আশুলিয়ার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র একতা প্রতিবেদক :
আশুলিয়ার জামগড়ায় প্রীতি গ্রুপের কারখানা চত্বরে অবৈধ ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহনের কারণে সংঘটিত বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৮ জনের প্রাণহানি এবং বহু মানুষের আহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।
সংগঠনটি বলেছে, এ ঘটনাকে কোনোভাবেই নিছক ‘দুর্ঘটনা’ বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। শ্রমিকের কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা, অনিরাপদ ও অবৈধভাবে গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলেই এই প্রাণহানি ঘটেছে। এটি অবহেলাজনিত শ্রমিক হত্যা এবং এর দায় সংশ্লিষ্টদের বহন করতে হবে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টায় পুরানা পল্টন ও জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকায় গার্মেন্ট টিইউসির বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভ মিছিল পরবর্তী সমাবেশে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি অ্যাডভোকেট মুন্টু ঘোষের সভাপতিত্বে ও সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহাজাহানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাদেকুর রহমান শামিম, সহ-সভাপতি জলি তালুকদার, কেন্দ্রীয় নেতা দুলাল সাহা, আজিজুল ইসলাম, শাহিন আলম প্রমুখ।
সমাবেশে গার্মেন্ট টিইউসি নেতৃবৃন্দ বলেন, শ্রমিকের জীবন কোনো প্রতিষ্ঠানের মুনাফার চেয়ে কম মূল্যবান নয়। বারবার দেখা যাচ্ছে, কারখানা ও শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন, অবৈধভাবে দাহ্য ও বিপজ্জনক পদার্থ পরিবহন এবং কর্তৃপক্ষের গাফিলতির খেসারত দিতে হচ্ছে শ্রমিকদের জীবন দিয়ে। ঘটনার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, কারখানা চত্বরে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন কীভাবে অনুমোদিত হলো এবং নিরাপত্তা বিধি কে বা কারা লঙ্ঘন করেছে—এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। মালিকপক্ষ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থার কোনো অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা থাকলে তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
সংগঠনটি অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছে। তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ বা দায়ীদের রক্ষার কোনো চেষ্টা শ্রমিকরা মেনে নেবে না। তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে এবং দায়ী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস সিলিন্ডারসহ সব ধরনের বিপজ্জনক ও দাহ্য পদার্থের পরিবহন ও ব্যবহারে নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে।
গার্মেন্ট টিইউসি নিহতদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য আইএলও কনভেনশন আনুযায়ী ন্যায্য ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য হারানোর কারণে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছে। আহতদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিশ্চিত করতে হবে এবং চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হারানো ও ভবিষ্যৎ জীবিকার ক্ষতির জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা বা ক্ষতিপূরণের দায় কোনোভাবেই তাদের পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র বলেছে, শ্রমিকের নিরাপত্তা দয়া নয়, অধিকার। কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতার কারণে একের পর এক শ্রমিকের মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। প্রতিটি প্রাণহানির জন্য দায় নির্ধারণ, বিচার এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকের জীবন রক্ষায় কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ না করে শুধু ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষ দায়মুক্ত হতে পারে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধে কারখানায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণে কার্যকর নিরাপত্তা কমিটি গঠন এবং নিরাপত্তা বিধি বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
গার্মেন্ট টিইউসি নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং আহতদের প্রতি সংহতি জানিয়ে অবিলম্বে বিচার, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি হুঁশিয়ার করে বলেছে, শ্রমিকের জীবন নিয়ে কোনো ধরনের অবহেলা, গাফিলতি কিংবা দায় এড়ানোর চেষ্টা বরদাশত করা হবে না। দায়ীদের বিচার ও শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।