কমরেড এ কে এম বজলুর রহমান এক আলোকবর্তিকার স্মরণে

বিকাশ সাহা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

সময়ের প্রবাহে অনেক মুখ, অনেক স্মৃতি ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন, যাদের জীবন ও কর্ম কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতির বিষয় নয়; তারা হয়ে ওঠেন একটি আদর্শ, একটি রাজনৈতিক-সাংগঠনিক ঐতিহ্য এবং একটি সময়ের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতীক। কমরেড এ কে এম বজলুর রহমান ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। ৪ জুন কমরেড এ কে এম বজলুর রহমানের ২৩তম প্রয়াণ দিবস। বজলু ভাই ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যাদের পরিচয় কোনো পদ-পদবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, কমিউনিস্ট সংগঠক, শ্রমজীবী মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আদর্শ ও সংগ্রামের পথে উদ্বুদ্ধ করে যাওয়া এক আলোকবর্তিকা। শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন থেকে তিনি একদিনের জন্যও বিচ্যুত হননি। কমরেড বজলুর রহমান বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সূত্রাপুর থানা কমিটির সভাপতি ছিলেন, ঢাকা মহানগর কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্রজীবনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন সত্তরের দশকে। তিনি বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নেরও একজন সংগঠক হিসেবে আশি ও নব্বইয়ের দশকে সূত্রাপুরে সংগঠনের বিস্তারে এবং নতুন প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্য ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যেই তার সংগ্রাম শেষ হয়নি। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি আজীবন সমাজতন্ত্রের আদর্শে অবিচল থেকেছেন। সূত্রাপুরের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে পাকিস্তান পর্ব দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চল কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তিক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। কিংবদন্তি কমিউনিস্ট নেতাদের পদচারণায় সমৃদ্ধ এই এলাকার মানুষের মধ্যে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সংগ্রামী চেতনা এবং সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধতা গড়ে উঠেছিল, কমরেড বজলুর রহমান ছিলেন তার অন্যতম ধারক ও বাহক। তিনি বিশ্বাস করতেন–সংগঠন কেবল রাজনৈতিক কর্মীদের সমাবেশ নয়; এটি একটি বৃহত্তর পরিবার। সেই কারণেই তার নেতৃত্বে সূত্রাপুরে গড়ে উঠেছিল সংগ্রাম, বন্ধুত্ব ও মানবিকতার এক অনন্য সংস্কৃতি। সাধারণ জীবনযাপন, উদার মনন, হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব, বন্ধু বৎসল তবে নীতিতে দঢ় এবং আদর্শের প্রশ্নে আপোসহীন অবস্থান তাকে মানুষের হৃদয়ের খুব কাছের মানুষে পরিণত করেছিল। স্বাধীনতার পরে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কমরেড ওসমান গণির নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে শোষণমুক্ত-সমাজতান্ত্রিক দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে যারা সূত্রাপুর অঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টি ও প্রগতিশীল গণসংগঠনের বিস্তারে এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম কমরেড বজলুর রহমান। সাধারণ-সরল জীবন, চিন্তা-চেতনায় উদারতা আর আদর্শের প্রতি অবিচল অবস্থানের কারণে বজলু ভাইয়েরা খেটে খাওয়া মানুষের প্রাণের সখা ছিলেন। তাইতো সেসময়ে সূত্রাপুরে গড়ে উঠেছিল শ্রমজীবী মানুষের ঐকতান। দারিদ্র্যকে জয় করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সংগ্রামের প্রতীক। তার সান্নিধ্যে এলে সংকোচ দূর হতো, সাহস জন্মাতো, মানুষ নিজের শক্তিকে নতুন করে আবিষ্কার করতো। বয়সের ব্যবধান জয় করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমার ও আমাদের পরম বন্ধু, আত্মীয়। কমরেড বজলুর রহমান ও তার সতীর্থ কমরেডবৃন্দ সোভিয়েত পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কমিউনিস্ট পার্টিতে যে বিভক্তি দেখা দেয় তার আঁচ লাগতে দেননি সূত্রাপুরে। প্রত্যেক কমরেডের পরিবার যেন সব কমরেডের পরিবার এমন ধারায় পার্টি ও গণসংগঠন বিস্তৃত সূত্রাপুরে। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে যখন ঢাকায় কমিউনিস্ট পার্টি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করে তখন থেকেই সূত্রাপুরে পার্টির সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। প্রকাশ্য ও গোপন পার্টি সংগঠনের বিস্তারে সূত্রাপুরের মাটি আর মানুষের রয়েছে বিশাল অবদান। এখানকার মানুষ কিংবদন্তি কমিউনিস্ট নেতা কমরেড জ্ঞান চক্রবর্তী, কমরেড অনীল মুখার্জী, কমরেড জীতেন ঘোষ, কমরেড নেপাল নাগ, কমরেড সোমেন চন্দ, কমরেড হাতেম আলী খান, কমরেড সুনীল রায়সহ অসংখ্য কমরেডদের প্রতিপালন করেছেন, সেল্টার দিয়েছেন। বৃটিশ ও পাকিস্তানী আমলে নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির বেশ কয়েকটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল (বাড়ি) ছিল সূত্রাপুর এলাকায়। আর সে কারণেই এখানকার কমরেডদের মধ্যে কমিউনিস্ট ঐতিহ্য, আবেগ, ভালোবাসা, কঠোরতা, সাংগঠনিক নিষ্ঠা সঞ্চারিত হয়েছে এবং হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। ন্যাপ নেতা সরদার হালিম, সৈয়দ মনসুর আহমেদ, আব্দুল হামিদ খান মজলিস (চান) এ অঞ্চলে বামপন্থি, প্রগতিশীল রাজনীতির বিকাশে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কমরেড ওসমান গণির হাত ধরে আবু ভাই, মাধব দা, লতিফ ভাই, ইলিয়াস ভাই, বজলু ভাই, আসমত ভাই, মোসলেহ ভাই, সামসউদ্দিন ভাই, রতন দা, রেহানা আপা, পরিমল দা, শংকর দা সেতু বন্ধনের কাজ করেছেন অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের সাথে পরবর্তী প্রজন্মের কমরেডদের। আবু ভাই, আসমত ভাই, রতনদা, মোসলেহ ভাই আর শংকর দা ছাড়া অন্যরা সকলেই আজ প্রয়াত। তবুও সূত্রাপুরে পার্টির লাল পতাকা বহমান। তারা পূর্বসূরীদের ঐতিহ্য ধারণ করে প্রজন্মান্তরে কমিউনিস্ট আদর্শ ও সংগ্রামের ধারা ছড়িছে দিতে কাজ করছে। বিলোপবাদীদের দুরভিসন্ধি খারিজ করে ১৯৯৩ সালে ঢাকা মহানগরে কমরেড মোর্শেদ আলী, কমরেড আব্দুল মালেক, কমরেড দিবালোক সিংহের নেতৃত্বে পার্টি পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়। ১৯৯৪-৯৫ সালে একঝাঁক তরুণ ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় পার্টি সংগঠনের নেতৃত্বে আসে। সে সময়ে ১৯৯৪ সালে সূত্রাপুর থানা সম্মেলনে কমরেড এ কে এম বজলুর রহমান সভাপতি এবং আমি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। একই সময়ে পার্টির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক কমরেড আব্দুল্লাহ আল কাফী রতন তেজগাঁও থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কমরেড মাহবুবুল হক রিপন রমনা থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ছাত্র আন্দোলনের বন্ধু রিপন ভাই বহুকাল আগেই আদর্শচ্যুত হয়ে বিপরীতমুখী যাত্রা শুরু করেছেন বলে শুনেছি। ১৯৯৪ থেকে ২০০১ সময়কালে টানা তিন মেয়াদে বজলু ভাই আর আমি সূত্রাপুর থানা কমিটির নেতৃত্বে ছিলাম। আমি আসলে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা মহানগর কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই পার্টি সূত্রাপুর থানা কমিটির নেতৃত্বে আসি। কিন্তু বজলু ভাই আমার সব দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা, অজ্ঞতা ছাপিয়ে আমাকে আজকের বিকাশে পরিণত করেছেন। তার এবং থানা কমিটির অন্যদের সহযোগিতায় আমি এই দায়িত্ব পালনকালে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করতে পেরেছিলাম। মাধব দা, বজলু ভাই, আবু তাহের ভাই (আমার শিক্ষক), মুরাদ ভাই, কাজলদা, জাহিদ ভাই এর সাথে আমরা মিলে সূত্রাপুরে একটা টিমওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল। এর বাইরে ডা. পি কে রায়, অধ্যাপক মুমিনুল হক, জহিরুল ইসলাম, জহির মল্লিক, অমল চক্রবর্তী, শামীম আওলাদ খান, জয়প্রকাশ চৌধুরী এবং সাথে একদল ছাত্র কমরেড আমাদের সাহস জুগিয়েছেন। তারা ঐক্য, রাজনৈতিক শৃঙ্খলা এবং সাংগঠনিক ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও সূত্রাপুরে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ধারাবাহিকতা অটুট আছে। রাজনীতি হলো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র আর সংগঠন হলো সেই ক্ষেত্র দখল করে মানুষের বসবাস উপযুক্ত ও নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনের হাতিয়ার। এজন্য প্রয়োজন হয় রাজনৈতিক তত্ত্ব, দর্শন ও অর্থনৈতিক নীতি এবং শক্তিশালী ও জনভিত্তিসম্পন্ন সংগঠন। বজলু ভাইয়েরা আমাদের সে কাজে উদ্বুদ্ধ করেছেন তাদের কর্মনিষ্ঠা আর আদর্শনিষ্ঠা নিয়ে। কিন্তু আমরা কজন সেই কঠিন সংগ্রামের পথে, আদর্শের পথে সংগঠন ও জনভিত্তি বিস্তারে সততার সাথে কাজ করছি, সেটা বড় প্রশ্ন। বজলু ভাইয়ের জীবন আমাদের শেখায়–রাজনীতি শুধু ক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। সংগঠন শুধু কাঠামো নয়; এটি বিশ্বাস, ভালোবাসা, ত্যাগ ও সংগ্রামের সমষ্টি। তিনি তার জীবন দিয়ে এই শিক্ষা রেখে গেছেন। কমরেড এ কে এম বজলুর রহমান ২০০৩ সালে ৪ জুন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হয়েছেন। কিন্তু মানুষ চলে গেলেও তার আদর্শ, শিক্ষা ও সংগ্রামের উত্তরাধিকার রয়ে যায়। তার রক্ত পতাকা হাতে আজও আমরা বহমান সকল প্রকার শোষণ-বৈষম্য উচ্ছেদ করে মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। কমরেড বজলুর রহমান লাল সালাম। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, সূত্রাপুর থানা কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..