদের রেজিস্ট্রেশন ভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন করে তাদের পরিচয়পত্র প্রদান করতে হবে।
৩. ক্ষেতমজুরদের মধ্যে সুলভ মূল্যে পল্লী রেশন ও গণবণ্টন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৪. ক্ষেতমজুরদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে সরকারিভাবে বিশেষ উদ্যোগ ও কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
৫. ক্ষেতমজুর সন্তানদের মধ্যে বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৬. ভূমিদস্যুদের কবল থেকে খাস জমি উদ্ধার করে তা ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের স্থায়ী বন্দোবস্ত প্রদান করতে হবে।
৭. ৫৫ বছরের ঊর্ধ্বে ক্ষেতমজুরদের জন্য সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৮. চলমান সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে দুর্নীতি অব্যবস্থাপনা দূর করতে হবে।
৯. ক্ষেতমজুর সমিতির ১০ দফাসহ অন্যান্য দাবিসমূহ বাস্তবায়ন করতে হবে।
১১. শিক্ষা সম্পর্কে
এ সময়কালে শিক্ষাক্ষেত্রে কিছু মৌলিক সমস্যা আগের তুলনায় আরো গভীর হয়েছে। একধারার সার্বজনীন, বিজ্ঞানসম্মত, অসাম্প্রদায়িক, গণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করাসহ গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল ঢেলে সাজানো ছাড়া এসব সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব নয়। পার্টির দ্বাদশ কংগ্রেস থেকে তাই আমরা দাবি করছি–
১. শিক্ষাকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। সকল নাগরিকের শিক্ষার অধিকার রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।
২. ধর্মান্ধ উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির দাবি মেনে সরকার পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যবইয়ের যে পরিবর্তন করেছে, সেটা বাতিল করতে হবে। শিক্ষার বিষয়বস্তুকে সেক্যুলার ও বিজ্ঞানসম্মত করতে হবে।
৩. আমাদের সমাজ-সভ্যতা বিকাশের বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক একমুখী শিক্ষার পথে ঢেলে সাজাতে হবে। স্কুলে পর্যায়ে বিজ্ঞানের ওপর জোর দিতে হবে এবং বিজ্ঞানের ও অংকের শিক্ষক দ্রুততার সাথে নিয়োগ দিতে হবে।
৪. অভিন্ন সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি উৎপাদনমুখী-বৃত্তিমুখী-কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৫. শিক্ষাক্ষেত্রে যে পরিমাণ ব্যয়-বরাদ্দ করা হয় তা তার চেয়েও বহুগুণ পরিমাণে সম্পদ-সমৃদ্ধি-মানবিক অর্জন রূপে ফিরে আসে। এজন্য শিক্ষাক্ষেত্রে এখনই জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ করতে হবে। পর্যায়ক্রমে বাজেটের বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। বরাদ্দকৃত টাকা দুর্নীতিমুক্তভাবে খরচের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬. সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণির স্বার্থে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেওয়া ইউজিসি কৌশলপত্র বাতিল করতে হবে।
৭. উচ্চশিক্ষার উন্নতি সাধন করতে হবে। অল্প আয়ের পিতামাতার সন্তান ও মেধাবীদের জন্য বৃত্তি চালু, তার সংখ্যা ও পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে।
৮. স্কুলে পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষকদের বেতন স্কেল উচ্চ মর্যাদার সাথে সংগতিপূর্ণ করতে হবে। শিক্ষক শিক্ষার্থী অনুপাত ১ঃ৩০ কার্যকরী করতে হবে। এমপিও এবং নন এমপিও শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূর করতে হবে।
৯. শিক্ষার সরকারিকরণ নয়, প্রকৃত জাতীয়করণ করতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষার দায়ভার সরকার নেবে কিন্তু প্রতিষ্ঠান স্বায়ত্বশাসিত হবে।
১০. স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে সরকারি হস্তক্ষেপ ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
১১. পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জাতিসত্বার সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একটা নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমতা বিধানে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। হাওর এলাকার জন্য ভাসমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাসহ বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
১২. নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কে
নারী সমাজের উপরে নিপীড়ন-অত্যাচার-বৈষম্য অব্যাহত আছে। ক্রমেই বেড়ে চলা বহুমাত্রিক এ নির্যাতন ও বৈষম্য এবং প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হবার ঝুঁকি এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। নারীর ওপর এ ধরনের সহিংসতা ও বৈষম্যের পরিস্থিতি সমতা-গণতন্ত্র-উন্নয়ন ও শান্তির লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য নারী সমাজের উপর সংঘটিত সকল অন্যায়-অত্যাচার ও বৈষম্য দূর করে সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাদের সমান অংশগ্রহণ, সমমর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পার্টির দ্বাদশ কংগ্রেস দাবি করছে–
১. ধর্ষণসহ সকল প্রকার যৌন সহিংসতা বন্ধ করতে হবে।
২. বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে এবং নারী শিক্ষার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. সম্পদ ও সম্পত্তিতে নারী পুরুষের সমঅধিকারসহ সর্বক্ষেত্রে নাগরিকের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৪. ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫. পর্নোগ্রাফি ও নারী পাচার বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৬. সাইবার ক্রাইম আইনের মাধ্যমে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। সেইসাথে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. মাদকের অনুপ্রবেশ ও বিস্তারসহ মাদকের ভয়াবহতা থেকে যুব ও তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হবে।
৮. জন্ম নিবন্ধনের নামে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। মৃত বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন বন্ধ করতে প্রয়োজনে আইন সংশোধন করতে হবে।
৯. পাঠ্যপুস্তকে নারীর প্রতি সমমর্যাদাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীর সঠিক প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে।
১০. গৃহশ্রমের আর্থিক মূল্য জাতীয় আয় নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যুক্ত করতে হবে এবং গৃহশ্রমের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিতে হবে।
১১. অভিবাসী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আশু পদক্ষেপ নিতে হবে।
১২. কোনো প্রকার সংরক্ষণ ছাড়াই জাতিসংঘের নারীর প্রতি সকল বৈষম্য বিলোপ সনদ বা সিডও এবং নারী উন্নয়নের বৈশ্বিক রূপরেখাস্বরূপ বেইজিং প্লাটফর্ম অ্যাকশন পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
১৩. প্রাণ-প্রকৃতি পরিবেশ সম্পর্কে
প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে যেকোনো উন্নয়ন প্রক্রিয়া শেষ বিচারে মানুষের স্বার্থবিরোধী উন্নয়ন হিসেবে চিহ্নিত হয়। পরিবেশ ধ্বংসকারী যেকোনো উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বিপরীতে পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়নের আন্দোলন এগিয়ে নিতে হবে।
১. সুন্দরবনসহ দেশের বনাঞ্চল রক্ষা করতে হবে।
২. নদীর জীবন ফিরিয়ে আনতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ, নদী খাল দখলমুক্ত ও খনন ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. পার্ক, মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, প্লাবন ভূমি সংরক্ষণ, পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে।
৪. কৃষি জমির বৈচিত্র রক্ষায়, উৎপাদনশীলতা রক্ষায় কৃষিজমির মাটির অপব্যবহার কঠোরভাবে রোধ করে তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
৫. বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, অপরিকল্পিত ইটভাটা বন্ধ করতে হবে।
৬. ভূমিকম্প, সুনামি, বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবেলায় পদক্ষেপ নিতে হবে।
৭. বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও এই পরিবর্তনে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের মানবিক জীবন দিতে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
৮. ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনা, টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প, চীনের ব্রহ্মপুত্র নদের উপর বাঁধসহ যেসব প্রকল্প পরিবেশের জন্য হুমকি তা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
৯. পরিবেশ-প্রতিবেশ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় যতটুকু সাংবিধানিক অধিকার, আইন আছে তা বাস্তবায়নের ভূমিকা নিতে হবে।
১০. সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সকল বনবিনাশী প্রকল্প বাতিল করতে হবে। উপকূলজুড়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অপরিকল্পিত শিল্পায়ন বন্ধ করে সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা উন্নয়ন বোর্ড গঠন করতে হবে। উপকূলীয় এলাকার জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। সুন্দরবনের খালে বিষ দিয়ে মাছ নিধন, বৃক্ষনিধন এবং বাঘ-হরিণসহ বন্যপ্রাণী হত্যা বন্ধ করতে হবে।
১১. ব্যয়বহুল ও দেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব ও আরো কতক বিষয়ের বিবেচনায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ঝুঁকির কারণে অনুপযুক্ত। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ঝুঁকি মোকাবেলায় বিজ্ঞানভিত্তিক ভূমিকা নিতে হবে।
১২. মিঠা পানির দেশ বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আর্সেনিক-লবণাক্ততাসহ নানাভাবে পানি দূষণের বিপরীতে সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
১৪. জাতীয় সম্পদ সম্পর্কে
তেল-গ্যাস-কয়লা-পাথরসহ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ আমাদের দেশ। এসব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশ ও দেশের মানুষের অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি ও দেশপ্রেম হীনতা ও লোভ-লালসা এক্ষেত্রে সংকট তৈরি করেছে। সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্যবাদী দেশ বহুজাতিক কোম্পানি তাদের স্বার্থে এদেশে এজেন্ট তৈরি করে ক্ষমতাসীনদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে এসব সম্পদ লুটপাট করার পথ পরিস্কার করছে। আমরা আমাদের সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছি না। সিপিবির দ্বাদশ কংগ্রেস দাবি করছে যে,
১. আমাদের সকল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের স্বার্থে সকল সম্পদের সংরক্ষণ ও ব্যবহারে প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
২. স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবেশ ও জনস্বার্থ সংরক্ষণ করে জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
৩. খনিজ সম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যুৎ খাতে দায়মুক্তি আইন বাতিলসহ দায়মুক্তির সকল পদক্ষেপ বাতিল করতে হবে।
৪. উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন নিষিদ্ধসহ ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫. আবাদি জমি, পানিসম্পদ, জনবসতি, পরিবেশ-প্রতিবেশকে প্রাধান্য দিয়ে খনিজ সম্পদের ব্যবহার ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্র স্থাপনের পরিকল্পনা করতে হবে।
৬. স্থল ও সমুদ্রভাগের গ্যাস উত্তোলনের জন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। মাগুরছড়া টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র ধ্বংসের জন্য দায়ী বহুজাতিক কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং ওই টাকা টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা কাজে ব্যবহার করতে হবে।
৭. গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর জ্বালানি নিয়ে বিভিন্ন সরকারের সময়কালে সম্পাদিত জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি শ্বেতপত্র প্রকাশ এর জন্য দায়ী দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত ও বিচার করতে হবে।
৮. দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে যথাযথ ভূমিকা নিতে হবে এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের মুখে দেশের মানুষকে স্বস্তি দিতে জরুরি ভিত্তিতে দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে।
১৫. যাতায়াত ব্যবস্থা ও পরিবহন সম্পর্কে
দেশে যাতায়াত ব্যবস্থার অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই কিন্তু দেশের বাস্তবতায় যেভাবে পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার সেটি না হওয়ায় যাতায়াত ও পরিবহনের ক্ষেত্রে নানান নৈরাজ্য ও সমস্যা-সংকট বিরাজ করছে।
এই কংগ্রেস স্বল্পমূল্যে নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থার লক্ষ্যে দাবি জানাচ্ছে।
১. দেশের নৌ পরিবহন ব্যবস্থাকে অন্যতম প্রধান গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য নদীর নাব্যতা রক্ষাসহ নৌ-পরিবহনকে গুরুত্ব দিতে হবে।
২. রেল ব্যবস্থাকে গণ্য করতে হবে আরেকটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন খাত হিসেবে। এই খাতে সম্প্রতি কিছু অগ্রগতি হলেও দেশীয় বিশেষজ্ঞদের গুরুত্ব না দিয়ে বিদেশি পরামর্শক নির্ভর হয়ে অগ্রসর হওয়ার খরচের তুলনায় অগ্রগতি কম। কংগ্রেস পরিকল্পিতভাবে এই খাতকে অগ্রসর করার দাবি জানাচ্ছে।
৩. সড়ক ব্যবস্থা উন্নয়নের সাথে সাথে সড়কপথ পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান যাতায়াত মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে শুরুতে রাজধানী থেকে উপজেলা পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় নানা ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সীমাহীন নৈরাজ্য চলছে। কংগ্রেস সড়ক পরিবহন খাতকে ঢেলে সাজানোর এবং এক্ষেত্রে সরকার-মালিক-টাউট ‘শ্রমিক নেতা’ সমন্বয়ে যে ‘ক্রিমিনাল সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে তা নির্মূলের জন্য জোর দাবি জানাচ্ছে।
৪. যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নয়নে শুধু বড় বড় পরিকল্পনা নয় দেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা প্রকল্প গ্রহণ, অহেতুক খরচ বাড়ানো ও সময় বৃদ্ধির নামে অর্থের অপচয় রোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে মূলনীতি ও দুর্নীতির সাথে জড়িতদের চিহ্নিত ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. কংগ্রেস উপযুক্ত পুনর্বাসন ব্যাতিরেকে ব্যাটারিচালিত রিক্সা, ভ্যান, অটো ইত্যাদির উপর নিষেধাজ্ঞা ‘রিক্সা মুক্ত সড়ক’ প্রচলন, চালকদের হয়রানি-অত্যাচার বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছে।
১৬. দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয় উগ্রবাদী, সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান সম্পর্কে
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদী, সাম্প্রদায়িক শক্তির ভয়াবহ বিপজ্জনক উত্থান অত্র অঞ্চলের শান্তি, নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি বাম-প্রগতিশীল আন্দোলনের জন্য বিরাট হুমকি হিসেবে বিরাজ করছে। বর্তমানে সেই বিপদ আরো বেড়েছে। সিপিবি’র দ্বাদশ কংগ্রেস দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয় উগ্রবাদী, সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। সাম্রাজ্যবাদ ও এই অঞ্চলের কর্পোরেট পুঁজি তার শাসন ও শোষণ আরও পাকাপোক্ত করতেই ভারতে হিন্দুত্ববাদ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ জেহাদ তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে। এই প্রক্রিয়া নতুনভাবে গতিবেগ পেয়েছে আফগানিস্তানে সশস্ত্র জঙ্গি তালেবান শাসনের পুনরায় আগমনের মাধ্যমে। সিপিবি’র দ্বাদশ কংগ্রেস দক্ষিণ এশিয়ার এই অপশক্তি মোকাবেলায় এই অঞ্চলের কমিউনিস্ট ও বামপন্থি প্রগতিশীল শক্তিসহ গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক শক্তির ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।
১৭. ইউক্রেন সম্পর্কে
এই কংগ্রেস ইউক্রেনের মূল ভূখণ্ডে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা করছে। সিপিবি দ্বাদশ কংগ্রেস বিশ্বাস করে এই মুহূর্তে ইউক্রেনের শান্তিই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। এটা ঠিক যে, সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র তথা আজকের ইউক্রেন রাষ্ট্রকে ঘিরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দীর্ঘদিনের আগ্রাসী অভিসন্ধি এবং তারই অংশ হিসেবে সম্প্রতি সৃষ্ট উত্তেজনা ও আগ্রাসী তৎপরতা চালিয়েছে। কংগ্রেস তারও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিলে আজ রাশিয়া এবং চীনকে কোণঠাসা করার আগ্রাসী ভূ-রাজনৈতিক অভিলাষ, পাইপ লাইনের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার তেল-গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা বাতিল করে মার্কিন বহুজাতিক তেল কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা এবং উত্তেজনা সৃষ্টি করে তার অস্ত্র ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষ্য চরিতার্থ করতে এই পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। রাশিয়াকে টার্গেট করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পোল্যান্ডভিত্তিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রসারিত করার জন্য ইউক্রেনের নয়া নাজী অপশক্তিকে সে আজ নগ্নভাবে ব্যবহার করতে উদ্যত হয়েছে। সিপিবির দ্বাদশ কংগ্রেস অবিলম্বে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা বন্ধসহ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব ধরনের সামরিক তৎপরতা বন্ধের দাবি জানাচ্ছে এবং শান্তিপূর্ণ আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে এই সঙ্কট সমাধানের দাবি জানাচ্ছে। একইসাথে ইউক্রেনে অবস্থানরত বাংলাদেশ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি দাবি জানাচ্ছে। সিপিবি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর রাশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহমত প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিলো তা ন্যায়সঙ্গত। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ন্যাটো কোনোভাবেই রাশিয়ায় নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে ফেলার অধিকার রাখে না।
১৮. প্যালেস্টাইন সম্পর্কে
সিপিবি’র দ্বাদশ কংগ্রেস প্যালেস্টাইনের চলমান জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রতি পার্টির সংহতি ও সমর্থন পুনঃব্যক্ত করছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং ইসরাইলী জায়নবাদ প্যালেস্টাইনের নিরীহ নাগরিকদের ওপর এমনকি শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের উপর বর্বর হামলা এখনও অব্যাহত রেখেছে। প্যালেস্টাইন সম্পর্কে জাতিসংঘে গৃহীত প্রস্তাবনাবলী এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন ক্রমাগত লংঘন করে জায়নবাদী ইসরাইল নানা কৌশলে প্যালেস্টাইনের ভূখণ্ড দখল করে চলেছে। একইসাথে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সরাসরি মদদে জেরুজালেমে ইসরাইলের রাজধানী স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ চিরতরে বন্ধের চক্রান্ত করছে। সিপিবি’র দ্বাদশ কংগ্রেস অবিলম্বে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবনাবলীর আলোকে প্যালেস্টাইন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানাচ্ছে এবং অবিলম্বে প্যালেস্টাইনের নাগরিকদের ওপর সকল প্রকার হামলা, অবরোধ ও দখলদারিত্ব বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছে।
১৯. ল্যাটিন আমেরিকা সম্পর্কে
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হামলা ও নাশকতার দীর্ঘদিনের শিকার হলো ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশসমূহ। এদের মধ্যে কিউবা এবং ভেনিজুয়েলার কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাম্রাজ্যবাদের হুমকিকে উপেক্ষা করে এসব দেশ নিজস্ব ধাঁচের সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বেশ কয়েকটি দেশে বামপন্থি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার তেলসহ মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ কব্জা করার জন্য আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্ররা ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশসমূহের উপর নানা ধরনের অর্থনৈতিক অবরোধ ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। সিপিবি’র দ্বাদশ কংগ্রেস কিউবার উপর থেকে মার্কিনের অন্যায় অবরোধ তুলে নেয়াসহ, ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া এবং সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকাকে ঘিরে মার্কিন নাশকতামূলক তৎপরতা বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছে এবং সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে সেসব দেশের জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের প্রতি পরিপূর্ণ সমর্থন ও সংহতি জানাচ্ছে।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন