
একতা বিজ্ঞান ডেস্ক :
মহাকাশযান সূর্যের এত কাছ থেকে আগে কখনো কোনো ছবি তুলতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পার্কার সোলার প্রোব সূর্যের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র প্রায় ৬১ লাখ কিলোমিটার দূর দিয়ে অতিক্রম করার সময় সূর্যের বায়ুমণ্ডল ও সৌরবায়ুর নজিরবিহীন ছবি ধারণ করেছে। নাসার ভাষ্য অনুযায়ী, এগুলো সূর্যের সবচেয়ে কাছ থেকে তোলা ছবি।
ঐতিহাসিক ছবিগুলো ধারণ করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পার্কার সোলার প্রোবের রেকর্ড গড়া কাছাকাছি অতিক্রমের সময়। তখন মহাকাশযানটি সূর্যের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৩৮ লাখ মাইল বা প্রায় ৬১ লাখ কিলোমিটার দূরে পৌঁছেছিল। একই সময় এটি ঘণ্টায় প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার কিলোমিটার গতিতে ছুটছিল, যা মানুষের তৈরি কোনো বস্তুর সর্বোচ্চ গতির রেকর্ড। ছবিগুলো পরে প্রক্রিয়াজাত করে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশ করে নাসা।
ছবি তোলার কাজটি করেছে পার্কার সোলার প্রোবের সূর্য অনুসন্ধানের প্রশস্ত ক্ষেত্র চিত্রগ্রাহক, সংক্ষেপে ‘উইসপার’ নামের ক্যামেরা ব্যবস্থা। এটি সরাসরি সূর্যের অত্যন্ত উজ্জ্বল পৃষ্ঠের দিকে তাকায় না। বরং মহাকাশযানের তাপঢালের পাশ দিয়ে সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসা সৌরবায়ুর ছবি ধারণ করে। নতুন ছবিগুলোতে সৌরবায়ুর বিভিন্ন প্রবাহ এবং একাধিক সৌর বিস্ফোরণ থেকে বের হওয়া পদার্থের পারস্পরিক সংঘর্ষও স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।
সৌরবায়ু হলো সূর্য থেকে অবিরাম বেরিয়ে আসা বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত অতিক্ষুদ্র কণার প্রবাহ। এই প্রবাহ ঘণ্টায় ১৬ লাখ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে সৌরজগতের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে। পৃথিবীর কাছাকাছি এসে সৌরবায়ু ও সূর্যের বিস্ফোরণজনিত কণা ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাবে মেরুজ্যোতি দেখা দেওয়ার পাশাপাশি উপগ্রহ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক গ্রিড এবং মহাকাশচারীদের নিরাপত্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২০১৮ সালের আগস্টে উৎক্ষেপণ করা পার্কার সোলার প্রোব ২০২১ সালে প্রথম কোনো মানবনির্মিত মহাকাশযান হিসেবে সূর্যের করোনা অতিক্রম করে। তীব্র তাপ ও বিকিরণ থেকে যন্ত্রটিকে রক্ষা করতে প্রায় ১১ দশমিক ৪ সেন্টিমিটার পুরু কার্বন-যৌগিক তাপঢাল ব্যবহার করা হয়েছে। এই ঢাল প্রায় ১ হাজার ৩৭৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে।
অভিযানটি এখনো চলছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পার্কার সোলার প্রোব সূর্যের ২৯তম কাছাকাছি অতিক্রম সম্পন্ন করেছে। এবারও এটি একই রেকর্ড দূরত্বে পৌঁছে সূর্যের উত্তর মেরুর কাছাকাছি অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করেছে। সেই অভিযানে সূর্যের বায়ুমণ্ডল, সৌরবায়ু ও সৌর বিস্ফোরণ সম্পর্কিত নতুন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের আশা, পার্কারের এসব পর্যবেক্ষণ সৌরবায়ুর উৎপত্তি, করোনার অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা এবং মহাকাশের আবহাওয়া কীভাবে সৃষ্টি হয়-এসব দীর্ঘদিনের রহস্য সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।