দখলদারি, চাঁদাবাজি ও ভাঙচুর : ক্ষমতার বদল, লুণ্ঠনের ধারাবাহিকতা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একটি সরকারের পতন মানেই রাষ্ট্রের চরিত্রের পরিবর্তন নয়। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করলেও পরবর্তী বাস্তবতা একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে: ক্ষমতার কেন্দ্র বদলালেও রাষ্ট্র ও অর্থনীতির সেই কাঠামো কি বদলেছে, যে কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক প্রশ্রয়, পেশিশক্তি ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে? সাম্প্রতিক দখলদারি, চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও সন্ত্রাসের ঘটনাগুলো সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে। ঢাকার মিরপুরে দীর্ঘদিন ধরে নিম্নআয়ের মা ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও স্থাপনা ধ্বংসের অভিযোগ, চিকিৎসা সরঞ্জাম লুটের অভিযোগ—এসব কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা নয়; জনস্বার্থের প্রতিষ্ঠান কতটা সহজে ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর স্বার্থের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে, তারও একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। একই সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জমি, নির্মাণ প্রকল্প, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসন খাতকে ঘিরে হামলা, চাঁদা দাবি ও দখলের অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও অস্ত্রের ভয়, কোথাও ভাঙচুর, কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়া—পদ্ধতি বদলালেও ক্ষমতা ও অর্থের সম্পর্কটি যেন অটুট। মফস্বলেও জলাশয়, হাওর, ইজারা ও স্থানীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে সংঘাতের খবর মিলছে। এর মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কৃষক ও প্রকৃত মৎস্যজীবীরা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দখল ও চাঁদাবাজির কেন্দ্রগুলো অনেক ক্ষেত্রে নতুন হাতের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার অভিযোগ উঠছে। পরিবহন, টার্মিনাল, বাজার, নির্মাণকাজ, ঝুট ব্যবসা কিংবা স্থানীয় ইজারা—যেখানে অর্থের প্রবাহ রয়েছে, সেখানেই প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠতেই পারে: আমরা কি সত্যিই একটি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছি, নাকি কেবল তার পরিচালকদের পরিবর্তন করেছি? রাষ্ট্রের দুর্বলতা এখানেই সবচেয়ে স্পষ্ট। আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, প্রশাসন যদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের কাছে নত হয় এবং অপরাধের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক থাকলে বিচার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, একই ধরনের অনাচার পুনরুৎপাদিত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। এ কারণেই সমস্যাটিকে শুধু ‘ক্যাডার বদল’ বা ‘দল বদল’-এর সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং আইনের শাসনের গভীর সংকট। একটি সরকার পতনের পর নতুন রাজনৈতিক শক্তি পুরোনো দখলদারি ব্যবস্থার জায়গা নিলে পরিবর্তনের অর্থই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মানুষ গণঅভ্যুত্থানে শুধু একটি সরকারের পরিবর্তন চায়নি—চেয়েছে নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান ও বৈষম্যহীন নাগরিক জীবন। সেই প্রত্যাশার বিপরীতে যদি আবারও হাসপাতাল ভাঙে, জমি দখল হয়, চাঁদাবাজি চলে, শ্রমিকের পাওনা আদায়ে রাস্তায় নামতে হয় এবং অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে নিরাপদ থাকে, তাহলে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্ন ক্ষমতার চেয়ার কার দখলে থাকবে—তা নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি দখলদার ও লুণ্ঠনকারীর আশ্রয়স্থল থাকবে, নাকি নাগরিকের অধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াবে? রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, দখলদারি, চাঁদাবাজি, সহিংসতা ও জনসম্পদ লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে একই আইনি মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা না হলে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনই স্থায়ী অর্থ বহন করবে না। জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রকৃত পরীক্ষা সেখানেই।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..