ব্রিকস পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
১৯৯১ সালের মিখাইল গর্বাচেভ কর্তৃক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল। দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থার অবসানের মধ্য দিয়ে ভয়ঙ্কর একমেরু বিশ্বের তাণ্ডব যুগে মানুষ প্রবেশ করেছিল। দ্বিমেরুর একমেরুর নেতৃত্বে ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং তার দোসর সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ। অন্যপক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের অর্থনৈতিক জোট। তবে গণচীন এই দুই বিশ্বব্যবস্থার বিপক্ষে ত্রিবিশ্ব তত্ত্ব হাজির করেছিল। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে চীনা প্রতিনিধি দলের নেতা দেং শিয়াও পিং ত্রিবিশ্ব তত্ত্বের ঘোষণা দেন। চেয়ারম্যান মাও সে তুংয়ের অনুমোদনেই এ নীতি ঘোষণা করা হয়। এ তত্ত্বে বলা হয়, বিশ্ব তিন ভাগে বিভক্ত, প্রথম বিশ্বে অন্তর্ভুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন, দ্বিতীয় বিশ্ব জাপান ও ইউরোপ এবং চীনসহ বাকি দেশগুলো নিয়ে তৃতীয় বিশ্ব। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের ফলে সৃষ্ট মার্কিন আধিপত্যের বিপরীতে পৃথিবী পুনরায় বহুমেরু বিশ্বে পরিণত হচ্ছে এবং ব্রিকসের গঠন ও সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে তা দ্রুত পরিণতি লাভ করছে। ব্রিকস কীভাবে বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে এবং আনবে তা সংক্ষেপে আলোচনা করার জন্যই এ নিবন্ধের অবতারণা। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গত ১২-১৩ সেপ্টেম্বর দুদিনব্যাপী ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং সম্মেলনের স্বাগতিক প্রধান নরেন্দ্র মোদী, চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং, রাশিয়া রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন, দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি সিরিল রামাফোসা, ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান, মিশরের রাষ্ট্রপতি আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি প্রাবোও সুবিয়ান্তো, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ আলী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহামেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ। আরো অংশ নিয়েছেন ব্রিকস অংশীদার ও আমন্ত্রিত দেশসমূহের মধ্যে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, কাজাখস্তানের রাষ্ট্রপতি কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ, ফিলিপাইনের রাষ্ট্রপতি ফের্দিনান্দ মারকোস জুনিয়র, বুরুন্ডির রাষ্ট্রপতি এভারিস্তে এনদাইশিমিয়ে, ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী লে মিন হুং, উগান্ডার উপ-রাষ্ট্রপতি জেসিকা রোজ এপেল আলুপ্রো, নাইজেরিয়ার উপ-রাষ্ট্রপতি কাশিম শেত্তিমা, বেলারুশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাক্সিম রিজেনকভ, কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ পারিলা। ব্রিকস বিশ্বের পাঁচটি অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার অদ্যাক্ষরের সমন্বয়ে গঠিত একটি অর্থনৈতিক জোট। ২০০১ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, এবং চীন মিলে ব্রিক নামে এ জোটটি যাত্রা শুরু করেছিল। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে জোটটি ব্রিকস নাম নেয়। পাঁচটি রাষ্ট্রই জি-২০-এর সদস্য। ব্রিকস যুক্তরাষ্ট্র ও ধনী দেশগুলোর জোট জি-৭ বা শিল্পোন্নত ও বিকাশমান অর্থনীতির জোট জি-২০ বিরোধী কোনো শিবির নয়। ব্রিকসের লক্ষ্য ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর উন্নয়ন। ব্রিকস এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সহযোগিতার প্রচার করা। এছাড়া বৈশ্বিক মানবতার বিকাশে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখা এবং ন্যায়সঙ্গত ও ন্যায্য বিশ্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা। ২০২৪ সালের ১ জানুযারি থেকে ব্রিকসের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৬টি দেশ। এগুলো হরো সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আর্জেন্টিনা, মিশর, ইথিওপিয়া। ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ১৫তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে ব্রাজিলের বামপন্থি প্রেসিডেন্ট লুলা দ্য সিলভা বলেছিলেন, ‘জি-৭, জি-২০ বা যুক্তরাষ্ট্র আমরা কারও বিরোধী শিবির হতে চাই না। আমরা নিজেদের মধ্যে সংগঠিত হতে চাই।’ ব্রিকস জোটের বর্তমান এগারটি সদস্য দেশের আয়তন বিশ্বের আয়তনের ৩০ শতাংশ, জনসংখ্যা পৃথিবীর জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ। এ দেশসমূহ বিশ্বের ৪০.১ শতাংশ খনিজ তেল, ৩৬ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস, ৭৮ শতাংশ কয়লা, ৫০ ভাগ আকরিক লোহা, ৪০ শতাংশ ভুট্টা এবং ৪৬ শতাংশ গম উৎপাদন করে। ব্রিকস দেশগুলোর জিডিপি বিশ্বের বর্তমান জিডিপির ৪১ শতাংশ। বিশ্ব জিডিপিতে জি-৭ ও ব্রিকসের অংশীদারত্বের একটা তুলনামূলক পরিসংখ্যান দিলে ব্রিকসের অর্থনৈতিক ক্ষমতার ক্রমবর্ধমানশীলতা অনুধাবন করা সহজ হবে। ১৯৯৫ সালে বিশ্ব জিডিপি’র ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশের অংশীদার ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জি-৭ দেশসমূহ। ব্রিকস দেশসমূহ অংশীদার ছিল মাত্র ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ জিডিপি’র। ২০১০ সালে জি-৭ এর বিশ্ব জিডিপিতে অংশ কমে হয় ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ব্রিকসের অংশ বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৩ সালে বিশ্ব জিডিপিতে জি-৭ এর অংশীদারত্ব কমে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ব্রিকসের দেশসমূহের অংশীদারত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৬ সালে বিশ্ব জিডিপিতে জি-৭ এর অংশীদারত্ব ২৯ শতাংশে স্থির রয়েছে এবং ব্রিকসের দেশসমূহের অংশীদারত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ শতাংশ। মাত্র একত্রিশ বছরে ব্রিকস দেশসমূহ বিশ্ব জিডিপিতে অংশীদারত্বে জি-৭ দেশসমূহকে পিছে ফেলে অনেক এগিয়ে গেছে। ব্রিকস দেশসমূহের মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানিকারক প্রধান দশটি দেশের মধ্যে ছয়টি দেশ। এরা সম্মিলিতভাবে সমগ্র পৃথিবীর ৩০ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ করে। এদের মধ্যে সৌদি আরব (১২ শতাংশ), রাশিয়া (১১ শতাংশ), চীন (৫ শতাংশ), ব্রাজিল, আরব আমিরাত, ইরান (প্রত্যেকে ৪ শতাংশ করে) বাজার অংশীদারত্ব। অর্থনৈতিক জোট হিসেবে ব্রিকস এখন সবচেয়ে শক্তিশালী জোট এবং ২০২৪ সালে নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এটির শক্তিমত্তা নতুন মাত্রায় উত্তীর্ণ হয়েছে। আবার চীন, ভারত, রাশিয়া, সৌদি আরব, ব্রাজিল সম্মিলিতভাবে বিশ্বে উৎপাদিত তেলের ৩০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক হচ্ছে তেলের ব্যবসা। ব্রিকস দেশগুলো নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সমাঝোতার মাধ্যমে স্বীয় মুদ্রায় তেল কেনাবেচার মাধ্যমে ডি-ডলারাইজেশন বা বি-ডলারিকরণের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। ২০১৫ সালের ২১ জুলাই ব্রিকস দেশসমূহ নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) নামে নতুন একটি বহুমুখী উন্নয়ন ব্যাংকের গোড়াপত্তন করে। বাংলাদেশসহ ১০টি দেশ এর সদস্য। ব্যাংকটির প্রাথমিক অনুমদিত মূলধন হচ্ছে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং পরিশোধিত মূলধন ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারপারসন হচ্ছেন ব্রাজিলের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান দিলমা রুসেফ। এনডিবি ঋণ, গ্যারান্টি ও অন্যান্য আর্থিক উপকরণের মাধ্যমে সরকারি বা বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্প সমর্থন ও অনুদান প্রদান করবে। ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে ব্যাংকটিকে আরো শক্তিশালী করার প্রসঙ্গটি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে। ব্রিকসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সদস্য দেশসমূহের জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়া এবং স্বায়ত্তশাসন অর্জন করার প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমা আধিপত্যের মোকাবিলা করা। সেক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্যের মূল বাহন ডলারের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সদস্য দেশসমূহের মধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য প্রচলন করার জন্য ব্রিকস মুদ্রা চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যা ‘ডি-ডলারাইজেন’ বা ‘বি-ডলারিকরণ’ নামে পরিচিত। ২০২২ সালে ১৪তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষণা করেছিলেন, ‘ব্রিকস দেশগুলো এমন এক মুদ্রাব্যবস্থা চালু করবে, যা দিয়ে একটি নতুন বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা চালু করা যাবে।’ এটি মার্কিন ডলারের আধিপত্যের জন্য সরাসরি হুমকি হবে এবং এর আধিপত্য খর্ব করতে সাহায্য করবে। যদিও ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিকসের নেতৃবৃন্দ ‘ব্রিকস মুদ্রা’ বিষয়ে কার্যকর কোন সিদ্ধান্ত নেননি। ব্রিকস মুদ্রার বিষয়টি স্থগিত থাকলেও এটিই হচ্ছে বর্তমান ডলার শাসিত বৈশ্বিক বাণিজ্যে মুখ্য আলোচ্য ইস্যু। ডলারের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার যে বড় তারতম্য তৈরি হচ্ছে এবং তার প্রেক্ষাপটে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা লাঘব করার জন্য একটি অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা চালু জরুরি। ব্রিকস মুদ্রা নিয়ে সিদ্ধান্ত না হলেও ব্রিকস সদস্যসমূহের ভেতরে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য করার বিষয়টি উৎসাহিত করা হয়। ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে সর্বসম্মতিতে গৃহীত নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিযোগের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে নিজ নিজ দেশের জাতীয় মুদ্রা বা স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যৌথ ঘোষণায় ব্রিকস দেশগুলোর ভেতরে অংশীদারত্বের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জ্বালানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা আরো বৃদ্ধি করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। আগামীদিনে ব্রিকসের আর্থিক প্রভাব আরো বৃদ্ধি পাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য খর্ব করে বহুমেরুকেন্দ্রিক যে বিশ্বব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছে তা আরও সম্প্রসারিত ও শক্তিশালী হবে ব্রিকসের অগ্রগতির সাথে সমানুপাতিকভাবে। ব্রিকসের মাধ্যমে গ্লোবাল সাউথভুক্ত দেশসমূহের পশ্চিমা বিশ্বের সাথে বার্গেনিং করার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। রাশিয়া এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে চীনের মুদ্রা আরএমবি (ইউয়ান) ব্যবহার করছে এবং আরএমবি এখন রাশিয়ায় সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করা মুদ্রা। ব্রাজিল ও চীন মার্কিন ডলার বাদ দিয়ে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করছে। অর্থ প্রদানের জন্য আরএমবি (ইউয়ান) ব্যবহার করার বিষয়ে সৌদি আরব বেইজিংয়ের সঙ্গেও আলোচনা করছে। এসবই মার্কিন ডলারের আধিপত্যকে আরো খর্ব করবে। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংকার অ্যান্ডি শেক্টম্যান ডলারের ভবিষ্যত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, সৌদি আরব যদি ঘোষণা দেয় যে, “আমরা এখন থেকে অন্যান্য মুদ্রায় তেল বিক্রি করবো। তখন দেখবেন যেসব দেশ গত ৫০ বছর ধরে ডলার ধরে রেখেছে, তারা আর তা ধরে রাখার আগ্রহ পাবে না। আর তারা সবাই যদি ডলার ‘আঁস্তাকুড়ে’ ফেলতে শুরু করে এবং আমি মনে করি এটি দ্রুতই ঘটবে, তাহলে এর প্রভাবে পশ্চিমে মুদ্রাস্ফীতির সুনামি দেখা দেবে।” ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন শেষে যে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’ সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয় তাতে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত পরিবর্তনসহ বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর সংস্কারের জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে এবং নিরাপত্তা কাউন্সিলে ভারত ও ব্রাজিলের স্থায়ী সদস্যপদের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বৈশ্বিক নেতৃত্বের জোর দাবিদার হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছে। ঘোষণাপত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম লঙ্ঘন করে ঢালাওভাবে শুল্ক আরোপ ও একতরফা সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য নীতির সমালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ২০২৫ সালের ২০ জানুযারি দ্বিতীয়বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ববাসীর বিরুদ্ধে যে শুল্কযুদ্ধ শুরু করেছে তার বিরুদ্ধে সতর্ক উচ্চারণ করা হয়েছে। ঘোষণাপত্রে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিকস সদস্যরা যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং বাধাহীন মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার যেকোনও নীতির বিরোধিতা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৬৭ সালের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তের ভিত্তিতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিশ্ব পরিস্থিতি ও ব্রিকস নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমরা এমন একটি সময়ে অতিবাহিত করছি যখন সারা পৃথিবী একটি অশান্ত এবং রূপান্তরের কালে প্রবেশ করেছে। এটি একটি বৃহৎ স্থানান্তর, বিভাজন এবং পুনর্গঠনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে যা আরও বেশি অনিশ্চয়তা, অস্থিতিশীলতা এবং ভাবনার অতীত উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সকল দেশের জন্য উন্নয়ন হলো এক অবিচ্ছেদ্য অধিকার, গুটিকয়েক দেশের সংরক্ষিত সুযোগ নয়। এই পৃথিবীতে রয়েছে বহু সভ্যতা ও বিকাশের পথ এবং পৃথিবীর এমনটিই হওয়া উচিত। কোনো একটি বিশেষ সভ্যতা বা পদ্ধতি দিয়ে মানুষের ইতিহাস শেষ হবে না।’ ব্রিকসে নতুন অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘অনেকগুলো দেশ ব্রিকস সহযোগিতা মেকানিজমের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেছে। আমাদের দরকার উন্মুক্ততা, অন্তর্ভুক্তি এবং উভয়েই বিজয়ী হওয়ার মতো সহযোগিতার চেতনায় কাজ করতে বেশি বেশি দেশকে ব্রিকস পরিবারে অন্তর্ভুক্ত করা। এইভাবে গ্লোবাল গভার্ননেন্সকে অধিকতর সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত করার জন্য আমরা আমাদের বুদ্ধিমত্তা ও শক্তিকে কাজে লাগাতে পারি।’ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী নতুন নতুন দেশ, অর্থনৈতিক শক্তি যদি ব্রিকসে শামিল হয় তবে তা পশ্চিমাদের বিশ্ব নিয়ন্ত্রণকে খর্ব করে অ-পশ্চিমা তথা গ্লোবাল সাউথ একটা শক্তিশালী বলয় তৈরি করবে। যা পৃথিবীকে নির্দিষ্ট দেশ, গোষ্ঠীর নাগপাশ থেকে মুক্ত করবে। বিশ্ব হবে গণতান্ত্রিক ও বহুমেরু বিশিষ্ট। ব্রিকস যত বড় হবে, যত শক্তিশালী হবে, এনডিবি যতই আইএমএফ, বিশ্বব্যাংককে প্রতিস্থাপন করতে থাকবে ততই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা এগিয়ে যাবে, শক্তিশালী হবে। লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..