হামে মৃত্যু ৭০০ ছাড়াল দায় কার?
হামে শিশু মৃত্যু সাতশ পেরিয়ে গেছে। দেশে এত শিশুর মৃত্যুন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। গত ২৬ জুন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘হামের প্রাদুর্ভাব: মৃত্যু ৭০০ ছাড়াল’। সেদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে মারা গেছে ৬০৯ শিশু। নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৯৩ শিশুর। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৭০২।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ৮৬৯ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এছাড়া ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা ৯৭ হাজার ৫২২। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে ১০৭ জন। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ১১ হাজার ৫৪৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮১ হাজার ২৮৩ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৭৭ হাজার ৬১৩ জন।
হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনা কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতির একটি উদাহরণ মাত্র। মূলত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে টিকা কেনায় চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডের কারণেই দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে।
তৎকালীন ড. ইউনূসের সরকার দায়িত্ব নিয়ে টিকা সংগ্রহের পুরনো পদ্ধতি বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করেছিল। সে সময় ইউনিসেফের কর্মকর্তারা একাধিকবার সরকারের উচ্চপর্যায়ে সতর্ক করে জানিয়েছিল, নতুন সিদ্ধান্ত ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। টিকা সংগ্রহে ১২ মাস বিলম্ব ঘটবে। কিন্তু সরকার ইউনিসেফের সতর্কবার্তা শোনেনি।
বর্তমান সরকার হামের প্রাদুর্ভাব কমাতে পারছে না? টিকার ঘাটতি থাকতে পারে, কিন্তু প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সাধারণ যেসব পদক্ষেপ সরকার নিতে পারে। সংক্রমণের শিকার শিশুকে আলাদা করা, তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা, সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা, একটা টাস্কফোর্স বানিয়ে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় করা, এসব কাজের উদ্যোগ তো গ্রহণ করা যেতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকার সংকটই বড় কথা নয়। সংক্রমণ ঠেকানোর প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলো যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি। হাসপাতালের আইসিইউ বাড়ানোর চেয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণই বেশি জরুরি ছিল। আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা হয়নি। তাবু খাটিয়ে হলেও আইসোলেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এসব দায়ও সরকার ও কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।
চিকিৎসকদের মতে, হামে সব বয়সের মানুষ আক্রান্ত হতে পারে; তবে শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। চিকিৎসকরা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট, যা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতিকে উন্মোচিত করেছে।
হাম সমাজে সৃষ্টি হওয়া চরম বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি। হামে শিশু মৃত্যুর দোষীদের কেউ আইনের আওতায় আনছে না। হামে শিশু মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলেও সরকার দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’’ কিন্তু আমরা কি সংবিধানের এই মৌলিক অধিকারের বিধান মানছি? হামে প্রতিটি শিশুমৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয় এটি আমাদের সমষ্টিগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। হামে শিশু মৃত্যুর দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন