ট্রেন্ডের প্রজন্ম এবং অদৃশ্য আধিপত্য

মীর নাসিমুল ইসলাম সেলিম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ইতিহাসে এমন সময় খুব কম এসেছে, যখন একটি প্রজন্মের হাতে এত প্রযুক্তি ছিল, অথচ তার চিন্তার ওপর এত অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ছিল। একটি প্রজন্মের সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রযুক্তি নয়; তার বিচারবোধ। প্রযুক্তি মানুষকে তথ্য দিতে পারে, কিন্তু প্রজ্ঞা দিতে পারে না। অ্যালগরিদম হাজারো মতামত হাজির করতে পারে, কিন্তু কোনটি সত্যের কাছাকাছি- সেই সিদ্ধান্ত মানুষকেই নিতে হয়। আমরা এমন এক সময়ে আছি, যেখানে তরুণদের হাতে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি, কিন্তু একই সঙ্গে সবচেয়ে আগ্রাসী মনোযোগ-অর্থনীতি। এখানে মানুষের সময়, মনোযোগ, রাগ, ভালোবাসা সবকিছুই প্রতিযোগিতার পণ্য। তাই প্রশ্নটি আর শুধু “জেন-জি কেমন?” নয়। প্রশ্ন হলো কেমন সমাজ, কেমন অর্থনীতি এবং কেমন ডিজিটাল সংস্কৃতি একটি প্রজন্ম তৈরি করছে? তিন যুগ, তিন ধরনের মানুষ প্রত্যেক যুগ তার প্রয়োজন মতো মানুষ তৈরি করে। ঔপনিবেশিক শাসন তৈরি করেছিল প্রতিরোধের মানুষ। মুক্তিযুদ্ধ তৈরি করেছিল সংগ্রামী মানুষ। আর একবিংশ শতাব্দির ডিজিটাল পুঁজিবাদ তৈরি করছে এক নতুন মানুষ- “স্ক্রল-মানুষ”। সে খবর পড়ে না, খবরের প্রতিক্রিয়া দেখে; বই পড়ে না, বইয়ের রিভিউ দেখে; ইতিহাস বোঝে না, ইতিহাসের ক্লিপ দেখে। যে কি না পড়ে কম, দেখে বেশি; ভাবে কম, প্রতিক্রিয়া জানায় বেশি; সংগঠিত হয় কম, ট্রেন্ড অনুসরণ করে বেশি। আজকের তরুণদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের বয়স নিয়ে নয়; তাদের চেতনা নিয়ে। আর সেই চেতনার স্থপতি তারা নিজেরা নয়। সেটি নির্মাণ করছে বাজার, অ্যালগরিদম এবং ভোগবাদী সংস্কৃতি। ত্যাগের প্রজন্ম চার দশক আগের তরুণদের জীবন ছিল কঠিন, কিন্তু তাদের চিন্তা ছিল দীর্ঘমেয়াদি। বিদ্যুৎ কম ছিল, তথ্য সীমিত ছিল, কিন্তু বই ছিল তাদের প্রধান শিক্ষক। একটি মত গড়ে উঠত পাঠচক্রে, সংগঠনে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বিতর্কে। তারা জানত, ইতিহাসে স্থায়ী কিছু অর্জন করতে হলে ত্যাগের বিকল্প নেই। একটি চাকরির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করা, একটি আন্দোলনের জন্য মাসের পর মাস সংগঠন গড়ে তোলা, ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া, এসব ছিল তাদের শিক্ষার অংশ। তাদেরও ভুল ছিল, পরাজয়ও ছিল। কিন্তু একটি বড় পার্থক্য ছিল, তারা ট্রেন্ডের রাজনীতি করত না; তারা বিশ্বাসের রাজনীতি করত। তারা বুঝত, সমাজ পরিবর্তন কোনো মুহূর্তের আবেগে নয়, দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আসে। ট্রেন্ডের প্রজন্ম এবং অদৃশ্য আধিপত্য আজকের তরুণের হাতে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি। একটি স্মার্টফোনেই গ্রন্থাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদপত্র। কিন্তু প্রযুক্তি কি মানুষকে মুক্ত করছে, নাকি নিয়ন্ত্রণ করছে? কার্ল মার্ক্স লিখেছিলেন, “প্রতিটি যুগেই শাসক শ্রেণির ধারণাই সমাজের প্রভাবশালী ধারণায় পরিণত হয়”। ডিজিটাল যুগে সেই আধিপত্যের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে অ্যালগরিদম। ফলে মানুষ মনে করে সে স্বাধীনভাবে মত গড়ছে, অথচ তার মনোযোগ, ক্ষোভ, পছন্দের বড় অংশই অদৃশ্যভাবে নির্মিত হচ্ছে। এই কারণেই আজ তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে, কিন্তু প্রজ্ঞার নয়। আগের প্রজন্ম তথ্যের অভাবে বই পড়ত। আজকের প্রজন্ম তথ্যের প্রাচুর্যে পড়ার প্রয়োজনই অনুভব করে না। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও দিয়েই তারা ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামত গঠন করে ফেলে। আন্তোনিও গ্রামসি যাকে বলেছিলেন “সাংস্কৃতিক আধিপত্য”, আজকের ট্রেন্ড-সংস্কৃতি সেটিরই আধুনিক রূপ। মানুষ প্রতিবাদও করে, কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষাটিও তাকে শিখিয়ে দেয় সেই ব্যবস্থাই, যার বিরুদ্ধে সে দাঁড়াতে চায়। দৃশ্যের রাজনীতি গি দ্য বোর্দ লিখেছিলেন, আধুনিক সমাজে বাস্তবতা ক্রমশ প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই ভবিষ্যদ্বাণীকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে। এখন আন্দোলনের শক্তি তার নৈতিক ভিত্তিতে নয়, বরং কত দ্রুত তা ভাইরাল হয়- সেখানে মাপা হয়। ফলে সংগ্রামের চেয়ে সংগ্রামের দৃশ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হারবার্ট মারকুস সতর্ক করেছিলেন, ভোগবাদী সমাজ এমন মানুষ তৈরি করে যে নিজেকে স্বাধীন মনে করে; অথচ তার চাহিদা, রুচি বাজার তৈরি করে দেয়। অ্যালগরিদম-নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল সংস্কৃতি সেই প্রক্রিয়াকে আরও গভীর করেছে। ২০২৪ থেকে ২০২৬ : একই শিক্ষা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে। সময়ের সঙ্গে আন্দোলনের ভেতরে নানা রাজনৈতিক স্লোগান ও এজেন্ডা যুক্ত হতে থাকে। ফলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল- মূল দাবিটি কোথায় হারিয়ে গেল? ২০২৬ সালের জুলাইয়েও শিক্ষা, বন্যা, পরীক্ষার অনিশ্চয়তা নিয়ে যৌক্তিক ক্ষোভের পাশাপাশি এমন রাজনৈতিক প্রতীক সামনে এসেছে, যার সঙ্গে মূল দাবির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না। শিক্ষাটা একটাই- যখন একটি আন্দোলন নিজের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা স্পষ্ট রাখতে পারে না, তখন অন্য শক্তিগুলো তার ভেতরে নিজেদের উদ্দেশ্য প্রবেশ করায়। আন্দোলন তখন আর শুধু আন্দোলনকারীদের থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। আমাদের সময়ের সংকট : আজকের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়, প্রযুক্তিগতও নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো, চিন্তার জায়গা দখল করে নিয়েছে ট্রেন্ড। যে সমাজে অ্যালগরিদম শিক্ষক হয়ে যায়, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হয়। যে সমাজে ইনফ্লুয়েন্সার বুদ্ধিজীবীর জায়গা নেয়, সেখানে মতাদর্শ নির্বাসিত হয়। যে সমাজে প্রতিবাদও ভিউ-লাইক-শেয়ারের প্রতিযোগিতায় বন্দি হয়, সেখানে সংগঠন দুর্বল হয় এবং নাগরিক ভোক্তায় পরিণত হয়। আমাদের তরুণদের দোষ দেওয়া সহজ। কিন্তু তাদের এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে যে অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা, তাকে প্রশ্ন করাই আজ বেশি জরুরি। একসময় মানুষ ইতিহাস পড়ে রাজনীতি শিখত। এখন রাজনীতি শেখে ট্রেন্ড দেখে। একসময় নেতা খোঁজা হতো আদর্শে। এখন খোঁজা হয় ফলোয়ারের সংখ্যায়। একসময় সংগ্রামের মূল্য নির্ধারিত হতো ত্যাগে। এখন নির্ধারিত হয় রিচ, রিলস ও রিঅ্যাকশনে। জাতি গড়ে ত্যাগে, ট্রেন্ডে নয় : এই রূপান্তর কোনো প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর। এর বিরুদ্ধে লড়তে হলে শুধু নতুন প্রযুক্তি নয়, নতুন চেতনা দরকার; শুধু দ্রুত ইন্টারনেট নয়, গভীর পাঠ দরকার; শুধু ক্ষণিকের আবেগ নয়, দীর্ঘ সংগঠন দরকার। ইতিহাস কখনও ট্রেন্ডের হাতে লেখা হয় না। ইতিহাস লেখে সংগঠিত মানুষ- যাদের হাতে থাকে আদর্শ, মাথায় থাকে বিচারবোধ, আর হৃদয়ে থাকে ত্যাগের সাহস। তাই এই সময়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তরুণদের নিন্দা করা নয়; তাদের চিন্তার অস্ত্র ফিরিয়ে দেওয়া। বই, বিতর্ক, সংগঠন, ইতিহাসচর্চা, এসবই একটি গণতান্ত্রিক ও সচেতন সমাজের ভিত্তি। ট্রেন্ড বদলায় প্রতিদিন। ইতিহাস বদলায় প্রজন্মের হাতে। আর যে প্রজন্ম ত্যাগের ভাষা ভুলে যায়, ইতিহাস তাকে স্মরণ করে না, ব্যবহার করে। ত্যাগের উত্তরাধিকার কেউ জন্মগতভাবে পায় না; সমাজ তাকে শেখায়। কিন্তু যে সমাজ তরুণদের হাতে বইয়ের বদলে শুধু স্ক্রিন, সংগঠনের বদলে শুধু ট্রেন্ড আর ইতিহাসের বদলে শুধু অ্যালগরিদম তুলে দেয়, সে সমাজ একদিন নিজেই ত্যাগের অনাথ হয়ে পড়ে। জাতি গড়ে ত্যাগে, ট্রেন্ডে নয়। লেখক : সদস্য, সিপিবি, টাঙ্গাইল জেলা কমিটি মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব লেখকের। -সম্পাদক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..