জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি : সংকটের বোঝা জনগণের ঘাড়ে!

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
জ্বালানি তেলের দাম আবার বাড়ানো হয়েছে। এবার এক ধাক্কায় সব রকম জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এর পক্ষে নানা অর্থনৈতিক যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, ভর্তুকির চাপ ইত্যাদি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কারা? আর এই সংকটের সব দায় কেন জনগণকেই বহন করতে হবে? জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে, কৃষির উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। তার অভিঘাত গিয়ে পড়ে বাজারে। চাল-ডাল-তেল-সবজি থেকে শুরু করে ওষুধ, পোশাক, নির্মাণসামগ্রী—কোনো কিছুই এর বাইরে থাকে না। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার হন শ্রমিক, কৃষক, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ। যে শ্রমিকের মজুরি মাসের পর মাস একই থাকে, তার যাতায়াত খরচ বাড়ে। যে কৃষক ডিজেল দিয়ে সেচ দেন, তার উৎপাদন খরচ বাড়ে। যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পণ্য পরিবহন করেন, তার ব্যয় বাড়ে। কিন্তু এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত কে বহন করে? উৎপাদক ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর একদিকে খরচের চাপ, অন্যদিকে বাজারে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার চাপ—দুই দিক থেকেই তারা আক্রান্ত হন। বিপরীতে অর্থনীতির ওপরের স্তরে যারা মূল্যবৃদ্ধির সুযোগে অতিরিক্ত মুনাফা করতে সক্ষম, তাদের অবস্থান এক নয়। এখানেই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রশ্নটি নিছক অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরে গিয়ে শ্রেণির প্রশ্নে পরিণত হয়। সরকার যদি বলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, তাহলে পাল্টা প্রশ্ন করতে হয়—আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সময় তার সুফল জনগণ কতটা পেয়েছে? বিশ্ববাজারের দামের ওঠানামার পুরো ঝুঁকি কেন ভোক্তার ওপর চাপবে? মূল্য নির্ধারণের কাঠামো কতটা স্বচ্ছ? রাষ্ট্রের রাজস্বনীতি ও জ্বালানি নীতির বোঝা কেন বারবার সাধারণ মানুষের ঘাড়ে এসে পড়ে? বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভরতা। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যদি আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল থাকে, তাহলে বিশ্ববাজারে সামান্য অস্থিরতাও দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা দেবে। অথচ দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনায় দেশীয় সম্পদ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গণপরিবহন ও জ্বালানি দক্ষতার প্রশ্নকে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে—সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভর্তুকি কাদের জন্য—এই প্রশ্নটিও তাই গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন রক্ষায় রাষ্ট্রীয় সহায়তাকে যদি ‘অর্থনৈতিক অপচয়’ বলা হয়, অথচ বড় ব্যবসা ও পুঁজির স্বার্থ রক্ষায় নানা সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে সেই অর্থনৈতিক নীতির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। আমরা মনে করি, জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্রীয় বিবেচনায় আনতে হবে। মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অদক্ষতার বোঝা জনগণের ওপর চাপানো চলবে না। একই সঙ্গে কৃষি, গণপরিবহন ও ক্ষুদ্র উৎপাদন খাতকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন আমদানিনির্ভরতা কমানো, দেশীয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ, কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি। সর্বোপরি প্রয়োজন এমন একটি জ্বালানি নীতি, যেখানে মুনাফা নয়, মানুষের প্রয়োজন ও জাতীয় স্বার্থ হবে প্রধান বিবেচনা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা মানে বাস্তব অর্থনৈতিক সংকট অস্বীকার করা নয়। বরং প্রশ্ন হলো—সংকটের সমাধানের নামে সংকটের সমস্ত ভার কেন শ্রমজীবী মানুষের ওপর চাপানো হবে? জনগণের আয় কমছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে। তাই দরকার এমন অর্থনৈতিক নীতি, যা জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ধ্বংস না করে উৎপাদন ও জীবনযাত্রাকে সুরক্ষা দেবে। জনগণের ঘাড়ে বোঝা চাপিয়ে কোনো টেকসই অর্থনৈতিক সমাধান হয় না। জ্বালানি নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে মুনাফা নয়—মানুষকে ফিরিয়ে আনতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..