আফ্রিকায় মানুষ ও হাতির সংঘাত আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা

একতা ডেস্ক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আফ্রিকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে মানুষ ও বন্য হাতির মধ্যে সংঘাত দ্রুত বাড়ছে। মানুষের বসতি, কৃষিজমি, রাস্তা ও বেড়া সম্প্রসারণের কারণে হাতিদের প্রাকৃতিক চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। নতুন এক গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি শতাব্দীর শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার বেশ কিছু অঞ্চলে এই সংঘাত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। নামিবিয়া, বতসোয়ানা, অ্যাঙ্গোলা ও জাম্বিয়ার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গত দুই দশকে দ্রুত ভূমি পরিবর্তন ঘটেছে। বনভূমি ও তৃণভূমির বড় অংশ কৃষিজমি, বসতি ও অন্যান্য মানবিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে হাতির আবাসস্থল এবং এক সংরক্ষিত এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়ার প্রাকৃতিক পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গবেষকেরা ২০০৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মানুষ ও হাতির সংঘাতের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁরা দেখতে পেয়েছেন, মানুষের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভূমির অতিরিক্ত ব্যবহার সংঘাত বৃদ্ধির প্রধান কারণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির সংকটও কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গবেষণায় কম্পিউটারভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে ভবিষ্যতের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ২০৮৫ সালের মধ্যে মানুষ ও হাতির উচ্চ সংঘাতপূর্ণ এলাকার পরিমাণ বর্তমানের তুলনায় ৩৩ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে দ্রুত কৃষিকাজ বিস্তৃত হচ্ছে এবং মানুষের বসতি হাতির চলাচলের পথের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, সেখানে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। আফ্রিকার সাভানা হাতি শুধু একটি বড় বন্য প্রাণী নয়, বরং ওই অঞ্চলের বাস্তুব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা বন ও তৃণভূমির গঠন পরিবর্তন করে, পানির উৎস তৈরিতে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন উদ্ভিদের বীজ ছড়িয়ে দেয়। ফলে বহু প্রাণী ও উদ্ভিদের অস্তিত্ব পরোক্ষভাবে হাতির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মানুষের তৈরি রাস্তা, বেড়া ও বসতি হাতিদের স্বাভাবিক পথ আটকে দিচ্ছে। খাদ্য ও পানির সন্ধানে হাতির পাল তখন কৃষিজমি ও জনবসতির দিকে চলে আসে। তারা ক্ষেতের ফসল খেয়ে ফেলে, ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনার ক্ষতি করে এবং কখনো কখনো মানুষ বা গবাদিপশুর জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। স্থানীয় মানুষের কাছে এসব ঘটনা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ। অনেক পরিবার কৃষির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এক রাতের হাতির আক্রমণে তাদের কয়েক মাসের খাদ্য বা আয় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এর ফলে ক্ষুব্ধ মানুষ অনেক সময় হাতিকে তাড়াতে গিয়ে আহত হন বা প্রতিশোধ হিসেবে হাতি হত্যা করেন। গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইভান প্যাট্রিকের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। নামিবিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশটির পরিবেশ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের গবেষকেরাও এতে অংশ নেন। গবেষকেরা নামিবিয়ার এমন ৩৮টি এলাকার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন, যেখানে প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। নামিবিয়ার জাম্বেজি অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অঞ্চলটি আর্দ্র ও কৃষিকাজের জন্য উপযোগী হওয়ায় সেখানে দ্রুত কৃষিজমি বাড়ছে। একই সঙ্গে এটি হাতিদের গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথ। ফলে মানুষ ও হাতির ব্যবহৃত এলাকা ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, নামিবিয়ায় হাতির মাধ্যমে ফসলের ক্ষতিই মানুষ ও হাতির সংঘাতের সবচেয়ে সাধারণ রূপ। এ ধরনের ক্ষতি অনেক সময় বন্য প্রাণীভিত্তিক পর্যটন বা নিয়ন্ত্রিত শিকার থেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠী যে অর্থ আয় করে, তার চেয়েও বেশি হয়ে থাকে। এতে সংরক্ষণ কার্যক্রমের প্রতি স্থানীয় মানুষের আগ্রহ ও সমর্থন কমে যেতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চলে সংরক্ষণ উদ্যোগের কারণে বর্তমানে প্রায় তিন লাখ হাতি সুরক্ষিত রয়েছে। কয়েক দশক ধরে চোরাশিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে হাতির সংখ্যা কমে যাওয়ার পর কিছু এলাকায় তাদের সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করেছে। তবে আবাসস্থল সংকুচিত হলে এই সংরক্ষণ সাফল্য স্থায়ী নাও হতে পারে। গবেষকেরা মনে করেন, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। সংঘাতের প্রধান কারণ যেহেতু ভূমির ব্যবহার, তাই পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন কৃষিজমি, রাস্তা বা বসতি নির্মাণের সময় হাতির চলাচলের পথ খোলা রাখা, নিরাপদ বনাঞ্চল সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের ক্ষতিপূরণব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হাতি তাড়ানোর নিরাপদ পদ্ধতি, আগাম সতর্কতাব্যবস্থা এবং ফসল রক্ষার কার্যকর কৌশল চালু করলে ক্ষতি কমানো সম্ভব। গবেষকদের মতে, মানুষ ও হাতি উভয়ের প্রয়োজন বিবেচনা করে ভূমি পরিকল্পনা করা গেলে ভবিষ্যতের বড় সংঘাত এড়ানো যেতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের জীবিকা যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্য প্রাণীও টিকে থাকার সুযোগ পাবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..