ট্রাম্পের ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ ও টেকনোফ্যাসিজমের উত্থান

টিটো খন্দকার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে সাধারণ কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সংস্কৃতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ভাষণ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন, তা দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন মার্কিন ক্যাপিটল হিলে দাঁড়িয়ে ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ বা কোনো রাজনৈতিক নির্বাচনী জনসভার মহড়া দিচ্ছিলেন। মার্কিন আধিপত্যবাদী ঔদ্ধত্যের চরম বহিঃপ্রকাশ দেখা গেলো ট্রাম্পের বক্তব্যে। যে দাম্ভিকতার সাথে তিনি ভেনিজুয়েলায় আমেরিকার একতরফা সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে আনার বীরত্বপূর্ণ(!) কাহিনী শোনালেন এবং অর্থনৈতিক অবরোধের মাত্রা বাড়িয়ে কিউবায় তৈরি করা চরম মানবিক বিপর্যয়ের সংবেদনহীন গল্পকে নিজেদের অর্জনের খাতায় যোগ করলেন, তা ১৯ শতকের সেই ‘গড়হৎড়ব উড়পঃৎরহব’-এর আধুনিক ও উগ্র সংস্করণ ছাড়া আর কিছু নয়। অন্য একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা লঙ্ঘন করে তার রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে আনা কিংবা অমানবিক অর্থনৈতিক অবরোধ সৃষ্টি করে আরেকটি রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের খাদ্য ও চিকিৎসাকে রুদ্ধ করে রাখাকে সাফল্যগাঁথা হিসেবে উপস্থাপন করার এই ঘটনা যে বার্তাটি দেয় তা হচ্ছে, বিশ্ব রাজনীতিতে এখন আর আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘ সনদের কোনো স্থান নেই, সেখানে ভর করেছে “গরমযঃ রং জরমযঃ” বা জোর যার মুলুক তার নীতি। জাতিসংঘের মঞ্চে ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (অও)কে সুপার ইন্টেলিজেন্স (ঝও) হিসেবে অভিহিত করা এবং এ সংক্রান্ত বৈশ্বিক নিরাপত্তা নীতিমালার প্রয়োজনীয়তাকে নাকচ করে দেওয়ার ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক চমক নয়। এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে একুশ শতকের এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, যাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অভিহিত করছেন ‘টেকনো-ফ্যাসিজম’ (ঞবপযহড়-ঋধংপরংস) বা প্রযুক্তিনির্ভর ফ্যাসিবাদ হিসেবে। ঐতিহাসিকভাবে ফ্যাসিবাদের মূল ভিত্তি ছিল রাষ্ট্রের অখণ্ড শক্তি ও কর্পোরেট স্বার্থের অনৈতিক মেলবন্ধন। আজ সেই রূপটিই দেখা যাচ্ছে টেক-জায়ান্টদের ছায়ায়। সিলিকন ভ্যালির গুটিকয়েক কর্পোরেশন আজ তথ্য, অ্যালগরিদম এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর একক আধিপত্য বিস্তার করেছে। ট্রাম্প যখন আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ও বৈশ্বিক তদারকিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন, তখন আমেরিকান এক্সেপশনালিজমের যে মূল বার্তাটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে, তা হচ্ছে প্রযুক্তির লাগাম থাকবে মার্কিন রাষ্ট্র এবং হাতে গোনা কয়েকটি বিশাল প্রযুক্তি কোম্পানির হাতে, সাধারণ মানুষ বা আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে তারা জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে না। প্রযুক্তির আসল ঝুঁকিগুলোকে ঢেকে দেওয়ার জন্য ভাষার রূপান্তর বা নতুন পরিভাষার আমদানি ফ্যাসিবাদের পুরোনো হাতিয়ার। “অৎঃরভরপরধষ” শব্দটিকে রূপক অর্থে ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে তার জায়গায় “ঝঁঢ়বৎ” বসানো কেবল শব্দ-ছলনা নয়; এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ন্যারেটিভ তৈরি করার ছক। প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণহীন স্বায়ত্তশাসন, নজরদারি, অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত (অষমধৎরঃযসরপ ইরধং) এবং ডেটা দখলের (উধঃধ ঊীঃৎধপঃরড়হ) মতো বাস্তব সংকটগুলোকে একপাশে সরিয়ে রেখে একে এমন এক অলৌকিক ও পরাক্রমশালী শক্তি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাকে প্রশ্ন করা বা যার ওপর আইন চাপানোকে প্রগতি বিরোধী বলে চিহ্নিত করা যায়। অও যখন কেবল হুকুম তামিল করার প্রযুক্তিগত উপকরণ না থেকে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এজেন্সি বা ক্ষমতা অর্জন করছে, তখন তাকে নিয়ন্ত্রণ করার বৈশ্বিক নীতিমালা না থাকাটা সভ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকি। হ্যাকিং, নির্বাচন প্রভাবিতকরণ, যুদ্ধের ময়দানে স্বায়ত্তশাসিত মারণাস্ত্রের ব্যবহার কিংবা গণ-নজরদারির মাধ্যমে নাগরিক স্বাধীনতা হরণের যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়। উগ্র জাতীয়তাবাদ ও প্রযুক্তিগত আধিপত্যের অজুহাতে যখন বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে বুড়ো আঙুল দেখানোর মাধ্যমে জন্ম দেয়া হচ্ছে এমন এক প্রযুক্তি-নৈরাজ্যের, যার উর্বর জমিতে ডালপালা মেলছে টেকনো-ফ্যাসিজম, যেখানে মানবিক সার্বভৌমত্বের অপমৃত্যু ঘটিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকারের সীমা নির্ধারণ করে দেবে সিলিকন উপত্যকার প্রাণহীন, অলক্ষ্য অ্যালগরিদম। লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা ও কানাডা প্রবাসী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..