জাতিসত্তা

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্প্রীতি ও উন্নয়ন

সঞ্জীব দ্রং

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে একটি দিবস আছে এটি হয়তো অনেকে খেয়াল করেন না। ২০০১ সালে ইউনেস্কো সর্বজনীন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। পরের বছর ২০০২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৫৭/২৪৯ রেজুলেশনের মাধ্যমে ২১ মে ‘ওয়ার্ল্ড ডে ফর কালচারাল ডাইভারসিটি ফর ডায়ালগ এন্ড ডেভেলপমেন্ট’ হিসেবে ঘোষিত হয়। দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে গুরুত্বপূর্ণ এই দিবসটি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। অনেক শিক্ষিত মানুষ এই বিষয়ে অবগত বলে আমার মনে হয় না। পরবর্তীতে ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল সময়কে জাতিসংঘ ‘সংস্কৃতির সম্প্রীতি দশক’ ঘোষণা করে, যেখানে পারস্পরিক বোঝাপড়াকে বিকশিত করা এবং জ্ঞান, সংস্কৃতি, নৃতাত্ত্বিক, ভাষাগত ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। কেন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ- এই প্রশ্নের উত্তরে ইউনেস্কো বলেছে, পৃথিবীর বড় বড় সংঘাতের ৪ ভাগের ৩ ভাগই সাংস্কৃতিক সংঘাত থেকে সৃষ্ট। সংস্কৃতির কারণে যে ব্যবধান রচিত হয়, তার দ্রুত নিরসন হওয়া জরুরি শান্তি, স্থিতি ও উন্নয়নের জন্য। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উন্নয়নের চালিকা শক্তি। এটি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং মানুষের আধ্যাত্মিক, আবেগ, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এমন একটি সম্পদ, যা দারিদ্র্য দূরীকরণ ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয়। একই সাথে ইউনেস্কো বলছে, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য শুধু স্বীকৃতি প্রদানই যথেষ্ট নয়, একে গ্রহণ ও উদযাপনের মধ্য দিয়ে সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ সাধন করতে হবে। এজন্য মিডিয়া ও তথ্যপ্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। আমাদের দেশ ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও জাতি বৈচিত্রের দেশ। জেন্ডার বৈচিত্র্য ও প্রতিবন্ধীতার বৈচিত্র্য নিয়েও আজকাল আলোচনা হচ্ছে। জোহান্সবার্গ ঘোষণাপত্রের শ্লোগান ছিল, ‘আমাদের সমৃদ্ধ বৈচিত্র্য, আমাদের সম্মিলিত শক্তি।’ ইউনেস্কো কনভেনশনে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বোঝার জন্য ৪টি লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো: সংস্কৃতি গঠনের জন্য টেকসই পদ্ধতিকে সহযোগিতা করা, সাংস্কৃতিক সামগ্রী ও সেবার ভারসাম্যপূর্ণ প্রবাহ অর্জন, টেকসই উন্নয়ন কাঠামোতে সংস্কৃতিকে সম্পৃত্তকরণ এবং মানবাধিবার ও মৌলিক স্বাধীনতার বিকশিতকরণ। এই কনভেনশনে শুরুতে বলা হয়েছে, ‘আত্ম-পরিচিতি, বৈচিত্র্য ও বহুত্ব’ মানবতার কমন ঐতিহ্য। মানবতার এই কমন ঐতিহ্যকে (হেরিটেজ) স্বীকৃতি দিতে হবে এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। এভাবে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য থেকে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের দিকে অগ্রসর হতে হবে। শুধু তাই নয়, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে উন্নয়নের জন্য অন্যতম ফ্যাক্টর হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশটা সুন্দর ও বৈচিত্র্যময়। এখানে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-সুরমা নদী আছে, আবার সাংগু-মাইনি-সোমেশ্বরী-সীমসাং-চেংগী-বুগাই নদী আছে। আর স্মরণাতীত কাল ধরে আছে গারো, হাজং, সাঁওতাল, খাসিয়া, মনিপুরী, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুন্ডা, কোচ, বানাই, হদি, লুসাইসহ নানা জাতির মানুষ। এখানে ২০১৯ সালের মার্চ মাসে ৫০টি আদিবাসী জাতিসত্তার স্বীকৃতি দিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট একটি সমীক্ষায় পেয়েছে দেশে ভাষা আছে ৪১টি। এখানে বাংলা ও উর্দু বাদে বলা যায় ৩৯টি ভাষা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের ভাষা। সরকারের এই প্রতিষ্ঠান বলছে, এদের মধ্যে কমপক্ষে ১৪টি ভাষা বিপন্ন। এই বিপন্ন ভাষাগুলো আদিবাসী মানুষের মাতৃভাষা। বাংলাদেশ বহু জাতি, বহুভাষাভাষী ও বহু সংস্কৃতির মানুষের দেশ- এভাবে চিন্তা করলে আমাদের দেশটা সুন্দরতর হয়। বৈচিত্র্যের মধ্যে সৌন্দর্য ও ঐকতান- কথাটি আমাদের জন্য প্রযোজ্য। কত জাতি, কত ভাষা, কত বর্ণ, কত সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের এক পৃথিবী। আমাদের কমন হোম। এক ধরিত্রী, এক ঠিকানা। আমরা সকলে মানুষ। আদিবাসী, বাঙালি সকলে। সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই, কথাটি যেন মনে ধারণ করি। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উদযাপনের জন্য মানব মর্যাদার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। সাংস্কৃতিক অধিকার অর্জন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ তৈরি করে। আবার বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ভাষার বহুত্ববাদ, শিল্পকলা, প্রযুক্তি জ্ঞান ও বিজ্ঞান শিক্ষায় সমান অধিকার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে। সমাজে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্মানীয় হলে তা ফলপ্রসূ ডায়ালগকে সহায়তা করে ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করে। শুধু তাই নয়, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সমাজে সামাজিক বন্ধন, পারস্পরিক সহযোগিতা, যোগাযোগ, উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা, সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যময়তাকে শক্তি হিসেবে গ্রহণ করা এবং উদযাপন করা জরুরি। বৈচিত্র্য কোনো হুমকি নয়, বরং সৌন্দর্য–কথাটির মর্মার্থ সবার মাঝে ছড়িতে দিতে হবে। মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে শ্রদ্ধাবোধ জাগানোর একটি সংস্কৃতি আমাদের গড়ে তুলতে হবে। কবি শামসুর রাহমান ‘কথা ছিল’ কবিতায় লিখেছেন, ‘প্রত্যেককে দেখাব অনিন্দ্য সূর্যোদয়।’ অন্য ধর্মের কারণে, ভিন্ন ভাষাভাষি ও সংস্কৃতির কারণে কেউ যেন বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার না হন। একটি সুন্দর অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় সকল ধর্মের ও সংস্কৃতির মানুষ অকাতরে অংশগ্রহণ করেছিলেন, জীবন দিয়েছিলেন। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বিখ্যাত লেখক, রেক্স নিটলফোর্ড বলেছিলেন, আপনি ভূ-পৃষ্ঠের দিকে তাকান, সেখানে নানা ধরনের অনেক গাছ দেখতে পাবেন, কিন্তু সেটি অভিন্ন ভূ-পৃষ্ঠ বা ল্যান্ডস্কেপ। ধরিত্রী সম্পর্কে মানুষের ভাবনা এমনি হওয়া উচিৎ। আমাদের দেশে মানুষকে, সমাজ ও সংস্কৃতিকে এই দৃষ্টিতে দেখার মানুষের সংখ্যা বাড়াতে হবে। উন্নয়ন ও শান্তির জন্য একে অন্যকে শ্রদ্ধা ও সম্মান না করে আমাদের উপায় নেই। পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্যই মানব সমাজকে এই ভিন্নতাকে স্বীকার করে নিতে হবে, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সত্যকে মেনে নিতে হবে। সরকারকে এ কাজে অগ্রণী ভূমিকার পালন করতে হবে। সমাজে সহনশীলতা ও সহমর্মিতাকে এগিয়ে নিতে হবে। মানুষদের মধ্যে আমরা যদি সংলাপ ও আলোচনার সংস্কৃতি চালু করতে পারি, তবে একটি ইনক্লুসিভ সংবেদনশীল সমাজ গড়ে উঠবে। ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস চলে গেল। আমরা ব্যাপক উদযাপন করলাম। রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য হয়েও নিজে পালন করেনি। তবে বাধাও দেয়নি। বরং কোথাও কোথাও সহযোগিতা করেছে। আশা করি ভবিষ্যতে সব ভ্রান্তি দূর হবে। আদিবাসী মানুষ সম্মানীয় শ্রদ্ধেয় হবে। দেশে একটি জাতীয় আদিবাসী নীতি হবে। আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতি নিয়ে একসাথে আমরা এগিয়ে যাবো। এজন্য পরিবারে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈচিত্র্যের শক্তি, সহনশীলতা ও পরমত সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে হবে, যা টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, আদিবাসী ফোরাম

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..