সমুদ্রের ১৭ মিটার নিচে আধুনিক মানববাসস্থান ‘ভ্যানগার্ড’

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিজ্ঞান ডেস্ক : এবার সমুদ্রের তলদেশে বসবাসের ক্ষেত্রে শুরু হয়েছে নতুন এক অধ্যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপকূলে চালু হয়েছে সম্পূর্ণ কার্যকর পানির নিচের বাসস্থান বা ‘সাবসি হ্যাবিট্যাট’। বিজ্ঞানী ও বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ডাইভাররা এই স্থাপনায় কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত অবস্থান করে সামুদ্রিক গবেষণা পরিচালনা করতে পারবেন। সমুদ্র প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান ‘ডিপ’ তৈরি করেছে ‘ভ্যানগার্ড’ নামের এই পানির নিচের বাসস্থান। ল্যাবরেটরি, শয়নকক্ষ এবং ডাইভিং স্টেশনের সমন্বয়ে নির্মিত স্থাপনাটিতে একসঙ্গে চারজন গবেষক বা ক্রু সদস্য থাকার সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা কিজ ন্যাশনাল মেরিন স্যাংকচুয়ারির টেনেসি রিফ এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭ মিটার গভীরে একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্মের ওপর ভ্যানগার্ড স্থাপন করা হয়েছে। সমুদ্রের তলদেশেই গবেষণাগার ভ্যানগার্ডের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো গভীর সমুদ্র থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন নমুনা তাদের স্বাভাবিক পরিবেশ ও চাপের মধ্যেই পরীক্ষা করা। সাধারণত সমুদ্রের গভীর থেকে কোনো জীব, উদ্ভিদ বা অন্যান্য নমুনা ওপরে নিয়ে এলে পানির চাপ দ্রুত পরিবর্তিত হয়। এতে নমুনার কোষীয় ও আণবিক গঠনে পরিবর্তন ঘটতে পারে। ফলে গবেষকদের পক্ষে গভীর সমুদ্রে নমুনাটির প্রকৃত অবস্থা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। ভ্যানগার্ডের গবেষণাগারে সমুদ্রের তলদেশের চাপ বজায় রেখেই নমুনা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা করা সম্ভব হবে। এতে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, প্রবালপ্রাচীর এবং গভীর সমুদ্রের পরিবেশ সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে। নাসার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জলচারী ও ভ্যানগার্ডের প্রথম দিকের ক্রু সদস্য ডন কার্নাগিসের মতে, সমুদ্রের নিচে দীর্ঘ সময় অবস্থানের সুযোগ বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। দীর্ঘসময় পানির নিচে থাকার সুযোগ ভ্যানগার্ড একটি বড় ডিকম্প্রেশন চেম্বারের মতো কাজ করে। এর ভেতরের বাতাস ও বায়ুচাপ নিয়ন্ত্রিত রাখায় বাসিন্দারা ‘স্যাচুরেশন ডাইভার’ হিসেবে দীর্ঘ সময় সমুদ্রের নিচে থাকতে পারবেন। সাধারণ স্কুবা ডাইভিংয়ে একজন ডাইভার গভীর পানিতে সীমিত সময় কাজ করতে পারেন। কিন্তু ভ্যানগার্ডের বাসিন্দারা প্রতিবার পানির ওপরে ফিরে না এসে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে সমুদ্রের তলদেশে অবস্থান করতে পারবেন। হ্যাবিট্যাটের সঙ্গে যুক্ত বিশেষ নলের মাধ্যমে ডাইভাররা সরাসরি অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় গ্যাস পাবেন। ফলে তারা স্টেশন থেকে বেরিয়ে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সমুদ্রের তলদেশে গবেষণা, নমুনা সংগ্রহ এবং মেরামতের কাজ করতে পারবেন। খোলা দরজা দিয়েই সরাসরি সমুদ্রে যাত্রা ভ্যানগার্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলোর একটি হলো ‘মুন পুল’। এটি হ্যাবিট্যাটের মেঝের নিচে থাকা একটি খোলা প্রবেশপথ, যা সরাসরি সমুদ্রের পানির দিকে উন্মুক্ত। ভেতর ও বাইরের চাপ সমান রাখায় দরজাটি খোলা থাকলেও হ্যাবিট্যাটের ভেতরে পানি প্রবেশ করে না। ডাইভাররা এই পথ দিয়ে সরাসরি সমুদ্রের তলদেশে যেতে এবং কাজ শেষে আবার স্টেশনে ফিরে আসতে পারেন। পানির নিচের স্টেশনটির সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠে থাকা একটি ভাসমান বয়া বিশেষ কেব্লের মাধ্যমে যুক্ত। এই বয়া থেকে হ্যাবিট্যাটে বাতাস, বিদ্যুৎ এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ সরবরাহ করা হয়। এর মাধ্যমে মূল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সঙ্গে ক্রু সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগ রাখতে পারেন। হ্যাবিট্যাটে স্বাদুপানির সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের পানি নিরাপদভাবে অপসারণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আরও বড় প্রকল্পের পরিকল্পনা ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিপ জানিয়েছে, ভ্যানগার্ড তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রাথমিক ধাপ। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ সালের মধ্যে ‘সেন্টিনেল’ নামের আরও বড় ও উন্নত পানির নিচের বসতি চালু করতে চায়। সেন্টিনেল প্রকল্প সফল হলে পৃথিবীর বিভিন্ন মহীসোপান অঞ্চলে অস্থায়ী কিংবা স্থায়ীভাবে মানুষের বসবাসের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেখানে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও ডাইভাররা দীর্ঘ সময় অবস্থান করে গবেষণা ও সামুদ্রিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। বিজ্ঞান ছাড়াও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বর্তমানে ভ্যানগার্ডকে প্রধানত বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সামুদ্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পটির সঙ্গে মহাকাশ প্রযুক্তি, তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রতিরক্ষা খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আগ্রহও রয়েছে। ভবিষ্যতে সাবসি হ্যাবিট্যাট শুধু বিজ্ঞানীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের কাছেও পরিচিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি শিল্পী, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ইতিহাসবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের সমুদ্রের তলদেশে নিয়ে গিয়ে সেখানকার পরিবেশ সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা দেওয়ার কথা ভাবছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সমুদ্রের নিচে দীর্ঘমেয়াদি মানববসতি চালুর এই উদ্যোগ সামুদ্রিক বিজ্ঞান, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং গভীর সমুদ্র অনুসন্ধানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..