বেলুচদের ন্যায্য স্বাধীনতার পাশে দাঁড়াক বাংলাদেশ
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘদিন লড়াই করে যাওয়া জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বেলুচদের নাম সবার আগেই আসবে। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে বেড়ে ওঠা এই জাতিগোষ্ঠী বহুদিন আগে থেকেই ব্রিটিশদের মানচিত্র কাটাকুটির খেলায় ত্রিধাবিভক্ত হয়ে তিন দেশের ভেতর অবস্থান করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেলুচদের অবস্থান পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে; অনেকে আছে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তানে, ডুরাল্ড লাইনের খপ্পরে পড়ে কেউ পড়েছে আফগান সীমানার ভেতর।
এর মধ্যে স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে বেশি লড়াইয়ের মধ্যে আছে পাকিস্তান অধ্যুষিত বেলুচিস্তান। জেনে রাখা ভালো, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দ্বিজাতিতত্ত্বকে ভিত্তি করে পাকিস্তান যখন ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছিল, বেলুচিস্তান তার মধ্যে ছিল না। সেসময় এই এলাকা ছিল ‘খানাত অব কালাত’, স্বাধীন প্রিন্সলি স্টেট। পাকিস্তান ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করার পর এই ‘খানাত অব কালাত’-ও নিজেদের আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল। পরে ১৯৪৮ সালে এটি পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই যোগদান আপসে হয়েছে বলে পাকিস্তান জোর গলায় দাবি করে এলেও বেলুচ ইতিহাসবিদদের অনেকেরই ভাষ্য- সামরিক আর রাজনৈতিক চাপে বেলুচদের পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য করা হয়েছিল, যা জাতিগোষ্ঠীটির বেশিরভাগ মানুষ কখনোই মন থেকে মেনে নেয়নি। যার ফলশ্রুতিতে প্রায় ৮ দশক ধরেই সেখানে স্বাধীনতার আন্দোলন জারি রয়েছে।
ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তানের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী প্রদেশ এই বেলুচিস্তান। জনসংখ্যা অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় অত্যন্ত কম, মাত্র দেড় কোটি। অথচ এই প্রদেশেই রয়েছে পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক সম্পদ। কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গওদর বন্দর। এসব বিবেচনায় বেলুচিস্তানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব সূচকে তাদের দিকে পাকিস্তান সরকারের নজর নেই বললেই চলে। মোদ্দা কথা, পাকিস্তানি শাসকরা বেলুচদের নিজেদের লোক মনে করে না, কিন্তু ওই ভূমির সব সম্পদ শুষে নিয়ে ইসলামাবাদ, সিন্ধু, পাঞ্জাবের উন্নতিতে কাজে লাগায়। যেমনটা তারা করেছিল এককালের পূর্ব পাকিস্তান, এখনকার স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সঙ্গে। যে চিত্রটা তাই আমাদের সহজেই বোঝার কথা।
এই যে অর্থনৈতিক শোষণ এই শোষণের কথা বললেই, ন্যায্য হিস্যা দাবি করলেই গর্জে উঠে পাকিস্তানের সেনা মদদের সরকার। আদতে এই ‘গ্যারিসন কান্ট্রির’ সব সরকারই আসলে সেনাবাহিনীর আমলার কাজ করে। জনগণের কথার মূল্য সেখানে নেই বললেই চলে, সেনা কর্মকর্তাদের চাওয়াই আসল। সেই চাওয়ার সঙ্গে না মিললে খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই যে ক্ষমতাচ্যুত করে অনেকটা বিনা বিচারে বা প্রহসনের বিচারের নামে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা যায় (কখনো কখনো নির্বাসনে পাঠানো বা জানে মেরে ফেলার ঘটনাও তো কম ঘটেনি) অধুনা ইমরান খানই তার সাক্ষী। এমন একটা দেশ যেখানে সেনাপ্রধানের প্রভাব প্রধানমন্ত্রী/রাষ্ট্রপতির চেয়ে বেশি; যিনি বিচারেরও ঊর্ধ্বে। হায় সেলুকাস।
সেই দেশে বেলুচরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, তাদের ওপর হয়ে যাওয়া শোষণ-বঞ্চনার প্রতিকার হিসেবে স্বাধীনতা চেয়ে আসছে। সশস্ত্র লড়াইও চালাচ্ছে। মাহরাং বেলুচদের মতো অনেকে শত ভয়ভীতি, বাধা উপেক্ষা করে, প্রিয়জনের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে প্রবল আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। গেরিলারা শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়ে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হচ্ছে।
ইসলামাবাদ তোতাপাখির বুলি আওড়ে যাচ্ছে। তারা এই মুক্তিকামীদের বলছে সন্ত্রাসী, কখনো কখনো ভারতের তাঁবেদার। অথচ বেলুচদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার নিগূঢ় যে কারণ সেদিকে মনোযোগী হচ্ছে না। চীনও চোখ বুজে আছে, কারণ ওই অঞ্চলে তার বিপুল বিনিয়োগ, সেটা যেন নষ্ট না হয় সেদিকেই তার সবচেয়ে বেশি নজর। আবার চীনকে যেন ঝামেলায় ফেলা যায় সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রও যে বেলুচদের ব্যবহার করার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে না- তাই বা কে বলতে পারে!
কিন্তু এ সবকিছু ছাপিয়েও বেলুচদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মিথ্যা হতে পারে না। সংস্কৃতি হোক, কী ইতিহাস, বেলুচদের স্বাধীনতার দাবির যৌক্তিকতা কোনোভাবেই কমে না। যে নৈতিকতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ পাকিস্তান নামক একটি নিষ্পেষণের কাঠামোর শৃঙ্খল ভেঙে নিজেদের মুক্ত করেছিল, ওই ভিত্তিতেই বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবি তুমুলভাবে যৌক্তিক হয়ে ওঠে। সেই দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করা আমাদের কেবল রাজনৈতিক কর্তব্য নয়, নৈতিক কর্তব্যও।
প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার এবং সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করার কথা আমাদের সংবিধানেই জোর দিয়ে বলা আছে।
অর্থাৎ, আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতিই আমাদের বলছে বেলুচিস্তানের পাশে দাঁড়াতে। বেলুচরা মুক্তি পাক, একবিংশ শতাব্দিতে তারা উদাহরণ হিসেবে আবির্ভূত হোক; বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামও সফল হোক। জয় বাংলা।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন