দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: মানুষের জীবন বাঁচাতে চাই গণমুখী অর্থনীতি
দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম দ্রব্যমূল্য। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি- প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সীমিত আয়ের মানুষ প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার হিসাব কষতে বাধ্য হচ্ছেন। শ্রমজীবী, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, এমনকি নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিজীবীরাও আজ আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে জনগণ যে স্বস্তি প্রত্যাশা করেছিল, তার প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আশা করেছিল বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাজারের ওপর প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার চিত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। ফলে শাসক বদলেছে, কিন্তু বাজারের চরিত্র এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকাংশেই আগের মতোই রয়ে গেছে।
এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই জনগণের সমস্যার সমাধান হয় না। অর্থনৈতিক নীতির চরিত্র বদলাতে হবে, মুনাফাকেন্দ্রিক বাজারব্যবস্থার পরিবর্তে জনস্বার্থকেন্দ্রিক নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং সিন্ডিকেট ও লুটপাটের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিতে হবে। রাষ্ট্র যদি বাজারের ওপর কার্যকর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘব হবে না। জনগণ শুধু নতুন সরকার নয়, নতুন ধরনের শাসন, জবাবদিহি এবং জনমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই প্রত্যাশা করে।
সিপিবি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রশ্নকে বাজারের অবাধ মুনাফার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, কৃষি উপকরণ ও গণপরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বাজারের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, অসাধু মজুতদার ও কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং সরকারি বিপণন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা আজ সময়ের দাবি।
কৃষকরাও আজ ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। উৎপাদক কৃষক তার ফসলের ন্যায্য দাম পান না, অথচ শহরের ভোক্তাকে সেই পণ্য কিনতে হয় কয়েক গুণ বেশি দামে। উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী ও মুনাফাখোর চক্র লাভবান হয়। এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে সমস্যার মূল কেবল উৎপাদনে নয়, বণ্টন ও বাজার ব্যবস্থায়।
অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষের মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না। মূল্যস্ফীতির চাপে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। ফলে মানুষ সঞ্চয় তো দূরের কথা, প্রয়োজনীয় খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয়ও বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, মুনাফার সর্বোচ্চীকরণ নয়। এমন একটি অর্থনীতি প্রয়োজন, যেখানে উৎপাদনের পরিকল্পনা, বাজার তদারকি এবং সম্পদের বণ্টন জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে। গণবণ্টন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, টিসিবির কার্যক্রম আরও কার্যকর ও সর্বজনীন করা, কৃষি ও খাদ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থায় বৈষম্য কমানো এখন জরুরি।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন